Skip to main content
Internet Archive's 25th Anniversary Logo

Full text of "Panchti Upanyas"

See other formats


পাঁচটি উপন্যাস 








পিন চিনি 


. ০. 0 ভি 
চু 2106.53 


ও ৮৬ না উট 


72/0111 07291৭%3 
0) 
71980118২০১ 


1981৭ 1০. 978-81-8374-0657-8 
প্রচ্ছদ 
সুব্রত চৌধুরী 
অলংকরণ 
সুব্রত মাঝি 


মূল্য 


২৫০.০০ 


12101151091 
7দা72581712বিধো। 
3/1 0০0109939 7০৬, 140152815 700 0099 
71701895 2241 1175, 94330 75550, 98308 06799 


ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক পত্র ভারতী, ৩/১ কলেজ রো, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে প্রকাশিত 
এবং হেমপ্রভা প্রিন্টিং হাউস, ১/১ বৃন্দাবন মল্লিক লেন, কলকাতা ৭০০ ০০৯ থেকে মুদ্রিত। 


পত্র" ভারতী প্রকাশিত বই 
একটা দেশ চাই 


প্রসঙ্গ ত 


দেখতে-দেখতে এই পৃথিবীতে পঁচান্তরটি বছর কাটিয়ে দিলাম। গত শতাব্দীর 
তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে এই শতকের প্রথম দশকের শেষাশেষি অবধি 
ব্যস্ত আমার জীবন। পঁচাত্তর পার করেও আমি বেঁচে আছি। 

এই দীর্ঘ সময়টা ভারতের তো বটেই, বিশেষ করে বাঙালির জীবনে কত 
উত্থানপতন যে ঘটে গেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, তুমুল স্বাধীনতা সংগ্রাম, 
নৌবিদ্রোহ, লালকেল্পলায় আই এন এর বীর সেনানীদের বিচারের নামে প্রহসন 
এবং তার প্রতিবাদে সারা ভারত জুড়ে তীব্র বিক্ষোভ, দাঙ্গা, দেশ-বিভাজন থেকে 
নানা ধরনের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা চলেছি। এর মধ্যে পাকিস্তান দুস্টুকরো 
হয়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র_বাংলাদেশ। এদিকে জঙ্গিহানা, 
মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়, লোকক্ষয়, নাশকতা, অনবরত কত কিছুই তো ঘটে 
চলেছে।' 

রাষ্ট্র তো তোলপাড় হচ্ছেই, বাঙালি মধ্যবিত্ু-জীবনকের এই উত্তাল সময় নানা 
দিক থেকে প্রচণ্ড ঝাকুনি দিয়ে চলেছে। দেশভাগের পর একদা শরণার্থী হয়ে এদেশে 
চলে এসেছিলাম। আমি মধ্যবিস্তদেরই একজন। আচটা আমার গায়ে কম লাগছে 
না। 

দীর্ঘকাল বেঁচে থাকলে অনেক কিছু দেখা যায়, অভিজ্ঞতা পরিধি বিস্তৃত হয়। 
পঁচাত্তর-পেরুনো জীবনে কত কিছুই তো প্রত্যক্ষ করেছি। যা দেখেছি, উপলব্ধি করেছি 
তার চেয়ে অনেক বেশি। বিপুলভাবে আলোড়িতও হয়েছি। 

লেখালেখি শুরু করেছিলাম উনিশশো চুয়ান্ন সালে। তারপর পঞ্চানন বছর ধরে 
অবিরল লিখেই চলেছি। পঞ্চান্টা বছর কম সময় নয়। এর মধ্যে নানা বিষয়বস্তু 
নিয়ে কত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ এবং খবরের কাগজের কলমে যা লিখেছি, ভাবলে 
নিজেই অবাক হয়ে যাই। যতদিন শ্বাসপ্রশ্থাস চালু থাকবে, লিখেও যাব। লেখকের 
এটাই নিয়তি। 

পঞ্ধান্ন বছরে যা লিখেছি, আমার সেই সব সৃষ্টি থেকে পাঁচটি উপন্যাস বেছে 
নিয়ে এই সংকলন প্রকাশিত হল। আশা করি, পাঠকের ভালো লাগবে। 


আগ 


পাচ টি উপন্যাস 


রণক্ষেত্র 

হঠাৎ বসস্ত 
আপন মনে 
মাঝখানে একজন 


অন্না বাপ 


৬৯ 
১৩৭. 
২৯৯ 
২৯১ 





প্রফুল্ল রায়__পাঁচটি উপন্যাস--২ 


ডির কাছ থেকেই রিকশা নিয়েছিল দীপা। অনেকগুলো অলিগলি ঘুরে এখন সেটা সঠিক 

রাস্তায় এসে পড়েছে। 

দীপা শুনেছে ব্রিটিশ আমলে রাস্তাটার নাম ছিল রবসন স্ট্রিট। স্বাধীনতার পর কলকাতা 
কর্পোরেশন নাম বদলে করেছে হরপ্রসাদ সরণি। হরপ্রসাদ চৌধুরি ছিলেন বিখ্যাত স্বাধীনতা-সংগ্রামী, 
পরাধীন ভারতে ইংরেজদের জেলে জীবনের অর্ধেক ক্ষয় করেছেন। তার নামেই এ-রাস্তার নাম। 

জায়গাটা দক্ষিণ কলকাতায়। এখানে এলে মনেই হয় না, এটা ক্যালকাটা মেট্রোপলিশের 
একটা অংশ। আশি কি নব্বুই লক্ষ মানুষের এই সুবিশাল শহরের ভিড়, চিৎকার, হইচই, টেনশন, 
উত্তেজনা, পোড়া গ্যাসোলিনের তীব্র গন্ধ-_কিছুই এখানে নেই। রাস্তাটা নির্জন, চুপচাপ একটা 
দ্বীপের মতো। 'পপুলেশন এক্সপ্লোশনে'র এই শহরের মধ্যে থেকেও যেন হরপ্রসাদ সরণি কলকাতার 
বাইরে। 

ঝকঝকে রাস্তাটার দু-ধারে প্রচুর গাছপালা-__দেবদারু, কৃষগ্চুড়া বা ঝাড়াল রেনট্রি। আর 
চোখে পড়ে বিরাট-বিরাট কমপাউন্ডওয়ালা একেকটা বাড়ি। বেশির ভাগই ব্রিটিশ আমলে তৈরি। 
গথিক স্ট্রাকচার, মোটা-মোটা থাম, সামনে সবুজ কার্পেটের মতো লন, ফুলের বাগান, টেনিস কোর্ট, 
লোহার ঘোরানো সিঁড়ি, ইত্যাদি-ইত্যাদি। 

সবে শীতের শুরু। সময়টা ডিসেম্বরের গোড়ার দিক। দারুণ একটা ঠান্ডা এখনও পড়েনি। 
তবে উত্তুরে হাওয়া এর মধ্যেই এশহরে হানা দিয়ে যাচ্ছে। 

কিছুক্ষণ আগে ন'টা বেজেছে। কাছাকাছি কোনও একটা থানার সাইরেনের আওয়াজ থেকেই 
তা টের পাওয়া গেছে। 

দ্রুত একবার কবজি উলটে ছোট্ট ঘড়িটা দেখে নিল দীপা। নস্টা বেজে সাত। সে জানে 
দশটার ভেতর না পৌঁছুতে পারলে মপিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা হবে না। কাটায়-কীটায় দশটাতেই 
তিনি বেরিয়ে যান। হাতে এখনও প্রচুর সময়, তবু অসহ্য উদ্বেগে দীপার স্াযুগুলো স্টিলের তারের 
মতো টানটান হয়ে গেল। শুধু উদ্বেগই নয়, অদ্ভুত এক উত্তেজনা এবং মারাত্মক ভয়ও। 

এমনিতে দীপা খুবই সাহসী এবং তেজী ধরনের মেয়ে। ব্যক্তিত্বও তার প্রবল। কিন্তু 
মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে আসার আগে সাতটা দিন ভয়ে এবং অস্থিরতায় ঘুমোতে 
পারেনি। দু-পা বাড়িয়ে তিন পা পিছিয়ে গেছে। শেষপর্যস্ত ভয়টা অবশ্য কাটিয়ে উঠেছে, 
মণিমোহনের সঙ্গে দেখা না করে তার উপায় নেই। কেন না, যত দেরি হবে তার পক্ষে অবস্থা 
ততই বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। 

দীপার বয়স বাইশ-তেইশ। লম্বাটে ডিমের মতো মুখ। রং বেশ ফরসাই। ভাসা-ভাসা মাঝারি 
চোখ, পাতলা ঠোট, ধারালো নাক। ছোট কপালের ওপর থেকে চুলের ঘের। চুল বেশ ঘন আর 
কালো। সেগুলো একবেণী করে পিঠের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। 

পরনে একটা জেলজেলে সিক্কের প্রিন্টেড শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ, পায়ে ফম দামের ন্লিপার। 
সারা শরীরে এক টুকরো ধাতুর চিহ্ন পর্যস্ত নেই। না হার, না চুড়ি, না কিছু। বাহাতের কবজিতে 
স্টিলের সরু ব্যান্ডে ওয়েস্ট আ্যান্ড ওয়াচ কোম্পানির পুরোনো গোল লেডিজ ঘড়ি। ঘড়িটা ছিল 
দীপার মায়ের। এটা তাদের বহুকাল আগের প্রায় ভুলে-যাওয়া সুদিনের স্মৃতিচিহ্ৃ। পায়ের কাছে 
মাঝারি সাইজের চামড়ার সুটকেস। সুটকেসটা /য কত বছর.আগের, দীপা জানে না। ওটার মধ্যে 
রয়েছে কিছু শাড়ি জামা এবং টুকিটাকি কণ্টা জিনিস। 


রণক্ষেত্র ১১ 


এখন, এই ডিসেম্বর মাসে আকাশের কোথাও একটুকরো মেঘ বা কুয়াশা নেই। শীতের 
ঝকঝকে নীলাকাশ থেকে সকালের মায়াবী রোদ সোনালি ঢলের মতো নেমে এসেছে দক্ষিণ 
কলকাতার এই রাস্তাটায়। ঝলমল করছে চারদিক। 

এত বেলাতেও রাস্তায় লোকজন বেশ কম। মাঝে-মাঝে দু-চারটে প্রাইভেট কার, স্কুটার 
কি সাইকেল হুস করে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। 

কোনও দিকেই লক্ষ্য নেই দীপার। যদিও সে মণিমোহনদের বাড়ির নম্বর জানে এবং মাস 
দুই-তিন আগে এসে দেখেও গেছে, তবু পলকহীন পরপর বাড়িগুলো দেখে যাচ্ছে। 

আরও খানিকটা যাওয়ার পর মোড়ের মাথায় সাতষট্রি নম্বর বাড়িটা চোখে পড়ল। 
সঙ্গে-সঙ্গে বুকের ভেতর শ্বাস আটকে গেল দীপার। “এই, থামো, থামো”__কাপা গলায় রিকশা 
থামিয়ে, ভাড়া মিটিয়ে, সুটকেস হাতে নেমে পড়ল দীপা। 

সামনেই লোহার প্রকাণ্ড গেটওয়ালা বাড়িটার গায়ে পেতলের হরফে নম্বরটা বসানো 
রয়েছে। গেটের দুপাশ থেকে উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল, তার মাথা ঘন লতায় ঘেরা। গেটের ডান 
পাশের দেওয়ালে পেতলেরই ঝকঝকে প্লেটে বাড়িটার নাম এনগ্রেভ করে লেখা £ এমারেল্ড হাউস। 

রিকশাওয়ালা চলে গেছে। তারপরও অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল দীপা। বুকের ভেতর 
হৃৎপিগুটা আগেই থমকে গিয়েছিল। এখন সেখানে কয়েকশো ঘোড়া একসঙ্গে দৌড়তে লাগল। 
মিনিট কুড়ি-পঁচিশ আগে রিকশায় ওঠার সময় থেকে যে-ভয় এবং উৎকণ্ঠা এক মুহূর্তের জন্যও 
তার সঙ্গ ছাড়েনি, সেগুলো হঠাৎ হাজার গুণ বেড়ে গেল। 

মাত্র দশ গজ দূরে এমারেল্ড হাউসের বিশাল লোহার গেট। দীপা একবার ভাবল, ওখানে 
যাবে না। যদি মণিমোহন চ্যাটার্জি তার সঙ্গে দেখা না করেন, বা দেখা করলেও অপমান করে 
তাড়িষে দেন? তার চাইতে বরং আর-একটা রিকশা ডেকে ফিরেই যাওয়া যাক। 

পরক্ষণেই দীপার মনে হল, এমারেম্ড হাউসের দশ গজের মধ্যে এসে এখন আব ফিরে 
যাওয়া যায় না। তার শরীরিক এবং মানসিক যা-অবস্থা তাতে মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা 
হওয়াটা একাস্ত জরুরি। 

দীপা শুনেছে, মণিমোহন চ্যাটার্জি অত্যন্ত রাগী এবং বদমেজাজি, গম্ভীর এবং রাশভারি। 
প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব তার। তিনি একজন বড় ইন্তাস্ট্রিয়ালিস্ট। এ ছাড়া বড়-বড় তিন-চারটে কোম্পানির 
ডাইরেক্টুরও। তবু দীপা যেখানে এসে পৌঁছেছে সেখানে দাঁড়িয়ে এই লোকটার সঙ্গে শেষ যুদ্ধটা 
করতেই হবে। 

হয় এই যুদ্ধে সে জিতবে, নইলে চিরকালের মতো অন্ধকারে তলিয়ে যেতে হবে। মনের 
সবটুকু সাহস এবং জেদ জড়ো করে এলোমেলো পায়ে দীপা সামনের দিকে এগিয়ে গেল। 

গেটের কাছে আসতেই কোখেকে একটা ধবধবে উর্দিপরা নেপালি দারোয়ান মাটি ফুঁড়েই 
যেন ওধারে এসে দীড়াল। বলল, “কিসকো মাঙতা? 

দীপা বলল, “মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করতে চাই।' 

দারোয়ানের মোঙ্গলিয়ান মুখে রীতিমতো বিস্ময় ফুটল। চাপা চোখ দুটো অনেকখানি বড় 
করে দীপার পা থেকে মাথা পর্যস্ত দ্রুত একবার দেখে নিল সে। খেলো পোশাক, হাতে রং- 
উঠে-যাওয়া পুরোনো সুটকেস। এভাবে কেউ এ-বাড়িতে আসে না। দারোয়ান জানতে চাইল, বড়ে 
সাব অর্থাৎ মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে মোলাকাত করার ব্যাপারে আগে থেকে আ্যাপয়েম্টমেন্ট 
করা আছে কিনা। ূ 

দীপা মাথা নাড়ল-_ত্যাপয়েন্টমেন্ট করা নেই। 

দারোয়ান কপাল কুঁচকে বলল, “তব্‌ তো বহোত মুশকিল হো গিয়া।' 

দীপার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। উদ্িগ্ন মুখে সে বলল, ম্কীসের মুশকিল £ 


১২ পাঁচটি উপন্যাস 


দারোয়ান জানায়, আযাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া বড়ে সাব কারও সঙ্গে দেখা করেন না। 

দীপা ভয়ে-ভয়ে জিগ্যেস করল, “তাহলে কি দেখা হবে না? একটু ভেবে আবার বলল, 
“আমি খুব বিপদে পড়ে তার কাছে এসেছি।, 

দারোয়ান সন্দিশ্ধ চোখে কিছুক্ষণ দীপাকে লক্ষ্য করল। তারপর জিগ্যেস করল, “বড়ে সাবের 
সাথ আপনার কী দরকার? নৌকরি-উকরির জন্যে এসেছেন? 

দীপা অবাক হয়ে গেল, “নৌকরি-উকরি-_মানে চাকরি? 

হী? 

দারোয়ান একপাশে ঘাড় হেলিয়ে বুঝিয়ে দিল, অনেকেই চাকরি-বাকরির জন্য বড়ে সাবকে 
উত্যক্ত করে তোলে। তাই বড়ে সাবের কড়া হুকুম, চাকরির উমেদারদের যেন বাড়িতে ঢুকতে 
না দেওয়া হয়। দীপা যদি তেমন উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে, বড়ে সাবের সঙ্গে দেখা হবে না। 

দারোয়ানের কথায় সামান্য ভরসা পাওয়া গেল। জোরে শ্বাস টেনে দীপা দ্রুত বলে উঠল, 
না-না, আমি চাকরির জন্যে আসিনি ।' 

একটু চুপ করে থেকে দারোয়ান বলল, “আপনার সাথ বড়ে সাবের জান-পয়চান আছে? 

দারোয়ানটা একেবারে বিরুদ্ধ পক্ষের উকিলের মতো জেরা শুরু করে দিয়েছে। জবরদস্ত 
শিল্পপতির লোক তো-_মনে-মনে ভাবল দীপা। বলল, 'না-না, উনি আমাকে চেনেন না। কখনও 
দেখেননি ।' 

কী একটু ভাবল দারোয়ান। হয়তো দীপার চেহারা বা পোশাক-টোশাক দেখে তার কিছুটা 
করুণাই হয়ে থাকবে। বলল, “থোড়া ঠহ্র যাইয়ে। বড়ে সাবের কাছে আপনার কী নাম বলব? 

“নাম বলে লাভ নেই। বলবেন জরুরি কাজে একটি মেয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে 
এসেছে।' 

“ঠিক হ্যায়।” 

বন্ধ গেটের বাইরে দীপাকে দীড় করিয়ে দারোয়ান চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দীপার বুকের 
ভেতর ঝড় বয়ে যেতে লাগল যেন। মণিমোহন চ্যাটার্জি কি তার সঙ্গে দেখা করবেন? 

মিনিট তিনেক বাদে দারোয়ানটা ফিরে এল। আন্তে-আস্তে মাথা নেড়ে বলল, “মোলাকাত 
নেহী হোগা।” ৃ 

এমনিতে মোঙ্গলিয়ানদের ভাবলেশহীন মুখে সুখ-দুঃখ আনন্দ বা হতাশা, কিছুই তেমন ফোটে 
না। তবু দারোয়ানটাকে দেখে মনে হল, মণিমোহন চ্যাটার্জির সঙ্গে দীপাকে দেখা করিয়ে দিতে 
পারলে সে খুশিই হত। 

দেখা হবে না! অত্যন্ত হতাশ দেখাল দীপাকে। তার পা দুটো থরথর করে কাপতে শুরু 
করেছে। চারপাশের দৃশ্যাবলী দ্রুত ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। মনে হল, সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে 
না, হড়মুড় করে হাঁটু ভেঙে, ঘাড় গুঁজে পড়ে যাবে। 

কিন্তু কয়েক সেকেন্ড মাত্র। তার পরেই অদম্য এক সাহস এবং রাগ তার ওপর ভর 
করল যেন। নিজের অজান্তে সে চেঁচিয়ে উঠল, “দেখা না করে আমি যাব না। কিছুতেই না। 

দারোয়ানটা চমকে উঠল। কিছুক্ষণ আগেও যাকে ভীরু এবং কুঠিত মনে হয়েছে, খুব নীচু 
গলায় ভয়ে-ভয়ে যে কথা বলছিল, আচমকা তাকে এভাবে চিৎকার করতে দেখলে হৃকচকিয়ে 
যাওয়ারই কথা। দারোয়ান বোঝাতে চাইল, বড়ে সাব খুব ব্যস্ত আছেন, এখন কারও সঙ্গে কথা 
বলার সময় নেই তবার। ইচ্ছা হলে, দীপা তার ঠিকানা দিয়ে যেতে পারে। পরে সুবিধেমতো বড়ে 
সাব যোগাযোগ করে নেবেন। তখন দীপা তার জরুরি কথা বলার সুযোগ পাবে। 

গলার স্বর আর-এক পরদা চড়িয়ে দিল দীপা, “পরে নয়। এখনই তার সঙ্গে দেখা করতে 
দিতে হবে। 


রণক্ষেত্র ১৩ 


দারোয়ান এবার ভয়ে-ভয়ে বাড়িটার ভেতর দিকে তাকাল। তারপর মুখ ফিরিয়ে বলল, 
“দিদিজি, আপ যাইয়ে। চেল্লামেলি করলে বড়ে সাব বহুত গুস্সা করবেন।' 

কণ্ঠস্বর একই জায়গায় রেখে দীপা বলল, “গুস্সা করলে করবেন। তাতে আমার কিছু 
যায় আসে না। তুমি যদি দেখা করিয়ে না দাও, আমি গেটের বাইরে বসে থাকব। বাড়ি থেকে 
বেরুতে তো হবেই। তখন তোমার বড় সাহেবকে ধরব।” দারোয়ানকে প্রথম-প্রথম সে আপনি 
করেই কথা বলছিল। এখন প্রচণ্ড উত্তেজনার বশে “তুমি' করে বলতে শুরু করেছে। 

দারোয়ান খুবই বিপন্ন বোধ করল। সাহেব সকালের দিকটা নিজের ফ্যাক্টনি এবং অফিসের 
নানা কাজকর্ম নিয়ে মগ্ন হয়ে থাকেন। এই সময় হইচই করলে কাজে মন দিতে পারেন না। 
ফলে ভীষণ রেগে যান। এদিকে এই অচেনা মেয়েটা চেঁচামেচি করে তাকে কি ফেসাদেই না 
ফেলেছে। তাকে থামাবার জন্য হাতজোড় করে বলতে লাগল, “আপ আজ যাইয়ে দিদিজি। অন্য 
দিন আসুন, জরুর মোলাকাত করিয়ে দেব।' 

কিন্তু দারোয়ানের কাকৃতিমিনতি কিছুই কানে তুলল না দীপা। উন্মাদের মতো সে সমানে 
চিৎকার করে যেতে লাগল। 

যখন এই সব চেঁচামেচি চলছে সেই সময় ভেতর দিক থেকে একটা আধবুড়ো বেয়ারা 
গোছের লোক দৌড়তে-দৌড়তে গেটের কাছে চলে এল। শশব্যস্তে বলল, “কী হচ্ছে সব? কে 
এত হল্লা করছে? সাহেব রাগ করছেন 

দারোয়ান কিছু বলার আগেই দীপা বলে উঠল, “আমি হল্লা করছি। তোমাদের সাহেব 
যতক্ষণ আমার সঙ্গে দেখা না করছেন, আমি ঠেঁচিয়ে-েচিয়ে সাত পাড়ার লোক জড়ো করে 
ফেলব। যাও, বলো গিয়ে তোমার সাহেবকে ।' 

বেয়ারাটা হতভন্বের মতো দু-চার সেকেন্ড দাড়িয়ে রইল। তারপর উর্ধ্বশাসে বাড়ির দিকে 
ছুটল এবং একটু পরেই আবার ফিরে এসে বলল, “আসুন আমার সঙ্গে । দারোয়ানকে বলল, 
“গেট খোল ।' মন্ত্রচালিতের মতো দারোয়ান ধাতব শব্দ করে লোহার বিশাল গেট খুলে দিল। 


দুই 


আগে ভালো করে লক্ষ্য করেনি দীপা। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল, নুড়ির রাস্তা সোজা সামনের 
দিকে চলে গেছে। সেটার একদিকে সবুজ কার্পেটের মতো লন। সেখানে অনেকগুলো গার্ডেন 
আমব্রেলার তলায় বেতের সোফা-টোফা সাজানো। একটা মালি মোয়ার দিয়ে সমান মাপে ঘাস 
ছেঁটে যাচ্ছে। রাস্তাটার আর-এক দিকে নানারকম মরশুমি ফুলের বাগান। সেখানে অন্য একটা 
মালি বড় কীাচি দিয়ে ফুলগাছের বুড়ো পাতা বা শুকনো ডাল ছেঁটে দিচ্ছে। লনের ওধারে উঁচু 
কমপাউন্ড ওয়ালের গায়ে টানা ব্যারাকের মতো খানকয়েক ঘর গা-ঘেঁষার্ঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। 
দেখেই টের পাওয়া যায়, ওগুলো সার্ভেন্ট এবং মালিদের কোয়া্টার্স। 
নুড়ির রাস্তাটা সোজা গিয়ে বিরাট থামওয়ালা একটা তেতলা বাড়ির সিঁড়ির কাছে থেমেছে। 
বেয়ারাটার সঙ্গে নুড়ির রাস্তা পেরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে এল দীপা। এখানে মোটা- 
মোটা অগুনতি থাম লাইন দিয়ে দীড়িয়ে আছে। সিঁড়ির পেছনে চৌকো-চৌকো শ্বেত-পাথর বসানো 
অনেকখানি জায়গা জুড়ে বারান্দা। তারপর থেকে সারি-সারি ঘরগুলো। দরজা-জানালা বিরাট- 
বিরাট। জানালাগুলোর দুটো পরে পাল্লা। একটা খড়খড়ি, অন্যটা পালকাটা রঙিন কাচ। 
বেয়ারা একটা ঘর দেখিয়ে বলল, “এখানে একটু বসুন। বড় সাহেব এখনই আসবেন।, 
বেয়ারা চলে গেল। আর দীপা আস্তে-আস্তে সামনের প্রকাণ্ড ঘরটায় গিয়ে ঢুকল। 


১৪ পাঁচটি উপন্যাস 


গোটা ঘরটার মেঝে ছইঞ্চি পুরু দামি কার্পেটে মোড়া। চারদিকে কম করে সাত-আট 
সেট সোফা । এ ছাড়া সুদৃশ্য কাশ্মীরি কাঠের স্ট্যান্ডে পেতলের নকশাদার ফ্লাওয়ার ভাস। দুপাশের 
দেওয়াল কেটে কাচের পাল্লা বসিয়ে নানা ধরনের বই রাখা আছে। হিস্ট্রি সোশিওলজি 
আ্নপ্রোপোলজি থেকে শুর করে নানা সাবজেক্টের বই। তা ছাড়া আছে এনসাইক্লোপিডিয়া 
ব্রিটানিকা এবং ওয়ার্ড বুক সিরিজের সেট। এত বিচিত্র ধরনের বই জীবনে কখনও চোখে দেখেনি 
দীপা। 

একটা দেওয়াল ঘেঁষে উচু স্ট্যান্ডে টিভি । আরেকটা দেওয়ালের পুরোটা জুড়ে আ্যাকুয়েরিয়ামে 
নানা দেশের লাল নীল সবুজ হলুদ, এমনি বিচিত্র রঙের মাছেরা খেলা করছে। সিলিং থেকে 
ঝাড়লঠনের মতো আলোর ঝাড় নেমে এসেছে। দুই দেওয়ালে দুটো এয়ারকুলার। 

সুটকেস নামিয়ে একটা সোফার কোণের দিকে জড়োসড়ো হয়ে বসল দীপা। এখান থেকে 
লন মালি গেট ফুল অর্কিউ-_-সবই দেখা যাচ্ছে। 

দীপা আগেই শুনেছিল মণিমোহন চ্যাটার্জিরা বিরাট বড়লোক । শুনতে-শুনতে মোটামুটি 
একটা ধারণা করে নিয়েছিল। এখন বাড়ির ভেতর পা দিয়ে মনে হচ্ছে, যা সে ভেবেছিল, 
মণিমোহনরা তার চাইতে অনেক গুণ বেশি বড়লোক । 

হঠাৎ আবছাভাবে পায়ের আওয়াজ কানে এল। এই বিশাল ড্রইংরুমটার অনেকগুলো দরজা। 
চমকে মুখ ফেরাতেই দীপা দেখতে পেল, ভেতর দিকের দরজার কাছে মধ্যবয়সি একটি পুরুষ 
দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স ষাটের কাছাকাছি। গায়ের রং বাদামি। ছ+ফুটেরও বেশ হাইট। লম্বাটে ভরাট 
মুখ, চওড়া কপাল, ধারালো চিবুক, পুরু ঠোট এবং কঠিন চোয়াল। 

'বৃষস্কন্ধ' বলে একটা কথা আছে, ভদ্রলোককে দেখলে তাই মনে পড়ে যায়। ছড়ানো বিশাল 
কাধ তার, হাত দুটো হাটু ছাড়িয়ে নেমে এসেছে। মোটা-মোটা হাড়ের ফ্রেমে মজবুত সুদৃঢ় স্বাস্থ্য। 
কাচাপাকা চুল ব্যাক-ব্রাশ করা। 

সব চাইতে বিস্ময়কর তাঁর চোখ। গায়ের রং-এর মতোই মণি দুটো বাদামি। তার তাকানোর 
ভঙ্গি, মোটা রোমশ ভুরু, শক্ত চিবুকের গঠন- এ-সবের মধ্যে তার ব্যক্তিত্ব যতটা, তার চাইতে 
অনেক বেশি নিষ্ঠুরতা যেন ফুটে রয়েছে। এই মানুষটাকে ঘিরে কোথায় যেন মোটা-মোটা অদৃশ্য 
দেওয়াল খাড়া হয়ে আছে। সেগুলো ভেঙে তার কাছাকাছি যাওয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার। 

এমন এক প্রচণ্ড শক্তিমান প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুদ্ধ করে জেতা প্রায় অসম্ভব। এমারেন্ড 
হাউসে আসার আগে বারকয়েক শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দীপার। আরও একবার হল পনেরো 
ফুট দূরে দরজার ফ্রেমের নীচে দাড়ানো মানুষটিকে দেখে । নিজের অজান্তে কখন যে উঠে দাঁড়িয়েছে, 
দীপা টের পায়নি। সে বুঝতে পারছিল ইনিই মণিমোহন চ্যাটার্জি । 
দিয়ে তীক্ষ চোখে দীপাকে লক্ষ্য করতে লাগলেন তিনি। আযাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আসার জন্য বিরক্তিতে 
তার কপাল কুচকে আছে। দীপার জেলজেলে শাড়ি, রুল্ষ্ন চুল, খেলো চটি ইত্যাদি দেখতে-দেখতে 
বিরক্তির সঙ্গে তাচ্ছিল্য এবং কিছুটা ঘৃণাই যেন মিশল। 

মিনিটখানেক একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর মণিমোহন ঘরের মাঝখানে চঙ্গে এলেন। গম্ভীর 
কর্কশ গলায় বললেন, “গেটের কাছে দাঁড়িয়ে অসভ্যের মতো চিৎকার করছিল্লে কেন? 

ভয়ে কাঠ হয়ে যেতে-যেতে আচমকা দীপার মধ্যে কি একটা ম্যাজিক ঘটে গেল যেন। 
সে বুঝতে পারছিল, সমানে-সমানে যুদ্ধ না করে মিইয়ে বা কুঁকড়ে থাকলে মণিমোহন তাকে গুঁড়িয়ে 
ফেলবেন। দুর্জয় সাহস এবং জেদ নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। সেসব আবার ফিরে এল 
যেন। শ্থাসক্রিয়া আবার স্বাভাবিক হয়ে আসতে লাগল। ফুসফুসে অনেকখানি বাতাস টেনে দীপা 
বলল, “অসভ্যের মতো চিৎকার না করলে আগনি বাড়িতে ঢুকতে দিতেন না।' 


রণক্ষেত্র ১৫ 


ভেতরে-ভেতরে একটু থমকে গেলেন মণিমোহন। এরকম সাজগোজ এবং চেহারার একটি 
মেয়ে তার সামনে এসে ঘাড় নুইয়ে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে, এটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু সে 
যে এভাবে মুখের ওপর জবাব দেবে, মণিমোহন ভাবতে পারেননি । বললেন, “তুমি জানো না, 
আযাপয়েম্টমেন্ট ছাড়া আমি কারও সঙ্গে দেখা করি নাঃ 

“জানতাম না। আপনার দারোয়ান একটু আগে আমাকে বলেছে। অবশ্য--' কথা শেষ 
না করে দীপা থেমে গেল। 

'অবশ্য কি? কপাল আরও কুঁচকে গেল মণিমোহনের। 

“আগে থেকে চেষ্টা করলেও আমার মতো একটা মেয়েকে আ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতেন কি? 

এমন মেয়ে আগে আর কখনও দেখেননি মণিমোহন। 

সত্যিই তিনি একে দেখা করার সুযোগ দিতেন না। মনে-মনে তিনি স্বীকার করলেন, মানুষ 
চেনার অপরিসীম ক্ষমতা এই মেয়েটার । দীপার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তিনি পালটা প্রম্ন করলেন, 
“কী নাম তোমার? 

“আমি মার্গারেট থ্যাচার কি ইন্দিরা গান্ধীর মতো বিখ্যাত মহিলা নই যে নাম বললেই 
চিনতে পারবেন। তবু যখন জানতে চাইলেন তখন বলছি__আমার নাম দীপা, দীপা মণ্ডল।" 

মণিমোহন বুঝতে পারছিলেন, শুধুমাত্র ব্যক্তিত্ব দিয়ে বা গম্ভীর গলায় কথা বল্ল এই মেয়েটি 
অর্থাৎ দীপাকে নোয়ানো যাবে না। তিনি বললেন, “তুমি আমার কাছে কী চাও & 

দীপা বলল, “ঠিক এক কথায় তা বলা যাবে না। দয়া করে আপনি যদি বসেন, আমিও 
বসতে পারি। তারপর আপনার কাছে আসার কারণটা জানাচ্ছি।” 

দীপা যেভাবে তাকে বসতে বলল তাতে মনে হচ্ছে, এই বাড়ি-টাড়ি তার নয়-_দীপার। 
তিনিই এখানে দীপার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। রেগে উঠতে গিয়েও কিছুটা মজাই যেন লাগল 
মণিমোহনের, কিন্তু বাইরে তা ফুটে উঠতে দিলেন না। নীরস রুক্ষ গলায় বললেন, “বসবার সময় 
নেই। যা বলার তাড়াতাড়ি বলে ফ্যালো।' 

“এত কথা দাঁড়িয়ে-দদাড়িয়ে বলা যায় না। দয়া করে বসুন।” অত্যন্ত বিনীত ভাবেই বলল 
দীপা, তবু তার বলার ভঙ্গিতে কোথায় যেন খানিকটা জেদ রয়েছে। 

“ঠিক আছে, বোসো।” কবজি উলটে ঘড়ি দেখে নিয়ে মশিমোহন বললেন, “দশ মিনিট 
সময় দিতে পারি। তার মধ্যে তোমার বক্তব্য শেষ করতে হবে।' বলতে-বলতে একটা সোফায় 
বসে পড়লেন মণিমোহন। 

যুদ্ধের প্রথম রাউন্ডে তার জেদটার জয় হওয়াতে দীপার আত্মবিশ্বাস বেশ কিছুটা বেড়ে 
গেল। একটু দূরে আগের সেই সোফায় মণিমোহনের মুখোমুখি বসে পড়ল সে। 

বললেন, “এবার বলো-_, পরক্ষণেই তার চোখ এসে পড়ল দীপার সেই 
রং-ওঠা কালচে সুটকেসটার ওপর। দীপার সোফার পাশে কার্পেটের ওপর সেটা সন্তর্পণে দীড় 
করানো আছে। 

মণিমোহন একটু অবাক হয়েই এবার বললেন, 'এ কি, সুটকেস নিয়ে এসেছ কেন? এরকম 
লটবহর নিয়ে কেউ কখনও কারও সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারে, এটা তার কাছে অভাবনীয়। 

সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিল না দীপা। স্থির চোখে এক পলক মণিমোহনকে দেখে অন্য দিকে 
মুখ ফিরিয়ে নিল। এবার সে আসল জায়গায় পৌঁছে গেছে। শরীরে এবং মনে যেখানে যতটুকু 
শক্তি এবং সাহস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সব এক জায়গায় জড়ো করে দীপা আস্তে-আস্তে বলল, 
'আমি এখানে থাকতে এসেছি। সুটকেসে আমার জামাকাপড় আছে।, 

নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না মণিমোহন। তীব্র চাপা গলায় বললেন, 
“হোয়াট £ 


১৬ পাঁচটি উপন্যাস 


দীপা ফের একইরকম কণ্ঠস্বরে বলতে লাগল, “এখানে থাকতে এসেছি। বলতে পারেন, 
আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই।' 

দীপার কথা শেষ হতে-না-হতেই চিৎকার করে উঠলেন মণিমোহন, “অধিকার-__ মানে রাইট! 
হোয়াট ডু ইউ মিন? 

দীপা মণিমোহনের দিকে তাকাল না। চোখ নামিয়ে অনেকক্ষণ ঠোটে ঠোট চেপে শ্বাসরুদ্ধের 
মতো বসে রইল। 

মণিমোহন অসহিষুও হয়ে উঠেছেন। বললেন, “চুপ করে রইলে কেন? বলো- কীসের 
অধিকার?” 

চোখ তুলল না দীপা। মেঝের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, “বলতে লজ্জা করছে, 
তবু নিজের ভবিষ্যৎ আর আপনাদের পরিবারের সুনামের জন্যে না বলে উপায় নেই। 

শরীরের সমস্ত স্নায়ু টানটান করে অপেক্ষা করতে লাগলেন মণিমোহন। 

দীপা এবার বলল, “আমার পেটে অনীশের বাচ্চা রয়েছে।' 

মণিমোহনের মাথার ভেতর একটা জুলস্ত পেরেক ঢুকে গেল যেন। কর্কশ গলায় তিনি 
বললেন, “কে অনীশ? 

আপনার ছেলে? 

নিজের অজান্তেই মণিমোহন খাড়া দাড়িয়ে পড়লেন। তার শরীরের রক্তচাপ হঠাৎ যেন 
অত্যস্ত বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছে গেছে। চোখের সাদা অংশে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে লাগল 
গলার শিরগুলো দড়ির মতো পাকিয়ে উঠল। অত্যন্ত হিংস্র এবং নিষ্ঠুর দেখাল মণিমোহনকে। 
তার গলার পেশি ছিড়ে একটা জান্তব চিৎকার বেরিয়ে এল, ইম্পসিবল- ইম্পসিবল। আমি 
বিশ্বাস করি না। 

দীপাও উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, “আপনার জায়গায় আমি হলেও বিশ্বাস করতে চাইতাম 
না। নিজের ছেলের সম্বন্ধে এসব কে আর বিশ্বাস করতে চায়? 

“স্টপ দিস লাই।' 

দীপা যেটুকু লেখাপড়া জানে তাতে এই ইংরেজি শব্দ তিনটের মানে বুঝতে অসুবিধে 
হল না। সে বলল, “আমি যে বলেছি তার একটা বর্ণও মিথ্যে নয়। ধমকে, চিৎকার করে আপনি 
আমাকে থামাতে পারবেন না।, 

মণিমোহনের চোয়াল পাথরের খিলানের মতো শক্ত হয়ে উঠল। দীতে দাত ঘষে গলার 
স্বর আরও কয়েক পরদা চড়িয়ে দিলেন, “ইউ ডার্টি উম্যান, তুমি আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে এসেছ? 

ডার্টি উম্যান কথাটার অর্থ দীপা জানে কিন্ত ব্ল্যাকমেল শব্দটা তার সম্পূর্ণ অজানা । অপমানে 
তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল। তীব্র গলায় বলল, “আমি বাজে নোংরা মেয়ে নই, ভদ্র পরিবারের 
মেয়ে। একটু থেমে বলল, 'ব্ল্যাকমেল বলতে আপনি কি বোঝাতে চাইছেন? 

“ভয় দেখিয়ে এ-বাড়িতে ঢুকতে চাইছ! কিন্তু তা হবে না।' বলতে-বলতে মণিমোহনের 
চোখমুখ সন্দিষ্ধ হয়ে উঠল, 'কে তোমাকে এ বাড়িতে পাঠিয়েছে? 

দীপা বলল, “কেউ না। আমি নিজেই এসেছি। ভয় দেখিয়ে আপনার পুত্রবধূ হওয়ার 
কোনওরকম ইচ্ছাই আমার নেই। সেটুকু আত্মসম্মান বোধ আমার আছে। কিন্তু এখন আমি 
নিরুপায়।, 

'এই মুহূর্তে তুমি যদি এখান থেকে বেরিয়ে না যাও, আমি পুলিশ ডাকবা।' 

দীপা অদ্ভুত হাসল। বলল, "ডাকতে পারেন, আমার আপত্তি নেই। এখানে আসার আগে 
আমিও থানায় যাওয়ার কথা ভেবেছিলাম। পরে ভাবলাম, আপনার সঙ্গে দেখা না করে কিছু 
করা ঠিক হবে না। ভাবলাম, সব শুনে আপনি আমাকে বিপদ আর লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবেন।' 


রণক্ষেত্র ১৭ 


মেয়েটার স্পর্ধা দেখে অবাক হয়ে গেলেন মণিমোহন। সে যদি সত্যি-সত্যিই ব্ল্যাকমেলের 
উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে তাহলে বুঝতে হবে এমন দুঃসাহসী ক্রিমিনাল খুব কমই জন্মেছে কিন্তু 
তার অপকট মুখ, কথা বলার ভঙ্গি দেখে এক-একবার সংশয় হচ্ছে, মেয়েটা বোধহয় মিথ্যে বলছে 
না। জীবনে অসংখ্য মানুষ দেখেছেন মণিমোহন, বিপুল তার অভিজ্ঞতা। তিনি জানেন, সত্যের 
নিজস্ব একটা জোর আছে। কিন্তু মেয়েটা যা বলছে তা যদি আদৌ মিথ্যে না হয়? না, না, ভাবনাটাকে 
এক ধাক্কায় মাথা থেকে বার করে দিলেন মণিমোহন। তারপর আবার যখন চিৎকার করতে 
যাবেন সেই সময় চোখে পড়ল, ঘরের বাইরে বেয়ারা এবং মালিরা এসে জড়ো হয়েছে। 
উগ্র রক্তাক্ত চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে হাতে নাড়লেন মণিমোহন, “যাও-_কী দরকার এখানে % 
বলে তার খেয়াল হল, এভাবে টেঁচামেচি করা ঠিক হয়নি! এ-জাতীয় নোংরা জঘন্য ব্যাপার, 
তা যতই মিথ্যে হোক, চাকর-বাকরদের কানে যাওয়া ঠিক নয়। তারা এই নিয়ে চারদিকে চাউর 
করে বেড়াবে। 

মালি এবং বেয়ারারা উর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গেছে। মণিমোহন আবার দীপার দিকে ফিরলেন। 
রাগ উত্তেজনা হিংস্রতা এবং প্রবল রক্তচাপে তার মাথার ভেতরটা টগবগ করে ফুটছিল। কিন্তু 
এবার আর বিস্ফোরণ ঘটতে দিলেন না। প্রাণপণে গলার স্বরটা অনেকখানি নামিয়ে আস্তে-আস্তে 
মণিমোহন বললেন, “সিট ডাউন-_, দীপা বসলে মণিমোহনও ফের মুখোমুখি বসলেন। মাথার 
ভেতরে যা-ই চলুক, খুব শাস্ত গলায় জিগ্যেস করলেন, “তোমরা কোথায় থাকো 

“ঢালিপাড়ায়।, 

“ঠিক বস্তিতে নয়। বস্তিতে ঢোকার মুখে যে গলিটা রয়েছে, অঘোর নন্দী লেন, তারই 
একটা বাড়িতে।' 

“বাড়ির নম্বর কত?' 

“তেরো। 

এত কথা যে মণিমোহন জিগ্যেস করছেন সেটা অকারণে নয়। তিনি বুঝতে পারছিলেন, 
দীপা ভয় পাওয়ার মেয়ে নয়। তর্জন-গর্জন করে বা ধমকধামক দিয়ে তাকে দমানো যাবে না। 
তাকে নাড়াচাড়া করতে হবে অন্যভাবে । সে জন্য তার সম্পর্কে খুঁটিনাটি অনেক কিছু জানা দরকার। 

মণিমোহনের কণ্ঠস্বর এবং ব্যবহার হঠাৎ যেভাবে বদলে গেল তাতে অস্বস্তি বোধ করল 
দীপা। এতক্ষণ অনবরত হুমকি দেওয়ার পর তার এই নতুন চালটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ভেতরে- 
ভেতরে সে খুবই সতর্ক হয়ে রইল। 

মণিমোহন এবার বললেন, “কে-কে আছে তোমার? 

দীপা স্থির চোখে মণিমোহনের দিকে তাকিয়ে বলল, “বাবামা আর ছোট ভাই।, 

“বাবা কী করেন? 

“কিছু না। একটা লোহার কারখানায় কেরানি ছিলেন। তিন বছর হল, কারখানা বন্ধ হয়ে 
গেছে। আর কোথাও কাজ পাননি। 

“ভাই ছোট না বড়? 

দু-বছরের ছোট।, 

“সে কিছু করে? 

'না। ক্লাস এইট পর্যস্ত পড়েছিল। মাইনে দিতে না পারায় স্কুল থেকে নাম কেটে দিয়েছে। 
ওই পড়াশোনায় চাকরি হয় না। এখন মস্তানি করে বেড়ায়। 

“আই সি। তাহলে তোমাদের সংসার চলে কী করে? 

“আমি ঢালিপাড়ার প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করি। আর সকাল-বিকেল টিউশনি । এতে কোনও 


প্রফুল্ল বায়-_পাঁচটি উপন্যাস-_-৩ 


১৮ পাঁচটি উপন্যাস 


রকমে চলে।' 

কতদূর পড়াশোনা করেছ? 

“তাহলে তুমি ছাড়া রোজগার করার আর কেউ নেহা? 

না! 

মণিমোহনের হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল। ব্যস্তভাবে ঘড়ি দেখে বললেন, “তোমাকে দশ 
মিনিট সময় দেব বলেছিলাম। বেয়াল্লিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে। এবার আমাকে উঠতে হবে। 

দীপা চমকে উঠল, "আমার-_-আমার কী হবে? 

মণিমোহনের চোখের বাদামি তারা থেকে এবার আগুন ছুটতে লাগল। দাঁতে দাত চেপে, 
চাপা গলায় তিনি বললেন, “বদমাশ মেয়ে, যার ভাই মস্তান, বাবা বেকার, যারা বস্তিতে থাকে, 
আমি তাকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলব! তুমি ভেবেছ কিঃ ব্ল্যাকমেল করার জায়গা পাওনিঃ, 

ব্টাকমেল শব্দটার মোটামুটি একটা মানে আন্দাজ করে নিয়েছিল দীপা। তীক্ষ গলায় বলল, 
“আমি আপনাকে ব্ল্যাকমেল করতে আসিনি। 

তুমি যা বলছ তার প্রমাণ কী? 

ঠোট টিপে কী যেন ভাবল দীপা। তারপর জোরে শ্বাস টেনে বলল, “অনীশ বাড়ি আছে? 

মণিমোহন হকচকিয়ে গেলেন। “তাকে_ তাকে দিয়ে কী হবে? 

“দয়া করে তাকে এখানে ডাকান। আমার অবস্থার জন্য কে দায়ী, প্রমাণ কবে দেব।, 

“ঠিক আছে।” দীপার চ্যালেঞ্জটা প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই নিলেন মণিমোহন। একটা বেয়ারাকে ডেকে 
বললেন, “ছোট সাহেবকে এখানে আসতে বলো। বলবে, আমি ডেকেছি। 

দু-মিনিট পর অনীশ ড্রাইংরুমে এসে ঢুকল এবং দীপাকে দেখে থমকে দীড়িযে পড়ল। 
তার চোখে ভয়ের ছায়া পড়েছে। 

এমনিতে অনীশ বেশ সুপুরুষ। মণিমোহনের মতোই হাইট। তবে গায়ের রং টকটকে নয়-_ 
বাদামি। চুল ব্র্যাকব্রাশ করা, নাকমুখ কাটা-কাটা, চওড়া কপাল, ধারালো থুতনি। এই মুহুর্তে তাকে 
ফাদে-পড়া ইঁদুরের মতো দেখাচ্ছে। ঠোট টিপে আডষ্ট ভঙ্গিতে সে দাঁড়িয়ে আছে। 

দু-দিক থেকে দীপা আর মণিমোহন পলকহীন অনীশকে লক্ষ্য করছিলেন। অনীশ কিন্ত 
সোজাসুজি কারও দিকেই তাকাতে পারছিল না। চোখের কোণ দিয়ে একবার বাবাকে, একবার 
দীপাকে দেখছিল। বিশেষ করে দীপাকে। তাকে এ বাড়িতে বাবার সঙ্গে ড্রাইংরুম দেখবে, অনীশ 
কখনও ভাবতেও পারেনি। 

মণিমোহন দীপাব দিকে আঙুল বাড়িয়ে রুক্ষ গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করলেন, “এই মেয়েটিকে 
চেনো? 

অনীশ ভয় এবং অস্বাচ্ছন্দ্য কাটিয়ে ওঠার জন্য ভেতরে-ভেতরে নিজের সাঙ্গেই যেন 
প্রাণপণে যুদ্ধ করছিল। চোখে-মুখে নকল বিস্ময় ফুটিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বলতে চাইল, 'না।" 
তবু গলাটা সামান্য কেঁপে গেল। 

দক্ষিণ কলকাতার এই নিরিবিলি রাস্তা, মণিমোহনের সাজানো ড্রইংরুম, বাইল্লের লন, বাগান 
_দীপার চোখের সামনে সমস্ত কিছু ঝাপসা হয়ে যেতে লাগল। পায়ের তলায় ফ্রার্পেট- মোড়া 
মেঝে ঢেউয়ের মতো দুলতে লাগল। মুখ থেকে দ্রুত সব রক্ত নেমে যাচ্ছে তার। কিস্তু মাত্র 
কয়েক মুহূর্ত। তার পরেই দীপার মাথার ভেতর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কিছু একটা ঘটে গেল। 
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার। দীতে দীত চেপে স্থির চোখে অনীশের দিকে তাকাল সে। 

এদিকে মণিমোহন অনীশকে বলছিলেন, 'একে দেখোনি কোনওদিন? 

এতক্ষণে অস্বাচ্ছন্দ্য এবং নার্ভাস ভাবটা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠেছে অনীশ। নীরসট্ট গলায় 


রণক্ষেত্র ১৯ 


সে বলল, 'না। 

“আই সি” মণিমোহন এবার বললেন, “কিন্ত এই মেয়েটি তোমার সম্বন্ধে সিরিয়াস 
আালিগেশন এনেছে। কী বলেছে জানো? 

উত্তর না দিয়ে অনীশ অপেক্ষা করতে লাগল। 

গলা খাকরে মণিমোহন বললেন, “মেয়েটি বলছে, সে প্রেগনেন্ট। এর জন্যে তোমাকে দায়ী 
করছে।' 

প্রথমে চমকে উঠল অনীশ। তার পরেই গলার শির ছিড়ে চিৎকার করল, “লাই-__-আটার 
লাই। পুরোটাই বানানো আর মিথ্যে। 
ছুটবে। শিরর্দীড়া বেয়ে গলগল করে ঘাম ছুটে যাচ্ছে। দীপা কিন্তু চিৎকার করল না। তীব্র মোচড়ে 
শরীরটাকে পুরোপুরি অনীশের দিকে ঘুরিয়ে তীক্ষ চাপা গলায় জিগ্যেস করল, “তুমি আমাকে চেনো 
নাঃ কখনও দেখোনি?, 

“নো-_নেভার! কে আপনি?” রুক্ষ, বিরক্ত মুখে বলল অনীশ! 

“মিথ্যেবাদী, নির্লজ্জ” _দীপা বলতে লাগল, “তুমি যে আমাকে চেনো, কম করে পঞ্চাশটা 
লোক তার সাক্ষী আছে। 

অনীশ মণিমোহনের দিকে ফিরে বলল, “বাবা, শি ইজ আ ডেঞ্জারাস উম্যান। আমাদের 
ব্টাকমেল করতে এ-বাড়িতে ঢুকেছে।' 

মণিমোহন বললেন, “আমারও সেইরকমই মনে হয়েছিল। তোমার মুখে শুনবার জন্যে ডেকে 
পাঠিয়েছি।' দীপার দিকে ফিরে দরজা দেখিয়ে বললেন, “গেট আউট । এই মুহূর্তে এখান থেকে 
বেরিয়ে যাও) 

মবিয়া ভঙ্গিতে দীপা বলল, “আমি যাব না।” 

মণিমোহন বললেন, “ধৈর্ধের একটা সীমা আছে। এক মিনিটের ভেতর এখান থেকে না 
গেলে আমার চাকর আর দারোয়ানেরা তোমাকে লাথি মারতে-মারতে বার করে দেবে।' 

'বার তো করে দিতে চাইছেন। আমার পেটের বাচ্চার কী হবে 

উত্তর না দিয়ে, লম্বা-লম্বা পা ফেলে দরজার কাছে চলে গেলেন মণিমোহন। উত্তেজিত 
গলায় ডাকলেন, 'লছমন, তরখু সিং, লালধারী-_ইধার আও।' 

মুখ থেকে হুকুম খসতে-না-খসতেই আধ ডজন বেয়ারা-টেয়ারা দৌড়ে এল। মণিমোহন 
দীপাকে দেখিয়ে বললেন, “এই আওরতের ঘাড় ধরে গেটের বাইরে বার করে দিয়ে এসো। 

দীপা বলল, "খবরদার, আমার গায়ে কেউ হাত দেবে না। আমি নিজেই যাচ্ছি।” মণিমোহনকে 
বলল, “আজ আমাকে তাড়িয়ে দিলেন কিন্তু আমি আপনাদের ছাড়ব না। আমার ক্ষতি করে দিয়ে 
আপনার ছেলে পার পেয়ে যাবে, তা আমি কিছুতেই হতে দেব না। কিছুতেই না-_ 

মণিমোহন গর্জে উঠলেন, “গেট আউট।' 

নাক-মুখ ঝাঝা করছে দীপার। অপমানে কপালের রগগুলো যেন ছিঁড়ে যাবে। কিছুই যেন 
সে দেখতে পাচ্ছিল না। অন্ধের মতো টক্কর খেতে-খেতে ড্রইংরুমের বাইরে বেরিয়ে এল দীপা। 
তারপর প্রায় টলতে-টলতে লন এবং বাগানের মাঝখানে নুড়ির রাস্তার ওপর দিয়ে গেটের বাইরে 
বেরিয়ে গেল। 

কয়েক পা যেতে-না-যেতেই কার যেন অস্পষ্ট ডাক কানে এল দীপার, “এ আওরত, এ 
আওরত-_' 





ফেরাতেই দীপা দেখতে পেল, মণিমোহনের নেপালি দারোয়ানটা তাকে ডাকছে। চল্লিশ- 
মিনিট আগে যখন প্রথম সে ওই গেটটার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল দারোয়ানটা তাকে 





তখনই দারোয়ানের চোখে দীপা অনেকটা নেমে গেছে। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে “সে এখন আওরত 
বলে ডাকছে। 

চোখাচোখি হতেই দীপার সেই পুরোনো সুটকেসটা ফুটপাথে ছুড়ে দিল দারোয়ান। তখনই 
দীপার মনে পড়ল, সুটকেসটা মণিমোহনদের ড্রইংরুমে ফেলে সে চলে এসেছিল। 

কয়েক পা পিছিয়ে এসে সুটকেসটা তুলে নিল দীপা । তারপর আবার চলতে শুরু করল। 
তার মনে হচ্ছিল, আগুনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে যেন। 


তিন 


হরপ্রসাদ সরণি যেখানে ডাইনে ঘুরে একটা আঁকাবাঁকা রাস্তায় মিশেছে, সেই মোড়ের মাথায় রিকশার 
স্ট্যান্ড। দশ-বারোটা রিকশা সেখানে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দীপা মোড়ে এসে রিকশায় উঠে 
বলল, “ঢালিপাড়ার বস্তির কাছে চলো।” রেললাইনের ধারে ওই বিশাল বস্তিটা এই অঞ্চলের বিখ্যাত 
জায়গা। বিখ্যাত না বলে নোটোরিয়াস বলাই হয়তো ঠিক। সবাই জায়গাটা চেনে। 

রিকশায় যেতে-যেতে দু-ধারের বাড়িঘর লোকজন গাড়ি-টাড়ি, কিছু চোখে পড়ছিল না 
দীপার। কিছুক্ষণ আগে মণিমোহনদের বাড়িতে যা-যা ঘটে গেল সেসব ভাবতে চেষ্টা করছিল সে। 
কিন্ত পরপর ধারাবাহিক ভাবে কিছুই যেন ধরতে পারছে না, ভাবনাটা ছিড়ে-ছিড়ে যাচ্ছে। তবে 
সব কিছু ছাপিয়ে বারবার অনীশের মুখটা তার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। ধূর্ত বেড়ালের মতো 
সরটুকু খেয়ে গৌফ মুছে অনীশ তার জীবন থেকে সরে পড়েছে। অথচ একদিন তাকে কি বিশ্বাসই 
না করেছিল! অসীম নির্ভরতায় নিজের সব কিছু তার হাতে সঁপে দিয়েছে দীপা। এর পরিণতি 
কী হতে পারে, একবারও চিস্তা করে দ্যাখেনি। 

কিন্ত তার পেটে যে বাচ্চাটা এসেছে, একটু আগে তার দায়িত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করল 
অনীশ। শুধু কি তাই, অনীশ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, দীপাকে সে চেনে না, এমনকী কখনও 
দেখেনি পর্যস্ত। মানুষের এই বিশ্বাসঘাতকতা তার মাথার ভেতরে জুলস্ত পেরেকের মতা বারবার 
বিধে যাচ্ছিল। 

দীপা অনীশ এবং মণিমোহনকে জানিয়ে এসেছে, সহজে তাদের ছাড়বে না। কিন্তু তারা 
সোসাইটির একেবারে নীচের লেভেলের মানুষ। তাদের কোনও জমকালো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড 
নেই। আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে পুলিশ অফিসার, এমএলএ বা মন্ত্রী খুজে পাওয়া যাবে না। আর 
অনীশরা? ওরা আছে সোসাইটির সব চাইতে উঁচু স্তরে। অগাধ টাকা ওদের, প্রচুর ক্ষমতা এবং 
চারদিকে প্রচণ্ড ইনফ্লুয়ে্স। রাগ এবং উত্তেজনার ঝৌকে দীপা তো শাসিয়ে এল কিন্তু ওইরকম 
প্রবল শক্তিমান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সে লড়াই চালাবে কীভাবে? তার ক্ষমতা কতটুকু? এই অসম 
যুদ্ধে ওরা ইচ্ছা করলে তাকে গুঁড়িয়ে শেষ করে ফেলতে পারে। কিছুক্ষণ আগেও শ্রিররদাড়া টানটান 
করে দীপা অনীশ এবং মণিমোহনের সঙ্গে দাতে দাত চেপে সামনে লড়ে গেছে। কিন্তু এখন উত্তেজনা 
কেটে যাওয়ার পর ন্নায়ুগুডলো ক্রমশ আলগা হয়ে যাচ্ছে। অনীশরা যখন স্বীকারই ফরল না তখন 
অবৈধ সন্তানের মা হয়ে চরম অসম্মান আর দুর্নাম গায়ে মেখেই কি তাকে পৃথিবীত্তে বেঁচে থাকতে 
হবে? সে তো একরকম শেষ হয়ে যাওয়াই। ভেতরে-ভেতরে ভীষণ ক্লাস্ত আর বিপর্যস্ত বোধ 
করল দীপা। দু'হাতে মুখ ঢেকে জোরে মাথা নাড়তে-নাড়তে রুদ্ধ গলায় সে সামনে বলে যেতে 
লাগল, “পারব না, পারব না, পারব. না-_, 

কখন যে রিকশাটা রেললাইনের ধারে ঢালিপাড়া বস্তির সুখে চলে এসেছে, দীপার খেয়াল 


রণক্ষেত্র ১ 


ছিল না। রিকশাওয়ালা গাড়ি থামিয়ে বলল, “মাইজি-_-আ গিয়া__ 

আচ্ছন্নের মতো হাতের ভেতর থেকে মুখ তুলল দীপা। তারপর ভাড়া মিটিয়ে সুটকেসটা 
হাতে নিয়ে নেমে পড়ল। 

দীপাদের বাড়িটা ঠিক বস্তির ভেতরে নয়। অঘোর নন্দী লেন নামের একটা সরু গলি 
বর্ডার লাইনের মতো মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। সেটার একধারে কুখ্যাত ঢালিপাড়া বস্তি, আর 
এধারে সারি-সারি পুরোনো ক্ষয়াটে চেহারার সব বাড়ি। বেশির ভাগই টিনের বা টালির। 
দুচারটে ইটের তৈরি একতলা যা আছে সেগুলোর বয়স যে কত, কেউ জানে না। জব চার্নকের 
সময়েই হয়তো ওগুলোর ভিত গাঁথা হয়েছিল। এইরকম একটা বাড়িতেই আরও তিন ভাড়াটের 
সঙ্গে দীপারা থাকে। 

ওদের ভাঙাচোরা সদর দরজার পাল্লায় প্রচুর কাঠের টুকরো এবং টিনের তাপ্লি। নীচের 
দিকটা জলে ক্ষয়ে-ক্ষয়ে অনেকটা ফাক হয়ে গেছে। 

কাছাকাছি আসতেই দীপা দেখতে পেল, মা সদরের বাইরে দাড়িয়ে আছে। 

দীপার মা কমলার বয়স পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন। একসময় বেশ সুন্দরীই ছিল মহিলা । এখন সারা 
শরীর জুড়ে শুধু ধ্বংসের ছাপ। গায়ের রং কবেই জ্বলে গেছে। গাল ভেঙে চোয়ালের হাড় ঠেলে 
বেরিয়েছে। চোখদুটো ইঞ্চিখানেক গর্তে ঢোকানো। চুল উঠে-উঠে কপালটা একেবারে মাঠ। 

এই মুহূর্তে কমলার পরনে মিলের আধময়লা লাল-পাড় শাড়ি আর সাদা জামা । শির বার- 
করা সরু-সরু দুই হাতে দু-গাছা লোহা ছাড়া সমস্ত শরীরে ধাতুর চিহৃমাত্র নেই। অবশ্য লোহার 
সঙ্গে সধবার লক্ষণ হিসেবে দুটো শীখাও রয়েছে। 

কমলা চাপা নীচু গলায় জিগ্যেস করল, “কী হল ওখানে? তার কণ্ঠস্বরে ভয় এবং উৎকণ্ঠা 
জড়ানো। 

দীপা উত্তর দিল না, আচ্ছন্নের মতো মায়ের পাশ দিয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকে সোজা নিজের 
ঘরে চলে এল। 

এ-বাড়িতে সবসুদ্ধু খানছয়েক ঘর। ছিরিছাীদহীন ব্যারাকবাড়ির ঘরের মতো এগুলোও পরপর 
তোলা হয়েছে। সামনে দিয়ে টানা চওড়া বারান্দা। 

বা-দিকে বারান্দার শেষ মাথার ঘর দুখানা দীপাদের। তার পরের দুটো ঘর নিয়ে থাকে 
প্রাইভেট ফার্মের এক কেরানি-_উমাপদ, তার স্ত্রী শিবানী এবং তাদের দু'টো ছোট-ছোট বাচ্চা। 
উমাপদর পরের ঘরটায় থাকে এক মধ্যবয়সি নার্স-_বিভা। সে একা নির্বাঞ্জাট মানুষ, মা-বাবা 
ছেলেপুলে বা খুব ঘনিষ্ঠ আস্্ীয়স্বজন বলতে তার কেউ নেই। বিভার পাশের ঘবটা এক হিন্দুস্থানি 
হকারের। নাম রাজেম্বর সিং, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। খুব ছোট্ট সংসার রাজেশ্বরের। স্বামী 
আর স্ত্রী মিলিয়ে মাত্র দূজন। স্ত্রী গঙ্গা বাজা বলে বাচ্চা-কাচ্চার ঝামেলা নেই। রাজেশ্বর সারা 
সকালটা বাঁধা খদ্দেরদের বাড়ি-বাড়ি খবরের কাগজ দেয়। তারপর বাকি দিন গড়িয়াহাটায় নানারকম 
ম্যাগাজিন-ট্যাগাজিন বেচে। ওখানে এক বাড়ির দেওয়ালে তার ছোটখাটো একটা স্টল আছে। 
সব মিলিয়ে এ-বাড়িতে মোটমাট চার ভাড়াটে। 

টানা বারান্দার নীচে এক ফালি চাতাল। চাতালটা বহুকাল আগে সিমেন্ট দিয়ে বীধানো 
হয়েছিল। এখন ফেটে চাকলা-চাকলা সিমেন্ট উঠে ভেতরের মাটি বেরিয়ে পড়েছে। ফাটা 
জায়গাগুলোতে জমে আছে শুকনো শ্যাওলার পুর আত্তর, আর গজিয়েছে ঘাস। 

চাতালটার ডান দিকে টালির ছাউনি দেওয়া পরপর চারটে রান্নাঘর, বাঁ-দিকে কর্পোরেশনের 
কল, স্নান-্টান করার জন্য খানিকটা ঘেরা জায়গা আর দুটো পায়খানা । এগুলো সবই এজমালি। 

এই মুহূর্তে বাড়িতে লোকজন বেশি নেই। উমাপদ, রাজেম্বর এবং বিভাকে এ-সময়টা 
কখনই পাওয়া যায় না, যে যার কাজে বেরিয়ে যায়। আর দীপার ভাই পিস্টুর সঙ্গে বাড়ির সম্পর্ক 


২২ পাঁচটি উপন্যাস 


সামান্যই। দু-বেলা খাওয়া আর রান্তিরে ঘুমের সময়টুকু বাদ দিলে সারাদিনই সে বাইরে-বাইরে 
থাকে। নণ্টার পর থেকে বাড়িটা চলে যায় মেয়েদের দখলে। 

এখন শিবানী আর গঙ্গাকে রান্নাঘরে দেখা যাচ্ছে। তারা খুবই ব্যস্ত। বারান্দায় শিবানীর 
বাচ্চাদুটো হুটোপাটি করছে। আর বাঁদিকের শেষপ্রান্তে একটা হাতল-ভাঙা খাটো চেয়ারে বসে 
খবরের কাগজ পড়ছে দীপার বাবা আদিনাথ । 

আদিনাথের বয়স যাট-বাষট্টি। কোনও একসময় লম্বা-চওড়া সুপুরুষ চেহারা ছিল তার। 
এখন শরীর-টরীর ভেঙ্চেরে একেবারে ধ্বংসন্ত্বপ হয়ে দীড়িয়েছে। পরনে রং জুলে-যাওয়া লুঙ্গি 
আর তালিমারা হাফশার্ট। 

দীপাকে তার ঘরে ঢুকতে দেখে হাতের কাগজ একপাশে রেখে শশব্যস্তে উঠে দীড়াল 
আদিনাথ । 

এদিকে কমলাও মেয়ের পেছন-পেছন ঘরের ভেতর চলে এসেছিল। এই পুরোনো ভাঙাচোরা 
বাড়িটার যা হাল তার সঙ্গে দীপার এই ঘরটা একেবারেই খাপ খায় না। ঘরটা ছিমছাম, চমৎকার 
সাজানো । একধারে তক্তাপোশে ধবধবে বিছানা, আর-এক দিকে ছোট একটা আলমারি। সাজবার 
জন্য ড্রেসিং টেবল নেই। তবে দেওয়ালে একটা চৌকো ঝকঝকে আয়না লাগানো রয়েছে, সেটার 
সঙ্গে সুদৃশ্য কাঠের তাক জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে আছে টুকিটাকি কণ্টা প্রসাধনের জিনিস-_ 
পাউডার, চিরুনি, ছোট একটা সেন্টের শিশি, ক্রিমের কৌটো, কুমকুম ইত্যাদি ইত্যাদি। একপাশে 
একটা ছোট পড়ার টেবলও রয়েছে, টেবলটার ওপর সুতোর ফুলতোলা সুন্দর টেবল ব্লথ। টেবলে 
রয়েছে মাটির সুদৃশ্য ফুলদানি, কলম, একটা চৌকো টেবল ক্লক আর ধূপদানি। দেওয়াল কেটে 
র্যাক বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্র এবং শরৎচন্দ্রের কিছু বই ব্রাউন পেপারের মলাট দিয়ে সাজিয়ে 
রাখা হয়েছে। 

কমলা বলল, “অনীশদের ওখানে কী হয়েছে, বলনি না তো? 

দীপা এবারও উত্তর দিল না। হাতের সুটকেসটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে নিজেকে একরকম 
বিছানায় ছুড়েই দিল সে এবং বালিশে মুখ গুঁজে চুপচাপ পড়ে রইল। 

কমলা আবার বলল, “অনীশদের বাড়ি যাওয়ার সময় বলেছিলি ফিরবি না। তা 
হলে-__" কথা শেষ না করেই থেমে গেল সে। 

কমলার না-বলা কথার মধ্যে অনুচ্চারিত একটা প্রশ্ন ছিল। সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না 
দীপার। তবু সে চুপ করেই থাকে। যেভাবে কিছুক্ষণ আগে দীতে দীত চেপে প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন 
মণিমোহনের সঙ্গে সে যুদ্ধ করেছে তাতেই তার সবটুকু শক্তি শেষ। এই মুহুর্তে কথা বলতে ইচ্ছা 
করছে না তার। এমনকী কারও সঙ্গই ভালো লাগছে না। 

কমলা তক্তাপোশের কাছে এসে দীড়াল। অনেকটা ঝুঁকে জিগ্যেস করল, “ওদের সঙ্গে দেখা 
হয়নি? 

মা যেভাবে একটানা ঘ্যানঘ্যান করে চলেছে তাতে কতক্ষণ আর মুখ বুজে থাকা যায়! 
অবশ্য মাকে দোষও দেওয়া যায় না। তার সম্পর্কে মায়ের উৎকগ্ঠা এবং দুর্ভাবনা তো থাকবেই। 
অনিচ্ছাসত্তেও দীপা এবার বলল, “হয়েছে।, 

“তবে? 

“তোমার কী ধারণা, ওরা আমাকে বরণ করে ঘরে তুলে নেওয়ার জম্যে হাত ধুয়ে বসে 


ছিল? 
শ্বাস টানার মতো শব্দ করে কমলা বলল, “কিন্তু তুই তো ওখানে থাকার জন্যেই গিয়েছিলি।' 
দীপা বালিশ থেকে মুখ না তুলেই বলল, “হ্যা, গিয়েছিলাম। নিজের সম্মান আর ভবিষ্যতের 
জন্যে আমাকে তো চেষ্টা করতেই হবে। কিস্তু-_, 


রণক্ষেত্র ৩ 


“কিন্তু কি? 

তমি কি জানো-_” দীপা বলতে লাগল, “ওদের বাড়িতে কত চাকরবাকর আর দারোয়ান 
আছে! 

কমলা বলল, “থাকতেই পারে। তুই তো বলেছিস, ওরা খুব বড়লোক।' 

একটু চুপ করে থাকল দীপা। তারপর বলল, “চাকর-দারোয়ান ডেকে অনীশের বাবা আমাকে 
বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে। 

শঙ্কিত মুখে কমলা জিগ্যেস করল, “চাকরেরা তোর গায়ে হাত তুলেছে নাকি? 

“নিজের থেকে না বেরিয়ে এলে তুলত।' 

দরজার বাইরে একটা চাপা ফ্যাসফেসে গলা শোনা গেল, “হারামীদের এতবড় আম্পর্ধা! 
আমার মেয়ের গায়ে হাত তুললে চামড়া গুটিয়ে দিয়ে আসতাম।” 

আদিনাথের গলা। মুখ না তুলেও দীপা টের পেল, বাবা বারান্দার কোণ থেকে উঠে এসে 
দরজার কাছে দীড়িয়ে আছে। 

আদিনাথের এই আস্ফালনের দাম কানাকড়িও নয়। দীপা জানে, দুর্বল ভীরুর পাল দূর 
থেকেই চোটপাট কবে। কাছে যাওয়ার সাহস তাদের নেই। নইলে দীপার এমন মারাত্মক ক্ষতির 
কথা জানবার পরও বাড়িতে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকত না আদিনাথ। দৌড়ে গিয়ে অনীশের 
টুটি ধরে টেনে এনে ম্যারেজ-রেজিস্ট্রারের কাছে চলে যেত। এসব না করে বাড়িতে বসেই সে 
শুধু চেঁচামেচি করছে। 

কমলাও জানে, তার স্বামীর দৌড় কতটা। তার কথার উত্তর না দিয়ে দীপাকে জিগ্যেস 
করল, 'অনীশ তখন ও-বাড়িতে ছিল? 

দীপা বলল, “ছিল। তার সামনেই তো ওর বাবা আমাকে অপমান করল।' 

কমলা চমকে উঠল, “অনীশ দীড়িয়ে-দাড়িয়ে সব দেখল? বাপকে কিছু বলল না!” 

“কিছু না। উলটে জানালো, সে আমাকে চেনে না। কোনও জন্মে দেখেনি। ভয় দেখিয়ে 
আমি নাকি ওদের বাড়িতে ঢুকতে চাইছি।' 

বাইরে চাপা হিংস্র গলায় গর্জে উঠল আদিনাথ, “বিশ্বাসঘাতক_ জানোয়ার ।' 

কমলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। তার পায়ের জোর যেন আলগা হয়ে যাচ্ছিল। 
মাথাটা ভয়ানক টলছিল। আবছা গলায় বলল, “এতবড় সর্বনাশ করার পর এমন কথা বলতে 
পারল অনীশ? মুখে বাধল না!' 

দীপা কিছু বলল না। হঠাৎ সে টের পেল, চোখের মণি ফাটিয়ে জলের শ্বোত বেরিয়ে 
আসছে। 

দীপার পিঠে একটা হাত রেখে কমলা খুব আস্তে করে ডাকল, “বুনা__, 

দীপা অনুভব করল, মায়ের হাতটা ভয়ানক কাপছে। তার ছোঁয়ার মধ্যে ভয় উদ্বেগ মমতা, 
এমনি কত কি যে মেশানো। সে বলল, “কী বলছ মা 

কমলা বলল, “এখন কী করবি তুই? ওরা তোকে এভাবে তাড়িয়ে দিল! 

অনীশদের বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর দীপা এতই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে যে-কোনও 
কিছুই স্পষ্ট ভাবার শক্তিটুকু পর্যস্ত অবশিষ্ট নেই। পেটের বাচ্চাটাকে নিয়ে সে কী করবে, তার 
গর্ভবতী হওয়ার খবরটা জানাজানি হওয়ার পর লোকে তার গালে কী পরিমাণ চুনকালি মাখাবে, 
তার জন্য কতটা অসম্মান ও দুর্নাম অপেক্ষা করছে- এই মুহূর্তে এসব চিস্তা করতে পারছে না 
দীপা। মায়ের কথায় মাথার ভেতর প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে গেল যেন। শিরদীড়ার ভেতর দিয়ে 
বিদ্যুৎ চমকের মতো কিছু ওঠানামা করতে লাগল। আচমকা উদ্ত্রান্তের মতো মুখটা বালিশে ঘষতে- 
ঘষতে সে চিৎকার করে উঠল, “যাও তোমরা, যাও। আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না-__কিচ্ছ্ু 


২৪ পাঁচটি উপন্যাস 


ভালো লাগছে না।' 

কমলা আর দাঁড়াল না। ভয়ে-ভয়ে মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত ঘরের বাইরে বেরিয়ে 
গেল। 

মুখ না ফিরিয়ে দীপা টের পেল, বাবাও দরজার পাশ থেকে সরে গেছে। 

অনেকক্ষণ পর অস্থিরতা কমে এল দীপার। উত্তেজিত স্রাযুগ্ডলো ক্রমশ শান্ত হয়ে আসছে। 
আস্তে-আস্তে মুখ তুলল সে। থুতনিটা বালিশে ডুবিয়ে দূরমনক্ষর মতো সামনের জানালা দিয়ে 
বাইরে তাকাল। 

জানালার গা ঘেঁষে একটা নিমগাছ। নীচে কিছু আগাছা, ভাঙা ইটের টুকরো, কাচের টুকরো, 
নানা রকমের জঞ্জাল, ইত্যাদি। তার পরেই ভাঙাচোরা পাঁচিল। পাঁচিলের পর সরু গলি। গলি 
পেরিয়ে এঅঞ্চলের বিখ্যাত ঢালিপাড়ার বস্তি। বস্তির মুখে দু-তিনটে মুদি দোকান, পান-বিড়ির 
দোকান, আর আছে চায়ের স্টল। এই স্টলগুলোর সামনে কাঠের বেধে চিরস্থায়ী একটি ভিড় 
সারাক্ষণ অনড় হয়ে থাকে। দিনরাত ওখানে হইহল্লা, চিৎকার, খিস্তি। 

চায়ের দোকানগুলো দেখে ওদের সত্যিকার চেহারা বোঝার উপায় নেই। বাইরে বিরাট 
উনুনে চব্বিশ ঘণ্টা চায়ের জল ফুটছে। একপাশে সারি-সারি বোয়েমে নোনতা বিস্কুট আর বাজে 
বেকারির রদ্দি পাউরুটি সাজানো । বস্তির লোকেরা এসে চা-বিস্কুটও খায়, রুটিও কেনে । আদতে 
এগুলো ধোৌকাবাজি। এদের আসল কারবারটা সামনের দিকে নয়, পেছনে । সেখানে রয়েছে জালা 
বোঝাই তাড়ি আর দিশি চোলাই মদের সারি-সারি বোতল। 

সন্ধের পর দোকানগুলোতে ভিডটা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে বাড়ে হল্লা এবং 
চিৎকার। এক-এক দিন মাতলামির ডিগ্রি চড়ে গেলে ছুরি মারামারি কিংবা বোমাবাজি শুরু হয়ে 
যায়। 

বস্তির পর রেললাইন। তার ওধারে অনেকটা জায়গা জুড়ে রেল ইয়ার্ড। সেখানে বন্ধে 
মাদ্রাজ হরিয়ানা থেকে মাল বোঝাই হয়ে অগুনতি ওয়াগন আসে। সর্বক্ষণই ওখানে কয়েকশো 
ওয়াগন দাঁড়িয়ে থাকে। ঢালিপাড়া বস্তির সমস্ত সমস্যা এবং ঝামেলার উৎস ওই ওয়াগনগুলো। 

এখানে ওয়াগন ব্রেকারের তিন-চারটে গ্যাং আছে। ওয়াগনের দখল নিয়ে তাদের মধ্যে 
প্রায় রোজ খুনোখুনি তো হচ্ছেই, তার ওপর রয়েছে রেলপুলিশের সঙ্গে প্রতি রাত্রেই এনকাউন্টার। 
বোমা রাইফেল আর স্টেনগানের শব্দে তখন সমস্ত এলাকা থরথর কাপতে থাকে। 

এই মুহূর্তে বস্তির মাথায় যে আকাশের লম্বাটে অংশটা দেখা যাচ্ছে সেখানে এলোমেলো 
টুকরো-টুকরো মেঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর চোখে পড়ছে কণ্টা চিল। অলস ডানা মেলে তারা বাতাসে 
ভেসে বেড়াচ্ছে। 

দীপা বস্তির মাথায় স্কাইলাইন, মেঘ, চিল, চায়ের দোকান-__কিছুই দেখছিল না। কয়েকমাস 
আগের একটা রাতের ছবি তার চোখের সামনে অদৃশ্য কোনও স্ক্রিনে যেন ফুটে উঠছিল। 

এ-বছর মারাত্মক বর্ধা গেছে। কলকাতার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছিল, পঞ্চাশ বছরের 
মধ্যে এত বৃষ্টি আর হয়নি। অর্ধশতাব্দীর এই রেকর্ড বর্ষণে কলকাতা একেবারে ডুবে গিয়েছিল। 

জুন মাসের মাঝামাঝি সেই দিনটায় খুব সম্ভব এ-বছরের সব চাইতে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল। 
সকাল থেকেই পাহাড়ের মতো কালো ভারি মেঘে আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। যণ্ত বেলা .বাড়ছিল, 
মেঘের ভারে আকাশটা যেন ঝুলে পড়ছিল। 

ভোর হতে-না হতেই অয-আলল বৃষ্টি শুরু হয়েছে সেদিন। কিন্তু তা দেখে বিকেল পর্যন্ত 
বোঝা যায়নি, সন্ধের সময় গোটা শহর লগুভগ্ড করে অমন বিপর্যয় ঘটে যাবে। 

তখন ভবানীপুরে বিকেলের দিকে একটা টিউশনি করত দীপা। আড়াইটে কি তিনটে বাজলে 
সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। বেরুবার মুখে কমলা বলেছিল, “আকাশের যা অবস্থা, আজ 


রণক্ষেত্র ৫ 


না হয় পড়াতে না-ই গেলি।, 

দীপা বলেছে, “যে মেয়েটাকে পড়াই, আসছে সপ্তাহে তার হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা। এখন 
না গেলে চলে! 

“কিন্তু জোরে বৃষ্টি নামলে মুশকিলে পড়ে যাবি। ফিরবি কী করে£ কমলাকে বেশ চিস্তিত 
মনে হয়েছিল। 

দীপা বলেছে, “সকাল থেকেই তো মেঘ জমে আছে। জোরে বৃষ্টি নামার হলে এতক্ষণে 
নেমেই যেত। মনে হচ্ছে সারাদিনই এইরকম গুঁড়ি-গুঁড়ি পড়বে।, 

“বেরুবিই যখন, বেশি দেরি করিস না, তাড়াতাড়ি পড়িয়েই চলে আসিস।, 

“ঠিক আছে।, 

ভবানীপুরে পৌছুতে-পৌঁছুতে চারটে বেজে গিয়েছিল। ঘণ্টাখানেকের বেশি সে তার 
ছাত্রীটিকে পড়ায়নি। পাঁচটা যখন বাজে, ছাত্রীর মা-ই তাকে তাড়া দিয়ে উঠিয়ে দিয়েছিল। “আজ 
আর পড়াতে হবে না। শিগগির বাড়ি চলে যান। মেঘের যা চেহারা হচ্ছে, চারদিক ভাসিয়ে দেবে।” 

জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে চমকে উঠেছিল দীপা । আকাশের যে রং দেখে সে বেরিয়েছিল, 
এর মধ্যে কখন যেন তার গায়ে কেউ আরও দশ পোঁচ আলকাতরা লাগিয়ে দিয়েছে। মেঘের 
পাহাড় কলকাতার ওপর আরও অনেকখানি নেমে এসেছে। 

ছাত্রীর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সবে বাস রাস্তায় এসেছে দীপা, আকাশটাকে ভেঙে-চুরে বৃষ্টি 
নেমে গেল, সেইসঙ্গে উলটোপালটা ঝড়ো হাওয়া কলকাতার হাড় গুঁড়িয়ে দিতে-দিতে চারদিকে 
ঘোড়া ছুটিয়ে যেতে লাগল। ব্যাগ থেকে দীপা সবে ছাতাটা খুলেছে, সঙ্গে-সঙ্গে দমকা তেজী হাওয়ায় 
সেটার ভাটিগুলো মট করে ভেঙে গেল। দুর্যোগের হাত থেকে নিজেকে বাঁচার জন্য দৌড়ে সামনের 
একটা ঝোলানো বারান্দার তলায় অগুনতি লোকের মধ্যে গিয়ে দীড়িয়েছিল সে। 

তারপর দেড়-দু-ঘণ্টা এমন তোড়ে বৃষ্টি পড়ল যাতে দশ ফুট দূরের কিছুই প্রায় দেখা 
যায়নি। প্রবল ঝড় রাস্তার ধারের অনেকগুলো বিরাট-বিরাট গাছ শেকড়সুদ্ধু উপড়ে এনে মাটিতে 
শুইয়ে দিয়েছিল। 

কলকাতায় আধ ঘণ্টা মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হলে দেড় ফুট জল জমে যায়। সেদিন যা 
ঘটেছিল সেটা পৃথিবীর আদিম দুর্যোগের মতো ভয়াবহ। একটানা প্রচণ্ড বৃষ্টিতে বুক সমান জল 
জমে গিয়েছিল। ইঞ্জিনে জল ঢুকে কয়েকশো ট্যাক্সি, বাস, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা অচল হয়ে 
চারপাশে দাড়িয়ে পড়েছিল। | 
গিয়েছিল দীপা। বারবার মনে হচ্ছিল, মায়ের কথা শুনলেই ভালো করত। এত মেঘ মাথায় নিয়ে 
বাড়ি থেকে বেরুনো ঠিক হয়নি। 

কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এখন কীভাবে সে বাড়ি ফিরবে? দু-একটা বাস 
যাও জল ঠেলে-ঠেলে আসছে, এক সেকেন্ডও দাঁড়াচ্ছে না। দীড়ালেই বা কি! সেগুলোর পেটের 
ভেতর এক ইঞ্চিও ফাক নেই। এমনকী দরজা-জানালাতেও গুচ্ছের লোক ঝুলছে। মানুষের সেই 
নিরেট দেওয়াল ফুঁড়ে কার সাধ্য বাসে ওঠে। বিশেষ করে তার মতো একটা মেয়ের পক্ষে এটা 
প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। 

রাস্তার যা হাল তাতে গোটা কলকাতা একরকম অচলই হয়ে গেছে। এর মধ্যে আড়াই 
মাইল জল সাঁতরে বাড়ি পৌঁছুনোর কথা ভাবা যায় না। রাস্তার কোথায় ম্যানহোল খোলা আছে, 
কোথায় টেলিফোন বা সিএমডিএ-র লোকেরা গর্ত খুঁড়ে রেখেছে তা-ই বা কে জানে। ইলেকট্রিকের 
তার ছিড়ে যেখানে-সেখানে মরণফাদ তৈরি হয়ে আছে। এই অবস্থায় বাড়ির দিকে যাওয়া মানে 
মৃত্যু প্রায় অবধারিত। 


প্রফুল্ল রায়__পাঁচটি উপন্যাস-_৪ 


২৬ পাঁচটি উপন্যাস 


ঘণ্টাদেড়েক পর জলের তোড় কমে এসেছিল। সেইসঙ্গে হাওয়ার দাপটও। তবে একটানা 
ঘ্যানঘেনে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছিল। 

এদিকে ঝুল-বারান্দার তলায় দু-ফুটের মতো জল জমে গেছে। বৃষ্টির ছাটে আগেই সারা 
শরীর ভিজে সপসপে হয়ে গিয়েছিল দীপার। মাথা থেকে, শাড়ি জামা থেকে সমানে জল ঝরছিল। 
হাতের আঙুলগুলো ভিজে-ভিজে সিটিয়ে গেছে। ভীষণ শীত করছিল তার। জলো হাওয়ায় গায়ে 
কাটা দিয়ে উঠছিল। 

বৃষ্টিটা ধরে এলে ঝুল-বারান্দার তলা থেকে লোকজন জল ভেঙে-ভেঙে চলে যেতে শুরু 
করেছিল। জায়গাটা দ্রুত ফাকা হয়ে যাচ্ছিল। 

একা এভাবে জলেডোবা নির্জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা মেয়ের পক্ষে ঠিক নয়। তার 
ওপর ঝপ করে বিকেলটা ফুরিয়ে গিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছিল। 

ওদিকে আকাশে তখনও প্রচুর মেঘ। বৃষ্টিটা যে কমে এসেছিল, তার মানে এই নয়-_ 
একেবারেই থেমে যাবে। যে-কোনও মুহূর্তে প্রচণ্ড উদ্যমে আবার শুরু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

ভীষণ ভয় করছিল দীপার। চটি দুটো খুলে এক হাতে ঝুলিয়ে, আর-এক হাতে শাড়িটা 
অনেকখানি গুটিয়ে একসময় সে জল ভাঙতে শুরু করেছিল। যতই এগুচ্ছিল, চোখে পড়েছে 
চারদিকে রাস্তা বলতে কিছুই নেই-_সব নদী। 

জলের তলায় অত্যস্ত সতর্ক ভঙ্গিতে, গর্ত-টর্ত বাচিয়ে পা ফেলতে হচ্ছিল দীপাকে। পাঁচ 
ফুট করে এগুচ্ছিল, আর অনেকটা করে জীবনীশক্তি যেন ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিল। 

আধ ঘণ্টা যাওয়ার পর দীপার মনে হয়েছিল, আর পারবে না। হাতে-পায়ের জোড় দ্রুত 
আলগা হয়ে আসছিল। চারদিক ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। যে-কোনও মুহর্তে ঘাড় গুঁজে, মুখ থুবড়ে 
সে পড়ে যাবে। 

ধুকতে-ধুঁকতে আরও খানিকটা যাওয়ার পর হঠাৎ দীপার চোখে পড়েছিল একটা দামি 
প্রাইভেট কার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ভেতরে জল ঢুকলেও গাড়িটা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি। 

একজন সুপুরুষ চেহারার যুবক ড্রাইভ করছিল। জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সে বলেছে, 
“আপনি কোন দিকে যাবেন? ৃ 

দীপা চমকে উঠেছিল। সে জানে এই জাতীয় ছোকরারা খারাপ মতলব নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। 
লিফট দেওয়ার নাম করে গাড়িতে তুলে রেপ-টেপ করে কোথাও ফেলে দেয়। চেঁচামেচি করলে 
খুন, মার্ডারও করে ফেলে। দীপার মতো মেয়েকে বাড়ি বসে থাকলে তো চলে না। অনেক সময় 
টুইশনি করে ফিরতে-ফিরতে রাতও হয়ে যায়। অনেকদিন রাৰ্রে প্রায় ফাকা রাস্তায় যখন সে 
বাসটাসের জন্য দীড়িয়ে আছে সেই সময় নিঃশব্দে একটা দামি গাড়ি গা ঘেঁষে এসে দীড়িয়েছে। 
মুখ বাড়িয়ে চাপা গলায় কেউ বলেছে, “উঠে আসুন না।” দীপা ভয় হয়তো পেয়েছে, তবে তা 
বুঝতে দেয়নি। পা থেকে চটি খুলে, চিৎকার করে বলেছে, “তুমি যাদের খুঁজছ আমি সেই ক্লাসের 
নই। জুতিয়ে তোমার গাল ছিঁড়ে দেব। 

গাড়ি আর দাঁড়ায়নি, আচমকা দারুণ স্পিড তুলে উধর্বশ্বাসে পালিয়ে গেছে। 

সেই দুর্যোগের রাতে শরীরের সবটুকু শক্তি ফুরিয়ে এলেও দীপা চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল 
কিন্তু তার আগেই যুবকটি আবার বলেছে, 'দূর থেকে লক্ষ্য করছিলাম, আপনি জল ঠেলে-ঠেলে 
এগুচ্ছেন। রাস্তা একেবারে ফাকা। এভাবে একা-একা কোনও মেয়ের পক্ষে হেঁটে যাওয়া খুবই 
রিক্কি। জলের তলায় কোথায় গর্ত-র্ত আছে, কে জানে। তা ছাড়া এই রাস্তাটা রাত্রিবেলা খুব 
খারাপ। আ্যান্টি-সোশাল এলিমেন্টরা সুযোগের জন্য ওত পেতে থাকে । 

যুবকটিকে খারাপ মনে হয়নি। অস্তত কথায়-বার্তায় তাকে দায়িত্বশীল নাগরিকের মতো 
লেগেছিল-_যে শুধু নিজের কথাই ভাবে না, অন্যের ব্যাপারেও চিন্তা করে। সেই দুর্যোগের রাতে, 


রণক্ষেত্র ২৭ 


কলকাতা যখন জলের তলায় ডুবে গেছে, ফাকা রাস্তায় একটি বিপন্ন অচেনা মেয়েকে ফেলে 
যেতে তার মন সায় দেয়নি। সে এবার বলছিল, “নিজের সম্বন্ধে সার্টিফিকেট দিতে বাধ্য হচ্ছি। 
আই আ্যাম নট আ বিস্ট। আমাকে ভদ্রলোক ভাবতে পারেন। উঠে আসুন-__" 

দীপার দ্বিধা তখনও কাটেনি। উত্তর না দিয়ে জড়সড় হয়ে সে যুবকটির দিকে তাকিয়েই 
ছিল। 

যুবকটি এবার বলেছে, “অন্য সময় হলে আপনার দিকে হয়তো তাকাতামই না, কিন্তু 
আকাশের চেহারা দেখছেন? প্লিজ, আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না।' 

কথাগুলো শুনতে-শুনতে দীপার মনে হয়েছিল, তার সম্বন্ধে যুবকটি যেন একটা নৈতিক 
দায়িত্ব বোধ করছে। এরপর সে আর কিছু ভাবতে পারছিল না। শুধু মনে হয়েছিল, হয়তো এক 
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে অন্য এক বিপর্যয়ের মধ্যে গিয়ে পড়ছে। গাড়িতে তুলে যুবকটি যদি তার 
গায়ে হাত দিতে চেষ্টা করে, সে ছেড়ে দেবে না। দীপাকে খুন না করা পর্যস্ত তার শারীরিক 
ক্ষতি করার ক্ষমতা কারও নেই। তেমন দরকার হলে মানুষের সঙ্গে এখনও সে কিছুক্ষণ যুঝতে 
পৌঁছিনো তার পক্ষে অসম্ভব। 

শেষপর্যস্ত নিরুপায় এবং মরিয়া হয়েই গাড়িতে উঠেছিল দীপা। যুবকটি কিন্তু তার 
অসহায়তার কোনওরকম সুযোগই নেয়নি, বরং তার আচরণ কথাবার্তা-_সবই ছিল অত্যত্ত ভদ্র 
এবং মার্জিতি। তার ব্যবহারে আপত্তিকর বা ভয় পাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। 

ফন্ট সিটে নিজের পাশে দীপাকে বসতে বলেনি যুবকটি । ব্যাক-ডোর খুলে পেছনের সিটে 
তাকে বসিয়েছিল। বলেছিল, “আপনি কোথায় যাবেন 

দীপা তাদের রাস্তার নাম জানিয়েছিল। র 

যুবকটি বলেছিল, “ভালোই হল, আমিও ওই দিকেই যাচ্ছি। কাছাকাছিই আমাদের বাড়ি।' 

দীপা উত্তর দেয়নি। সে মনে-মনে ঠিকই করে নিয়েছিল, পারতপক্ষে সে নিজের থেকে 
যেচে কিছু বলবে না। বেশি কথা বলা মানেই খানিকটা সুযোগ দেওয়া। গান্তীর্যের দেওয়াল তুলে 
যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রাখতে চেষ্টা করবে সে। অবশ্য যে-মানুষ অযাচিতভাবে তাকে বিপদ 
থেকে বাঁচিয়েছে, বাড়ি পৌঁছে নিশ্চয়ই দীপা তাকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জানাবে। 

যুবকটি এবার বলেছে, 'গাড়ি কিন্তু জোরে চালাতে পারব না। খুব আস্তে-আস্তে এগুতে 
হবে) 

কারণটা বুঝতে অসুবিধে হয়নি দীপার। অত জলে স্পিড তোলা অসম্ভব। 

ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার করে দিয়েছিল যুবকটি, “চারদিকে তাকিয়ে দেখুন, কত গাড়ি 
অচল হয়ে পড়ে আছে। একবার ইঞ্জিনে জল ঢুকে গেলে আমার গাড়ির অবস্থাও ওগুলোর মতোই 
হবে। তাহলে সারারাত গাড়িতে বসেই দুজনকে কাটাতে হবে।' বলে সে একটু হেসেছিল। 

হালকা চালে মজা করেই কথাটা বলেছে যুবকটি, তবু রাতভর মেঘাচ্ছন্ন আকাশের তলায় 
জলেডোবা নির্জন রাস্তায় একটি অচল গাড়িতে তার সঙ্গে রাত কাটাবার কথা ভাবতেই অদ্ভুত 
ভয়ে দীপার শিরদাড়ার ভেতর দিয়ে বরফের মতো ঠান্ডা স্রোত যেন বইতে শুরু করেছিল। কাপা 
গলায় সে বলেছে, “স্পিড দেওয়ার দরকার নেই। আপনি আস্তেই চালান। বাড়িতে পৌঁছুতে দেরি 
হলে আর কি করা যাবে? 

জলে ঢেউ তুলে স্টিম লঞ্চের মতো এগিয়ে চলেছে গাড়িটা। ঠান্ডা ভেজা বাতাস এতক্ষণ 
মিইয়ে ছিল, হঠাৎ আবার তার দাপট বেড়ে গিয়েছিল। আকাশটা আড়াআড়ি চিরে বিদ্যুৎ ঝলকাতে 
লাগল। চিনির দানার মতো হালকা বৃষ্টি পড়ছিল, আচমকা সেটার তোড় প্রচণ্ড বেড়ে গেল। 

লক্ষ কোটি সিসের ফলা মিনিটে হাজার মাইল স্পিডে যেন নেমে আসছে আকাশ থেকে। 


২৮ পাঁচটি উপন্যাস 


এভাবে ঘণ্টাখানেক চললে কণ্টা ক্রাই-স্ত্রেপার ছাড়া গোটা কলকাতা সোজা জলের তলায় ডুবে 
যাবে। 

গাড়ির জানালাগুলো খোলা ছিল। তার ভেতর দিয়ে উলটোপালটা জলের ছাট আসছিল। 
যুবকটি প্রায় টেঁচিয়ে উঠেছে, “জানলা বন্ধ করুন। বলতে-বলতে সামনের দিকের জানালাগুলোর 
কাচ সে নিজেই তুলে দিয়েছিল। 

আর চমকে উঠে দ্রুত হাত বাড়িয়ে পেছন দিকের জানালা বন্ধ করেছিল দীপা। 

যুবকটি বলেছিল, “এরকম বৃষ্টি পড়তে থাকলে পনেরো মিনিটের মধ্যে ইঞ্জিনে জল ঢুকে 
যাবে। কী যে করব তখন! গাড়ির ভেতরে কম পাওয়ারের যে নীলাভ বাহ্থটা জুলছিল তার 
আলোয় তাকে খুবই চিস্তিত দেখাচ্ছিল। 

দীপা কিছু বলেনি। তবে সে-ও খুব উৎ্কঠিত হয়ে উঠেছিল। টের পাচ্ছিল, ভেতরকার 
উদ্বেগ তার চোখেমুখেও ফুটে বেরিয়েছে। 

শেষপর্যস্ত অবশ্য ইঞ্জিনে জল ঢোকেনি। বৃষ্টিটা হঠাৎ যেভাবে প্রবল বেগে আবার পড়তে 
শুরু করেছিল, তাতে মনে হয়েছিল, বাকি রাতটুকু আর থামবে না। কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে 
হঠাই থেমে গিয়েছিল। আর যুবকটি রাস্তার জলের বিরুদ্ধে একটানা যুদ্ধ করে-করে যখন 
ঢালিপাড়ার বস্তির কাছে চলে এসেছিল তখন একটা বেজে গেছে। 

কাছাকাছি এলেও দীপাদের বাড়ি পর্যস্ত যাওয়া সম্ভব হয়নি, কেন না, ওদিকটা খুবই নীচু। 
দীপাদের অঘোর নন্দী লেনে তখন কম করে সাড়ে তিন ফুটের মতো জল। ্‌ 

যুবকটি এক জায়গায় গাড়ি থামিয়ে বলেছিল, “আপনাদের বাড়ি এখান থেকে কত দুরে? 

দীপা বলেছিল, “সামনের ওই রাস্তাটা ডানদিকে ঘুরে যেখানে আর-একটা রাস্তায় গিয়ে 
পড়েছে, সেই মোড়ের মাথায়।” 

“আপনাকে এই রাস্তাটুকু জল ঠেলে হেঁটে যেতে হবে। গাড়ি নিয়ে ওদিকে যাওয়া 
ইম্পসিবল। ইঞ্জিনে জল ঢুকলে আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না।' 

না, না, আপনাকে আর যেতে হবে না।' গাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে দীপা বলেছিল, “আমার 
জন্যে আপনার অনেক কষ্ট হল। কী বলে যে ধন্যবাদ দেব।' 

ধন্যবাদের কিছু নেই। কেউ বিপদে পড়লে আর-একজনকে তো পাশে এসে দীড়াতেই 
হয়।' 

ভদ্র পরোপকারী এই যুবকটিকে সেই মুহূর্তে খুব ভালো লেগেছিল দীপার। বলেছিল, “এত 
কাছে এলেন, অথচ বাড়ি নিয়ে যেতে পারছি না। রাস্তার যা হাল! 

যুবকটি হেসে বলেছিল, “পরে কখনও দেখা হলে যাওয়া যাবে।' 

“আচ্ছা চলি। নমস্কার।' 

নমস্কার। বলেই হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গিয়েছিল যুবকটির। খুব ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল সে, 
“ওই দেখুন, একসঙ্গে এতটা সময় কাটালাম, অথচ কেউ কারও নাম জানি না। আমি-_অনীশ 
চ্যাটার্জি” 

দীপা তার নাম জানিয়ে জলের ভেতর সতর্ক পা ফেলে-ফেলে বাড়ির দিকে এগিয়ে 
গিয়েছিল। 


পরের দিন একটু বেলায় যখন কাছাকাছি থানা থেকে নন্টার সাইরেন বেজে উঠেছে, 
সেই সময় আদিনাথ দীপার ঘরের সামনে এসে ব্যস্তভাবে ডাকাডাকি শুরু করেছিল, “বুনা-_ 
বুনা-_- 


রণক্ষেত্র ২৯ 


দীপার ঘুম কিছুক্ষণ আগে ভেঙেছে কিন্তু তখনও বিছানা থেকে ওঠেনি। কাল প্রচণ্ড বৃষ্টিতে 
ভেজার জন্য জুর-জবুর লাগছিল। মাথাটা ভীষণ ভারী, কপালের দুপাশে রগগুলো অনবরত 
লাফাচ্ছিল। সে ঠিকই করে রেখেছে আজ আর স্কুলে যাবে না। সারাদিন শুয়ে-শুয়েই কাটিয়ে 
দেবে। বেলা আর-একটু বাড়লে বাবা বা পিন্টুকে দিয়ে ইনফ্লুয়েঞ্জা ট্যাবলেট আনিয়ে খেয়ে নেবে। 

শুয়ে-শুয়ে অন্যমনক্কের মতো বাইরে পাঁচিলের ওধারে ঢালিপাড়া বস্তির একটানা টালির 
চাল, কাকেদের ওড়াউড়ি বা আকাশ দেখছিল দীপা। কাল অনেক রান্তিরে বাড়ি ফেরার পর আর 
বৃষ্টি হয়নি। জলে-ধোওয়া আকাশ বেলা নণ্টার রোদে ঝকঝক করছিল। আকাশের দিক থেকে 
নীচে তাকালেই চোখে পড়ছিল তাদের অঘোর নন্দী লেনে এবং তার আশেপাশে সব জায়গাতেই 
কালকের বৃষ্টির জল খানিকটা-খানিকটা জমে আছে। এখানে একদিন তোড়ে বৃষ্টি হলে, জল সরতে 
তিনদিন লেগে যায়। 

আদিনাথের ডাকাডাকিতে ধড়মড় করে উঠে বসেছিল দীপা, “কী বলছ? 

“একটি ছেলে তোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছে? 

কে? 

“চিনি না, আগে দেখিনি। নাম বলল অনীশ ।' 

এই নামের কাউকে প্রথমটা চিনতেই পারেনি দীপা । পরক্ষণেই কাল রাতের সেই যুবকটির 
কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। রাব্রে পৌঁছে দিয়ে সকালেই যে আবার সে চলে আসবে, এটা ভাবা 
যায়নি। দীপা প্রায় হকচকিয়েই গিয়েছিল। বলেছিল, "অনীশ কোথায়? 

“বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।' 

এক মিনিট দাঁড়াতে বলো। ঘরটা গুছিয়ে নিই।, 

আদিনাথ বেশ অবাকই হয়ে গিয়েছিল, “ছেলেটা কে রে? চেহারা, জামাকাপড় দেখে ভালো 
ফ্যামিলির মনে হচ্ছে। 

ক্ষিপ্র হাতে বিছানা তুলে একটা ধবধবে চাদর পাততে-পাততে দীপা বলেছিল, “কাল রাস্তিরে 
যে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল, মনে হচ্ছে সে।, 

প্রচণ্ড দুর্যোগের মধ্যে কীভাবে বাড়ি ফিরেছে, কালই মা-বাবাকে জানিয়েছিল দীপা । আদিনাথ 
আর কোনও প্রম্ন না করে শশব্যস্তে চলে গিয়েছিল। পেছন থেকে বলেছে, 'আমার ঘরে এনে 
বসিও। আমি কলতলায় যাচ্ছি। 

মুখ-টুখ ধুয়ে, মা-বাবার ঘর থেকে শাড়ি-টাড়ি বদলে, মাকে অনীশের জন্য মিষ্টি আনার 
টাকা দিয়ে, ফের নিজের ঘরে এসে দীপা দেখল, ছোট টেবলটার পাশে একমাত্র চেয়ারটিতে বসে 
আছে অনীশ। আদিনাথ একধারে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গে কথা বলছে। 

দীপা আদিনাথের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “মা তোমাকে ডাকছে বাবা ।" 

হ্যা, যাই 

“আদিনাথ চলে যেতে বিছানার এক কোণে আস্তে-আস্তে বসেছিল দীপা। সে কিছু বলার 
আগেই হেসে-হেসে অনীশ বলেছে, দারুণ একটা সারপ্রাইজ দিলাম তো।' 

সারপ্রাইজ কথাটার মানে দীপার অজানা নয়। সে বলেছিল, “তা দিয়েছেন। এই সকালবেলায় 
আপনাকে আশা করিনি।” তার চোখ-মুখ এবং কণ্ঠস্বর থেকে তখনও বিস্ময় কাটেনি। 

“একরকম বাধ্য হয়েই আমাকে আসতে হয়েছে, বলতে পারেন।' 

কিছু না বলে অনীশের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছে দীপা। 

অনীশ বলেছে, কাল রাত্তিরে বাড়ি ফিরে মনে হয়েছিল ওভাবে রাস্তার জলের মধ্যে 
আপনাকে নামিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। এদিকে শ্নাম এরিয়া, জায়গাটা ভালো না। আপনাকে বাড়ি 
পর্যস্ত এগিয়ে দিয়ে আসা উচিত ছিল।' 


৩০ পাঁচটি উপন্যাস 


বিস্ময়টা এতক্ষণে অনেকটা থিতিয়ে এসেছিল। দীপা হালকা গলায় বলেছিল, “ও, এই 
জন্যে আমার খোঁজ নিতে এসেছেন? 

হ্যা।” আস্তে মাথা হেলিয়েছিল অনীশ। 

“কিজ্ত-_* 

'বলুন। 

“আপনি তো আমাদের বাড়ির আযন্রেস জানেন না। এলেন কী করে? 

'রাস্তাটা কাল দেখিয়ে দিয়েছিলেন। জিগ্যেস করে করে চলে এলাম। এটা কি খুব একটা 
ডিফিকাণ্ট ব্যাপার? 

দীপা বলেছিল, “রাস্তায় তো এখনও জল আছে? 

অনীশ বলেছিল, “আছে, তবে কালকের মতো অতটা নেই। আট-ন' ইঞ্চি মতো হবে।' 

গাড়ি এনেছেন নাকি? 

'না। কারা ইট পেতে দিয়েছে, তার ওপর দিয়ে আসতে অসুবিধে হয়নি 

“এত কষ্ট করে আসার কোনও মানে হয়!" দীপা হাসতে-হাসতে বলেছিল, “বাডি-ঘরের 
চেহারা দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমাকে বড়বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ঘোরাঘুরি করতে হয়। 
আমাদের মতো মেয়ের কথা অত ভাবতে নেই।” 

অনীশ কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল, মিষ্টির প্লেট আর চা নিয়ে কমলা ঘুরে ঢুকেছে। তার 
পেছন-পেছন আদিনাথ। 

কাপ-টাপণুলো টেবলের ওপর রেখে কমলা বলেছিল, 'একটু চা খান বাবা।' 

অনীশ বিব্রতমুখে বলেছিল, “আমি আপনার চেয়ে অনেক ছোট । আমাকে আপনি বলবেন 
না।' 

একটু ইতস্তত করে কমলা শেষপর্যস্ত বলেছিল, “কাল তুমি আমাদের অনেক উপকার করেছ। 
তোমার সঙ্গে দেখা না হলে মেয়েটার কী বিপদ যে হত! ভগবান তোমার ভালো করবেন? 

আদিনাথও গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল অনীশকে। রাস্তায় কত রকম লোক ঘোরাফেরা 
করে। কাল রাত্তিরে দীপা তাদের কারও পাল্লায় পড়লে সর্বনাশ হয়ে যেত। ভাগ্যিস অনীশের 
সঙ্গে দেখা হয়েছিল, ইত্যাদি-ইত্যাদি। 

অনীশ সবিনয়ে জানিয়েছে, বিশেষ কিছুই সে করেনি। যে কেউ এটুকু করত। 

আদিনাথ বলেছে, “কেউ করে না, কেউ করে না। আজকাল মনুষ্যত্ব জিনিসটা আর নেই 
বললেই চলে। এর মধ্যে কেউ ভালো কিছু করলে মনে হয়, মানুষ জাতটা একেবারে শেষ হয়ে 
যায়নি। আদিনাথকে সেই মুহূর্তে আশাবাদী দার্শনিকের মতো দেখাচ্ছিল। 

অনীশের খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। সে বলেছে, 'এ-সব শুনলে আমার ভীষণ সঙ্কোচ হয়। 

আদিনাথ একটু বেশি বকে। অনীশ জানানো সত্তেও তার আবেগ এবং উচ্ছাসের তোড় 
থামছিল না। 

অগত্যা কমলাকে বাধা দিতে হয়েছে, “তুমি এখন চল। ওরা কথা বলুক। একরকম জোর 
করেই স্বামীকে নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল সে। ৃ 

এরপর অবশ্য বেশিক্ষণ থাকেনি অনীশ। বড়জোর পীচ-সাত মিনিট। তারপর বিদায় 
নিয়েছিল। তাকে বাইরের রাস্তা পর্যস্ত এগিয়ে দিয়ে দীপা বলেছে, 'এদিকে এলে আবার আসবেন।, 

'আচ্ছা। মাথা নেড়েছিল অনীশ, “অবশ্য কবে আসব, এক্ষুনি বলতে পারছি না।, 

একটু চুপ। 

তারপর অনীশই আবার বলেছে, 'এর মধ্যে আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা বোধহয় 
নেই__তাই নাঃ 


রণক্ষেত্র ৩১ 


অনীশের মনোভাব বুঝতে অসুবিধা হয়নি দীপার। পলকের জন্য ভেতরে-ভেতরে থমকে 
ভেতর একা পেয়েও যে তাকে রেপ তো করেইনি, এমনকী ফ্রন্ট-সিটে নিজের পাশে পর্যস্ত বসায়নি, 
তাকে বিশ্বাস করা যায়। এখন পর্যস্ত যতটুকু দেখা গেছে তাতে অনীশকে ভদ্র শোভন মার্জিত 
এবং বিনয়ীই মনে হয়েছে। 

দীপা বলেছিল, “আমি ভবানীপুরে বিকেলের দিকে টিউশনি করতে যাই। ওখান থেকে 
রবীন্দ্রসদনের কাছে এসে বালিগঞ্জের বাস ধরি। 

কথাগুলোর মধ্যে একটা ইঙ্গিত ছিল, সেটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি অনীশের। সে জিগ্যেস 
করেছে, 'রোজ টিউশনিতে যান? 

হ্যা।' 

“রবীন্দ্রসদনের কাছে এসে কখন ফেরার বাস ধবেন?' 

“সাড়ে পাঁচটা, ছণ্টায়।” 

“কাইন্ডলি ওই সময় একটু ওয়েট করবেন।, 

“আচ্ছা । তবে সাড়ে সাতটার বেশি আমি বাইরে থাকি না। মা-বাবা ভীষণ চিস্তা করে। 

“তার ভেতরেই ফিরে আসবেন।' 

অনীশ চলে গিয়েছিল। 

আর দীপা বাড়ির বাঁধানো চাতাল পেরিযে নিজের ঘরে যেতে-যেতে লক্ষ্য করেছিল, 
আদিনাথ কমলা আর পিন্টু বারান্দার ওধার থেকে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে 
পারছিল, অনীশ সম্পর্কে ওদের অসীম কৌতৃহল। যে আগের রাত্রে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে পরের 
দিন ফের খবর নিতে আসে তার সম্বন্ধে অগুনতি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। 

দীপা দাঁড়ায়নি। কয়েক পলক ওদের দেখে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় শুয়ে 
পড়েছিল। এবং যা আন্দাজ করা গিয়েছিল তা-ই। এক মিনিটও কাটেনি, দরজাব বাইরে থেকে 
আদিনাথের গলা ভেসে এসেছিল, “বুনা-_' 

এটাই প্রত্যাশিত ছিল, কাজেই দীপা চমকে ওঠেনি । আস্তে-আস্তে মুখ ফিরিয়ে দরজার কাছে 
মা এবং বাবাকে দেখতে পেয়েছিল সে। চোখাচোখি হতেই ওরা ঘরে চলে এসেছে। দীপা আর 
শুয়ে থাকতে পারেনি, হাতের ওপর ভর দিয়ে উঠে বসেছিল। 

আদিনাথ এমনিতে এ-ঘরে আসে না, এখন কিন্তু যে চেয়ারটায় কিছুক্ষণ আগে অনীশ 
বসে ছিল সেখানে জাঁকিয়ে বসল। কমলাও দীপার গা ঘেঁষে বসেছে। অর্থাৎ অনীশের ব্যাপারটা 
খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে না জেনে মা আর বাবা এ-ঘর থেকে নড়বে না। 

কমলা একটু ইতস্তত করে বলেছে, 'অনীশকে তুই কতদিন চিনিস?, 

্রশ্নটার মধ্যে এমন কিছু ছিল যাতে মুহূর্তে স্নায়ুগুলো চকিত হয়ে উঠেছে দীপার। স্থির 
চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, “তোমাদের তো রাত্তিরে ফিরেই বলেছি, কালই ওকে 
প্রথম দেখলাম 

মায়ের মুখ-চোখ দেখে মনে হয়নি, তার কথা বিশ্বাস করেছে। সে বলেছিল, “কাল নামিয়ে 
দিয়ে আজই আবার চলে এল! 

বিরুদ্ধ পক্ষের ঝানু উকিলের মতো উলটোপালটা প্রশ্ন করে মা এবং বাবা কী জানতে 
চাইছে, বুঝতে অসুবিধা হয়নি দীপার। একমাত্র রোজগেরে মেয়ে যদি প্রেম করে বসে এবং তার 
পরিণতি বিয়ে পর্যস্ত গড়ায়, তখন এ-বাড়িতে নিশ্চয়ই আর থাকবে না। তার মানে গোটা 
পরিবারটাকে অবধারিত না খেয়ে মরতে হবে। অনীশের সঙ্গে ভদ্র ব্যবহার করলেও বা তাকে 
অনেকবার কৃতজ্ঞতা জানালেও তাদের মনে দুশ্চিন্তা এবং প্রবল ভয় ঢুকে গেছে। এটাই স্বাভাবিক। 


৩২ পাঁচটি উপন্যাস 


সংসার সম্পর্কে দীপার যথেষ্ট কর্তব্যবোধ এবং মমতা । বাবা-মা আর ভাইয়ের জন্য স্কুলের 
পরও মুখে রক্ত তুলে তাকে টিউশনি করতে হয়। তবু মা-বাবা এভাবে সন্দেহ করায় ভীষণ রেগে 
গিয়েছিল দীপা। রূঢ় গলায় সে বলেছে, “কী আবার ব্যাপার? মায়ের দিকে ফিরে বলেছে, “আজ 
চলে এলে আমি কী করতে পারি£' 

সংসারের একমাত্র প্রতিপালক এবং রক্ষক এভাবে খেপে উঠবে, আদিনাথরা ভাবতে 
পারেনি। মুহূর্তে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল। মিনমিনে গলায় আদিনাথ বলেছিল, “না, হঠাৎ 
এল কিনা__মানে আগে আসবে বলে তো শুনিনি-_, 

দীপা উত্তর দেয়নি। 

কমলা একটু ভেবে এবার জিগ্যেস করেছে, 'অনীশরা কোথায় থাকে? 

দীপা নীরস গলায় বলেছে, “জানি না। 

“কী করে ছেলেটি? 

মাথার ভেতরটা গরম হয়ে উঠেছিল দীপার। সে ফেটে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে 
নিয়েছে। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলেছে, “জিগ্যেস করিনি।" 

সন্দিগ্ধ চোখে কিছুক্ষণ মেয়েকে লক্ষ্য করে কমলা বলেছে, “একটা ছেলে হঠাৎ বাড়ি এল। 
তার সম্বন্ধে কিছু জানা গেল না-_” এই পর্যস্ত বলে আচমকা থেমে গিয়েছিল। 

দীপা খেপে উঠেছিল, “আবার যদি অনীশের সঙ্গে দেখা হয়, ওর তো বটেই, ওর 
চোদ্দোপুরুষের খবর জেনে নেব। বলব, সব লিখে দিন, আমার মা-বাবা জানতে চেয়েছে। একটু 
থেমে বলেছে, “এত যে জানতে চাইছ, তোমাদের মতলবটা কী?' 

আদিনাথ এবং কমলা, দুজনেই হকচকিয়ে গেছে । আদিনাথ বলেছে, “কীসের আবার মতলব, 
কিচ্ছু না। কি যে বলিস তুই! 
». কমলা বলেছে, “মেয়ে বড় হলে বাপ-মায়ের সবসময় দুশ্চিস্তা। তুই যখন মা হবি তখন 
বুঝতে পারবি।' 

মনের মধ্যে যাই থাক, কমলা যা বলেছে তাতে অনেকখানি যুক্তি আছে। দীপার উগ্র 
অসন্তুষ্ট ভাবটা নরম হয়ে এসেছিল। তবে সে কিছু বলেনি। 

আদিনাথ অনীশ সম্পর্কে আর কোনও প্রশ্ন করেনি। সে এবার শুধু বলেছে, “তোর শরীরটা 
ভালো না। এখন শুয়ে থাক, আমি ইনফ্লয়েপ্রা ট্যাবলেট নিয়ে আসছি। চলো গো--” কমলাকে 
সঙ্গে করে সে বেরিয়ে গিয়েছিল। 

ওরা চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকেছিল পিন্টু। একটা ভুরু ওপরে 
তুলে, আর-একটা ভুরু নীচে নামিয়ে আস্তে-আস্তে মাথাটা ঝাকাতে-ঝাকাতে বলেছিল, “দিদি, তুই 
টেরিফিক। 

চোখ কুঁচকে ভাইকে দেখতে-দেখতে দীপা বিরক্ত মুখে বলেছিল, “কীসের টেরিফিক? 

“গুরু, ডুবে-ডুবে বেশ ওয়াটার খাচ্ছিলে। এতদিনে ক্যাচ হয়ে গেলে।' ঠোটে ঠোট টিপে 
হাসতে শুরু করেছিল পিন্টু। 

পিন্টুর ইঙ্গিতটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি দীপার। সে ঝাঝিয়ে উঠেছে, “কীসের ওয়াটার? 
কীসের ক্যাচ? | 

'বুঝে-সুঝেও নকশা করছ গুরু? 

গলার স্বর আর-এক পরদা চড়িয়ে দীপা বলেছে, “একেবারে ইয়ার্কি করবি না। ভাগ এখান 
থেকে।' 

পিন্টু তার কথা গ্রাহাই করেনি। দীপার ঘর থেকে চলে যাওয়ার কোনওরকম ইচ্ছাও ছিল 
না তার। চোখ নাচিয়ে-নাচিয়ে সে বলেছে, “তোর টেস্ট আছে দিদি।, 


রণক্ষেত্র ৩৩ 


গলাটা আরও কয়েক পরদা চড়িয়ে দীপা বলেছিল, “গেলি এখান থেকে! 

যাচ্ছি বাবা, যাচ্ছি। তবে গুরু, একটা কথা বলে যাই-_' এই পর্যস্ত বলে ঠোট কামড়াতে- 
কামড়াতে অদ্ভুত কায়দা করে পিন্টু হেসেছিল। 

তার হাসি দেখে মাথার ভিতর রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করেছিল দীপার। উত্তর 
না দিয়ে জুলস্ত চোখে পিন্টুর দিকে তাকিয়ে থেকেছে সে। 

পিম্টু এবার বলেছিল, “মালটাকে যদি খেলিয়ে তুলতে পারিস, আমি একটা টেরিফিক 
জামাইবাবু পেয়ে যাব।' 

“জুতিয়ে তোমার মুখ ছিড়ে দেব বাঁদর।” বলতে-বলতে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে 
পিন্টুর দিকে দৌড়ে গিয়েছিল দীপা, “অসভ্য উল্লুক_. 

কিন্তু সে কাছাকাছি যাওয়ার আগেই কোমরটা মজাদার ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে-চুরিয়ে সট করে 
বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল পিন্টু। সেখান থেকে গলা বাড়িয়ে বলেছে, “কোনও হেল্প দরকার হলে 
বোলো গুরু। অলওয়েজ আমাকে পাবে। বলেই গলাটা টেনে নিয়ে ছুট লাগিয়েছিল। 

মা-বাবা আর পিন্টু যেভাবে অনীশের ব্যাপারটা নিয়ে হইচই বাধিয়ে দিয়েছিল তাতে দীপা 
ঠিকই করে ফেলেছিল, তার সঙ্গে আর দেখা করবে না। রবীন্দ্রসদনের কাছে এসে অনীশের জন্য 
দাড়াবেও না। বাস পেলেই উঠে পড়বে। কিন্তু পরের দিন ভবানীপুরে টিউশনি সেরে রবীন্দ্রসদনের 
কাছে আসতেই দেখা গেল, অনীশ বাসস্ট্যান্ডে দাড়িয়ে আছে। 

দীপাকে দেখে উজ্জ্বল হাসিমুখে অনীশ বলেছিল, “আপনার আগেই আমি এসে গেছি।, 

তক্ষুনি আদিনাথ কমলা এবং পিন্টুর মুখ দীপার চোখের সামনে মুহূর্তের জন্য ফুটে উঠেই 
মিলিয়ে গিয়েছিল। আড়ষ্টভাবে সে-ও হেসেছিল, “তা-ই তো দেখছি। কতক্ষণ দীড়িয়ে আছেন?' 

“এই মিনিট চার-পীচেক। আসুন-_' 

“কোথায় £ 

“আসুন না__ 

কিছুটা অনিচ্ছাসত্তবেও অনীশের সঙ্গে রাস্তা পার হয়ে ওধারে চলে গিয়েছিল দীপা। যে- 
গাড়িটায় করে দুর্যোগের রাতে অনীশ তাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে সেটা ফুটপাথের ধার ঘেঁষে 
দাড়িয়ে ছিল। রবীন্দ্রসদনের বাসস্ট্যান্ডে গাড়ি পার্ক করা বে-আইনি, তাই এখানে ওটা রেখে ওপারে 
গিয়ে দীপার জন্য অপেক্ষা করেছিল অনীশ। 

আগের দিন পেছনের দরজা খুলে দীপাকে ব্যাক সিটে বসতে বলেছিল অনীশ। সেদিন 
কিন্তু সামনের দরজা খুলে দিয়েছে, “উঠুন।" 

ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে দীপা, তবে কিছু বলেনি। আস্তে-আন্তে উঠে বসে পড়েছিল। 

অনীশ ঘুরে গিয়ে ওপাশের দরজা দিয়ে ড্রাইভারের সিটে উঠেই স্টার্ট দিয়েছিল। ছোট্ট 
ঝকঝকে বিদেশি গাড়িটা তেলের মতো মসৃণ ভাবে গড়াতে-গড়াতে রেসকোর্সের দিকে চলে 
গিয়েছিল। 

দীপা একটু উদ্দিগ্রভাবেই জিগ্যেস করেছে, “আমরা কোথায় যাচ্ছি বলুন তো? 

অনীশ বলেছে, বিশেষ কোনও জায়গায় নয়। ময়দানের দিকে কিছুক্ষণ বেড়িয়ে-টেড়িয়ে 
কোথাও বসে একটু চা খাব। 

“আমি কিন্তু রাত্তিরে বেশিক্ষণ বাইরে থাকি না? 

'মনে আছে। কাল বলেছিলেন, সাড়ে সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে যান।' 

হ্যা।' 

“তার আগেই ফিরবেন। 

দীপা উত্তর দেয়নি। শ্নাযুগুলোকে সতর্ক রেখে অনীশের পাশাপাশি ফ্রন্ট সিটে বসেছিল 


প্রফুল্প রায়- পাঁচটি উপন্যাস-_৫ 


৩৪ পাঁচটি উপন্যাস 


সে, আর হু-হা করে অনীশের কথার উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। 

সেদিন বেশি দেরি করেনি অনীশ। খানিকক্ষণ বেড়িয়ে চৌরঙ্গির এক রেস্তোরীয় চা খেয়ে 
আটটার ঢের আগেই দীপাকে পৌঁছে দিয়েছিল। 

একটা ব্যাপার দীপার চোখে পড়েছে, অঘোর নন্দী লেনে তাদের বাড়ি পর্যস্ত গাড়িটা নিয়ে 
যায়নি অনীশ। বেশ খানিকটা দূরে বড় রাস্তার মোড়ে তাকে নামিয়ে দিয়ে বলেছিল, “কাল কি 
দেখা হবেছ 

অনীশ যে এরকম কিছু বলবে, দীপার আগেই তা মনে হয়েছিল। 

সে জিগ্যেস করেছে, “কেন, দরকার আছে? 

'না। দরকার কিছু নেই। খানিকক্ষণ গল্প-টল্প করা যেত, এই আর কি।' 

সোজাসুজি অনীশের চোখের দিকে তাকিয়ে দীপা এবার বলেছে, গল্প করার মতো আর 
কেউ নেই বুঝি? 

সামান্য থিতিয়ে গিয়েছিল অনীশ। ঘাড় কাত করে বলেছে, অনেক আছে। তবে আপনার 
মতো কেউ নেই। 

“আমি কি অন্য সবার থেকে আলাদা % 

“এখন পর্যস্ত তাই তো মনে হচ্ছে।' 

একটু চুপ করে থেকে দীপা বলেছে, “ঠিক আছে, কাল রবীন্দ্রসদনের কাছে ওই সময় 
এলে দেখা হতে পারে।' 

“ফাইন।, 

অনীশ চলে গিয়েছিল। আর দীপা রাস্তার মোড় থেকে তাদের গলিতে ঢুকে পড়েছিল। 
ওখান থেকে তিন-চার মিনিট হাঁটলেই তাদের বাড়ি। 

পরের দিনও অনীশের সঙ্গে বিকেলে দেখা হয়েছিল। তার পরের দিনও। এবং এইভাবে 
প্রতিদিন। 

রোজই ঘণ্টাখানেক ময়দানে বা গঙ্গার ধারে ঘুরে কোথাও চা-টা খেয়ে বাড়ির কাছে বড় 
রাস্তার মোড়ে দীপাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে অনীশ। 

অনীশরা কোথায় থাকে, কী করে, দীপা নিজের থেকে কিছুই জানতে চায়নি। তবে এটা 
বুঝতে পারছিল, অনীশ পয়লাওয়ালা ভালো ফ্যামিলির ছেলে। প্রচুর টাকা না থাকলে অমন ঝকঝকে 
ফরেন গাড়িতে রোজ ঘোরে কীভাবে? দামি-দামি রেস্তোরীর অত বিল দেয় কী করে? 

বড়লোক লম্পট বজ্জাত ছেলেদের সম্বন্ধে দীপার পরিষ্কার ধারণা আছে। এরকম দু- 
একজনের পাল্লায় বেশ কয়েক বার তাকে পড়তে হয়েছে। অনেক কষ্টে, কখনও বুদ্ধি খাটিয়ে, 
কখনও বা শ্রেফ আঁচড়ে কামড়ে এবং চিৎকার করে লোকজন জুটিয়ে নিজেকে উদ্ধার করেছে 
নিন লা 

বং রেস্তোরীয় নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি অনীশ। তার গায়ে হাত দেয়নি, চুমু খায়নি 
নীরব 

একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছে দীপা। সেই যে প্রথম দিন বলে দিয়েছিল, রাত্তিরে সাড়ে 
সাতটার পর সে বাইরে থাকে না, সেটা ভোলেনি অনীশ। পরে আর তাকে মনে করিয়ে দিতে 
হতো না। সাড়ে সাতটার আগেই দীপাকে বাড়ির কাছাকাছি বড় রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে যেত। 
না অনীশ। এটা দীপার পক্ষে ভালোই হয়েছে। রোজ রান্তিরে একটা দামি গাড়ি থেকে তাকে 
নামতে দেখলে অঘোর নন্দী লেনে এবং ওধারেব বস্তির লোকজন তার সম্বন্ধে কী ভাববে, দীপা 


রণক্ষেএ ৩৫ 


তা জানে। সেটা তার পক্ষে খুবই অস্বস্তির কারণ হতো। 

অনীশ হয়তো দীপার অস্বাচ্ছন্দ্ের কথা ভেবে গলির ভেতর গাড়ি নিয়ে আসত না। কিংবা 
অন্য যে কারণ থাকতে পারে তা এইরকম-_-বস্তি এরিয়ায় দামি গাড়ি ঢুকতে দেখলেই সে সবার 
চোখে পড়ে যেত। অনীশ খুব সম্ভব তা একেবারে চায়নি। মোটামুটি এইভাবে অনীশের মনোভাবটা 
আন্দাজ করেছে দীপা। 

কিন্তু আর-একটা দিক তার কাছে আদৌ পরিষ্কার নয়। অনীশকে দেখে যেটুকু বোঝা গেছে 
তাতে তার মতো ছেলের পক্ষে দীপার মতো একটি মেয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া বেশ অস্বাভাবিক। 
এর কারণ কোনওভাবেই দীপা বুঝে উঠতে পারেনি। তার মনে যথেষ্ট সংশয় ছিল, কিন্তু এটাও 
তো ঠিক, দিনকয়েক মেলামেশার ফলে অনীশকে ভালোও লাগতে শুরু করেছিল। বিকেল হলেই 
ছাত্রী পড়িয়ে কখন যে রবীন্দ্রসদনের ফুটপাথে গিয়ে দীড়াত, নিজেরই খেয়াল থাকত না। এক 
দিকে সন্দেহ, অন্য দিকে প্রবল আকর্ষণ, তখন এই দুইয়ের টানা-পোড়েন চলছে দীপার মধ্যে। 
সে ভাবত, দেখাই যাক না অনীশ শেষপর্যস্ত তাকে কোথায় নিয়ে যায়। 

একদিন ময়দানের দিকে বেড়াতে-বেড়াতে দীপা জিগ্যেস করেছিল, “একটা কথা বলব, 
কিছু মনে করবে নাগ, 

ততদিনে তারা পরস্পরকে তুমি বলতে শুরু করেছে। অবশ্য এতটা ঘনিষ্ঠতার ইচ্ছা দীপার 
ছিল না। অনীশকে ভালো লাগলেও নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়ার মেয়ে সে নয়। নিজের চারপাশে 
অদৃশ্য সুকঠিন একটি দেওয়াল প্রথম থেকেই তুলে রেখেছে দীপা। কিন্তু অনীশ একরকম জোরজার 
করেই তাকে “তুমি” বলিয়েছে। গোড়ার দিকে এভাবে বলতে আড়ষ্ট বোধ করত দীপা, পরে অবশ্য 
সে ভাবটা কেটে গেছে। 

অনীশ বলছিল, “মনে করব কেন? যা বলবার বলে ফ্যালো-_, 

দীপা একটু চিস্তা করে বলেছে, “আমরা কীরকম জায়গায় থাকি, নিজের চোখেই দেখে 
এসেছ।' 

হ্যা, দেখেছি তো। 

“ওটাকে প্রায় বস্তিই বলা যায়।' 

“তাতে কী 

উত্তর না দিয়ে দীপা বলে যাচ্ছিল, “আমার মা-বাবা আর ভাইকেও তুমি দেখেছ।' 

হ্যা, দেখেছি তো।, একটু অবাকই হয়েছিল অনীশ। 

দীপা বলেছে, “আমরা ভীষণ গরিব। বাবার চাকরিবাকরি নেই, পুরোপুরি বেকার। ভাইটা 
পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, দিনরাত চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দেয়। লোকে বলে, মস্তান হয়ে 
উঠছে। এভাবে চললে কিছুদিনের মধ্যেই পুলিশের খাতায় নাম উঠে যাবে।' 

চোখের সামনে নিজেদের সংসারের একটা অস্বস্তিকর ছবি টাঙিয়ে দিয়ে দীপা ঠিক কী 
বোঝাতে চেয়েছে, ধরা যাচ্ছিল না। অনীশের বিস্ময় বাড়ছিলই। সে বলেছে, “এসব শুনে কী হবে? 
কোনও দরকার নেই।' 

“দরকার আছে। 

“মানে? 

যার সঙ্গে মিশু তার সব ব্যাকগ্রাউন্ড জেনে রাখা ভালো। 

অনীশ উত্তর দেয়নি। 

দীপা নিজের বুকে আঙুল ঠেকিয়ে এবার যা জানিয়েছে তা এইরকম। নিজের চারিত্রিক 
সুনাম এবং সেই কারণে সামাজিক সম্মান আর বিশুদ্ধ একটি শরীর ছাড়া তার কিছুই নেই। এ 


৩৬ পাঁচটি উপন্যাস 


দুটো কোনওভাবে নষ্ট হলে সে শেষ হয়ে যাবে, বেঁচে থাকার কোনও মানেই তখন তার কাছে 
আর থাকবে না। 

অনীশ প্রথমটা হকচকিয়ে গেছে। তারপর স্থির চোখে দীপাকে লক্ষ্য করতে-করতে বলেছে, 
ক'দিন তো আমাকে দেখলে। কী মনে হচ্ছে__আমি একটা জন্তু % 

ভিতরে-ভিতরে থিতিয়ে গিয়েছিল দীপা। কথাগুলো রূঢই হয়ে গেছে তার। বেশ খানিকক্ষণ 
পর সে আস্তে-আস্তে বলেছে, আমি তোমাকে জস্ত বলিনি। আমাদের মতো গরিব ফ্যামিলির 
মেয়েদের অবস্থাটা কী, সেটাই শুধু জানাতে চেয়েছি।” 

অনীশ উত্তর দেয়নি, একদৃষ্টে সে দীপার দিকে তাকিয়েই ছিল। 

দীপা এবার বলেছে, “একটা কথা বলতে চাই, কিছু মনে কোরো না। 

“মনে করব না- বলো।” 

“আমি তোমার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানি না।' 

অনীশ বলেছে, 'একটু ধৈর্য ধরে থাকো। খুব শিগগিরই তোমাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে 
যাব। তখন আমার সম্বন্ধে সবই জানতে পারবে। প্লিজ, শুধু কণ্টা দিন সময় আমাকে দাও ।" 

এরপর কিছু বলার থাকে না, অগত্যা দীপা চুপ করেই থেকেছে। 

এদিকে অনীশের ব্যাপারে বাড়িতে চাপা টেনশন চলছিল। যদিও সে মাত্র একদিনই এসেছিল 
তবু কমলা এবং আদিনাথের মনে বেশ খানিকটা দুর্ভাবনা থেকেই গেছে। অনীশ সম্পর্কে গোড়ায়- 
গোড়ায় তারা সোজাসুজি কিছু জিগ্যেস করত না, তবে মা-বাবার তাকানো এবং হাবভাব দেখে 
টের পাওয়া যেত ওরা রীতিমতো সন্দিগ্ধ আর চিত্তিত। 

অনীশের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে দীপার যা দৈনন্দিন রুটিন ছিল তার এতটুকু হেরফের 
হয়নি। তার মর্নিং স্কুল। কাটায়-কাটায় সে আগে যেমন স্কুলে যেত, পরেও তাই গেছে। ফিরেছে 
এগারোটায়। দুপুরে খেয়েদেয়ে একটু ঘুমিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েছে তিনটে নাগাদ। ফিরতে-ফিরতে 
সাতটা-সাড়ে সাতটা । আর্টটার পর এক মিনিটও সে বাইরে থাকেনি। তাকে ধরার কোনও উপায়ই 
ছিল না, তবু মা-বাবার সন্দেহ কিছুতেই কাটেনি। তারা যে তার চলাফেরার দিকে নজর রাখছে, 
সেটা টের পাওয়া ফেত। স্কুল থেকেই হোক বা টিউশনি সেরে সন্ধেবেলাতেই হোক, সে বাড়ি 
ফিরলেই খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে তাকে লক্ষ্য করত আদিনাথ আর কমলা। তার চোখে-মুখে ওরা কি খুঁজত, 
কে জানে। 

একদিন দীপা মাকে হঠাৎ জিগ্যেসই করে বসেছিল, “তোমরা আমার দিকে তাকিয়ে কী 
দেখ? 

কমলা চমকে উঠে বলেছে, কই, কিছু না তো।' 

রুক্ষ গলায় দীপা বলেছে, “কেন বাজে কথা বলছ। দেখ, অথচ স্বীকার করবে না।' 

কমলা একেবারে মিইয়ে গেছে। কোনওরকমে বলেছে, “কী যে বলিস তার মাথামুণ্ু নেই। 
বলতে-বলতে একরকম দৌড়েই রান্নাঘরে চলে গিয়েছিলি।' 

কিন্তু এভাবে বেশিদিন লুকোচুরি চলল না। এক রবিবারের সকালে দীপা খখন তার ঘরে 
বসে চা খাচ্ছে, মা এসে ঘরে ঢুকেছিল। ওই সময়টা মায়ের রান্নাঘরে ব্যন্ত থাকার কথা। নিশ্চয়ই 
কোনও জরুরি ব্যাপার আছে, নইলে সে আসত না। 

দীপা জিগ্যেস করেছিল, “কিছু বলবে? 

মালা বলেছিল, হ্যা। কিন্তু-_' 

৮ 
“বললেই তো তুই রাগারাগি করবি।' 


রণক্ষেত্র ৩৭ 


মায়ের মুখ-চোখের চেহারা দেখে হেসে ফেলেছিল দীপা, “আমি বুঝি সবসময় রাগ করি? 

ভরসা পেয়ে কমলা আস্তে-আস্তে মেয়ের পাশে বসেছিল, “না-না, শুধু-শুধু রাগ করবি 
কেন? সংসারের জন্যে মুখে রক্ত তুলে খাটিস, মেজাজ কি সবসময় ঠিক থাকে! 

চায়ে আলতো চুমুক দিয়ে দীপা এবার বলেছে, যা বলবে বলো।' 

কমলা তক্ষুনি উত্তর দিল না, মনে-মনে বলার জন্য যেন তৈরি হতে লাগল। 

কী হল তোমার? একটু যেন অসহিষু্ই হয়ে উঠেছে দীপা, “যা টাকা দিয়েছিলাম সব 
খরচ হয়ে গেছে? 

ক্ষুব্ধ অভিমানের গলায় কমলা বলেছিল, টাকা ছাড়া তোর সঙ্গে বুঝি আর কোনও কথা 
থাকতে পারে না? সেদিন যা দিয়েছিলি তাতে এ-মাসটা চলে যাবে। টাকার জন্যে এখন তোকে 
ভাবতে হবে না।” একটু থেমে বলেছে, “তোর কাছে অন্য ব্যাপারে এসেছি।' 

উৎসুক চোখে তাকিয়ে থেকেছে দীপা। 

এবার দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে কমলা জিগ্যেস করেছে, “আচ্ছা বুনা, ওই ছেলেটি তো আর এল 
না।' 

মা যে অনীশ সম্পর্কে কিছু বলতে এসেছে, আগেই আবছাভাবে বুঝতে পেরেছিল দীপা। 
আবার মনে হয়েছিল, এতদিন যখন এ-নিয়ে মুখ খোলেনি তখন হয়তো কিছু না-ও বলতে পারে। 
সতর্ক ভঙ্গিতে কমলার দিকে তাকিয়ে সে বলেছে, “শুধু-শুধু কি করতে আসবে? অত জলঝড়ের 
মধ্যে রাস্তার মোড়ে নামিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। ঠিকমতো পৌঁছুতে পেরেছি কিনা, দেখতে এসেছিল। 
তারপর আসার তো কোনও কারণ নেই।' 

কমলা থমকে গিয়েছিল। অনীশের ব্যাপারটা দীপা যে এভাবে উড়িয়ে দেবে, সে ভাবতে 
পারেনি। 

দীপা আবার বলেছে, হঠাৎ অনীশের কথা বললে যে? ওর সঙ্গে কিছু দরকার আছে? 

চমকে উঠে কমলা বলেছিল, “না-না, দরকার আবার কীসের % 

একটু চুপচাপ। 

তারপর কমলা আচমকা জিগ্যেস করেছে, “তোর সঙ্গে সেদিনের পর অনীশের আর দেখা 
হয়নি?' 

দীপার রাগও হচ্ছিল, আবার যথেষ্ট মজাও পাচ্ছিল সে। দুই বিরুদ্ধ পক্ষের ঘাঘু উকিলের 
মতো তাদের যেন দুর্দান্ত বুদ্ধির খেলা চলছিল। চোখ কুঁচকে মাকে দেখতে-দেখতে দীপা বলেছে, 
“আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে, এটা বললে তুমি কি খুশি হবে? 

কমলা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ পর করুণ মুখে বলেছে, “ওভাবে প্যাচ দিয়ে 
বলছিস কেন? সাদা মনে জিগ্যেস করলাম, তার ওই উত্তর হল? 

“ঠিক আছে, সোজাসুজিই বলছি। অনীশের সঙ্গে আমার রোজই দেখা হয়। 

কমলা খুব অবাক হয়নি, এই উত্তরটাই যেন সে আশা করেছিল। দেখা হোক বা না হোক, 
এ-ছাড়া অন্য কিছু বললে সে বিশ্বাসই করত না। পরিপূর্ণ চোখে মেয়েকে লক্ষ্য করতে-করতে 
কমলা শ্বাসরদ্ধের মতো জানতে চেয়েছে, “কেমন ছেলে অনীশ? 

“এখনও বুঝতে পারিনি। পারলে তোমাকে জানিয়ে দেব। 

দীপার কাধে হাত রেখে কাঁপা গলায় কমলা বলেছে, “দেখিস বুনা, আমাদের যেন সর্বনাশ 
না হয়ে যায়। 

এতক্ষণ দীপার সঙ্গে এক হিসেবি সন্দিষ্ধ ভীরু মেয়েমানুষ যেন কথা বলছিল। এই প্রথম 
সে টের পেয়েছে কমলার ভেতর থেকে তার নিজের মা বেরিয়ে এসেছে, যে সম্তানের বিপদের 


৩৮ পাঁচটি উপন্যাস 


আশঙ্কায় অস্থির, উৎকণ্ঠিত। কমলার হাতের ছ্রোঁয়া তার স্নায়ুর ভেতর দিয়ে হৃৎপিগু পর্যস্ত যেন 
পৌঁছে গিয়েছিল। 

দুহাতে মায়ের হাতটা জড়িয়ে ধরে বুকের ভেতর টেনে নিয়েছিল দীপা। গভীর গলায় 
বলেছিল, “মা, কত কম বয়েস থেকে তুমি আমাকে একা-একা রাস্তায় বেরুতে দিয়েছ। কখনও 
খারাপ কিছু কি দেখেছ? আমার ওপর বিশ্বাস রাখো, এমন কিছু করব না যাতে তোমাদের মাথা 
কাটা যায়, আর আমাকে আত্মহত্যা করতে হয়।' 

মনে আছে, সেদিনই মা চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ বাদে পিন্টু তার ঘরে এসেছিল। সে বলেছে, 
“কি গুরু, কীরকম চালাচ্ছ!' 

বস্তির ছোকরাদের সঙ্গে দিনরাত মিশে পিন্টুর বারোটা বেজে গেছে। কার সঙ্গে কীভাবে 
কথা বলতে হয়, জানে না! ভদ্রতা, সহবত-_এসবের ধার ধারে না। ভুরু কুঁচকে বিরক্ত মুখে 
তাকিয়েছিল দীপা, কিছু বলেনি। 

ঘরের একমাত্র চেয়ারটা শব্দ করে টেনে নিয়ে বসতে-বসতে পিন্টু এবার বলেছে, "খুব 
উড়ছিস দিদি।” 

উড়ছিস দিদি!' ভ্যাংচানোর ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে ঝাঝিয়ে উঠেছে দীপা, “ছোটলোক, 
বাদর-_এসব কী ধরনের কথা! বদের ধাড়ীদের সঙ্গে আড্ডা মেরে-মেরে একেবারে গোল্লায় গেছিস।' 

দীপার বিরক্তি বা ঝবাঝ কিছুই গায়ে মাখেনি পিন্টু। দুই চোখ আর দুই হাত নাচাতে- 
নাচাতে বলেছে, 'উড়লে বলব কি বডি ফেলে শুয়ে আছিস। যাঃ বাবা!” 

মুখ শক্ত হয়ে উঠেছে দীপার। দীতে দীত চেপে সে পিন্টুকে দেখছিল। 

পিন্টু থামেনি, “দুদিন আগে ভিক্টোরিয়ার দিকে গিয়েছিলাম। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি, সট 
করে চোখে পড়ল সেই মকেলের সঙ্গে তুই রেসকোর্সের পাশ দিয়ে একটা ফরেন কারে উড়ে 
বেড়াচ্ছিস। 

দীপা চমকে উঠেছে। ভেতরে-ভেতরে সে বেশ গুটিয়ে গিয়েছিল। তবে সে ভাবটা বাইরে 
ফুটে উঠতে দেয়নি। ব্যাপারটা পুরোপুরি' উড়িয়েই দিতে চেয়েছিল দীপা, “আজে বাজে কী বলছিস! 
তবে তার গলায় একটু আগের সেই ঝাঝ বা ক্রোধ ছিল না। 

“আজে বাজে!” চোখের তারা ঘুরিয়ে দীপাকে দেখতে-দেখতে বলেছিল পিন্টু। 

না তো কী!" দীপা পিন্টুর দিকে তাকাতে পারেনি। অবশ্য এ-বাড়ির কাউকে ভয় পাওয়ার 
কোনও কারণই নেই। কেন না তার পয়সাতেই সংসার চলে। সবাই এ-জন্য তাকে যে তোয়াজ 
করে, দীপা তা জানে। দীপা কিছু করলে বাধা দেওয়ার সাহস বা শক্তি কারও নেই। তবু ছোট 
ভাইয়ের কাছে ওভাবে ধরা পড়ে যাওয়াতে তার খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে 
নখ খুটতে-খুঁটতে সে বলেছে, দূর থেকে কাকে দেখতে কাকে দেখেছিস! আর সেটা আমার ঘাড়ে 
চাপিয়ে দিচ্ছিস।” 

পিন্টু চেয়ার থেকে উঠে দীপা যেদিকে মুখ ফিরিয়েছিল সেদিকে এসে ফোমরে হাত দিয়ে 
দাঁড়িয়েছিল। তারপর ঘাড় বাঁকিয়ে মজাদার ভঙ্গি করে বলেছে, 'আমার চোখে দূরবিন ফিট করা 
আছে গুরু। গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, ফরেন কারে সেই মকেলের পাশে তুমি ছাড়া আর কেউ ছিল 
না।' 

দীপা উত্তর দেয়নি। 

পিন্টু এবার বলেছে, উরিযিত রাডিত কি রইআরোর বাকি ও দিতি তার চোখ 
চকচকিয়ে উঠেছিল। 

দীপা বলেছে, “জানি না, যা এখান থেকে। 


রণক্ষেত্র ৩৯ 


পিন্টু চলে যায়নি। একটু চিত্তা করে বলেছে, “দিদি, একটা কথা বলব?, 

দীপা আস্তে-আস্তে মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়েছিল, তবে কিছু বলেনি। 

পিন্টু এবার বলেছিল, “এ-বাড়ি থেকে তুই কেটে পড়।, 

দীপা বিমুঢের মতো বলেছে, “কেটে পড়ব! মানে! 

“এখানে থেকে কী করবি বল। বাবা-মা আমি-_সবাই তোর ব্লাড চুষে ছিবড়ে করে ফেলব। 
চান্স যখন একটা পেয়ে গেছিস ওই মক্কেলটার কাধে চেপে স্রেফ হড়কে যা।' 

দীপা অবাক। কিছুক্ষণ আগেও অসভ্যতা আর বাঁদরামো করছিল পিন্টু, কিন্ত এখন তার 
চোখে-মুখে কণ্ঠস্বরে গভীর সহানুভূতির ছাপ। সে যে খুব আতন্তরিকভাবেই কথাগুলো বলেছে বুঝতে 
অসুবিধা হয়নি দীপার। 

এই পিন্টু স্কুল-টুল ছেড়ে যখন মস্তান হয়ে উঠল, বাজে বখা ছোকরাদের সঙ্গে মিশে 
জাহান্নামে যেতে লাগল, তখন থেকেই তাকে ঘেন্না করে আসছে দীপা। পারতপক্ষে সে তার সঙ্গে 
কথা বলত না, তাকে এড়িয়ে চলত। কিন্তু তার মধ্যেও মমতা এবং ভালোত্বের একটু তলানি 
যে এখনও অবশিষ্ট আছে-_এটা দীপার কাছে একটা নতুন আবিষ্কার। তার চোখের কোণ শিরশির 
করছিল, গলার কাছটা ভারী হয়ে উঠছিল। পিন্টুর হাত ধরে কাছে বসিয়ে কাপা গলায় সে বলেছিল, 
ধর আমি এ-বাড়ি থেকে চলে যাব। কিন্তু তোদের কী হবে? বাবার চাকরি নেই, তুই বেকার। 
সংসার চলবে কীভাবে? 

গুলি মার সংসার-ফংসারকে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। আমি তো মস্তান হয়েই গেছি, 
ওয়াগন ব্রেকারদের গ্যাং-এ ঢোকার জন্যে পা-ও বাড়িয়ে দিয়েছি। তাতে যদি কিস্সু না হয়, হাতে 
ড্যাগার আর চেম্বার তুলে নিতে হবে।' পিন্টু এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছিল, "আমাদের যা হওয়ার 
হবে, তুই তো ভালোভাবে বীচ।” 

দীপা উত্তর দেয়নি। অদ্তুত আবেগে তার বুকের ভেতর ঢেউ বয়ে যাচ্ছিল। 

পিন্টু হঠাৎ জিগ্যেস করেছে, “তোর ওই মকেলের বাড়ির ঠিকানাটা দে তো। 

দীপা চমকে উঠেছিল। ঠিকানা সে-ও জানত না, জানলেও দিত না। পিন্টু গিয়ে কী হুজ্জুত 
পাকিয়ে বসবে, কে জানে। দীপা বলেছিল, “ঠিকানা দিয়ে কী হবে? 

তার মনোভাবটা আঁচ করতে পেরেছিল পিন্টু। সে হেসে-হেসে বলেছে, “তোর ভয় নেই 
দিদি। আমার মতো মাকড়া ওর কাছে গেলে তোর কেস কিচাইন হয়ে যাবে। আমি যাচ্ছি না।' 

পিন্টুর এই কাগুজ্ঞান ভালোই লেগেছে দীপার। সে হালকা গলায় বলেছে, “তাহলে ঠিকানা 
চাইছিস কেন? 

“বাবাকে ভালো ড্রেস-ট্রেস চড়িয়ে পাঠিয়ে দেব। তোর মরেলের বাবার সঙ্গে বাত পাক্কা 
করে আসবে। একটা কাগজে ত্যাদ্রেসটা ঝট করে লিখে দে।' 

দীপা এবার বিরক্তভাবে বলেছিল, “আমি অনীশদের ঠিকানা জানি না।' 

“সে কি রে! মক্কেল তোকে বাড়ি পৌঁছে দিল, ফরেন কারে ঘোরাচ্ছে, আর তার ত্যাদ্রেসই 
জানিস না!' 

“ও বলছিল, শিগগির একদিন ওদের বাড়ি নিয়ে যাবে। 

অভিজ্ঞ বয়স্ক লোকের মতো এবার গম্ভীর মুখে পিন্টু বলেছে, “এটা ঠিক করিসনি দিদি, 
ওর ঠিকানাটা জানা দরকার। হয়তো মক্কেল জেন্টলম্যান, তবু আমরা ওর সম্বন্ধে কিছুই জানি 
না। যদি কিছু খারাপ মতলব-ফতলব থাকে ৮ 

পিন্টুর গানভীর্য, দূরদর্শী বিজ্ঞ মানুষের মতো কথাবার্তা দীপাকে বিস্মিত করেছিল। সেদিন 
এই বখাটে অসভ্য ইতর ছেলেটার ভেতর থেকে সম্পূর্ণ অচেনা একটি কোমল মমতাময় 


৪০ পাঁচটি উপন্যাস 


সহানুভৃতিপ্রবণ মানুষ যেন বেরিয়ে এসেছিল। একটা মানুষের ভেতর কতরকম মানুষই না থাকে! 
দীপা কী বলবে, ভেবে পাচ্ছিল না। 

অনীশের ঠিকানাটা যেন কোনও সমস্যার ব্যাপারই না, এভাবে পিন্টু এবার বলেছে, ঠিক 
আছে, ওটা নিয়ে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। আমি মকেলের পাত্তা লাগিয়ে ফেলব। কলকাতায় 
যখন থাকে তখন মাল যাবে কোথায়? তিনদিনের ভেতর অআ্যাদ্রেস নিয়ে আসব।' 


তিন দিন লাগেনি, দেড় দিনের মাথায় অনীশদের বাড়ি ঠিকানা জোগাড় করে এনেছিল 
পিন্টু। চোখ দুটো পুরোপুরি গোল করে বলেছিল, “এ কাকে ক্যাচ করেছিস দিদি! 

উদ্বিগ্ন মুখে দীপা জিগ্যেস করেছিল, “কেন, কী হয়েছে? 

“মকেলদের কী বাড়ি রে গুরু, দেখলে চোখ ট্যারা হয়ে যায়। চার-পাচটা ফরেন কারও 
আছে।” বলতে-বলতে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছিল পিন্টু, “আমার কী মনে হয়, জানিস দিদি? 

দীপা উৎসুক চোখে তাকিয়েছিল, “কী 

“ওই মালেদের ডেফিনিটলি নোট ছাপার কারখানা আছে। না হলে এমন টেরিফিক বাড়ি 
আর এত গাড়ি-ফাড়ি হয় কী করে? 

দীপা উত্তর দেয়নি। 

পিন্টু থামেনি। সমানে বলে যাচ্ছিল সে, “আরও অনেক খবর এনেছি, দিদি। তোর ওই 
মক্কেলের বাবার নাম মণিমোহন চ্যাটার্জি। ব্যারাকপুর আর টিটাগড়ে ওদের অনেকগুলো ফ্যাক্টরি 
আছে।' 

এ-ছাড়া আরও প্রচুর খবর দিয়েছিল পিস্টু। পলিটিক্যাল পার্টির নেতারা ওদের বাড়ি 
নিয়মিত যাতায়াত করে। ইলেকশানে যে ক্যান্ডিডেটের জেতার সম্ভাবনা, নির্বাচনী প্রচারের সময় 
গোপনে তাকে টাকাও দিয়ে থাকেন মণিমোহন। এটা নাকি তার ইনভেস্টমেন্ট, পরে নানাভাবে 
তিনি এর সুযোগ নিয়ে থাকেন। 

দীপা চমকে উঠেছিল। মণিমোহন চ্যাটার্জির নামটা তার আগেই শোনা। ইনিই যে অনীশের 
বাবা, এটা জানার সঙ্গে-সঙ্গে ভেতরে ভেতরে চাপা উদ্বেগ টের পেতে শুরু করেছিল সে। এত 
বড়লোকের ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ না হলেই হয়তো ভালো হত। 

পিন্টু এবার বলেছিল, “দিদি, তুই ভাবিস না। আসছে রবিবার বাবাকে মণিমোহন চ্যাটার্জি 
কাছে পাঠিয়ে দেব। মকেলের সঙ্গে তোর মহব্বত যখন জমে গেছে তখন চিস্তা-ফিস্তার কিছু 
নেই। বস্তির মেয়ের সঙ্গে রাজার ছেলের বিয়ে! শ্লা, একখানা ফাটাফাটি ব্যাপার হয়ে যাবে, না 
কি বলিস? 

দীপা শশব্যস্তে বলে উঠেছিল, 'না-না পিন্টু, মা-বাবাকে এখন কিছু বলিস না। তাড়াছুড়োর 
কী আছে, আর কিছুদিন যাক না।” 

আসলে সেই মুহূর্তে অনীশের কথা ভাবছিল দীপা। অনীশ কথা দিয়েছে, তাকে ওদের 
বাড়ি নিয়ে যাবে। যতদিন নিয়ে না যাচ্ছে সে অপেক্ষা করতে চাইছিল। 

দীপার চোখে-মুখে কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যাতে থমকে গিয়েছিল পিশ্ট্ু। সে বলেছে, 
“অল রাইট। তোর সিগন্যাল না পেলে মুখে তালা ঝুলিয়ে রাখব।' 

দীপা সতর্কভাবে বলেছে, “অনীশের ব্যাপারটা অন্য কাউকে বলিস না।' 

তুই আমাকে কী ভাবিস বল তো নিজের মাথায় আঙুল ঠেকিয়ে পিন্টু বলেছে, “এটার 
ভেতর স্ক্র্যাপ আয়রন পোরা রয়েছে? 


রণক্ষেত্র ৪১ 


দীপা হকচকিয়ে গিয়েছিল। 
পিন্টু এবার বলেছে, “আরে বাবা, আমি কি ড্রাম পিটিয়ে রাস্তায়-রাস্তায় বলে বেড়াব, 
তোমরা শোনো আমার দিদি প্রেমের হেভি গাড্ডায় পড়ে গেছে! তোর প্রেস্টিজ নেই 


এইভাবে মাসদেড়েক কেটেছে। তারপর আচমকা ভবানীপুরের টিউশনিটা হাতছাড়া হয়ে 
গিয়েছিল। যে মেয়েটিকে সে পড়াত, তার বাবা সাত দিনের নোটিশে মাদ্রাজে বদলি হয়ে 
গিয়েছিলেন। অবশ্য এর জন্য দীপার ক্ষতি খুব একটা হয়নি। ছাত্রীর বাবা যেদিন তাকে ট্রান্সফারের 
কথা বললেন তার পরদিনই কসবায় একটা টিউশনি পেয়ে গিয়েছিল দীপা । কাজেই ভবানীপুরের 
দিকে আর আসা হত না, একেবারে উলটো দিকে যেতে হতো। 

অসুবিধে যা হয়েছিল তা হল, অনীশের সঙ্গে তার যোগাযোগটা হঠাৎ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। 
আগে ভবানীপুরে টিউশনি সেরে রবীন্দ্রসদনের সামনে অনীশের জন্য অপেক্ষা করত দীপা, কিন্তু 
কসবায় ছাত্রী পড়িয়ে অত দূরে যাওয়া সম্ভব ছিল না। অবশ্য একদিন পড়াতে না গিয়ে সে 
ওখানে যেতে পারত, অনীশকে বলতে পারত রবীন্দ্রসদনের বদলে সাউথ ক্যালকাটার কোথাও 
যেন সন্ধেবেলা সে চলে আসে, কিন্তু নতুন টিউশনি নিয়েই কামাই করতে সাহস হয়নি। এর 
জন্য ছাত্রীর মা-বাবা যে আদৌ খুশি হবে না, সে তা জানত। 

অনীশের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবে, দীপা ঠিক করে উঠতে পারছিল না। অবশ্য 
পিন্টু ওদের বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করে এনেছে। সেখানে চিঠি লিখতে পারত দীপা, কিন্তু সে 
চিঠি যদি অনীশের হাতে না পড়ে অন্য কারও হাতে পড়ে? তা ছাড়া অনীশ যদি পায়ও, নিশ্চয়ই 
বিরক্ত হবে। কেন না সে তাকে ঠিকানা দেয়নি। নিশ্চয়ই ভাববে, দীপা পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়ে 
তার খবরাখবর নিয়েছে। ফলে দীপার সম্পর্কে তার ধারণা খুবই খারাপ হয়ে যাবে। 

আরও দিনকয়েক কাটার পর এক রবিবারের দুপুরে দীপা ঠিক করেছিল, হরপ্রসাদ সরণিতে 
অনীশদের এমারেল্ড হাউসের সামনে দিয়ে বারকয়েক ঘোরাঘুরি করবে। হঠাৎ যদি অনীশের সঙ্গে 
দেখা হয়ে যায়-_এটাই আসল উদ্দেশ্য। দেখা হলে অবশ্য তাকে একটু অভিনয় করতে হবে। 
অনীশকে সে জানিয়ে দেবে, একটা জরুরি কাজে সে ও-পাড়ায় গিয়েছিল এবং অনীশের সঙ্গে 
দেখা হওয়াটা নিতাস্তই আকস্মিক ব্যাপার। ওই রাস্তায় অনীশদের বাড়ি এটা জানার পর সে অবাক 
হওয়ার ভান করবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। মনে-মনে বেশ কয়েক বার এই অভিনয়টার রিহার্সাল দিয়ে 
নিয়েছিল দীপা। দেখা হওয়ার সম্ভাবনা যদিও খুব কম, তবু একটা সুযোগ নিতে চেয়েছিল। 

সেই দিনটা নানাভাবে তাকে অনেকগুলো সুযোগ করে দিয়েছিল। বাবা-মা সকাল বেলাতেই 
দক্ষিণেম্রে চলে গেছে। সেখানে কী একটা উৎসব ছিল, ওদের ফিরতে-ফিরতে রাত হয়ে যাবে। 
পিন্টুও বাড়ি ছিল না, বন্ধুদের সঙ্গে দু-দিনের জন্য দীঘায় বেড়াতে গেছে। পাশের ঘরের উমাপদ 
বউ ছেলেপুলে নিয়ে গিয়েছিল শালীর ছেলের অন্নপ্রাশনে। অবশ্য রাজেশ্বর সিংরা ছিল। ভোর 
থেকে বেলা বারোটা পর্যস্ত খাটুনির পর দুপুরে খেয়েদেয়ে সে বিকেল অব্দি ঘুমোয়। একা-একা 
তার নিঃসস্তান বউ গঙ্গা আর কি করবে, সে-ও শুয়ে পড়ে। বিভাও সেদিন বাড়িতে ছিল না, 
নার্সিংহোমে ডিউটি দিতে চলে গিয়েছিল। 

দুপুরে খেয়েদেয়ে ভালো একটা শাড়ি পরে, পরিপাটি চুল আঁচড়ে, একটু সেন্ট মেখে, 
ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল দীপা। সবার কাছেই একটা করে চাবি থাকে। মা-বাবা যদি 
তার আগেও কোনও কারণে ফিরে আসে, ঘরে ঢুকতে অসুবিধা হবে না। 


প্রফুল্ল রায় পাঁচটি উপন্যাস__-৬ 


৪২ পীচটি উপন্যাস 


পড়েছিল দীপা। ওধার থেকে অনীশ আসছে। 

প্রথমটা অবিশ্বাস্টই মনে হয়েছিল। পরক্ষণে আশ্চর্য এক আবেগ প্রবল স্রোতের মতো 
তার হৃৎপিণ্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যেতে শুরু করেছিল। দীপা টের পাচ্ছিল, এই আধাআধি চেনা, 
অনেকটাই অচেনা যুবকটিকে কবে যেন নিজের অজান্তেই ভালোবেসে ফেলেছে। 

একটু পরেই অনীশ কাছে চলে এসেছে। সে বলেছিল, “এ কি, বেরুচ্ছ নাকিঃ আর এক 
মিনিট দেরি হলে তোমার সঙ্গে দেখা হত না।' 

অনীশকে দেখে খুব ভালো লাগছিল দীপার। কি এক সুখানুভূতি তার স্নাযুগুলোকে আচ্ছন্ন 
করে ফেলছিল। সে বলেছে, “চলো, বাড়ি যাই।, 

তুমি কোনও কাজে যাচ্ছিলে নিশ্চয়ই ।' 

“তেমন কিছু জরুরি ব্যাপার নয়। এসো-_”' 
যাও না কেন? আমার ওপর রাগ-টাগ করেছ?" 

রবীন্দ্রসদনের সামনে না যাওয়ার কারণটা জানিয়ে দিয়েছিল দীপা। 

অনীশ বলেছে, “ও, এই ব্যাপার। আমি তো কিছুই জানি না। 

জানাব কী করে--বলো। আমাকে কি তোমার ঠিকানা দিয়েছ? 

বিব্রতভাবে অনীশ বলেছে, তা অবশ্য ঠিক। তোমাকে একটা ফোন নাম্বার দেব। এবার 
থেকে দরকার হলে দুপুরের দিকে ওখানে ফোন কোরো ।' 

“আচ্ছা ।” দীপা ঘাড় হেলিয়ে দিয়েছিল। 

অনীশ একটু ভেবে এবার বলেছে, “তোমার সঙ্গে কতদিন দেখা হচ্ছে না, আমার ভীষণ 
খারাপ লাগছিল। তাই ভাবলাম তোমাদের বাড়ি যাই।” 

দীপা মনে-মনে বলেছে, "আমারও খারাপ লাগছিল। তাই তোমার খোঁজে বেরিয়ে 
পড়েছিলাম । তবে মুখে কিছু বলেনি। 

অনীশ আবার বলেছে, “কসবায় কতক্ষণ পড়াও? 

“পাঁচটা, সাড়ে-পীচটা পর্যন্ত ।' 

“ছণ্টার সময় গোল পার্কের কাছ চলে যেতে পারি।' 

“এসো ।' 

বাড়ি ফিরে এসে তালা খুলে অনীশকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল দীপা। বলেছিল, “দু- 
মিনিট বসো, আমি আসছি।” 

অনীশ বলেছিল, “নিশ্য়ই মিষ্টি-টিষ্টি আনতে যাচ্ছ? 

সেইরকমই ইচ্ছে ছিল দীপার। সে বলেছে, “এই মানে-_' 

“মানে-টানের দরকার নেই। এইমাত্র ভাত খেয়ে এসেছি, মিষ্টি আনতে হবে না।' 

“চা করে আনি? 

কিচ্ছু করতে হবে না। প্রিজ তুমি বোসো। 

প্রায় জোর করেই দীপাকে বসিয়ে দিয়েছিল অনীশ। তারপর বলেছে, কাটা ভীষণ চুপচাপ 
দেখছি। কেউ নেই নাকি? 

না।' 

মা-বাবা, পিন্টু এবং বাড়ির অন্য ভাড়াটেরা কে কোথায় গেছে, সব জানিয়েছিল দীপা। 

সেই দুপুরবেলায় চারপাশ আশ্চর্য নিঝুম। বাইরে দেওয়ালের গা ঘেঁষে নিমগাছের ডালে 
একজোড়া শালিক অনবরত খুনসুটি করে চলেছে। কোথায় যেন থেকে-থেকেই ঘুমস্ত গলায় একটা 


রণক্ষেত্র ৪৩ 


কাক ডেকে উঠছিল। শালিকের কিচির-মিচির আর কাকের ডাক দুপুরের নির্জনতাকে অনেক গুণ 
বাড়িয়ে দিচ্ছিল। 

আকাশে ছন্নছাড়া কিছু মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। জলের মিহি দানা মেশানো হাওয়া বয়ে 
যাচ্ছিল ঝিরঝির করে। 

মুখোমুখি বসে এলোমেলো কথা বলতে-বলতে হঠাৎ কী যেন হয়ে গিয়েছিল দুজনের। 
সেদিনের স্তব্ধ নির্জন দুপুর অনিবার্ধ নিয়তির মতো দুটি যুবক-যুবতীকে পরস্পরের খুব কাছে টেনে 
নিয়ে গিয়েছিল, ঘটিয়ে দিয়েছিল আশ্চর্য এক ম্যাজিক। 

একসময় দীপা বিচিত্র এক ঘোরের মধ্যে টের পেয়েছিল সে আর অনীশ বিছানায় শুয়ে 
আছে আর দুজনের শরীর কী এক অন্রান্ত নিয়মে গলে-গলে মিশে যাচ্ছে। অস্পষ্টভাবে সে অনুভব 
করতে পারছিল দুটো পুরু উষ্ণ ঠোট তার ঠোঁটের সব নির্যাস শুষে নিচ্ছে। 

কতক্ষণ পর কে জানে, দুটো শরীর বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তারপরও অপরিসীম 
সুখানুভূতিতে সমস্ত স্নায়ু আচ্ছন্ন হয়ে ছিল দীপার। 

কিন্ত কখন যেন একসময় ঘোরটা কেটে গিয়েছিল দীপার। চমকে ধড়মড় করে উঠে বসেছে 
সে। শ্বাসরুদ্ধের মতো শাড়ি-টাড়ি টেনে উরু হাঁটু এবং পায়ের পাতা ঢেকে, দুই হাতে মুখ গুঁজে 
আচমকা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল। 

তার পিঠে একা হাত রেখে নরম গলায় অনীশ বলেছে, 'কাদছ কেন?, 

দীপার কান্না থামেনি। উদন্রান্তের মতো মাথা নাড়তে-নাড়তে সে বলেছে, “এ কী করলাম 
আমি, এ কী করলাম!” 

আস্তে-আস্তে দীপার পিঠে হাত বুলোতে-বুলোতে অনীশ বলেছে, 'এত ভেঙে পড়ছ কেন? 
যা হল তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। কোয়াইট ন্যাচারাল।' 

ভয়ে-ভয়ে দীপা জিগ্যেস করেছে, “যদি কিছু হয়ে যায় 

হলে তখন দেখা যাবে। অত নার্ভাস হয়ো না তো। স্মাইল- হাসো হাসো।' 

এরপর থেকে গড়িয়াহাটার মোড়ে সন্ধের আগে-আগে অনীশের সঙ্গে রোজ দেখা হতে 
লাগল। দিনগুলো স্বপ্নের মধ্যে যেন উড়ে যাচ্ছিল। 


মাসতিনেক বাদে হঠাৎ একদিন স্নান করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল দীপা । সেইসঙ্গে 
হড়হড় করে বমি, সারা শরীর একেবারে মাখামাখি হয়ে গিয়েছিল তার। 

কমলা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে দীপার হাত-পা-মুখ-বুক ধুইয়ে, জামাকাপড় বদলে ঘরে 
এনে শুইয়ে দিয়েছিল। 

প্রথমটা কমলার মনে হয়েছিল, খাওয়াদাওয়ার গোলমালে বদহজম হয়েছে, কিন্তু কিছুক্ষণের 
মধ্যে তার অভিজ্ঞ চোখ আতিপাতি করে দীপার চোখে-মুখে কি যেন খুঁজতে শুরু করেছিল। খুবই 
উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল কমলাকে। 

মায়ের দিকে তাকাতে পারছিল না দীপা। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে চেষ্টা করছিল। 

বেশ কিছুক্ষণ বাদে মায়ের সমস্ত শরীর যেন হুড়মুড় করে ভেঙে তার পাশে পড়ে গিয়েছিল। 
তার মুখ থেকে সব রক্ত পরতে-পরতে . নেমে গিয়ে সাদা হয়ে গেছে। দু-হাতে দীপাকে জড়িয়ে 
ধরে কাপা শিথিল গলায় সে বলেছিল, “কে আমাদের এমন ক্ষতি করল? 

দ্রুত মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়েই উপুড় হয়ে বালিশে মুখ শুঁজে দিয়েছিল দীপা। 
সেই দুপুরের প্রথম মাসটায় সে বুঝতে পারেনি কিন্তু দ্বিতীয় মাস থেকে একটু-একটু করে নিজের 


৪8৪8 পাঁচটি উপন্যাস 


শরীরে কীসের একটা সংকেত পাচ্ছিল। বিবাহিতা দু-একজন বন্ধুর কাছে এ-সব ব্যাপারে আগেই 
দীপা অনেক কিছু শুনেছে। নিজের দেহে সেই লক্ষণগুলি আবছাভাবে ফুটে উঠতে দেখছিল সে। 
আর এখন তো-_ 

শ্বাস-টানার মতো শব্দ করে চাপা গলায় কমলা আবার বলেছিল, 'কীরে, চুপ করে আছিস 
কেন? বল। 

দীপা মুখ তোলেনি, বালিশে মুখ গুঁজে রেখেই আবছা গলায় অনীশের নাম বলেছিল। 

খুব অবাক হয়নি কমলা। এটা যেন একরকম জানাই ছিল তার। তবু ভয়ার্ত মুখে সে 
বলেছে, “কী হবে এখন? অনীশ কিছু বলেছে? 

ভাবতে বারণ করেছে।' 

“বিয়ের কথা কিছু বলেছে? 

না।' 

“শেষে যদি পিছিয়ে যায়? 

দীপা উত্তর দেয়নি। 

কী চিস্তা করে কমলা জিগ্যেস করেছিল, “তোর বাবাকে অনীশদের বাড়ি পাঠাব? 

দীপা বলেছে, “আর কিছুদিন যাক না-_ 

“আর দেরি করলে লোকের কাছে মুখ দেখানো যাবে না।” 

একটু চুপ। তারপর কমলাই ফের বলেছে, অনীশ কি এর মধো আমাদের এখানে আসবে? 

দ্বিতীয় বার সেই যে অনীশ দীপার খোঁজে অঘোর নন্দী লেনে এসেছিল, তারপর থেকে 
মাঝে-মাঝেই আসত। দীপা বলেছিল, “আসতে পারে। আমাকে কিছু বলেনি। 

কমলা বলেছিল, “দু-চার দিনের ভেতর না এলে তোর বাবাকে পাঠাতেই হবে। এ-নিয়ে 
কারও আপত্তি আমি শুনব না।” চিরদিনের ভীরু কমলাকে সেই মুহূর্তে ভীষণ একরোখা আর 
জেদী মনে হয়েছিল। সর্বক্ষণ যে ভয়ে কুঁকড়ে থাকে তার ভেতর থেকে অন্য এক কমলা বেরিয়ে 
এসেছিল যেন। 

অনীশ কবে আসবে সেজন্য খুব 'বেশি অপেক্ষা করতে হয়নি, পরের দিনই সে দীপাদের 
বাড়ি চলে এসেছিল। 

আগের দিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেদিন কসবায় যায়নি দীপা। সন্ধেবেলা তার জন্য 
গোলপার্কে দাড়িয়ে থেকে-থেকে শেষপর্যস্ত কী ভেবে অঘোর নন্দী লেনে চলে এসেছে অনীশ। 
বাইরের দরজায় কড়া নাড়তে আদিনাথ এসে তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়েছিল। অন্যদিন সে এলে 
আদিনাথ বা কমলা সোজা দীপার ঘরে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু সেদিন আদিনাথ বলেছিল, “তোমার 
সঙ্গে খুব জরুরি কথা আছে। এসো-_, 

অনীশ রীতিমতো অবাকই হয়েছিল। চমকে আদিনাথের দিকে তাকিয়েছে সে। আদিনাথের 
মুখে চাপা অসন্তোষ ক্ষোভ বিরক্তি বা অন্য কী যে ছিল, ঠিক বুঝতে পারেনি। তবে এটা টের 
পেয়েছে, এই আদিনাথ অন্যদিনের আদিনাথের মতো নয়। যে-মানুষ মেয়ের রোজগারে বেঁচে থাকার 
্লানিতে জড়সড় হয়ে থাকে এই আদিনাথের মধ্যে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনীশ কেমন 
যেন অস্বস্তি বোধ করছিল। 

আদিনাথ সেদিন তাকে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে ঢুকেছিল। একটা হাতল-ভাঙা চেয়ারে 
অনীশকে বসিয়ে, তার মুখোমুখি বসতে-বসতে বলেছিল, "আজকালের ভেতর তুমি না এলে আমাকে 
তোমাদের বাড়ি যেতে হত।' 

হঠাৎ নার্ভাস হয়ে পড়েছিল অনীশ। বলেছিল, “কেন বলুন তো? গলার স্বরটা স্বাভাবিক 


রণক্ষেত্র 8৫ 


ছিল না তার, ভীষণ কাপছিল। 

এদিকে দীপা নিজের ঘরে শুয়ে ছিল। শুয়ে-শুয়েই টের পেয়েছিল, অনীশ এসেছে। কিছুক্ষণ 
অপেক্ষা করার পরও যখন অনীশ তার ঘরে এল না তখন আসন্তে-আস্তে উঠে বাইরে বেরিয়ে 
এসেছিল। সঙ্গে-সঙ্গে পাশের ঘরে আদিনাথ এবং অনীশের গলা শুনতে পেয়েছিল। তা ছাড়া চোখে 
পড়েছিল, ওই ঘরেরই দরজার ঠিক বাইরে শ্বাসরুদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে আছে কমলা । নিজের 
অজান্তেই মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। ওখান থেকে অনীশ এবং আদিনাথকে স্পষ্ট দেখা 
যাচ্ছিল। 

আদিনাথ তখন বলছে, “আমাদের ফ্যামিলিকে লোকলজ্জার হাত থেকে বাঁচাও ।, 

অনীশ বলেছিল, “আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।, 

“বুনা তোমাকে কিছু বলেনি % 

দীপার ডাক নাম যে বুনা, এতদিনে জেনে গেছে অনীশ। সে বলেছিল, “না। 

“লজ্জায় হয়তো বলতে পারেনি। কিন্তু আমার পক্ষে মুখ বুজে থাকা সম্ভব না।' এক নিশ্বাসে 
কথাগুলো বলে একটু থেমেছিল আদিনাথ। তারপর আবার শুরু করেছে, দীপা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে, 
তোমার সন্তান তার পেটে।' 

মুহূর্তে মুখটা রক্তশুন্য হয়ে গেছে অনীশের। গলগল করে ঘামতে শুরু করেছিল সে। ভাঙা- 
ভাঙা দুর্বল স্বরে বলেছে, কী বলছেন আপনি! 

“ঠিকই বলছি। আদিনাথ সোজাসুজি অনীশের চোখের দিকে তাকিয়েছিল। 

অনীশ মুখ নামিয়ে নিয়েছিল, ঘামে তখন তার জামা-টামা ভিজে গেছে। পুরোনো বাড়ির 
সেই ছোট চাপা ঘরটায় তার দম যেন আটকে আসছিল। 

আদিনাথ এবার বলেছে, “দেখ বাবা, মানুষের শরীরে কামের প্রবৃত্তি থাকবে, সাময়িক 
উত্তেজনায় সে কিছু করে বসবে, এটা অস্বাভাবিক কিছু না। তা ছাড়া যুবক-যুবতীকে তো ঘি 
আর আগুনই বলা হয়। যা হওয়ার তা হয়েই গেছে, এখন তোমাকে বুনা আর তোমার সম্তানের 
দায়িত্ব নিতে হবে।' 

বাবাকে যত দেখছিল ততই অবাক হয়ে যাচ্ছিল দীপা। ভীরু বেকার এবং মেয়ের পয়সায় 
বেঁচে-থাকা একটা অপদার্থ মানুষের মতো নয়, একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন দায়িত্বশীল পিতার মতো 
কথা বলছিল আদিনাথ । ফলে বাবার সম্বন্ধে খুবই শ্রদ্ধা হচ্ছিল। সেইসঙ্গে ভেতরে-ভেতরে তীব্র 
উত্কষ্ঠাও বোধ করছিল। আদিনাথ যেভাবে যা-যা বলছে তাতে অনীশ অসন্তুষ্ট না হয়। তার 
প্রতিক্রিয়া খারাপ হলে দীপাকে যে কী বিপদে পড়তে হবে, সে-ই জানে। 

অনীশের মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, সে বুঝিবা একটা অতল খাদের পাশে এসে দাড়িয়েছে 
আর যে-কোনও মুহূর্তে আদিনাথ তাকে ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দেবে। ভয়ার্ত স্তষ্ক গলায় সে 
বলেছিল, “আমাকে একটু ভাবতে দিন।' 

“ভাবাভাবির সময় নেই অনীশ।' আগের দিন যেভাবে কমলা দীপাকে বলেছিল অবিকল 
সেই সুর এবং সেই ভঙ্গিতে আদিনাথ অনীশকে বলে যাচ্ছিল, “তুমি তো জানোই, আমরা কত 
গরিব, তবু মানসম্মান বলে কিছু তো একটা আছে। তুমি যদি দয়া না করো, সেটা তো যাবেই, 
তার ওপর মেয়েটাকে গলায় দড়ি দিতে হবে? 

তক্ষুনি উত্তর দেয়নি অনীশ। অনেকক্ষণ পর বলেছিল, “ঠিক আছে, আমি বাড়িতে গিয়ে 
মা-বাবার সঙ্গে কথা বলি।' 

“কবে আমরা জানতে পারব? 

কাল।' 

তুমি আসবে? 


৪৬ পাঁচটি উপন্যাস 


হ্যা 

এরপর আর কোনও কথা হয়নি। মাথা নীচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল অনীশ 
এবং কমলা আর দীপাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। 

দীপা বলেছিল, “এসো আমার ঘরে।' 

অনীশ আস্তে-আস্তে মাথা নেড়েছে, 'না, আজ থাক।' দীপাদের পাশ দিয়ে সে সদর দরজার 
দিকে চলে গিয়েছিল। 

দীপা তার পিছুপিছু গেছে। বলেছে, 'দু-মিনিট বসে যাও। তোমার সঙ্গে অনেক কথা 
আছে।' 

“আজ আমাকে ক্ষমা করো। প্লিজ" পেছন ফিরে একবারও দীপার দিকে তাকায়নি অনীশ। 
অঘোর নন্দী লেনের আঁকাবাঁকা সর্পিল গলি মাড়িয়ে প্রায় টলতে-টলতে চলে গিয়েছিল। 

পরের দিন অনীশ আসেনি, তার পরের দিনও না। এমনকী দশদিন পার হয়ে যাওয়ার 
পরও না। এমনকী গোলপার্কে এসে দীপার জন্য অপেক্ষাও করেনি। 

উৎ্ককষ্ঠায়, ভয়ে, সামাজিক অসম্মানের আশঙ্কায় দীপাদের গোটা পরিবারটার শ্বাস বন্ধ হয়ে 
গিয়েছিল যেন। দীপার পেটে ভ্রুণটা যত বড় হচ্ছিল ততই দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগ পাল্লা দিয়ে বেড়ে 
যাচ্ছিল। 

দশদিন পর আদিনাথ বলেছিল, “ও আর আসবে না, মনে হচ্ছে।' 

আদিনাথের কথাগুলো যেন বাতাসে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছিল। দীপা বিমুঢ্রের মতো বাবার 
দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামিষে নিয়েছে। 

আদিনাথ দীতে দীত চেপে বলেছে, বিশ্বাসঘাতক! পশু?” 

বাঝ। যাই বলুক, অনীশক্ে এতউং চেক স্বরে লস ইচ্ছে হযনি দীপার ( সে তখনও 
ভাবছিল, নিশ্চয়ই অনীশ সুখবর নিয়ে আসবে। মা-বাবাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করাতে খানিকটা 
সময় লাগছে। সহজে এরকম একটা ব্যাপার কেউ কি মেনে নেয়! 

কমলা পাশেই দাঁড়িয়েছিল। এ ক'দিনে না খেয়ে, না ঘুমিয়ে প্রচণ্ড দুর্ভাবনায় তার শরীর 
একেবারে ভেঙে গেছে। চোখের কোলে স্থায়ী কালির ছোপ পড়েছে, গাল বসে গেছে, কগ্ঠার 
হাড় ফুঁড়ে বেরিয়েছে। সে বলেছিল, “এখন কী হবে মেয়েটার? আমরা যে শেষ হয়ে গেলাম।' 

একটু দূরে মূর্তির মতো বসে ছিল পিন্টু। আগেই সে দীপার ব্যাপারটা জেনেছে। আদিনাথের 
মতো প্রচণ্ড রাগে পিন্টু ফেটে পড়েনি বা কমলার মতো ভেঙে চুরমারও হয়ে যায়নি, শুধু বিষণ্ন 
চোখে দীপার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। পিন্টুকে এভাবে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে কখনও কেউ দেখেনি। 

এদিকে আদিনাথ স্ত্রীকে বলেছিল, “তুমি মনে করেছ, আমি ওকে ছেড়ে দেব? কক্ষনো 
না। এত বড় একটা অন্যায় করে হারামজাদা বজ্জাত পার পেয়ে যাবে, আমি তা হতে দেব না। 
দেশে আইনকানুন এখনও আছে।, 

অসহায় ভঙ্গিতে কমলা জিগ্যেস করেছে, 'কী করতে চাও তুমি? কত বড়লোক ওরা জানো! 
পয়সার জোরে ওরা আইনকানুন কিনে নিতে পারে। 

'অত সোজা না। এখনই আমি ওদের বাড়ি যাচ্ছি। বলে জামাকাপড় বদক্লাবার জন্য ঘরের 
দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছিল আদিনাথ। 

দীপার সমস্ত অস্তিত্বের মধ্যে হঠাৎ কী একটা প্রতিক্রিয়া ঘটে গিয়েছিল যেন। আদিনাথকে 
থামিয়ে সে বলেছিল, “তোমাকে যেতে হবে না বাবা-_ 

বিমুটের মতো আদিনাথ জিগ্যেস করেছে, “তাহলে? 

“আমি নিজেই যাব।' 

তুই! 


রণক্ষেত্র ৪৭ 


হ্যা, বাবা--' আস্তে মাথা নেড়েছে দীপা, যা করবার আমিই করব।' 
কিন্তু তুই ছেলেমানুষ। ওদের সঙ্গে কি পারবি!, 
“দেখি একবার । দীপার মুখ শক্ত হয়ে উঠেছিল। 


তারপর আজ কিছুক্ষণ হরপ্রসাদ সরণিতে মণিমোহন চ্যাটার্জি আর অনীশের সঙ্গে দেখা 
করে এসেছে। অনীশ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, সে তাকে চেনে না। চরম অপমান করে ওরা 
তাকে বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছে। 

একটা ব্যাপার কিছুতেই দীপা বুঝে উঠতে পারছে না, তার মতো গরিব পরিবারের মেয়ের 
সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠভাবে কেন মিশেছিল অনীশ? প্রথম দিকে তার কথাবার্তায় বা আচরণে তো এতটুকু 
গোলমাল ছিল না। কিন্তু দীপা গর্ভবতী হওয়ার পর সে পালাল কেন? মণিমোহন চ্যাটার্জির ভয়ে? 
বাবার কাছে অনীশ যে কুঁকড়ে থাকে সেটা নিজের চোখেই দেখে এসেছে দীপা। বাবার ভয়ে 
তাকে পিছিয়ে যেতেই হবে, এটা জানা সত্তেও সে কেন তার এমন মারাত্মক ক্ষতিটা করল? 

একটা মেরুদণ্ডহীন কেঁচোর বীজ পেটে নিয়ে কার জন্ম দিতে চলেছে দীপা? ঘৃণায় অপমানে 
তার সমস্ত শরীর ঘিনঘিন করতে লাগল। মনে হল, বমি করে ফেলবে । সেইসঙ্গে অসহ্য এক 
রাগ তার মাথায় আগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে দিতে লাগল। 


কতক্ষণ চুপচাপ বাইরের পাঁচিলের দিকে তাকিযে বিছানায় পড়ে ছিল, দীপার খেয়াল নেই। 
হঠাৎ বাইরের বারান্দা থেকে পিন্টুর চিৎকার ভেদে এল, 'অয়ারের বাচ্চার বডি আমি ফেলে 
দেব। শ্লা বেজন্মা, এক্ষুনি যাচ্ছি। দেখব কে তোকে বীচায়__? 

সঙ্গে-সঙ্গে আদিনাথ এবং কমলা একসঙ্গে ঠেঁচিয়ে উঠল, “মাথা গরম করিস না পিন্টু। 
তুই ঠান্ডা হয়ে বস। যা করার আমরা করব।' 

দীপা আর শুয়ে থাকতে পারল না। দ্রুত বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে বারান্দায় চলে এল। 
অবরুদ্ধ গলায় বলল, “কী হয়েছে? 

আদিনাথ বলল, পিন্টু অনীশদের বাড়ি যেতে চাইছে।' 

উত্তেজিত হইচই শুনে এরকমই কিছু আন্দাজ করেছিল দীপা। বলল, “ওখানে গিয়ে কী 
হবে? 

পিম্টু বলল, 'না গেলে হারামীর বাচ্চাকে টাইট দেব কী করে? শ্লা, ঢালিপাড়া বস্তি বেঁটিয়ে 
সব লোক নিয়ে ওদের বাড়ি ঘেরাও করব। দশটা পেটো ঝাড়লে বাপ বাপ বলে মাকড়া লাইনে 
এসে যাবে।' 

দীপা চমকে উঠল, “তুই কি চাস আমি আত্মহত্যা করি, 

মানে? 

“বস্তির লোকেরা যখন জিগ্যেস করবে, হঠাৎ মণিমোহন চ্যাটার্জির বাড়ি কেন ঘেরাও করতে 
যাচ্ছিস, তখন তাদের কী বলবি 

পিন্টু থতিয়ে গেল। মুখ নীচু করে বলল, “কিন্তু একদিন-না-একদিন সবাই তো ওই শালার 
কথা জানবে। 

পিন্টুর সঙ্গে এ-ব্যাপারে কথা বর্লতে লজ্জায় সঙ্কোচে মাথা কাটা যাচ্ছিল দীপার। কিন্ত 
না বলেই বা উপায় কী? হঠকারিতা বা উত্তেজনার ঝৌকে লোকজন জুটিয়ে সে যদি সত্যি-সত্যিই 
অনীশদের বাড়ি বোমা মারতে যায়, ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবে। মণিমোহন পুলিশ দিয়ে ওকে 


৪৮ পাঁচটি উপন্যাস 


ধরিয়ে পাচ-সাত বছরের জন্য জেলে ঢুকিয়ে দিতে পারেন। যাদের অত টাকা তারা প্রফেশনাল 
মার্ডারার লাগিয়ে পিন্টুকে খুনও করাতে পারে। 

তা ছাড়া অন্য দিক থেকে মারাত্মক অস্বস্তির কারণও আছে। পিম্টুটার যেরকম মাথা গরম, 
রাগের মাথায় বস্তির লোকেদের নিশ্চয়ই গিয়ে বলবে, অনীশ দীপাকে গর্ভবতী করে পালিয়ে গেছে। 
এটা জানাজানি হলে এখানে আর থাকা যাবে না। হয় আত্মহত্যা, নইলে রাতের অন্ধকারে মুখ 
ঢেকে চোরের মতো চলে যেতে হবে। 

হঠাৎ দীপার চোখে পড়ল, বাড়ির অন্য ভাড়াটেরা বাবা আর পিন্টুর ঠেঁচামেচিতে ঘর 
থেকে বেরিয়ে এসে হাঁ করে তাদের কথা শুনছে। তাড়াতাড়ি ভাইকে নিজের ঘরে টেনে এনে 
বোঝাতে লাগল দীপা। তার ব্যাপার নিয়ে কোনওরকম হইচই যেন বাধিয়ে না বসে পিশ্টু। মাথা 
ঠান্ডা করে ভেবেচিস্তে মণিমোহনদের মতো প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এগুতে হবে, নইলে ওরা 
একেবারে শেষ করে দেবে। 

দীপার কথাটা পছন্দ হল না পিন্টুর। দুর্বিনীত ঘাড় বেঁকিয়ে বলল, শ্লা, তোর এত বড় 
ড্যামেজ করে হড়কে বেরিয়ে যাবে আর আমরা ভেবেচিস্তে এগুব! আমার তো পেটো ঝেড়ে- 
ঝেড়ে হোল ওয়ার্ড একেবারে পাউডার করে দিতে ইচ্ছে করছে। তুই আমাকে আটকাস না দিদি। 

পিস্তু-_" 

“তুই ভাবছিস ওরা টাকার জোরে আমাকে শেষ করে দেবে, এই তো? এতদিন তুই আমাকে 
খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিস। তোর প্রেসটিজের জন্যে লাইফটা যদি চলে যায়-_যাবে। 

দু-চোখ জলে ভরে গিয়েছিল দীপার। গভীর আবেগে পিন্টুর একটা হাত নিজের মুঠিতে 
তুলে নিয়ে সে বলল, "আমার একটা কথা তোকে শুনতেই হবে।' 

কী? 

“কণ্টা দিন আমাকে সময় দে। এর ভেতর যদি কোনও উপায় ভেবে বার করতে না 
পারি তোর যা ইচ্ছে করিস।' 

চোখ কুঁচকে কী চিস্তা করল পিন্টু। তারপর বলল, “ঠিক আছে, তোকে এক উইক টাইম 
দিলাম।' বলেই বেরিয়ে গেল। 

আর ধীরে-ধীরে ফের বিছানায় গিয়ে শুয়ে দু-হাতে মুখ ঢাকল দীপা। মণিমোহনদের বাড়ি 
থেকে বেরিয়ে আসার সময় যা ভেবেছিল, আরও একবার সেই কথাই তার মনে পড়ে গেল। 
রা দি বিরুদ্ধে তার মতো দুর্বল অসহায় সম্বলহীন একটি মেয়ে যুদ্ধ চালাবে 

? 


চার 


অনীশদের বাড়ি থেকে ফেরার পর দুটো দিন কেটে গেছে। এর মধ্যে যান্ত্রিক নিয়মে দৈনন্দিন 
কাজগুলো করে গেছে দীপা। ডেইলি রুটিনে এতটুকু হেরফের হয়নি। সকালে উঠে স্কুলে যাওয়া, 
দুপুরে বাড়ি ফিরে খেয়েদেয়ে সামান্য রেস্ট নিয়েই কসবায় টিউশনি-১ এইভাবেই কেটে গেল। 

__ এই দু-দিনে পেটের জুণ নিশ্চয়ই আরও একটু বড় হয়েছে কিন্তু গনীশদের বিরুদ্ধে কোনও 
রণকৌশল এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি দীপা। একবার ভেবেছে, অনীশদের বাড়ি যাবে। 
পরক্ষণেই এই চিস্তাটা খারিজ করে দিয়েছে। ওখানে গিয়ে কাজের কাজ কিছু হবে না। প্রথমত 
দারোয়ান তাকে চিনে রেখেছে, কিছুতেই বাড়ির ভেতর ঢুকতে দেবে না। জোরজার করে ঢুকলেও 
পুলিশ ডেকে মণিমোহন তাদের হাতে তুলেও দিতে পারেন। চুরি, অনধিকার প্রবেশ বা ব্ল্যাকমেলিং 


বণক্ষেত্র ৪৯ 


-পয়সার জোরে এরকম ডজন-ডজন চার্জে ফাসিয়ে দিলে দীপা কী করতে পারে? 

দীপা আরও ভেবেছে, বাড়িতে না ঢুকে রাস্তায় দীড়িয়ে থাকবে। অনীশ যখন ভেতরে 
ঢুকবে বা বেরুবে তখন তাকে ধরবে। কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনে হয়েছে, যে মুখের ওপর বলে দিয়েছে 
তাকে চেনে না--এমন একটা নোংরা কৃমিকে ধরে কী লাভ£ যদি তার সঙ্গে দেখাও হয়ে যায়, 
কী করবে দীপা? চিৎকার করে রাস্তায় লোক জড়ো করবে? গালাগাল দিয়ে, অপমান করে তাকে 
ধুলোয় মিশিয়ে দেবেঃ কিন্তু এসব তার পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। 

আর-একটা কাজও করা যায়। হরপ্রসাদ সরণির প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে জানিয়ে দেওয়া 
যায়, অনীশ তার কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে। কিন্তু এসব করতে হলে নিজের গর্ভবতী হওয়ার 
প্রসঙ্গটা অনিবার্য নিয়মেই উঠবে। এটা তো মিথ্যে নয়, সেদিন নিঝুম দুপুরে নির্জন বাড়িতে যা 
ঘটেছিল তাতে দীপারও সায় ছিল। তার অনিচ্ছা বা আপত্তি থাকলে এই দেহ কোনওভাবেই দখল 
করতে পারত না অনীশ। কাজেই তৃতীয় এই চিস্তাটাকে নাকচ করে দিতে হয়েছে। 


দুদিন পর আজ কসবা থেকে ফিরে নিজের ঘরে বসে ছিল দীপা। তার চোখ জানালার 
দিকে ফেরানো। এখন পরিপূর্ণ পূর্ণিমা চলছে। রুপোর থালার মতো গোল চাদ উঠেছে আকাশে। 
দুধের মতো অঢেল জ্যোতস্নায় বস্তি এবং আবর্জনায়-ভরা কলকাতা আশ্চর্য মায়াবী হয়ে আছে। 
দীপা সেসব কিছুই দেখছিল না, অন্যমনস্কের মতো শুধু তাকিয়েই আছে। 

এখনও অবশ্য খুব খুঁটিয়ে না দেখলে বাইরে থেকে গর্ভধারণের লক্ষণ বোঝা যায় না 
কিন্তু ক'দিন আর? খুব বেশি হলে মাসখানেক বা মাসদুয়েক। যা করার তার মধ্যেই করে ফেলতে 
হবে। বাইরে থেকে আদিনাথের গলা ভেসে এল, “বুনা-_ 

জানালার দিক থেকে আস্তে-আস্তে এধারে মুখ ফিরিয়ে দীপা দেখতে পেল, একা বাবাই 
না, মা-ও দরজার বাইরে দঁড়িয়ে আছে। সে জিগ্যেস করল, “কিছু বলবে 

'হ্যা। দুজনে ঘুরে ঢুকল। আদিনাথ বসল চেয়ারে, আর কমলা তক্তপোশে দীপার গা ঘেঁষে। 

কারও সঙ্গ এই মুহূর্তে ভালো লাগছিল না দীপার, সে কিছুটা নিষ্পৃহ চোখে আদিনাথের 
দিকে তাকিয়ে রইল। 

আদিনাথ বলল, “একটা কথা ভেবে দেখলাম বুনা-_” 

“কী?, 

“অনীশদের নামে কেস করা দরকার। আজ দুপুরে জানাশোনা একজন উকিলের কাছে 
গিয়েছিলাম। সে বললে, কেস করলে আমরা জিতে যাব।' প্রবল উৎসাহে আদিনাথ বলতে লাগল, 
“কান ধরে ওকে বিয়ে তো করানো যাবেই, ক্ষতিপূরণও আদায় করতে পারব। তুই কী বলিস 

দীপা জিগ্যেস করল, “কেস যে করবে, টাকা পাবে কোথায়? তোমার উকিল কি বিনে 
পয়সায় আমাদের জন্যে মামলা লড়বে 

আদিনাথের উৎসাহ অনেকখানি নিভে গেল। টাকাপয়সায় কথাটা আগে ভেবে দেখেনি। 
সে বলল, "তুই কিছু টাকা জোগাড় করতে পারবি না? 

রেগে উঠতে গিয়েও হঠাৎ হেসে ফেলল দীপা। বলল, “কীভাবে সংসার চলছে, জানো 
নাঃ প্রতি মাসেই কিছু-না-কিছু ধার হয়ে যাচ্ছে। কেস করার টাকা আমাকে কে দেবে? আর 
দিলেও শোধ করব কী করে? 

এই সময় ভয়ে-ভয়ে কমলা রলে উঠল, 'সেই হারটা বেচে দিয়ে বরং-_ 

এই হারের একটা ছোট্ট ইতিহাস আছে। আদিনাথের চাকরি চলে যাওয়ার পর তার 
কোম্পানি থেকে কিছু টাকা পাওয়া গিয়েছিল। সেই টাকা থেকে দীপার বিয়ের জন্য একটা হার, 


প্রফুল্ল রায়__পাঁচটি উপন্যাস-_-৭ 


৫০ পাঁচটি উপন্যাস 


এক জোড়া কানের দুল আর চারগাছা ব্রোঞ্জের ওপর সোনার পাত-বসানো চুড়ি বানিয়ে রাখা 
হয়েছিল। হাজার কষ্ট এবং অভাব সত্তেও ওই সোনার জিনিস কণ্টা বিক্রির কথা আদিনাথরা 
ভাবতেও পারেনি। মানসিক দিক থেকে কতটা মরিয়া হয়ে উঠলে শেষ সম্বলটুকুও বেচার সিদ্ধান্ত 
নেওয়া যেতে পারে, দীপা বুঝতে পার্ছিল। এ-সবই তার সম্মান এবং সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্যে। 
মা-বাবা যে তার জন্য এতটা ভেবেছে, এই কারণে কৃতজ্ঞতা এবং গভীর আবেগে দীপার মন 
ভরে গেল। তবু অন্য একটা দিক সে ভোলেনি, সেটা কঠিন নিষ্ঠুর বাস্তবের দিক। দীপা বলল, 
কিন্তু মা, ওই গয়না কণ্টা বেচে তুমি কত টাকা পাবে? 

কমলা জিজ্ঞাস চোখে আদিনাথের দিকে তাকাল। সোনার দাম সম্বন্ধে তার পরিষ্কার ধারণা 
নেই। আদিনাথ বলল, “তিন-চার হাজারের মতো পেতে পারি।' 

দীপা কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই পাশের ঘরের শিবানী দরজা দিয়ে মুখ বাড়াল। 
আদিনাথকে বলল, “দাদা, আপনাকে কে ডাকছে।' 

“কে? আদিনাথ চেয়ার থেকে উঠতে-উঠতে জিগ্যেস করল। 

“নাম বলেনি।' শিবানী আর দাঁড়াল না। আদিনাথ ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোন পেরিয়ে 
সোজা সদরের দিকে চলে গেল। 

এমনিতে আদিনাথের কাছে লোকজন বড় একটা আসে না। এই অঘোর নন্দী লেনে বেশ 
কয়েক বছর কাটালেও তার চেনাজানা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। একসময় বন্ধুবান্ধব নিয়ে হইচই 
করে জীবন কাটিয়ে দিতে ভালোবাসত সে, তখন দিনরাত তাকে ঘিরে কত মানুষ, কত বন্ধু! 
কিন্তু চাকরি যাওয়ার পর যেদিন ঢালীপাড়া বস্তির গায়ে এই গলিতে চলে এল সেদিন থেকেই 
নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে আদিনাথ । বাজার করার সময়টুকু ছাড়া পারতপক্ষে সে বাড়ি থেকে বেরোয় 
না। বারান্দার এক কোণে একটা ভাঙা চেয়ারে সারাক্ষণ যে নিজেকে আটকে রেখেছে তার সঙ্গে 
কারও আলাপ পরিচয় বা ঘনিষ্ঠতা হওয়া সম্ভব নয়, কাজেই কেউ তার কাছে আসেও না। আচমকা 
আজ একজন এসে পড়ায় সবাই বেশ অবাকই হল। 

দীপা এবং কমলা খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। একটু পর তারা দেখতে পেল, 
দামি ধুতি-পাঞ্জাবি পাম্প শ্য পরা মধ্যবয়সি একটি লোককে সঙ্গে করে উঠোন পেরিয়ে পাশের 
ঘরে নিয়ে গেল আদিনাথ । লোকটাকে আগে আর কখনও দেখেছে বলে দীপা মনে করতে পারল 
না। তবে তার মনে কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। ছুট করে বাবা কেন একটা অচেনা লোককে 
একেবারে নিজেদের শোওয়ার ঘরে নিয়ে তুলল? দীপা কমলাকে জিগ্যেস করল, “এই লোকটাকে 
চেনো? 

না। কমলা মাথা নাড়ল, আগে আর কোনওদিন এ-বাড়িতে আসেনি ।' 

কমলার কথা শেষ হতে-না-হতেই আদিনাথ আবার এ-ঘরে এল। তাকে রীতিমতো উত্তেজিত 
দেখাচ্ছে। চাপা গলায় বলল, “মণিমোহন চ্যাটার্জি দূত পাঠিয়েছে। 

স্নায়ুগডলো মুহূর্তে টানটান হয়ে উঠল দীপার। শিররীড়া আপনা থেকেই সোজা হয়ে গেল। 
এটি হটে টির তারার “কেন, হঠাৎ লোক 

? 

“এখনও কিছু বলেনি। যা বলার তোমার আমার দুজনের সামনে বলতে চায়। দু-কাপ 
চা করে ও-ঘরে এসো।' বলেই চলে গেল আদিনাথ। 

কমলাও আর বসে থাকল না। “দেখি, অনীশের বাবা কী খবর পাঠিয়েছে-_ধলতে-বলতে 
সে-ও বেরিয়ে গেল। 

দীপা লক্ষ্য করেছে, মায়ের চোখে-মুখে গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে একটু আশাও চিকচিকিয়ে 
উঠেছে। মা হয়তো ভেবেছে, মণিমোহন চ্যাটার্জি তার মতো পালটেও থাকতে পারেন। দীপাকে 


রণক্ষেত্র ৫১ 


বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর তার অনুশোচনা হয়ে থাকতে পারে। সেই কারণে একটা 
মিটমাট করে নিতে চাইছেন। 

মায়ের মতো দীপা অবশ্য আশাবাদী নয়। তবু কী কারণে মণিমোহন হঠাৎ লোক পাঠিয়ে 
বসলেন তা জানার জন্য তীব্র কৌতুহল বোধ করতে লাগল। কতক্ষণ পর খেয়াল নেই, সে উঠে 
পড়ল। তারপর পা টিপে-টিপে বাইরে বেরিয়ে মা-বাবার ঘরের পাশে দরজার আড়ালে গিয়ে 
দাড়াল। যদিও এভাবে চোরের মতো অন্যের কথা শুনতে তার খারাপ লাগে, এটা খুবই কুরুচির 
ব্যাপার, তবু অপ্রতিরোধ্য কোনও শক্তি তাকে নিজের ঘর থেকে যেন এখানে টেনে নিয়ে এসেছে। 

দরজাটা আধাআধি ভেজানো। তার ফাক দিয়ে দীপা দেখতে পেল, সেই মাঝবয়সি লোকটা 
মা-বাবার বিছানায় বসে চা খেতে-খেতে বলছে, “এটাকে আপনারা একটা আযাকসিডেন্ট বলে ধরে 
নিন। আজকালকার দিনে ছেলেমেয়েরা কত ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশা করছে বলুন তো। আমাদের 
সময়ে কি এসব ছিল? বেশি মিশলে অনেক সময় এরকম আ্যাকসিডেন্ট ঘটেই যায়।” বলতে- 
বলতে একটু থেমে সে আবার শুরু করে, “আপনার মেয়ে একটা ভুল করে বসেছে। এটা অবশ্য 
কোয়াইট ন্যাচারাল। ওর যা বয়েস তাতে এমন ভুল হতেই পারে। যৌবন বড় গোলমেলে জিনিস 
মশাই।' লোকটার চোখ-মুখ শেষ দিকে দার্শনিকের মতো হয়ে উঠল। 

এদিকে শুনতে-শুনতে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে অদিনাথের। সে কর্কশ গলায় বলল, “এসব 
ধানাইপানাই শোনাবার জন্যে মণিমোহন চ্যাটার্জি আপনাকে পাঠিয়েছে নাকি? 

উহু উহ__-' শশব্যস্তে জিভ কেটে লোকটা বলল, “শুধু এসব কেন, আরও অনেক দরকারি 
কথা আছে আপনার সঙ্গে। 

“অনেক কথার দরকার নেই। একটা কথা জানতে পারলেই আমার চলবে ।' 

কী বলুন তো। 

“এই যে আমার মেয়েটার এতবড় সর্বনাশ করা হল, তার সম্মান এরপর কী করে বাঁচবে? 
লোকে যে আর ক'দিন পর আমাদের মুখে চুনকালি মাখিয়ে গায়ে থুথু দিতে-দিতে পাড়া ছাড়া 
করে দেবে। 

“আহা-_" ডান হাতে অভয়মুদ্রা ফুটিয়ে লোকটা বলল, “আপনাদের সবার সম্মান মানে 
প্রেস্টিজ যাতে বাঁচে, সেই জন্যেই তো চ্যাটার্জি সাহেব একটা ফরমুলা দিয়ে আপনার কাছে আমাকে 
পাঠিয়েছেন।' 

'কীসের ফরমুলা? 

“ভেরি সিম্পল। লোকলজ্জার হাত থেকে আপনার মেয়েও বেঁচে যাবে, আপনারাও মাথা 
উঁচু করে চলতে পারবেন। 

বিরক্ত গলায় আদিনাথ বলল, “পরিষ্কার করে বলুন, কীভাবে সেটা সম্ভব।' 

লোকটা বেশ নীচু গলায় কথা বলছিল। আচমকা স্বরটাকে আরও কয়েক পরদা নামিয়ে 
বলল, “যদি রাজি থাকেন, কালই একটা নার্সিং হোম ঠিক করে দিচ্ছি। কয়েক ঘণ্টার মোটে ব্যাপার। 
সকালে আপনার মেয়েকে ভরতি করে দিলে সন্ধেবেলা আগের মতো কুমারীটি হয়েই বাড়ি ফিরে 
আসবে। একেবারে নিষ্পাপ ভারজিন। কারও বাপের সাধ্যি নেই, কিছু টের পায়। 

জানাজানি হওয়ার ভয়ে জোরে টেঁচাতে পারছিল না আদিনাথ । হিংস্র গলায় বলল, “গর্ভপাত 
করিয়ে আমার মেয়ের সর্বনাশ করতে চাইছেন? 

“সর্বনাশ কোথায়? লোকটা কোনও কারণেই উত্তেজিত বা ক্ষিপ্ত হয় না। সব সময় পরম 
সহিষ্ঃ এবং অবিচলিত। নির্বিকার ভঙ্গিতে লে বলতে লাগল, “আযাবরশান করিয়ে তাকে তো নরম্যাল 
করে দেওয়া হবে। ভালো ছেলে দেখে সম্বন্ধ করে তখন তার বিয়ে দিতে পারবেন। গায়ে এই 


৫২ পাঁচটি উপন্যাস 


তার কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রায় ঠেঁচিয়ে উঠল আদিনাথ, “কি পাগলের মতো প্রলাপ 
বকছেন মশাই! আমার মেয়ের এমন মারাত্মক সর্বনাশ করে দিল অনীশ। এখন বলছেন গর্ভপাত 
করিয়ে অন্য ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতে-__' আদিনাথকে উন্মন্তের মতো দেখাচ্ছে। প্রবল রক্তচাপে 
তার গলা দড়ির মতো পাকিয়ে উঠেছে। চোখ দুটো যেন এই মুহূর্তে ফেটে যাবে। 

'দীড়ান-দীড়ান মশাই-_” হাত তুলে লোকটা বলল, “অনীশের কথা কী যেন বললেন? 
সে কার ক্ষতি করেছে? 

“কার আবার, আমার মেয়ের। ভেবেছেন, আবরশানের ব্যবস্থা করে সে পার পেয়ে যাবে? 

'এ তো অদ্ভুত কথা শুনছি। আপনার মেয়ে সেদিন চ্যাটার্জি সাহেবের সঙ্গে দেখা করে 
তার অবস্থার কথা বলেছিল। চ্যাটার্জি সাহেবের মনটা ভীষণ নরম, খুবই সিমপ্যাথেটিক টাইপের 
মানুষ, পরের দুঃখে গলে যান। তাই আমাকে বললেন, মেয়েটাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচিয়ে 
দাও। আর আপনি কিনা এরকম একটা বাজে ব্যাপারে তার ছেলে অনীশকে জড়িয়ে দিতে চাইছেন? 
এটা কিন্তু আপনার কাছে আশা করিনি আদিনাথবাবু।” অত্যন্ত দুঃখিত ভাবে মাথা নাড়তে লাগল 
লোকটা। 

আদিনাথ প্রথমটা থ হয়ে গেল। পরক্ষণেই হিতাহিত জ্ঞানশৃন্যের মতো চিৎকার করে উঠল, 
'অনীশ এ-ব্যাপারে না থাকলে মণিমোহন চ্যাটার্জি এমনি-এমনি আমার ছ'কোণা মুখ দেখার জন্যে 
আপনাকে পাঠিয়েছে? 

লোকটা বলল, “ওই যে বললাম, অত বড়লোক হলে কী হবে, চ্যাটার্জি সাহেবের হার্টটা 
একেবারে ফুলের মতো। সামান্য একটা ভুলের জন্যে আপনার মেয়ের জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে, 
তাই উনি আমাকে পাঠালেন। আপনি ওঁর গ্রেটনেসের কথাটা একবার ভেবে দেখুন।' 

শরীরের সব রক্ত হঠাৎ মাথায় উঠে এল আদিনাথের। দীতে দাত ঘষে সে বলল, “গ্রেটনেস! 
আপনার চ্যাটার্জি সাহেবকে বলে দেবেন, তার ছেলেকে আমি পাঁচ বছর জেলের ভাত খাইয়ে 
আনব। উকিলের সঙ্গে আমি পরামর্শ করেছি এ-ব্যাপারে । 

লোকটা আগের মতোই নির্বিকার। ধীরেসুস্থে পকেট থেকে দুটো কৌটো বার করল সে। 
এক নম্বর কৌটোটা খুলে বাঁ-হাতের তালুতে খানিকটা পানের মসলা ঢালল, তারপর দু-নম্বর কৌটো 
থেকে কয়েক কুচি জরদা নিয়ে তার সঙ্গে মিশিয়ে মুখে পুরল। জিভের তলায় সেগুলো রেখে 
আধবোজা চোখে তার ঝীঝটা শুষে নিতে-নিতে বলল, "আপনার বয়েস কত আদিনাথবাবু? 

আচমকা এরকম বেখাঙ্গা প্রশ্নে হকচকিয়ে গেল আদিনাথ। বলল, “আমার বয়েস দিয়ে 
কী হবে? 

“দরকার আছে। বলুন না” 

“ছাপান্ন-সাতান্ন।' 

“আমারই বয়সি। আমাকে বন্ধু হিসেবে ধরতে পারেন।' লোকটা বলতে লাগল, 'আপনাকে 
একটা সৎ পরামর্শ দিচ্ছি। একেবারে মাথা গরম করবেন না। আপনি বিশ টাকা ফি-র উকিল 
দেবেন, চ্যাটার্জি সাহেব তার বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার টাকা ফি-র পাঁচটা ঝানু ব্যারিস্টার দীড় করাবেন। 
একটার জায়গায় গঞ্াশটা ডেট নেবেন। কতদিন ওঁর সঙ্গে লড়াই চালাতে পারবেন? পরে হয়তো 
মানহানির কেস করে আপনাদেরই জেলে পাঠাবার ব্যবস্থা করবেন। ৃ 

এ কে রা তাত হরর রান 
যে সামান্য সোনাটুকু আছে তা বেচে মণিমোহনের সঙ্গে কতক্ষণ আর যুদ্ধ করা ধায়? ভেতরে 
তার যা-ই চলুক, বাইরে তা ফুটে উঠতে দিল না আদিনাথ। কর্কশ গলায় বলল, “অন্যায়ও করবে, 
উলটে মিথ্যে মামলায় ফাসিয়ে জেলেও পাঠাতে চেষ্টা করবে। কারবারটা ভালোই। তা মশাই আমাকে 
ভয় দেখিয়ে কাজ হবে না। যা হওয়ার হবে, জেলে যেতে হয়' যাব। কিন্তু অনীশ যে এমনি- 


রণক্ষেত্র | ৫৩ 


এমনি পার পেয়ে যাবে, সেটা কিছুতেই হতে দেব না।' 

লোকটা বলল, “আপনি যখন এত জোর দিয়ে বলছেন তখন না হয় ধরেই নিচ্ছি, আপনার 
মেয়ের অনেক পুরুষ-বন্ধুর মধ্যে অনীশ একজন ছিল-_” 

তাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে আদিনাথ খেঁকিয়ে উঠল, “আমার মেয়েকে আপনি ভেবেছেন 
কী? বাজে বদ ছুকরিদের মতো গণ্ডা-গগ্ডা ছেলে নিয়ে ঘোরে? 

“আচ্ছা-আচ্ছা, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, তার একজনই পুরুষ বন্ধু ছিল এবং কোনও 
এক দুর্বল মুহূর্তে দুজনেই ভুল করে বসেছে। কিন্তু মগ্ুলমশাই, আপনি যদি মনে করেন চ্যাটার্জি 
সাহেব আপনার মেয়েকে ছেলের বউ করে ঘরে নিয়ে যাবেন, বিরাট ভুল করবেন। আপনাকে 
অপমান করছি না। চ্যাটার্জি সাহেবের বেয়াই হিসেবে আপনাকে ভাবতে- মানে বুঝলেন কিনা, 
হেঁহে_" একটু থেমে ফের বলল, "ওই সব আকাশকুসুম ভেবে তো লাভ হয় না, মার্টিতে পা 
রেখে বাস্তব ব্যাপারটা বুঝতে হয়। তাই আপনাদের সম্মানও যাতে বাঁচে আর চ্যাটার্জি সাহেবদের 
সম্মানও বজায় থাকে, ওই নার্সিংহোমের ফরমুলাটা দিয়েছিলাম ।” 

আদিনাথ রক্তাক্ত চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে ছিল। বলল, “তাহলে মেনে নিচ্ছেন, 
আমার মেয়ের এই অবস্থার জন্যে অনীশই দায়ী।' 

“মেনে নিলাম কোথায়? আপনাদের মনে একটা সন্দেহ যখন দেখা দিয়েছে, চারদিকে একটা 
টিটিকার পড়ে যেতে পারে। এসব স্ক্যান্ডাল চ্যাটার্জি সাহেব একেবারেই পছন্দ করেন না। তাই 
আর কী-_" বলতে-বলতে গলাটা ঝপ করে অনেকখানি নামিয়ে দিল, “আমার কথা ভালোয়- 
ভালোয় মেনে নিলে আপনার মশাই লাভই হবে। নার্সিং হোমের খরচা তো দিতেই হবে না। 
নগদ হাজার দশেক টাকাও পেয়ে যাবেন। 

“'আঁ-_, 

“ঠিক আছে ঠিক আছে, ওটা পনেরো হাজারই দেওয়া যাবে। 

আদিনাথ বলল, টাকা দিয়ে আমাকে- 

তাকে থামিয়ে দিয়ে লোকটা বলল, “কত দিলে আপনি একেবারে সুবোধ বালক হয়ে যাবেন? 
কত? আমার দিক থেকে তিরিশ হাজার পর্যস্ত অফার রইল। দু-দিন পর আবার আসব। এর 
মধ্যে ভেবেচিস্তে মনস্থির করে রাখবেন। আচ্ছা এখন যাই?” বলতে-বন/.হ উঠে পড়ল সে। “মনে 
রাখবেন ভুজঙ্গ যোষ যা বলে গেল তাতে আপনাদের ভালোই হবে।' 

দীপা রুদ্ধম্বাসে সব শুনে যাচ্ছিল। আর দীড়াল না সে, দ্রুত নিজের ঘরে চলে এল। 
আর সেখান থেকেই দেখতে পেল আদিনাথ লোকটার সঙ্গে চাপা গলায় কী সব বলতে-বলতে 
বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে গেল। ওদের কথার একটি বর্ণও আর শুনতে পেল না দীপা। 


তিরিশ হাজার টাকার অফারটা তাদের সংসারের ভিত কাপিয়ে দিয়েছে, কয়েক ঘণ্টার 
মধ্যে সেটা টের পেতে দীপার আদৌ অসুবিধে হল না। 
কাল রাত্তিরে মণিমোহন সেই লোকটিকে পাঠিয়েছিলেন। সে চলে যাওয়ার পর থেকেই 
আদিনাথ আর কমলা অনবরত গুজগুজ করে কী সব পরামর্শ করে যাচ্ছে। খুব সম্ভব কাল রাত্তিরেও 
ওরা ঘুমোয়নি। তিরিশ হাজার টাকা সামান্য ব্যাপার নয়। 
আজ সন্ধেবেলায় টিউশনি থেকে ফিরে নিজের ঘরে বসে দীপা চা খাচ্ছে, বাইরে থেকে 
কমলার গলা কানে এল, “বুনা_ 
এ-ধারে মুখ ফেরাতেই দীপা দেখতে পেল মা দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে। চোখাচোখি 
হতেই কমলা বলল, “তোর সঙ্গে একটা কথা আছে।" বলতে-বলতে ভেতরে এসে দরজাটা ভেজিয়ে 


৫৪ পাঁচটি উপন্যাস 


তার গা ঘেঁষে বসল। 

মাকে লক্ষ্য করছিল দীপা। চায়ের কাপটা সামনের টেবিলে নামিয়ে রাখতে-রাখতে বলল, 
“কী কথা? 

কমলা তক্ষুনি উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ পর অত্যন্ত কুঠিত ভাবে বলল, দ্যাখ মা, যা 
ক্ষতি হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। তবে লোক জানাজানি হওয়ার আগে পেটের আপদটাকে 
দূর করে দেওয়াই ভালো। নার্সিং হোমে গেলে নাকি একদিনের ভেতর সব ব্যবস্থা হয়ে যায়।' 

মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে দীপা বলল, “কাল দুপুরেও তো বাবা বলছিল অনীশ আমাকে 
বিয়ে না করলে ওদের নামে কেস করবে, ওদের দিয়ে জেলের ঘানি ঘুরিয়ে ছাড়বে। আজ হঠাৎ 
সব পাপ ধুয়ে-মুছে আমাকে শুদ্ধ করে নিতে চাইছে যে?” 

এরকম একটা অস্বস্তিকর বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে ভীষণ বিব্রত বোধ করছিল 
কমলা। বলল, “সব দিক ভেবে দেখলাম, অনীশদের সঙ্গে মামলা করে আমরা কিছুতেই পারব 
না। মাঝখান থেকে তোর বিয়ের জন্যে যে সোনাটুকু রেখেছিলাম--সব খোয়াতে হবে। তার ওপর 
মানহানির মামলা করে ওরা আমাদের বিপদে ফেলে দেবে। তাই-_” 

ভুজঙ্গ ঘোষ কাল রাত্তিরে তোমাকে আর বাবাকে এইসব পরামর্শ দিয়ে গেছে__তাই না? 

কমলা হকচকিয়ে গেল, “কী বলছিস বুনা!' 

খুব শান্ত মুখে দীপা বলল, “আমি সব শুনেছি মা। তিরিশ হাজার টাকার জন্যে এতবড় 
জঘন্য অন্যায় মেনে নিতে চাইছ!' বলতে-বলতে সে টের পেল, বারান্দায় ভেজানো দরজার ঠিক 
বাইরে আদিনাথ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দুজনের কথা শোনার জন্যই যে সে সেখানে ওত পেতে 
রয়েছে, বুঝতে অসুবিধে হয় না। অর্থাৎ ভুজঙ্গ ঘোষ যে ফরমুলা দিয়ে গেছে কমলার মুখে তা 
শুনে দীপার কী প্রতিক্রিয়া হয় সেটা জানতে চাইছে। 

আঁচলে চোখ ঢেকে হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেদে উঠল কমলা। ভাঙা ঝাপসা গলায় বলল, “আমরা 
বড় গরিব বুনা। আইনকানুন বিচার আমাদের জন্যে নয়। তবু এর মধ্যে যদি কিছু টাকা পেয়ে 
যাই__অনেক দুঃখে, নিজের ওপর অনেক ঘেন্নায় এ কথা বলছি মা।' বলতে-বলতে তার কণ্ঠস্বর 
রুদ্ধ হয়ে এল। 

দীপা উত্তর দিল না। 

কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পর কমলা ভয়ে-ভয়ে বলল, “তুই তো কিছু বললি না বুনা__”' 

দীপা অন্যমনক্কর মতো বলল, “কী বলব? 

“তুই তো সব জানিস। ওই লোকটা এলে তো কিছু বলতে হবে।' 

আদিনাথ এবং কমলার মনোভাব বুঝতে পারে দীপা। তাদের ওপর এক ধরনের করুণাই 
হচ্ছে। দীপা জানে, তার এই অবস্থার জন্য মা-বাবা খুবই কষ্ট পাচ্ছে, ক্ষমতা থাকলে অনীশের 
বিশ্বাসঘাতকতার জন্য হয়তো ওরা তাকে খুনই করে ফেলত। কিন্তু ভুজঙ্গ ঘোষ কাল রাত্তিরে 
যে লোভটা দেখিয়ে গেছে সেটা বড়শির মতো তাদের গলায় আটকে গেছে। তাদের কাছে তিরিশ 
হাজার টাকা একটা বিরাট ব্যাপার। মেয়ের গর্ভপাতের জন্য হাজার বার তারা নিজেদের ধিকার 
দেবে, আত্মগ্লানিতে জীবনের শেষদিন পর্যস্ত পুড়তে থাকবে, তবু টাকাটা হাত পেতে নেবেও। 

মা-বাবার কথা দীপা যেমন ভাবছে, তার পাশাপাশি মণিমোহন চ্যাটার্জি মুখটাও তার 
মনে পড়ে যাচ্ছে। লোকটা তাকে দেখে গলার শির ছিঁড়ে চিৎকার করেছিল, বারবার ভয় 
দেখিয়েছিল, হুমকি দিচ্ছিল, এমনকী অপমান করে বাড়ি থেকে বারও করে দিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপারটা 
সেখানেই চুকে যায়নি। ভূজঙ্গ ঘোষকে পাঠিয়ে, আযবরশানের ব্যবস্থা করে এবং প্রচুর টাকা ঘুষ 
দিয়ে সে চিরকালের মতো এটাকে চাপা দিতে চায়। পরে যাতে এই নিয়ে কোনওরকম ঝঞ্ধাট 
বা সমস্যা না দেখা দেয় সেই কারণে পাকাপাকি বন্দোবস্ত করতে চাইছে। 


রণক্ষেত্র ৫৫ 


দীপার আচমকা মনে হল, মণিমোহন ভীষণ ভয় পেয়েছেন, নইলে লোক পাঠিয়ে এতগুলো 
টাকা দিতে চাইতেন না। তার পেটে যতদিন ভুণটা থাকবে তার আতঙ্ক কাটবে না। গলার কাঁটার 
মতো ওটা সারাক্ষণ আটকে থাকবে। দীপা ঠিক করে ফেলল, নার্সিং হোমে যাবে না, পেটের ভেতর 
অনীশের বাচ্চা বড় হতে থাক। সে কমলাকে বলল, “আমাকে একটু ভাবতে দাও। আর-_”' 

দম বন্ধ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল কমলা। কাপা গলায় জিগ্যেস করল, “আর কী? 

“ভুজঙ্গ ঘোষ এলে আমাকে খবর দিও । তাকে যা বলার আমি বলব।' 

এরপর আর কিছু বলতে সাহস হয়নি কমলার। 


দু-দিন পর রাত্রিবেলা যখন ভুজঙ্গ আবার এল তখন দীপা সবে টিউশনি সেরে বাড়ি 
ফিরেছে। আদিনাথের সঙ্গে উঠোন পেরিয়ে সে বারান্দায় উঠতে-না-উঠতেই দীপা নিজের ঘর থেকে 
বেরিয়ে এল। কোনওরকম ভণিতা-টণিতা না করে সোজা সে ভূজঙ্গকে বলল, “আপনি আমার 
সঙ্গে আসুন।, আদিনাথকে বলল, “বাবা, তুমি ও-ঘরে যাও। ভুজঙ্গবাবুর সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা 
বলে আমি ওঁকে তোমার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

আদিনাথ এবং ভুজঙ্গ দুজনেই থমকে দীডিয়ে গিয়েছিল। দীপা যে এভাবে এসে 
তাদের বলবে, কেউ ভাবতে পারেনি । বিস্ময়টা থিতিয়ে এলে ভুজঙ্গ বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। 
চলুন__" 

ভুজঙ্গকে ঘরে এনে দরজা ভেজিয়ে দিল দীপা। সে টের পেল, আদিনাথ নিজের ঘরে 
যায়নি, প্রচণ্ড উত্কষ্ঠা নিয়ে শ্বাসরুদ্ধের মতো দরজার ওধারে দাড়িয়ে আছে। 

যে ভুজঙ্গ কোনও কারণেই বিচলিত হয় না বা ঘাবড়ায় না, তার চোখে-মুখে অস্বস্তি 
দেখা দিল। অস্থিরভাবে সে বলল, “আমাকে কিছু বলতে চান? 

“নিশ্চয়ই ।' দীপাকে বিন্দুমাত্র উত্তেজিত বা চঞ্চল দেখাচ্ছে না। খুব শাস্ত গলায় সে বলল, 
“আপনি ওই চেয়ারটায় বসুন।' 

বিমূঢের মতো ঘরের একমাত্র চেয়ারটায় বসে ভুজঙ্গ অপেক্ষা করতে লাগল। আর খানিকটা 
দূরে, তক্তপোশে তার মুখোমুখি বসল দীপা। 

ভুজঙ্গ বলল, “কী ব্যাপার বলুন-_' 

সোজা তার চোখের ভেতর চোখ রেখে দীপা বলল, “মণিমোহন চ্যাটার্জি আপনাকে যে 
মতলবে বাবার কাছে পাঠিয়েছে তা হবে না।' 

চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল ভূজঙ্গ, “আ্যা, আপনি কী বলতে চাইছেন।' 

দীপা অচঞ্চল ভঙ্গিতে বলল, “তা আপনি ভালো করেই জানেন। মণিমোহন চ্যাটার্জিকে 
জানিয়ে দেবেন, আমি নার্সিং হোমে যাচ্ছি না।' 

ভুজঙ্গ অন্ধকার জগতের পোকা। মণিমোহন তাকে দিয়ে নানা ধরনের গোপন গহিত এবং 
জঘন্য কাজ করিয়ে নেন। সারাটা জীবন সে নোংরা ঘাঁটার্থাটি করেই কাটিয়ে দিচ্ছে। তার নখের 
মাথা থেকে চুলের ডগা পর্যস্ত দুর্গদ্ধে বোঝাই। এইসব কাজ করতে গিয়ে কতরকম মানুষই বা 
দেখল। কিন্তু দীপার মতো এমন তেজি বেপরোয়া মেয়ে জীবনে আর দেখছে কী? যার পেটে 
অবৈধ জুণ বড় হচ্ছে, আর ক'দিন পর শরীরে প্রেগনাঙ্সির লক্ষণ ফুটে উঠলে গোটা অঞ্চলের 
লোক যে তার গায়ে থুথু দেবে, এ সব গ্রাহাই করছে না। ভুজঙ্গ বলল, “এর ফল কী হবে 
বুঝতে পারছেনঃ | 

“আমি কি পাচ বছরের খুকি যে বুঝব না!” 

“লোকে যা-তা বলবে। 


৫৬ পাঁচটি উপন্যাস 


“তা তো বলবেই।* দীপা বলতে লাগল, “অবৈধ বাচ্চার মা হলে লোকে তাকে ঘেন্না করে, 
উৎপাত করে তার জীবন নষ্ট করে দেয়। কিন্তু যে লম্পট বজ্জাতের জন্যে তার এই দুর্ভোগ, 
এত কষ্ট, সে বেশ পার পেয়ে যায়। একটু থেমে বলল, “আমি কিন্তু অনীশকে ছাড়ব না।' 

ভুজঙ্গ কী বলবে, প্রথমটা ভেবে পেল না। অনেকক্ষণ পর বলল, “ব্যাপারটা মিটমাট করে 
নিলে ভালো হত না? 

“বদমাশ ইতর বিশ্বাসঘাতকের সঙ্গে কীসের মিটমাট? কর্কশ গলায় বলল দীপা। তার মুখ 
এখন শান-দেওয়া ছুরির মতো দেখাচ্ছে। 

ভুজঙ্গ বলল, “আপনার উত্তেজিত হওয়ার হয়তো কারণ আছে কিন্তু প্লাগারাগি করে তো 
সবসময় কাজ হয় না। বাস্তব দিকটাও মাথায় রাখতে হয়।” 

“বাস্তব দিক বলতে? 

“আপনার বাবার সঙ্গে কদিন আগে আমার কিছু কথা হয়েছে, আপনি কি তা জানেন? 

“তিরিশ হাজার টাকা ঘুষ দিতে চেয়েছেন তো 

ভুজঙ্গ বুঝতে পারছে, ওই তিরিশ হাজার টাকাটা দীপার কাছে ঘুষই, মোলায়েম করে 
উপহার বললে সে খেপে উঠবে। ভুজঙ্গ বলল, “ঘুষ যখন বলছেন তখন আর কী বলব! 
রা 

কী? 

“তিরিশে রাজি না হলে চ্যাটার্জি সাহেবকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিগারটা আর-একটু বাড়াবার 
চেষ্টা করব। ধরুন আরও দশ বাড়বে।” বলে উৎসুক চোখে দীপাকে দেখতে লাগল ভুজঙ্গ। 

দীপা বলল, “এক লাখ দিলেও আমি রাজি না।' 

এক লাখেও যে রফা করতে চায় না তাকে কোন অঙ্কের টাকা অফার করবে? 
ভূজঙ্গের মাথার ভেতর একটা চাকা ঘুরতে লাগল যেন। গলগল করে সে থামতে শুরু করেছে। 
দীপাকে সে যে কী বলবে, ভেবে পেল না। 

দীপা এবার বলল, “মিটমাটের একটা রাস্তাই খোলা আছে ভূজঙ্গবাবু।' 

ভুজঙ্গ আশান্বিত হয়ে উঠল। গভীর আগ্রহে জিগ্যেস করলে, “বলুন, কী রাস্তা-_ 

“মণিমোহন চ্যাটার্জিকে জানিয়ে দেবেন, টাকা দিয়ে আমাকে কেনা যাবে না। আমাকে ত্বার 
ছেলের বউ করে ঘরে তুলে নিতে হবে। এ-ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই।" 

ভুজঙ্গ তক্ষুনি উত্তর দিল না। তার মুখে অদ্ভুত এক নিষ্ঠুরতা ফুটে উঠতে লাগল। স্থির 
চোখে দীপাকে দেখতে-দেখতে বলল, “এটাই তাহলে আপনার শেষ কথা? 

হ্যা।' 

“আচ্ছা, তাহলে চলি। চ্যাটার্জি সাহেবকে আপনার কথা জানাব।' 

ভূজঙ্গ উঠে পড়ল। সে দরজা খুলতেই দেখা গেল মা আর বাবা বুকে শ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে 
আছে। তারা ভুজঙ্গকে নিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল। 


পাচ 


দ্বিতীয় বার ভুজঙ্গ যে এসেছিল তারপর আরও সাতদিন কেটে গেছে। এর মধ্যে মা আর বাবা 
দীপার সঙ্গে কথা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা মুঠোর ভেতর এসেও বেরিয়ে 
গেছে। এ-আক্ষেপ এবং হতাশা তাদের ঘুচবার নয়। 

মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য দীপা নার্সিং হোমে গেলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত? 


বণক্ষেত্র ৫৭ 


আজকাল আকছার এ-সব ঘটছে। কিন্তু জেদী একগুঁয়ে মেয়ে গো ধরে আছে, তাকে মণিমোহন 
চ্যাটার্জির ছেলের বউ করতে হবে, যা কি না একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। ফলে ওদিকটা তো 
গেলই, অতগুলো টাকার আশাও আর রইল না। চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকা কি একটা-দুটো পয়সা! 
জীবনে একসঙ্গে এত টাকা আগে আর কখনও দেখেনি আদিনাথরা, ওটা পেলে বাকি জীবনটা 
একেবারে নিশ্চিন্ত হয়ে কাটানো যেত। কিন্তু আহাম্মক অবুঝ মেয়ে হঠকারিতার ঝৌকে সব শেষ 
করে দিল। 

আজ টিউশনি সেরে ছাত্রীদের বাড়ি থেকে বেরুতে-বেরুতে বেশ রাত হয়ে গেল। ক্লাস 
ফোরের যে মেয়েটাকে সে পড়ায়, দিন পনেরো বাদে তার একটা পরীক্ষা রয়েছে। তাই একটু 
বেশি সময় দীপাকে ওর সঙ্গে লেগে থেকে পড়া-টড়াগুলো মাথার ভেতর ঢুকিয়ে দিতে হচ্ছে। 
মেয়েটা ভীষণ ফাকিবাজ। যেটুকু সময় দীপা থাকে ততক্ষণই বই নিয়ে বসে। বাকি সময়টা বই- 
টইয়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই বললেই হয়। 

পয়সা বাঁচাবার জন্য বাস-টাসে ওঠে না দীপা, পায়ে হেঁটেই কসবায় যাতায়াত করে। 

আজ ছাত্রীদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্যমনক্কের মতো হেঁটে আসছিল দীপা। হঠাৎ ঝপ 
করে লোডশেডিং হয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে গোটা অঞ্চলটা গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায়। 

লোডশেডিংটা কলকাতায় নতুন কোনও ব্যাপার নয়। ওটা ছাড়া এই শহরকে যেন ভাবাই 
যায় না। এখানকার মানুষজনের দিবাদৃষ্টি এমনই খুলে গেছে যে অন্ধকার যত ঘনই হোক, চলতে- 
ফিরতে কারও বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয় না। 

রাত একটু বেশি হলে কলকাতার এই দিকটায় লোক চলাচল কমে যায়। মোটামুটি ফাকা 
বাস্তা দিয়ে হেঁটে আসছিল দীপা। আচমকা যে অন্ধকার নেমে গেছে সেদিকে তেমন লক্ষ্য ছিল 
না তার। নিজের কথাই ভাবছিল সে। সেদিন রাতে ভুজঙ্গকে জানিয়েছিল, মিটমাটের শর্ত একটাই। 
তাকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে হবে অনীশকে। কিন্তু এ-শর্ত যে ওরা মানবে না, সে-সম্পর্কে 
এখন আর সংশয় নেই। তাহলে এর ভেতর ভূজঙ্গ নিশ্চয়ই চলে আসত। নিজের ন্যাধ্য অধিকার 
কীভাবে আদায় করবে আজ পর্যস্ত ঠিক করে উঠতে পারেনি দীপা। 

মৃণিমোহনের মতো প্রবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার রণকৌশল তার অজানা । 

সে জানে তরে পেটের বাচ্চাটার জনা মণিমোহনরা সন্ত্রস্ত হয়ে আছেন। ভূজঙ্গ চল্লিশ- 
পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ দিতে চাইলেও সে নার্সিং হোমে গিয়ে আবরশান করতে চায়নি। তার 
একমাত্র উদ্দেশ্য পেটের ভ্রণটাকে মণিমোহনদের বিরুদ্ধে মারাত্মক অস্ত্রের মতো ব্যবহার করবে। 
কিন্তু কীভাবে? সেই পদ্ধতিটা কিছুতেই স্থিব করতে পারছে না দীপা। 

আজকাল এক মুহূর্তও সে ঘুমোতে পারে না। সর্বক্ষণ পাথরের চাইয়ের মতো প্রবল 
দুশ্চিন্তা তার মাথার ওপর চেপে বসে থাকে। এক-এক সময় দীপার মনে হয়, স্নায়ুণ্ডলো ছিড়ে 
যাচ্ছে। 

বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও, দীপা তা টের পাচ্ছে তার পেটের ভ্রুণটা ক্রমশ বড় 
হচ্ছে। শরীরের ভেতর একটা প্রচণ্ড ভাঙচুর যে শুরু হয়ে গেছে, সেটা প্রতি মুহূর্তেই বোঝা যাচ্ছে। 
যদি শেষপর্যস্ত অনীশদের সম্বন্ধে কোনও একটা উপায় সে ভেবে বার করতে না পারে, কী পরিণতি 
হবে তার? অবৈধ একটা বাচ্চাকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাড়াবে সে? 

হঠাৎ রাস্তার ওধার থেকে কারা যেন টেঁচিয়ে উঠল, “ধারে যান, ধারে যান-_” 

দীপা চমকে উঠল। পরক্ষণেই সে টের পেল গীকগগাক করতে-করতে একটা বিরাট ট্রাক 
প্রচণ্ড স্পিডে তার পেছন দিকে পঞ্চাশ গজের ভেতর এসে পড়েছে। বাঁচতে হলে পাঁচ সেকেন্ডের 
মধ্যে তাকে কিছু একটা করতে হয়, নইলে ট্রাকটা তাকে পিষে দিয়ে চলে যাবে। 

এই রাস্তাটায় ফুটপাথ নেই। মোটামুটি রাস্তার ধার ঘেঁষেই হাটছিল দীপা। পলকের জন্য 


প্রফুল্ল রায়--_ পাঁচটি উপন্যাস--৮ 


৫৮ পাঁচটি উপন্যাস 


তার চোখের সামনে অন্ধকার এলাকাটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল। তার পরেই একরকম মরিয়া 
হয়ে পাশের একটা ছোট একতলা বাড়ির রোয়াকে লাফিয়ে উঠে পড়ল সে। সঙ্গে-সঙ্গে ট্রাকটা 
তার পাশ দিয়ে উন্মন্তের মতো তীব্র গতিতে বেরিয়ে গেল। 

সামলে উঠতে বেশ খানিকটা সময় লাগল দীপার। তার হৃদ্পিণ্ডে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। 
লাফ দিয়ে বারান্দায় উঠতে এক সেকেন্ড দেরি হলে এতক্ষণে তার কী হাল যে হতো, ভাবতেও 
শিউরে উঠছে দীপা। রক্তমাংস এবং হাড়ের একটা ডেলা পাকানো ভয়াবহ ছবি তার চোখের 
সামনে ফুটে উঠতে লাগল। 

হাত-পায়ের জোড় আলগা হয়ে আসছে দীপার, দীড়িয়ে থাকার মতো শক্তি আর অবশিষ্ট 
নেই। আস্তে-আন্তে দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ল সে। গলগল করে ঘাম ছুটে তার জামা-টামা 
ভিজে যেতে লাগল। 

এদিকে রাস্তার ওধার থেকে হইচই করতে-করতে আট-দশটা লোক দৌড়ে এসেছে। সবার 
চোখে-মুখে প্রচণ্ড উত্তেজনা এবং আশঙ্কা। একসঙ্গে তারা ছড়মুড় করে কথা বলতে লাগল। 

“দিদি, কিছু হয়নি তো আপনার? 

ট্রাক ড্রাইভারটা নির্ঘাত মাল খেয়ে চালাচ্ছিল। না হলে এরকম স্পিড দেয়? 

“শালাকে পুলিশে দেওয়া দরকার 

“এই সব লোকের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া উচিত।' 

ট্রাকের নম্বরটা নিতে পারলাম না। পেছন দিকের নাম্বার প্লেটের ওপর আলো ছিল না। 
ওটা পাওয়া গেলে ব্যাটাকে ধরে ফাসিয়ে দেওয়া যেত। 

লোডশেডিংটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। ঝপ করে যেমন অন্ধকার নেমেছিল ঠিক তেমনি 
আচমকাই আলো ফিরে এল। 

আকম্মিক মৃত্যুভয় এবং আতঙ্ক এখন অনেকখানি কেটে গেছে। আস্তে-আস্তে মুখ থেকে 
হাত সরিয়ে দীপা সামনের দিকে তাকাল। ততক্ষণে লোকগুলো তার ওপর প্রায় ঝুকে পড়েছে। 

উদ্িগ্র সুরে একটি মধ্যবয়সি লোক জিগ্যেস করলে, “আপনার চোট-টোট লাগেনি তো? 

আস্তে মাথা নাড়ল দীপা- লাগেনি। 

অন্য একজন বলল, “তবু একবার ডাক্তার-টাক্তার দেখিয়ে নেওয়া দরকার। কাছেই 
ডাক্তারখানা আছে। সেখানে চলুন-_ 

দীপা জানে, সে অক্ষতই আছে। প্রচণ্ড ভয় পাওয়া ছাড়া আর কোনও ক্ষতিই হয়নি তার। 
গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। জোরে শ্বাস টেনে সে বলল, “দয়া করে আপনারা একটা 
রিকশা ডেকে দিন। বাড়ি গিয়ে দরকার হলে ভাক্তার দেখাব।” 

একটি ছেলে রিকশা ডেকে নিয়ে এল। 


এরপর আরও দু-দিন একই ব্যাপার ঘটল। দু-দিনই দুটো ট্রাক গাগা করে মারাত্মক স্পিডে 
পেছন দিক থেকে ছুটে আসছিল। কিন্তু লোকজনের চিৎকারে লাফিয়ে একপাশে সরে যাওয়ায় 
আকসিডেন্টটা আর ঘটেনি। দীপা অল্লের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে। 

প্রথম দিন মনে হয়েছিল, ঘটনাটা নিতাত্তই আকম্মিক। হয়তো ট্রাকের ব্রেফ খারাপ হয়ে 
গিয়েছিল, কিংবা ড্রাইভার মদ-টদ খেয়ে নেশার ঘোরে গাড়ি চালাচ্ছিল। 

কিন্ত পরপর তিন দিন একই ঘটনা যখন ঘটল তখন দীপার মনে হয়েছে, এটা অনিচ্ছাকৃত 
ব্যাপার নয়। আকসিডেন্ট ঘটিয়ে তাকে খুন করার একটা ষড়যন্ত্রই যেন হয়েছে। তবে এ-সম্পর্কে 
সে পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তাকে খুন করে কার কী লাভ হবে, সে বুঝতে পারেনি। 


রণক্ষেত্র ৫৯ 


বাড়িতে এ-নিয়ে মা-বাবাকে কিছু জানায়নি দীপা। প্রথমত তারা ভীষণ ঘাবড়ে যাবে, 
হয়তো টিউশনি ছেড়ে দিতে বলবে। কিন্তু টিউশনি করে বাড়তি রোজগার না করলে সংসার 
চলবে কী করে? মা-বাবাকে না জানালেও পিন্টুকে জানিয়েছে দীপা। পিন্টু বলেছে, “সাবধান হয়ে 
রাস্তায় চলবি। আর দু-একটা দিন দেখ। যদি মনে হয় কোনও হারামি তোকে মার্ডার করার ধান্দা 
আর ফিরে যেতে হবে না। ড্রাইভারের লাশ ওখানে শুয়ে থাকবে আর ট্রাকটা আযাশ হয়ে যাবে। 

পিন্টু ভরসা দিলেও বড় রাস্তা দিয়ে রান্তিরে ফেরার ঝুঁকি নেয়নি দীপা। দিনের বেলা 
প্রচুর লোকজন আর বাস মিনিবাস ট্যাক্সি রিকশা চলে, তখন অত ভয় নেই। যাওয়ার সময় 
মেইন রোড দিয়েই সে যায় কিন্তু ফেরার সময় আজকাল সে গলি-টলি দিয়ে খানিকটা ঘুরপথেই 
বাড়ি আসে। 

এভাবে দিনচারেক বেশ ভালোই কাটল। তারপর আজ হঠাৎ একটা গলির মুখে আসতেই 
লোডশেডিং হয়ে গেল আর তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে দুটো ছোকরা তার সামনে এসে দীঁড়াল। তাদের 
মুখ চোয়াড়ে, নিষ্ঠুর রক্তাভ চোখ, শক্ত চোয়াল। পরনে টাইট ফুলপ্যান্ট আর বুশসার্ট। কোমরে 
চওড়া বেন্ট। একজনের বাঁ-হাতের কবজিতে স্টিলের বালা, আর-এক জনের ডান হাতে । একজনের 
গলায় রুপোর চেইনে লকেট ঝুলছে, লকেটটা অবিকল একটা মীনে-করা রুপোর ড্যাগার। আরেক 
জনের গলাটা খালি। তবে দুজনেরই হাতে আট ইঞ্চি ছোরা। অন্ধকারেও সে দুটোর ফলা যেন 
ঝলকাচ্ছে। দুজনেরই বয়স তেইশ-চব্বিশ। 

বুকের ভেতর শ্বাস আটকে গেল দীপার, ছোরার ফলার দিকে তাকিয়ে আতঙ্কে তার মুখ 
রক্তশূন্য হয়ে গেল। মুহূর্তে গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনওরকমে অসহ্য কাপা গলায় 
সে বলতে পারল,_-কী-কী চাই? র 

শব্দ না করে একটা ছোকরা বিশ্রী হাসল। সঙ্গে-সঙ্গে দু-পাটির অনেকগুলো দাত বেরিয়ে 
পড়ল, তার দীতগুলো কুকুরের দাতের মতো ধারালো। চোখ দুটো কুঁচকে সে বলল, “তোমার 
পেট চিরে বাচ্চাটা বার করে নিয়ে যেতে চাই দিদিমণি।' 

চমকে উঠল দীপা। সে শুধু বলতে লাগল, 'না-না”__না-না” কিন্তু তার গলায় এবার 
স্বর ফুটল না। 

দ্বিতীয় ছোকরাটা বা-পাশ থেকে দাতে দীত ঘষে বলে উঠল, “মনে করেছ বড় রাস্তা দিয়ে 
না গিয়ে গলি-ফলি দিয়ে গেলে বেঁচে যাবে! তিন-দিন্রাকওলাকে ভোগা দিয়ে হড়কে গেছ। এবার 
তোমার লাশ ফেলে দেব।' বলেই সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করে। 

তৎক্ষণাৎ দুজনের চেহারা আগোগোড়া বদলে যায়। ছোরা দুটো মাথার ওপর তুলে 
সরীসৃপের মতো তারা আস্তে-আস্তে দীপার দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। 

আগে আর কখনও নিজের চোখে কোন হত্যাকারীকে দেখেনি দীপা। এই প্রথম বুঝতে 
পণ্নল খুন করার সময় মানুষের মুখের চেহারা এই রকমই হয়ে যায়। বিহুলের মতো এক পলক 
তাকয়ে থাকে দীপা। পরক্ষণেই টের পায় তার মধ্যে অলৌকিক সাহস যেন নেমে এসেছে। শরীরের 
সবটুকু শক্তি জড়ো করে দুজনকে প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে চিৎকার করতে-করতে সে উদ্ভ্রাস্তের মতো 
ছুটতে থাকে। 

আচমকা এরকম একটা ঘটনার জন্য তৈরি ছিল না খুনি দুটো। প্রবল ধাক্কায় তারা হুড়মুড় 
করে রাস্তায় ছিটকে পড়ে। আর সেই সুযোগে দৌড়তে-দৌড়তে গলি-টলি পেরিয়ে দীপা একটা 
চওড়া রাস্তায় নেমে পড়ে। এখানে প্রচুর আলো, গাড়ি-টাড়ি এবং মানুষজনও অজঅ্র। 

খুনি দুটো কয়েক সেকেন্ড হতভম্বের মতো পড়ে থাকে। তার পরই খানিকটা সামলে নিয়ে 
স্প্িয়ের মতো লাফিয়ে উঠেই দীপা যেদিকে গেছে সেদিকে ছুটতে শুরু করে। কিন্তু গলির মুখ 


৬০ পাঁচটি উপন্যাস 


পর্যস্ত এসে থমকে দীড়িয়ে যায়। এত লোকজন এবং গাড়ি-্টাড়ি দেখে আর এগুতে সাহস হয় 
না। 
দীপা ততক্ষণে একটা বাসে উঠে পড়েছে। 


পরের দিনই কসবায় ছাত্রীর বাবাকে একটা চিঠি লিখে সে জানিয়ে দেয়, আপাতত জরুরি 
কারণে তার পক্ষে টিউশনি করা সম্ভব না, তিনি যেন মেয়ের জন্য অন্য টিউটরের ব্যবস্থা করেন। 
দীপা দূরে কোথাও টিউশনি করতে যাবে না, বাড়ির কাছাকাছি কিছু একটা জুটিয়ে নেবে। 


ছয় 


তাকে খুন করার জন্য যে চক্রান্ত চলছে সে-ব্যাপারে এখন আর এতটুকু সন্দেহ নেই দীপার। 
তিন দিন ট্রাকের তলায় তাকে পিষে মারার চেষ্টা হয়েছে, একদিন পেশাদার খুনিও পেছনে লাগানো 
হয়েছিল। কিন্তু চারবারই প্রায় অলৌকিকভাবে সে বেঁচে যায়। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা 
পেয়ে এখনও যে দীপা টিকে আছে তার কাছে এটা একটা বিস্ময়কর ঘটনা । 

মা-বাবা বা পিন্টুকে এখনও এ-সব কথা জানায়নি দীপা। কারণ তাকে হত্যার পরিকল্পনা 
বা ষড়যন্ত্র কারা করছে, হা করা মাত্র ওরা ধরে ফেলবে। মা-বাবা তাতে যত না ঘাবড়ে যাবে 
তার চাইতে খেপে উঠবে অনেক বেশি। বলবে, কেন সে পেটের ভেতর পাপ পুষে রেখেছে, 
কেন সে নার্সিং হোমে গিয়ে জঞ্জাল সাফ করে এল না, ইত্যাদি ইত্যাদি 

দীপারও এক-এক সময় মনে হচ্ছে ভুজঙ্গ ঘোষের কথামতো আাবরশনটা করিয়ে নিলেই 
হয়তো ভালো হতো। তাতে খুন হয়ে যাওয়ার ভয়টা অন্তত থাকত না, তার ওপর অনেকগুলো 
টাকাও পাওয়া যেত। কিন্তু পরক্ষণেই সেই অদম্য জেদটা তাকে পেয়ে বসেছে। দেখাই যাক, 
শেষপর্যস্ত ব্যাপারটা কোথায় গিয়ে দীড়ায়। যদি মরতেও হয়, অনীশদের সে সহজে ছাড়বে 
না। 

পিন্টুর সঙ্গেও এ-নিয়ে কোনও কথা বলেনি দীপা। ওর যা মাথা গরম তাতে হয়তো রাগের 
মাথায় বস্তির ছোকরাদের জুটিয়ে অনীশদের বাড়ি গিয়ে ঝামেলা করবে। বোমা-টোমাও মারতে 
পারে। তার ফল হবে মারাত্মক। পুলিশ ডেকে মণিমোহন নিশ্চয়ই ওদের জেলে পাঠিয়ে দেবেন। 
কিংবা ওঁর যা টাকার জোর তাতে পিন্টুর পেছনে প্রফেশনাল খুনিদেরও লাগিয়ে দিতে পারেন। 

দীপা বুঝতে পারছে, এখন উত্তেজনার ঝৌকে কিছু করা ঠিক হবে না। ভেবেচিস্তে ঠান্ডা 
মাথায় তাকে এগুতে হবে। 

কিছুদিন পারতপক্ষে সে বাড়ি থেকে বেরুবে না। অবশ্য স্কুলে যেতেই হবে। আর কাছাকাছি 
যদি দু-একটা টিউশনি পায়, সেখানেও ঘাবে। এই অঘোর নন্দী লেন বা ঢালিপাড়ার বৃত্তির দিকটায 
সে অনেকখানি নিরাপদ। 

বিকেলের দিকে আজকাল দীপা যে কসবা যাচ্ছে না, সেটা লক্ষা করে একদিন কমলা 
জিগ্যেস করল, “কি রে, কদিন ধরে দেখছি, তুই টিউশনিতে যাচ্ছিস না। 

দীপা একটু চুপ করে থাকে। তারপর মিথ্যেই বলে, িউশনিটা আর নেই।, 

“তাহলে-_, এই পর্যস্ত বলে একটু উদ্বিগ্ন ভাবেই কমলা তাকায়। 

মায়ের উদ্বেগের কারণটা বুঝতে অসুবিধে হয় না দীপার। সে বলে, “ভেবো না। তোমার 
টাকা পেলেই তো হল। নতুন টিউশনি আমি জোগাড় করে নেব।' 


রণক্ষেত্র ৬১ 


কমলার মুখটা ম্লান দেখায়। সে বলে, 'আমি কি তোকে টাকার কথা বলেছি।' 

এর উত্তর দিতে গেলে রূঢই হতে হবে দীপাকে। মুখের ওপর বলতে হবে, টাকা ছাড়া 
আমার সঙ্গে তোমাদের আর তো কোনও সম্পর্ক নেই।' কিন্তু এই মুহূর্তে তিক্ততা বা উত্তেজনা 
কিছুই ভালো লাগছে না দীপার। সে চুপ করে রইল। 

খানিকক্ষণ ইতস্তত করে গলা নামিয়ে কমলা বলল, “ওই ব্যাপারটার কী হবে? কিছু 
ভেবেছিস? 
মা কী ইঙ্গিত দিয়েছে, বুঝতে পারে দীপা। সে বলে, 'না।' 

এখনও সময় আছে, ভুজঙ্গ বলে সেই লোকটাকে ডেকে পাঠাব£ঃ তোর বাবার কাছে 
সে ঠিকানা দিয়ে গেছে। 

না 

মেয়েকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ দেখে কমলা । তারপর বলে, 'আমাদের মতো গরিবদের অত 
একগুঁয়েমি ভালো না। জেদটা এবার ছাড়।, 

দীপা উত্তর দিল না। 

কমলা বলতে থাকে, “ভূজঙ্গর কথায় সেদিন রাজি হলে সব দিক থেকেই ভালো হতো। 
কোনও দুশ্চিন্তা থাকত না।' 

হঠাৎ মাথার ভেতর প্রবল রক্তচাপ অনুভব করে দীপা। বলে, “মা, চুপ করো।' 

কমলা থামে না। গলা চড়িয়ে বলে, “কেন চুপ করব? নিজের দোষে বিপদ বাধিয়ে মেজাজ 
দেখানো হচ্ছে!' 

খেপে উঠতে গিয়েও একেবারে থ হয়ে যায় দীপা। বিমূঢের মতো বলে, “নিজের দোষে! 

'না তো কী? কমলার গলা আর-এক পরদা চড়ে, “তোর ইচ্ছে না থাকলে অনীশ সুযোগ 
নিতে পারত? শুধু-শুধু অন্যের ছেলেকে একতরফা দোষ দিলে তো চলবে না।' 

দীপা চমকে ওঠে। এই কথাটা মনে-মনে আগেও সে ভেবেছে। হয়তো সবাই তা-ই ভাবে। 
তবে এখন পর্যস্ত কমলা ছাঁড়া আর কেউ তার মুখের ওপ্র এভাবে বলেনি। 

আজ মায়ের ওপর কী যেন ভর করেছে! মরিয়া হয়ে সে বলতে থাকে, “তোর রোজগারে 
খাই বলে এ-সব সহ্য করতে হচ্ছে। এর চেয়ে মরা হাজার গুণ ভালো। কেন যে প্রাণটা বেরুচ্ছে 
না। 

দীপা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। 

কমলা এক নাগাড়ে বলে যায়, “আর ক'দিন পর তোর দিকে তাকিয়ে সবাই যখন ব্যাপারটা 
বুঝতে পারবে, চারদিকে টিটি পড়ে যাবে। তখন কী যে করব!” উদ্ভ্রান্ত, দিশেহারা দেখায় তাকে। 

দীপা শাস্ত মুখে এবার বলে, “তোমাদের কিচ্ছু করতে হবে না। গায়ে কেরোসিন ঢেলে 
নিজের হাতে আগুন ধরিয়ে দেব। মরার সময় কাউকে ফীসিয়ে যাব না-তুমি নিশ্চিত্ত থাকতে 
পারো। 

কমলা আর কিছু বলে না। ক্রুদ্ধ, হিংস্র চোখে তার দিকে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে 
বেরিয়ে যায়। 


আরও একমাস কেটে গেল। 

এর মধ্যে পাড়ার কাছাকাছি এক বাড়িতে টিউশনি জোগাড় করে নিয়েছে দীপা। ক্লাস 
টু আর ফোরের দুটি মেয়েকে পড়াতে হয়। ওরা দুই বোন। 

আজ দুপুরে স্কুল থেকে ফিরে কলতলায় স্নান করতে গিয়ে হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেল 


৬২ পাঁচটি উপন্যাস 


দীপা। সেই সঙ্গে হুড়ছড় করে বমিও করে ফেলল। ক'দিন ধরেই মাথা ঘোরে তার এবং বমিবমি 
ভাবটা ছিল, কিন্তু এতটা বাড়াবাড়ি আগে হয়নি। 

টিন আর দরমা দিয়ে ঘেরা কলতলার ঠিক বাইরে দীড়িয়ে ছিল বিভা। দীপা পড়ে যেতেই 
সে কমলাকে ডেকেই দৌড়ে ভেতরে টুকে পড়ে। দীপাকে টেনে তুলতে গিয়ে নার্সের অভিজ্ঞ, 
তীক্ষ চোখে তাকে দেখতে থাকে। 

ততক্ষণে রান্নাবান্না ফেলে ছুটে এসেছে কমলা। বিভা আর সে ক্ষিপ্র হাতে দীপার সারা 
শরীর ধুইয়ে-মুছিয়ে তার ঘরে এনে শুইয়ে দেয়। 

দীপা টের পায়, আগাগোড়া বিভার দুই চোখ অনবরত তার পা থেকে মাথা পর্যস্ত ছোটাছুটি 
করছে। বিভার ধারালো নজর তার রক্তমাংস এবং হাড় পর্যস্ত ফুঁড়ে ভেতরে কী যেন খুঁজতে 
থাকে। 

এরকম তীব্র জলজুলে চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। দীপা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে 
নেয়। প্রচণ্ড অস্বস্তিতে তার শরীর কুঁকড়ে যেতে থাকে। 

কমলা অত্যন্ত উৎকঠিত ভাবে কোমল গলায় জিগ্যেস করে, “কি রে, হঠাৎ মাথা ঘুরে 
গেল কেন? কাল রাত্তিরে ঘুম হয়নি? 

হয়েছে। আস্তে উত্তর দেয় দীপা। 

“ভালো হজম হয়েছিল? 

হয়েছিল। 

তা হলে এরকম হল কেন?' 

“কি জানি।, 

কমলা আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই বিভা পাশ থেকে বলে উঠল, “ও এখন 
বিশ্রাম করুক। চলুন বউদি, আমরা বাইরে যাই। আপনার সঙ্গে একটু দরকার আছে।' 

ঘণ্টাখানেক বাদে আবার যখন কমলা এ-ঘরে এল তখন তাকে আগুনখাকির মতো দেখাচ্ছে 
মায়ের এমন চেহারা আগে আর কখনও দেখেনি দীপা। বিশেষ করে যেদিন থেকে সে রোজগার 
করে সংসার চালাচ্ছে সেদিন থেকে ভয়ে-ভয়ে নিজেকে গুটিয়েই রেখেছে মা। 

এই মুহূর্তে মায়ের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল দীপা। 

কমলা দু-হাতে মাথার চুল খামচে ধরে হিস্টিরিয়া রুগির মতো টেঁচাতে লাগল, “এখন 
আমি কী করি! হে ভগবান কী করি! 

দীপা ভীত স্বরে জিগ্যেস করল, কী হয়েছে তোমার? ওরকম করছ কেন? 

তার কেন মরণ হয় না, এই সব বলে আরও কিছুক্ষণ ঠেঁচামেচি করল কমলা। তার 
চিৎকার কান্না এবং আক্ষেপের ভেতর থেকে যেটুকু জানা গেল তা এইরকম। দীপা যে গর্ভবতী 
হয়েছে, বিভা তা বুঝতে পেরেছে। কমলা অবশ্য বোঝাতে চেয়েছে, সংসারের জন্য দিনরাত খেটে- 
খেটে ক্রাস্তিতে দীপা মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। কিন্তু নার্সের অভিজ্ঞ চোখে ধুলো দেওয়া অত সোজা 
নয়। যা বুঝবার সে তা বুঝে ফেলেছে। আর বিভা যে-ধরনের মেয়েমানুষ তাত্রে তার পেটে 
কথা থাকে না। চব্বিশ ঘণ্টার ভেতর এ-ধারে অঘোর নন্দী লেন ওধারে ঢালিপাড়া বস্তি মিলিয়ে 
যে বিরাট এলাকা, সর্বত্র দীপার ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে যাবে। 

দীপা আস্তে-আস্তে চমকটা কাটিয়ে ওঠে। শান্ত মুখে বলে, “আজ হোক কাল হোক, লোকে 
তো জানতই। না হয় ক'দিন আগেই জানল। আমরা তো চিরকাল এটা চাপা দিয়ে রাখতে পারব 
না।' 

চুপ কর তুই, চুপ কর। পেটের জন্যে তোর অনেক অত্যাচার অপমান সহ্য করেছি, 


রণক্ষেত্র ৬৩ 


কিন্তু আর না। যদি মরিও তোর অন্ন আর মুখে তুলব না।' 
দীপা আর্ত স্বরে টেঁচিয়ে ওঠে, মা, মা 
কমলা আর দাঁড়ায় না, দু-চোখে আঁচল চাপা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। 


বিভার সম্বন্ধে মায়ের ধারণা যে কতটা নির্ভুল দু-দিনেই টের পেয়ে যায় দীপা। এ-অঞ্চলে 
ডগা কাপিয়ে-কাপিয়ে সিটি দেয় বা নানারকম অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে উত্যক্ত করে তোলে। কিন্তু 
দীপার এমন একটা ব্যক্তিত্ব এবং গান্তীর্য রয়েছে যে কেউ এ-সব করতে সাহস করে না। তা 
ছাড়া সে এখানকার প্রাইমারি স্কুলের ছেলেমেয়েদের খুব যত্বু করে পড়ায়। টিচার হিসেবে দীপা 
খুবই দায়িত্বশীল। এই সব কারণে ঢালিপাড়া বস্তি, অঘোর নন্দী লেন এবং আশেপাশের বিরাট 
এলাকা জুড়ে যত মানুষজন, সবাই তাকে ভালোও যেমন বাসে, তেমনি তার সম্বন্ধে তাদের মনে 
এক ধরনের শ্রদ্ধার ভাবও রয়েছে। 

তা ছাড়া অন্য একটা কারণেও মস্তান বা বখা ছোকরারা দীপাকে বিরক্ত করে না। কেন 
না সে পিন্টুর দিদি। পিন্টুও তো হাফ-মস্তান। দিদির পেছনে কেউ লাগলে পিন্টু ছেড়ে দেবে 
না, ছুরি এবং পেটো নিয়ে গোটা এলাকা সে তোলপাড় করে ফেলবে। 

আগে সে যখন স্কুলে যাতায়াত করত বা কোনও কাজে রাস্তায় বেরুত, কেউ তার দিকে 
বিশেষ তাকাত না। তাকালে এবং চোখাচোখি হয়ে গেলে “কেমন আছেন দিদি?” বা “কোথায় 
চললেন? _সসন্ত্রমে এজাতীয় দু-একটা কথা বলত। খুবই সাধারণ সৌজন্যমূলক প্রশ্ন। দীপা 
লক্ষ্য করেছে, পিন্টুর বন্ধুরা তাকে দেখলে চট করে হাতের তালুতে সিগারেট লুকিয়ে ফেলত। 

কিন্তু ইদানীং এ-অঞ্চলের লোকেরা, সে রাস্তায় বেরুলেই অদ্তুত চোখে তাকিয়ে-তাকিয়ে 
দেখে। একদিন একটা লোককে চোখ কুঁচকে দাত বার করে হাসতে দেখেছে। লোকটার নাম সে 
জানে না, তবে মুখটা চেনা। 

বাড়িতে স্বস্তি নেই। দীপা লক্ষ্য করেছে, অন্য ভাড়াটেরা আজকাল পারতপক্ষে তাদের 
ঘর মাড়ায় না। কেমন যেন এড়িয়ে-এড়িয়ে চলে। তাদের, বিশেষ করে তাকে যেন চেনেই না, 
এমন একটা ভাব। অথচ দীপা চলতে-ফিরতে টের পায়, চোরা চোখে বাড়ির লোকেরা খুঁটিয়ে- 
খুঁটিয়ে তার পা থেকে মাথা পর্যস্ত লক্ষ্য করে। 


এইভাবে দিনতিনেক কেটে গেল। 

এর মধ্যে কমলা এক ফৌঁটা জল পর্যন্ত খায়নি। ভীষণ জেদ তার। দীপা অনেক সাধ্যসাধনা 
করেছে, তার হাতে-পায়ে ধরেছে কিন্তু মাকে টলানো যায়নি। অবৈধ অবাঞ্থিত সম্তান পেটে পুষে 
রেখে যে-মেয়ে সংসারের সবার মুখে চুনকালি লাগিয়ে দিয়েছে তার রোজগারের ভাত সে মুখে 
তুলবে না। বাবা খিদেটা একেবারেই সহ্য করতে পারে না, তাই খাচ্ছে। কিন্তু দীপার সঙ্গে কথা 
বন্ধ করে দিয়েছে৷ 

একমাত্র পিন্টুকে কাছে পেলে কথা বলে মনটা হালকা হয় কিন্তু ক'দিন ধরে তাকেও 
বেশি দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনও একটা ব্যাপারে সে ভীষণ জড়িয়ে গেছে। সারাদিনে 
হট করে একবার এসে নাকেমুখে গুঁজেই দৌড় লাগাচ্ছে। রাত্তিরে কখন এসে আবার কখন বেরিয়ে 
যাচ্ছে, টেরই পাওয়া যাচ্ছে না। 


৬৪ পাঁচটি উপন্যাস 


দীপা যে কী করবে, ভেবে পায় না। যত দিন যাচ্ছে আরও বিভ্রান্ত, আরও দিশেহারা 
হয়ে পড়ছে সে। চারপাশে এমন কেউ নেই যে তাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারে, বুঝিয়ে দিতে 
পারে কী তার করা উচিত এবং কোন পথে এগুলে জীবনের সবচেয়ে জটিল এই সমস্যা থেকে 
বেরিয়ে আসতে পারে। ক্রমশ সে যেন এক বায়ুশুন্য অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। 

আজ সন্ধেবেলা টিউশনি সেরে বাড়ি ফিরতেই দীপার চোখে পড়ল মা-বাবার ঘরে কারা 
যেন কথা বলছে। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ভালো করে লক্ষ্য করতেই মা-বাবা আর পিন্টুকে 
দেখা গেল। ওরা ছাড়া আর কারা আছে, ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। দরজার দিকে পেছন ফিরে 
বসার জন্য ওদের মুখ চোখে পড়ছে না। 

ও ঘরে কীসের আলোচনা চলছে, কে জানে। এই সময়টা কোনওদিনই বাড়ি থাকে না 
পিন্টু। আজ নিশ্চয়ই এমন কিছু জরুরি ব্যাপার ঘটেছে যাতে তাকে থাকতে হয়েছে। 

যাদের কাছে আজকাল কেউ আসে না, হঠাৎ তাদের ঘরে কেন এত লোকের সভা বসেছে-_ 
এটা জানার জন্য অদম্য এক কৌতুহল দীপাকে পেয়ে বসে। একবার সে ভাবে সটান মা-বাবার 
ঘরে চলে যায়। পরক্ষণেই চিন্তাটাকে নাকচ করে আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায়। 
আর সেই মুহূর্তে পিন্টু তাকে দেখতে পায়। “দিদি, দিদি-_' বলতে-বলতে সে বেরিয়ে আসে। 

দীপা দাঁড়িয়ে পড়ে। 

কাছে এসে পিন্টু বলল, “তোর এত দেরি হল আজ? 

দীপা জানায়, তার দুই ছাত্রীর সামনেই একটা পরীক্ষা রয়েছে, পড়াতে-পড়াতে দেরি হয়ে 
গেছে। 

পিন্টু এবার বলে, “সেই বিকেল থেকে নীলকাস্তবাবু তোর জন্যে এসে বসে আছেন।' 

রীতিমতো অবাক হয়েই দীপা জিগ্যেস করল, “নীলকাস্তবাবু কে£' 

তুই তো আবার রাজনীতি-ফীতি বুঝিস না। গ্রেট পলিটিক্যাল লিডার। এবার আমাদের 
এই এরিয়া থেকে নীলকাস্তদা ইলেকশানে দীড়াচ্ছেন।, 

“ইলেকশান-ফিলেনশান না, অন্য দরকারে এসেছেন নীলকান্তদা। তুই তোর ঘরে গিয়ে বস, 
আমি ওঁকে নিয়ে আসছি।' বলে আর দাঁড়ায় না পিন্টু, দীপাকে কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ না 
দিয়ে পাশের ঘরে চলে যায়। 

অগত্যা দীপা বিভ্রান্তের মতো নিজের ঘরে ঢোকে। তার সঙ্গে একজন রাজনৈতিক নেতার 
কী দরকার থাকতে পারে, সে ভেবে পায় না। 

ঘরে এসে দীপা বসে না, বিছানার পাশে দাড়িয়ে থাকে। একটু পর নীলকাস্তকে নিয়ে 
আসে পিন্টু। তবে মা-বাবা বা অন্য কেউ আসেনি। 

নীলকাত্তর বয়স ষাটের কাছাকাছি। মাথার চুল বেশির ভাগই সাদা। শরীরে একফোঁটা 
বাড়তি মেদ নেই। খুব লম্বা নন, মাঝারি হাইটের পেটানো স্বাস্থ্য তার। পরনে ধবধবে ধুতি- 
গা্জাবি। চোখে পুরু লেলের চশমা। আম্চর্য নেহ-মাধানো মুখ তাঁর। টোখলেছ মনে হয় বাব! 
কি কাকার মতো আপনজন। 

পিন্টু দুজনের আনুষ্ঠানিক পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, “দিদি, তুই নীলবকাস্তদার সঙ্গে কথা 
বল। আমি যাই। বলে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে চলে গেল। 

দীপা একটু ইতস্তত করে নীলকাস্তকে বলল, 'আপনি বসুন” 

নীলকাস্ত ঘরের একমাত্র চেয়ারটায় বসে বললেন, “আপনিও বসুন না-_” তার কষ্ঠস্বর 
এই বয়সেও বেশ সুরেলা এবং গন্তভীর। 


রণন্সে্রে ৬৫ 


দীপা বিছানার এক কোণে বসে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। 

নীলকাস্ত বললেন, “মা, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, খুব ক্লাস্ত। বেশিক্ষণ সময় আপনার 
নেব না। মাত্র পাঁচ মিনিট।, 

দীপা উত্তর দিল না। 

নীলকাস্ত কোনওরকম ধানাই-পানাই না করে কাজের কথায় চলে এলেন, “মা, আপনি 
আমাকে নিজের সন্তানের মতো মনে করবেন। আমার কাছে আপনার কোনওরকম সক্ষোচ নেই। 
এই পর্যস্ত বলে একটু থেমে আবার শুরু করলেন, “পিন্টুর কাছে আপনার দুঃখের কথা সব শুনেছি। 

দীপা শিউরে উঠেই মুখ নামিয়ে নিল, তার মাথাটা বুকের ওপর ঝুলে পড়ল যেন। সে 
বুঝতে পারছিল পিস্টু আর কোনও দিকে পথ না পেয়ে তার সমস্যা সমাধানের জন্য সোজা 
রাজনৈতিক নেতার কাছে চলে গেছে। উদ্দেশ্য, মণিমোহনদের ওপর পলিটিক্যাল প্রেসার দিয়ে 
তাদের দাবি মানতে বাধ্য করানো। নিশ্চয়ই পিন্টু নীলকাত্তকে তার গর্ভবতী হওয়ার খবরও দিয়েছে। 
লঙ্জায়, সঙ্কোচে দীপার নাকমুখ ঝাঝা করতে লাগল। 

নীলকাস্ত বলতে লাগলেন, 'এই সব কৃমিকীটদের শায়েস্তা না করলে সোসাইটি ধ্বংস হয়ে 
যাবে। এ আমরা হতে দিতে পারি না। মনুষ্যত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে এই সব অশুভ শক্তিকে 
গুঁড়িয়ে দিতেই হবে।' মিটিংয়ে ঠেঁচিয়ে-টেঁচিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের যা হয় নীলকাস্তরও 
তা-ই হচ্ছিল। কথায়-কথায় বক্তৃতার ঢং এসে যাচ্ছিল। 

দীপা প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। এবারও কিছু বলল না। 

নীলকাস্ত সমানে বলে যাচ্ছেন, “আপনি কি জানেন মা, নেক্সট ইলেকশানে মণিমোহন 
চ্যাটার্জি এখান থেকে দাঁড়াচ্ছে । যে লম্পট বজ্জাত ছেলেকে ওভাবে প্রোটেকশান দেয়, পীপলের 
সঙ্গে যাদের এতটুকু সম্পর্ক নেই, যারা আপনার মতো গরিব ফ্যামিলির মেয়ের সর্বনাশ করে, 
তাদের জনপ্রতিনিধি হওয়ার অধিকার নেই। ওদের আমি ক্রাশ করে দেব। এ জন্যে আপনাকে 
আমার পাশে চাই।' 

দীপা মুখ তুলল না। 

নীলকাস্ত থামেননি, "আমি একটা পরিকল্পনা করেছি। আপনাকে সঙ্গে নিয়ে এ-পাড়ার প্রতিটি 
মানুষের কাছে যাব, জানিয়ে দেব মণিমোহন চ্যাটার্জি আপনার কতটা ক্ষতি করেছে 

শুনতে-শুনতে শ্বাস আটকে আসতে থাকে দীপার। সে পরিষ্কার বুঝতে পারে, আগামী 
নির্বাচনে নীলকাস্ত তাকে শাণিত অস্ত্রের মতো ব্যবহার করে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী মণিমোহনকে ধ্বংস 
করতে চান। যে অবৈধ জুণ পেটের ভেতর বড় হচ্ছে তাকে এভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে কাজে 
লাগানো যেতে পারে, কে ভাবতে পেরেছিল! দেখা যাচ্ছে, নিঃস্বার্থ পরোপকারের জন্য তার কাছে 
ছুটে আসেননি নীলকাস্ত। পৃথিবীতে অবৈধ সন্তানেরও তাহলে প্রয়োজনীয়তা আছে! 

দীপা মনস্থির করে ফেলল। তার চরম লজ্জাকে এবং গ্লানিকে ব্যবহার করে নীলকাস্ত 
ইলেকশানে তরে যাবেন, এটা সে কিছুতেই হতে দেবে না। অবরুদ্ধ গলায় সে বলল, “আমাকে 
ক্ষমা করবেন। এমনিতেই আমি মরে আছি। ওভাবে আমাকে রাস্তায় নামালে আত্মহত্যা করা ছাড়া 
উপায় থাকবে না।' বলে জোরে-জোরে প্রবল বেগে মাথা নাড়তে লাগল। 

নীলকাস্ত বললেন, 'আপনি বুঝতে পারছেন না মা-_”' 

কিন্তু কার কথা শেষ হল না। তার আগেই দীপা বলে উঠল, “ওভাবে বেরুলে আপনি 
হয়তো জিতে যাবেন, মণিমোহন চ্যাটার্জি হয়তো হেরে যাবেন, কিন্তু আমার অবস্থাটা কী হবে 
সেটা ভেবেছেন কী?' 


প্রফুল্ল রায়-_ পাঁচটি উপন্যাস-_ ৯ 


৬৬ পাঁচটি উপন্যাস 


তার উদ্দেশ্যটা যে দীপা এভাবে এবং এত তাড়াতাড়ি ধরে ফেলবে, আগে বুঝতে পারেননি 
নীলকান্ত। প্রথমটা হকচকিয়ে গেলেন কিন্তু অসীম ধৈর্য এবং অধ্যবসায় তার। কয়েক মুহূর্ত পর 
শান্ত সহিষুও মুখে বললেন, “শুধু ইলেকশানের দিকটাই দেখছেন, অন্য দিকটা কিন্তু ভেবে দেখেননি 
মা। এভাবে ঘুরলে মণিমোহনদের ওপর একটা প্রচণ্ড প্রেসার পড়ত। তারা শেষপর্যস্ত আপনার 
সঙ্গে একটা আপসের পথে আসতই।' 

হাতজোড় করে দীপা শুধু বলল, “আমাকে ক্ষমা করুন__' 

নীলকাত্ত বুঝতে পারছিলেন, এখন দীপাকে টানা-হ্যাচড়া করতে গেলে লাভ হবে না। পরে 
আবার এসে ঠান্ডা মাথায় তাকে বোঝাতে হবে। চেয়ার থেকে উঠতে-উঠতে বললেন, “আজ আমি 
যাচ্ছি। এখন আপনি খুবই ক্রাত্ত, তা ছাড়া মনটাও বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। আমার কথাটা পরে ভেবে 
দেখবেন। খবর দিলেই আমি চলে আসব। মনে রাখবেন আমি আপনার শুভাকাঙক্ষী।' 


সাত 


নীলকান্ত চলে যাওয়ার পর পিন্টুকে নিজের ঘরে ডেকে আনল দীপা। তারপর উন্মাদের মতো 
টেচিয়ে বলল, “নীলকাস্তবাবুকে আমার কথা বলেছিস কেন? 

দিদির এমন উগ্র মূর্তি আগে আর কখনও দেখেনি পিন্টু। সে বেশ ঘাবড়েই গেল, “কী 
করব বল। তুই নিজে কিছু করছিস না। এদিকে লোকে গুজগুজ শুরু করে দিয়েছে। আমিও যে 
মণিমোহন শুয়োরের বাচ্চাটার বাড়িতে গিয়ে পেটো-ফেটো ঝাড়ব__ ভেবে দেখলাম তাতে ফায়দা 
নেই। শালাদের যা টাকা, আমাকে ফলস কেসে ফাঁসিয়ে দেবে। আজকাল পলিটিক্যাল হুড়ো ছাড়া 
কিছু হয় না। তাই নীলকাস্তদার কাছে গিয়েছিলাম” 

দীপা বলল, “আমাকে শেষ না করে তুই ছাড়বি না।, 

পিন্টু কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, 'নীলকান্তদাকে তুই তো ভাগিয়ে দিলি। 
কিন্ত কিছু একটা না করলে কী করে চলবে। চারদিকে সব শালা মাকড়া ব্যাপারটা জেনে 
গেছে 

দীপা হঠাৎ দু-হাতে মুখ ঢেকে অনেকক্ষণ আচ্ছন্নের মতো বসে রইল। তারপর বলল, 
“আজ রাতটা আমাকে ভাবতে দে। কাল থেকে কিছু একটা করবই।' 

পরের দিন সকালে পিন্টুকে ডাকতে হল না, সে নিজের থেকেই দীপার ঘরে চলে এল। 
বলল, “কি রে, কিছু ভেবেছিস? 

সারারাত ঘুমোয়নি দীপা। আরক্ত চোখে পিন্টুর দিকে তাকিয়ে বলল. “ভেবেছি। তোকে 
দুটো কাজ করতে হবে। 

“কী? 

“মণিমোহন চ্যাটার্জির বাড়ির উলটোদিকের ফুটপাথে দু-তিনটে তক্তপোশ পেতে দিবি। 
পারবি?” 

“পারব না কেন? কিন্তু ওখানে তক্তপোশ পেতে কী হবে? 

পরে বুঝতে পারবি।' 

একটু ভেবে পিন্টু বলল, “কবে পাততে হবেঃ 

দীপা বলল, "আজই? 

“এ তো একটা কাজ হল। আর-একটা?£ 


রণক্ষেত্র ৬৭ 


“বারো-চোদ্দোটা ছেলে জোগাড় করতে হবে।' 

“বারো-চোদ্দোটা কেন, বারো-চোদ্দোশো জোটাতে পারি। 

“অত দরকার নেই। যা বললাম তা পেলেই হবে। তবে দেখে যেন মনে হয় ভদ্র ফ্যামিলির 
ছেলে। বখা, নেশাখোর, চোয়াড়ে মার্কা চেহারা চলবে না।' 

“ঠিক আছে, জেন্টলম্যানের বাচ্চাদের মতো চেহারাই পাবি।, 

তক্তপোশ পেতে ছেলেগুলোকে ওখানে নিয়ে বসাবি। তারপর আমাকে খবর দিবি। 

পিন্টু চলে যাওয়ার পর মুখ-টুখ ধুয়ে এসে আলতা দিয়ে খবরের কাগজে বড়-বড় হরফে 
পোস্টার লিখতে শুর করল দীপা। 


ঠিক দু-ঘণ্টা বাদে দেখা গেল, হরপ্রসাদ সরণিতে মণিমোহনের বাড়ির ঠিক উলটোদিকের 
ফুটপাথে একটা বাড়ির বাউন্ডারি ওয়ালের ধার ঘেঁষে পরপর তিনটে তক্তপোশ পাতা রয়েছে। 
মাঝখানের তক্তপোশটায় বসে আছে দীপা এবং তাকে ঘিরে পিন্টু এবং তার দলবল। যে 
পোস্টারগুলো কিছুক্ষণ আগে দীপা তার ঘরে বসে লিখেছিল, এখন সেগুলো বাউন্ডারি ওয়ালে 
আঠা দিয়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। পোস্টারগুলোয় যা লেখা আছে তা এইরকম ঃ 

“মণিমোহন চ্যাটার্জির ছেলে অনীশ দীপা মণ্ডল নামে একটি মেয়ের চরম ক্ষতি করেছে। 
সব জেনেশুনেও মণিমোহন ছেলের কুকর্মের কোনও প্রতিকার করেননি, বরং তাকে প্রশ্রয় 
দিয়েছেন।' 

“আমরা মণিমোহনকে চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। এর মধ্যে যদি তিনি একটি সম্মানজনক 
মীমাংসায় না আসেন, তার ছেলে অনীশের কুকীর্তি বিস্তৃাতভাবে ফাস করব। 

“আপনারা হয়তো জানেন না মণিমোহন চ্যাটার্জি আগামী নির্বাচনে বিধানসভার প্রার্থী 
হচ্ছেন। যিনি লম্পট শয়তান ছেলেকে প্রশ্রয় দেন, দেশ তার কাছে কী আশা করতে পারে!' 

হরপ্রসাদ সরণির লোকজনই শুধু না, মুখে-মুখে খবর পেয়ে বীকে-ঝাকে চারপাশের মানুষ 
দীপাদের দেখতে এল। যত বেলা চড়তে লাগল, ভিড়ও ততই বেড়ে চলল। সেই সঙ্গে হইচই, 
চিৎকার এবং মণিমোহনদের সম্বন্ধে নানা ধারালো মস্তব্যও চলতে লাগল। 

দীপা পোস্টারে চব্বিশ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছিল। অতটা সময় লাগল না। সন্ধের 
পর ভুজঙ্গ ঘোষ এসে খবর দিল, মণিমোহন দীপার সঙ্গে কথা বলতে চান। রাত্রিবেলা লোকজন 
চলে গেলে ভুজঙ্গ এসে দীপাকে মণিমোহনের বাড়ির খিড়কি দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাবে। দীপা 
জানাল, তার সঙ্গে কথা বলতে হলে মণিমোহনকে তাদের অঘোর নন্দী লেনের বাড়িতে যেতে 
হ্‌বে। 

ভূজঙ্গ বলল, “তা হলে আমি চ্যাটার্জি সাহেবকে জিগ্যেস করে আসি।' 

দীপা বলল, 'আসুন।' 

রাস্তা পেরিয়ে ওধারে চলে গেল ভুূজঙ্গ। দশ মিনিট বাদে ফিরে এসে জানাল, মণিমোহন 
রাত বারোটায় দীপাদের বাড়ি যাবেন। 

দীপা বুঝতে পারল, মানুষজনের সামনে মণিমোহন অঘোর নন্দী লেনে যাবেন না, তার 
মর্যাদায় আটকাবে। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে তবেই মণিমোহনের পক্ষে যাওয়া সম্ভব। 

কাটায়-কীাটায় বারোটায় মণিমোহন দীপাদের বাড়ি এলেন। সঙ্গে ভুজঙ্গ। ঘরের দরজা বন্ধ 
করে ঘুমস্ত বাড়িতে আদিনাথ কমলা পিন্টু এবং দীপার সঙ্গে তার কথাবার্তা শুরু হল। দশ মিনিটের 
ভেতরেই এত বড় একটা জটিল সমস্যার সমাধানের সৃত্রও বেরিয়ে গেল। 


৬৮ পাঁচটি উপন্যাস 


মণিমোহন বললেন, “যা হওয়ার হয়ে গেছে। লেট আস ফরগেট ইট। আমি পনেরো দিনের 
মধ্যে দীপাকে পুত্রবধূ করে নিয়ে যাব।' 


॥ আট ॥ 


মণিমোহনের কথার নড়চড় হল না। ঠিক পনেরো দিনের মধ্যেই অনীশের সঙ্গে দীপার বিয়ে হয়ে 
গেল। 

এ-বিয়েতে প্রচুর খরচ করেছেন মণিমোহন। অজস্র আলো জুলেছে, নহবতখানা বসিয়ে 
দিনরাত সানাই বাজানো হয়েছে, বাজি পোড়ানো হয়েছে। অঘোর নন্দী লেন এবং ঢালিপাড়া বস্তির 
অগুনতি মানুষকে নেমস্তন্ন করে খাইয়েছেন মণিমোহন। 

এই বিয়ের পেছনে মণিমোহনের সুদূরপ্রসারী একটা চাল রয়েছে। বস্তির মেয়েকে যখন 
পুত্রবধূ করে ঘরে তুলতেই হল তখন তা থেকে যতটা সুবিধে এবং লাভ নিংড়ে বার করে নেওয়া 
যায়। মণিমোহন যেন সবাইকে দেখাতে চাইছেন, তিনি কত মহানুভব, কত উদার। আসলে কিছুদিন 
বাদে যে নির্বাচন আসছে তার লক্ষ্য সেদিকেই। এই বিয়ের জোরেই তিনি এ-অঞ্চলের ভোটারদের 
কাছে গিয়ে হাত পাততে পারবেন। 

বৌভাতের এক সপ্তাহ পর দ্বিরাগমনে এল দীপা এবং অনীশ। আদিনাথের কাছে তিন 
রাত থাকার কথা ওদের, কিন্তু অনীশ একদিন থেকেই চলে গেল। জরুরি কাজে তাকে কলকাতার 
বাইরে যেতে হবে। তিন দিন পর ফিরে সে দীপাকে নিয়ে যাবে। 

প্রথম রাতটা কাটিয়ে পরের দিন দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দীপা সোজা আলিপুর কোর্টে 
চলে এল এবং খুঁজে-খুঁজে একজন ভারিকী -চেহারার মধ্যবয়সি উকিলও বার করল। তাকে দিয়ে 
মণিমোহনের ঠিকানায় ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়ে বাড়ি ফিরতে-ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। 

আরও দু-দিন পর উদ্দিগ্র মুখে অনীশ এসে হাজির। বলল, “কী ব্যাপার, তুমি ডিভোর্সের 
নোটিশ দিয়েছ! 

হ্যা।” খুব শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নড়ল দীপা। 

“এর মানে? 

“খুব সহজ। তোমার সঙ্গে আমার যে-বিয়েটা হয়েছে তার পেছনে ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা 
কিছুই নেই। যা আছে তা হল ঘৃণা, সন্দেহ আর বিদ্বেব। এর ওপর কোনও সম্পর্কই টিকতে 
পারে না। 

“তা হলে বিয়ের জন্যে এত সব কাণ্ড করলে কেন? 

“আমার আর আমার পেটের বাচ্চাটার জন্যে একটা সামাজিক স্বীকৃতির দরকার ছিল। 
কুমারী মেয়ের সম্তানদের লোকে কী বলে, নিশ্চয়ই তুমি তা জানো। আমার বাচ্ছাটার ওরকম 
দুর্ভাগ্য হোক, সেটা আমি চাইনি। তাই তোমাকে এভাবে বিয়ে করেছি। একটানা কথাগুলো বলে 
একটু হাঁপায় দীপা। তারপর তীব্র গলায় আবার বলে, “তোমাকে আমি ঘৃণা করি। ঘৃণা-_ঘৃণা-_ 
ঘৃণা-_ 

বিজান্তের মতো তাকিয়ে থাকে অনীশ। 





হারবার লাইনের লাস্ট ডাউন ট্রেনটা ভিক্টোরিয়া টারমিনাস থেকে যখন বান্দ্রা পৌঁছুল, 
প্রযাটফর্মের প্রকাণ্ড ঘড়িটায় তখন রাত একটা বেজে পঁচিশ। বান্দা এলাইনের শেষ স্টেশন। 

বোম্বাইয়ের যে শহরতলি দিয়ে হারবার লাইনের ট্রনগুলো যায়, তার দু-ধারে ইন্ডাস্ত্রিয়াল 
বেন্ট অর্থাৎ কটন মিল, গ্লাস ফ্যাক্টুরি, ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা ইত্যাদি-ইত্যাদি। আর আছে বন্ধে পোর্ট। 

সারাদিন, শুধু দিনই বা কেন, রাত বারোটা পর্যস্ত এ-লাইনের ট্রেনগুলোতে গাদাগাদি ভিড় 
লেগে থাকে। কিন্তু এখন এই লাস্ট ডাউন ট্রেনটা একরকম ফাঁকাই এসেছে। বন্বে পোর্টের কিছু 
মজুর, কলকারখানার লাস্ট শিফটের কিছু ওয়ার্কার কামরাগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে ছিল। ট্রেন 
থামতেই তারা হুড়মুড় করে প্ল্যাটফর্মে নেমে চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল। 

জোহনের কিন্তু অত তাড়াহুড়ো নেই। ট্রেনটা একেবারে ফাকা হয়ে গেলে ধীরেসুস্থে কাধে 
লম্বা ফ্লুটের বাঝ্সটা চাপিয়ে নেমে পড়ল সে। এটা সাত নম্বর প্ল্যাটফর্ম। স্টেশনের বাইরে যেতে 
হলে লম্বা ওভারব্রিজ পেরিয়ে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে গিয়ে নামতে হবে। বাইরে বেরুবার গেটটা 
ওখানেই। জোহন এলোমেলো পা ফেলে ওভারব্রিজের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে চলল । অল্প-অল্প টলছিল 
সে। এই টলটলায়মান অবস্থাটা অতিরিক্ত মদ্যপানের ফল। 

জোহনের বয়স সাতচলিশ-আটচলিশ। জাতে সে গোয়াঞ্চি পিদ্রু, অর্থাৎ গোয়ার ক্রিশ্চান। 
গোল ধরনের মুখ তার, ধারালো চিবুক, ছড়ানো কাধ। লম্বায় পাঁচ ফুট সাত-আট ইঞ্চির বেশি 
হবে না। গায়ের রং পোড়া ব্রোঞ্জের মতো। হাত-পায়ের হাড় বেশ চওড়া এবং মজবুত। শরীরে 
চর্বির পরিমাণ কম, তাই তাকে কিছুটা রোগা দেখায়। জুলপি এবং মাথার চুল সিকি ভাগ সাদা 
হয়ে গেছে। সব চাইতে আশ্চর্য তার চোখ। এমন সরল, মায়াবী চোখ কচিৎ দেখা যায়। 

জোহন একটা ব্যান্ড পার্টিতে লম্বা ফুট অর্থাৎ বাঁশি বাজায়। এছাড়া অফ-সিজনে অর্থাৎ 
যখন উৎসব-টুৎসব থাকে না কিংবা যেটা, বিয়ের মরশুম নয়, বায়নার অভাবে তাদের বাজনার 
দল যখন বেকার বসে থাকে, সেই সময়টা সাট্ট্রা কিংবা মাট্‌কা খেলে, রেসের বই-টই বেচে কিছু 
কামিয়ে নেয়। 

এই মুহূর্তে জোহনের পরনে সার্টিনের ওপর জরির কারুকার্য-করা হাইনেক পাঞ্জাবি আর 
দু-ধারে লম্বালঘি নীল বর্ডার দেওয়া ফুল প্যান্ট; মাথায় নেটিভ স্টেটের রাজাদের মতো পাগড়ি। 
পায়ে সস্তা দামের রঙচঙে নাগরা। অর্থাৎ ব্যান্ড পার্টির পুরো ড্রেসটা রয়েছে তার গায়ে। 

আজ দুপুরে জোহনদের বাজনার দল- আনারকলি ব্যান্ড পার্টি” মেরিন লাইন্সে এক 
মাড়োয়ারি শেঠের মেয়ের বিয়েতে বাজাতে গিয়েছিল। তারপর আর বাজনার ড্রেসটা ছাড়া হয়নি। 

শেঠজির বাড়িতে রাত এগারোটা পর্যস্ত তারা একটানা বাজিয়ে গেছে। তারপর হিসেবপত্র 
বুঝে নিয়ে চলে এসেছিল । 

জোহনদের বাজনার দলের বেশির ভাগ লোকই থাকে পুরোনো বোম্বাইীতে, পায়ধুনির 
দিকটায়। কেউ-কেউ তারদেও কিংবা সেন্টালের কাছে। একমাত্র জোহনই এতদূরে, শহরতলির প্রায় 
শেষ মাথায় ছিটকে চলে এসেছে। সে ঠিক বান্দ্রাতেই থাকে না, থাকে সমুদ্রের ধারে ডান্ডা কোস্টের 
কাছে এক লঝঝড় বস্তিতে । এখানে এই বস্তিগুলোকে বলে ঝোপড়পট্টি। বান্দ্রা স্টেশন থেকে প্রায় 
তিনটি মাইল গেলে তবে ডান্ডা কোস্টের সেই ঝোপড়পট্রি। 

রাত এগোরোটায় শেঠজির বাড়ি থেকে বেরিয়ে একে-একে সব যে-যার আস্তানায় চলে 
গেছে। একা জোহনই মেরিন লাই থেকে কারনাক রোডে এসে হাটতে-হাঁটতে ব্রফোর্ড মার্কেটের 


হঠাৎ বসস্ত ৭১ 


কাছে চলে এসেছিল। 

বিয়ে বাড়ি কিংবা ফেস্টিভ্যালে বাজাতে-টাজাতে গেলে বেশির ভাগ জায়গাতেই তাদের 
খাইয়ে দেয়। কিন্তু মেরিন লাইক্সের শেঠজিটি এমনই চিপ্পুস মাড়োয়ারি যে এক গেলাস জল পর্যস্ত 
খাওয়ায়নি। দুপুর একটা থেকে রাত এগারোটা অর্থাৎ ঝাড়া দশটি ঘণ্টা একনাগাড়ে বাজিয়ে দারুণ 
খিদে পেয়ে গিয়েছিল জোহনের। পাকস্থলীতে খিদেটা আগুনের মতো দপদপ করছিল। ক্রফোর্ড 
মার্কেটের পিছন দিকে সিন্ধিদের একটা হোটেলে ঢুকে প্রথমে এক বোতল ঠার্রা (এক জাতের দিশি 
মদ) খেয়েছে জোহন, তারপর গলা পর্যস্ত ঠেসে-ঠেসে রুটি আর মাংস। খানপিনা হয়ে গেলে ঠার্রার 
নেশায় টলতে-টলতে সে চলে এসেছিল ভিক্টোরিয়া টারমিনাসে; সেখান থেকে বারোটা পয়তাল্লিশে 
হারবার লাইনের লাস্ট ট্রেন ধরে বান্দ্রায় এসেছে। 

সাত নশ্বর প্ল্যাটফর্মটা এখন একেবারে ফাকা । শুধু এই প্ল্যাটফর্মটাই নয়, অন্য প্ল্যাটফর্মগুলোতেও 
লোকজন চোখে পড়ছে না। চায়ের স্টল, খাবারের স্টল, মিল্ক বার, খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিনের 
দোকান, ফলের স্টল, সব বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি, কালো কোট গায়ে দিয়ে যে টিকিট কালেক্টারগুলো 
অন্য সময়ে দীড়িয়ে থাকে, তাদেরও এখন দেখা যাচ্ছে না। 

পায়ে-পায়ে ওভারব্রিজের কাছে চলে এল জোহন। তারপর টলতে-টলতে সিঁড়ি টপকে ওপরে 
উঠতে লাগল। মিনিট পাঁচেক বাদে দেখা গেল স্টেশন পেরিয়ে সে বাইরের রাস্তায় চলে এসেছে। 
এখান থেকে বাস ধরে তাকে ডান্ডায় যেতে হবে। জোহন স্টেশনের উলটোদিকের বাস স্ট্যান্ডটায় 
গিয়ে দীড়াল। খানিকক্ষণ দীড়িয়ে থাকার পর তার হঠাৎ খেয়াল হল, স্ট্যান্ডে সে ছাড়া আর কেউ 
নেই। কীরকম একটা সন্দেহ হল জোহনের। নেশাজড়ানো ঘোলাটে চোখে এদিক-সেদিক তাকাতেই 
তার চোখে পড়ল, বাঁ-দিকের ফুটপাথে গ্যাসের আলো জ্বালিয়ে মাছভাজাওলারা বসে আছে। রাত 
দুটো-তিনটে পর্যস্ত ভাজা পমফ্রেট মাছ শালপাতায় সাজিয়ে ওরা বসে থাকে। কেন না আশে-পাশে 
অগুনতি বে-আইনি শুঁড়িখানা আর বার আছে। চাট হিসেবে ভাজা পমফ্রেট মাছের দারুণ ডিম্যান্ড। 

মাছভাজাওলাদের কাছে এসে জোহন জিগ্যেস করল, “ডান্ডার লাস্ট বাস কি চলে গেছে? 

একটা মাছভাজাওলা বলল, “হা, আধা ঘণ্টা আগে।' 

তার মানে ঝাড়া তিনটি মাইল এখন জোহনকে হাটতে হবে। জড়ানো, চাপা গলায় সে 
বলল, “যাঃ শালে__' বলেই এলোমেলো টলমলে পায়ে বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে হেঁটে চলল। বাকের 
শপিং সেন্টার, নতুন সিনেমা হল, হোটেল, গেস্টহাউস পেরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে সে লিংকিং রোডে 
এসে পড়ল। তারপর কোনাকুনি ডান্ডা কোস্টের দিকে এগুতে লাগল। 

এত রাতে রাস্তায় লোকজন নেই। মাঝে-মধ্যে দু-একটা ফ্লাইং পুলিশ দেখা যাচ্ছে। কচিৎ 
কখনও হুস করে জুহু বিচের দিকে থেকে এক-আধটা প্রাইভেট কার সম্তর-আশি মাইল স্পিডে বেরিয়ে 
যাচ্ছে। 

বান্দ্রা থেকে ডান্ডা কোস্ট পর্যস্ত রাস্তায়-রাস্তায় যে ফ্লাইং পুলিশেরা ঘুরে বেড়ায়, তারা সবাই 
জোহনকে চেনে । চলতে-চলতে যাদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তারা কেউ-কেউ সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে। 

একটা মারাঠি পুলিশ হাতের ভেতর কাঠের রুল ঘোরাতে-ঘোরাতে বলল, “ড্রেসটা তো 
দারুণ বানিয়েছিস; বিলকুল রাজা-রাজা মনে হচ্ছে! 

জোহনের গায়ে যে পোশাক সেটা আনকোরা নতুন, আজই সে প্রথম পরেছে। তাদের 
“আনারকলি ব্যান্ড পার্টি'-র ড্রেস রাজরাজড়াদের পোশাকের ঢং নকল করে বানানো হয়। জোহন 
ঢুলু-ঢুলু চোখে তাকিয়ে ডান হাতটা কপালের কাছাকাছি সেলামের ভঙ্গিতে তুলে বলল, “আপনার 
মেহেরবানি।' 

রগড়ের গলায় পুলিশটি এবার বলল, “তা রাজাসাব, এত তকলিফ করে পায়দল যাচ্ছেন 
যে?, 


৭২ পাঁচটি উপন্যাস 


“রোজই তো এয়ার-কম্ডিশনড কারে চড়ে বেড়াই। আজ ভাবলাম একটু হাঁটি-__' বলেই 
চোখ পিটপিট করতে লাগল জোহন। 

'শালে হারামি-_" আলতো করে জোহনের পাছায় রুলের খোঁচা দিয়ে পুলিশটা এগিয়ে গেল। 

আরও খানিকটা যাবার পর আর-একটি পুলিশের সঙ্গে দেখা হল। সে তার মুখের কাছে 
নাক এনে গন্ধ শুঁকে বলল, “আই, আজ আবার ঠার্রা গিলেছিস!' 

হ্যা-_" ঘাড়টা আড়াই ফুট হেলিয়ে দিল জোহন, “খেতে কি চাই, তবে না খেয়ে পারি 

কায 

রর 

স্‌ হয়ে যাবে যে” 

'কার লস্‌ হবে?” 

“ওই যারা ঠার্রা বানিয়েছে। মাল না কাটলে শালেলোগ রাস্তায় বসে যাবে। সেই জন্যেই 
তো খেতে হয়। 

নেশার মধ্যেও করুণ মুখ করে বলল জোহন। 

পুলিশটা ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করল। তারপর আচমকা খেঁকিয়ে উঠল, “দিল্লাগি! যা 
ভাগ, শরাবি কাহাকা-_ 

জোহন ফ্যাক্‌ করে একটু হাসল। তারপর ঘাড় হেট করে টলতে-টলতে আবার এগিয়ে চলল। 

দ্বিতীয় পুলিশটির পর আর কারও সঙ্গে দেখা হল না। কতক্ষণ বাদে, জোহনের খেয়াল 
নেই, একসময় ডান্ডা কোস্টের কাছে চলে এল সে। 

বান্দ্রা এবং খারের নতুন টাউনশিপটা যেখানে শেষ হয়েছে, তারপর অনেকটা রাস্তা একেবারে 
নির্জন। তার দু-ধারে বাড়ি-টাড়ি নেই; এমনকি মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন যে দু-চারটে আলো লাগিয়ে 
দিয়ে গিয়েছিল, কারা যেন সেগুলো খুলে নিয়ে গেছে। সুতরাং রাস্তাটা অন্ধকারও। 

এই রাস্তাটা সমুদ্রের ধারে ডান্ডা কোস্টের ঝোপড়পট্রিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। জোহন এই 
জনশুন্য ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তার আধাআধি যখন এসে পড়েছে, সেই সময় খুব কাছাকাছি কোথায় 
যেন ধত্তাধস্তির শব্দ শুনতে পেল। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই মেয়ে-গলার তীক্ষ কাতর চিৎকার হাৎপিগু 
ছিড়ে দিয়ে চলে গেল, “বাঁচাও-বাঁচাণ্ড, মেরে ফেলল-_” 

এবড়ো-খেবড়ো রাস্তায় টক্কর খেয়ে চলতে-চলতে থমকে দাঁড়িয়ে গেল জোহন। পুরো এক 
বোতল ঠার্রা তলপেটে নিন্নচাপ সৃষ্টি করছিল এবং মাথার ভেতর একটানা মেরি-গো-রাউন্ড ঘুরিয়ে 
যাচ্ছিল। পলকে নেশাটা ফিকে হয়ে এল। কোথেকে শব্দটা আসছে বোঝবার জন্য ভয়ে সে চারদিকে 
তাকাতে লাগল। একে অন্ধকার, তার ওপর নেশায় চোখ ভারী হয়ে প্রায় বুজে আছে। জোহন করল 
কি, দু-আঙুল দিয়ে ডান চোখের পাতা টেনে বড় করে দেখতে চেষ্টা করল। কিন্তু না, কিছুই চোখে 
পড়ছে না। আচমকা তার মনে পড়ে গেল, পকেটে একটা লাইটার রয়েছে। ঝট করে সেটা বার 
করে জ্বালিয়ে ফেলল। সঙ্গে-সঙ্গে আবছাভাবে তার চোখে পড়ল, কয়েক গজ দূরে দুটো ঢ্যাঙা চেহারার 
লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের বয়স-টয়স বোঝা যাচ্ছে না, তবে দু-জনেরই হাতে দুটো লম্বা ছোরা। 
লাইটারের আলোয় ছোরা দুটো ঝকঝকিয়ে উঠছে। তাদের পায়ের কাছে কেউ, প্লঁকটা মেয়েই হবে 
হয়তো, পড়ে আছে। কারও নড়াচড়া নেই; সব মিলিয়ে সিনেমার ফ্রিজ শটের মতো সব স্থির। 

শরীরের সবগুলো জোড়ের মুখে প্রচণ্ড ঝাকুনি লাগল যেন। জোহন একবার ভাবল, পেছন 
ফিরে দৌড় লাগায়। দৌড়তে গিয়ে দেখল, পেরেক ঠুকে পা দুটো যেন কেউ রাস্তার সঙ্গে সেঁটে 
দিয়েছে। হঠাৎ এক কাণ্ডই করে বসল সে, ভাঙা বসে-যাওয়া গলায় বলল, “তোরা কে? 

ঢ্যাঙা লোক দুটো, হত্যাকারীর মতো যাদের চেহারা, চাপা গলায় বলল. “চোপ শালে, বাত্তি 
বুঝা (নিভিয়ে দে), নেহি তো পেটে ভ্যাগার ঘুসিয়ে দেব।' 


হঠাৎ বসস্ত ৭৩ 


ফুঁ দিয়ে লাইটারটা নেভাতে যাচ্ছিল জোহন, মুহূর্তে লোক দুটোর পায়ের তলা থেকে 
মেয়ে-গলার অস্পষ্ট গোঙানি উঠে এল। সঙ্গে-সঙ্গে মাথার ভিতরটা কীরকম জট পাকিয়ে গেল 
তার। শরীরের সবটুকু শক্তি গলায় জড়ো করে সে চিৎকার করে উঠল, “মার্ডার-মার্ডার পুলিশ- 
পুলিশ 

আচমকা চিৎকারে লোকদুটো হকচকিয়ে গেল। তারপর লাফ দিয়ে পাশের ঝোপঝাড়ের 
ভেতর দিয়ে নিমেষে উধাও । মেয়েটা ওখানে পড়েই রইল। 

এবার কী করবে জোহন ভেবে পেল না। সমুদ্ধের দিক থেকে যে উলটোপালটা হাওয়া 
উঠে আসছিল, লাইটারটা তাতেই নিভে গেছে। অন্ধকারে কিছুক্ষণ দীড়িয়ে থাকল সে, তারপর 
অলৌকিক কোনও শক্তির টানে মেয়েটা যেখানে পড়ে আছে, পায়ে-পায়ে সেখানে চলে এল। 

কাছে এসে লাইটারটা আবার জবালল জোহন। দমকা বাতাসে তক্ষুনি সেটা নিভে গেল। 
কিন্তু পলকের মধ্যে সে যা দেখল, ঠার্রার নেশাটা তাতেই ছুটে গেল। চাপ-চাপ ঘন রক্তে অনেকটা 
জায়গা ভেসে গেছে আর তার মধ্যে মেয়েটা কাত হয়ে ঘাড় গুঁজে পড়ে আছে। জোহনের মনে 
হল, শরীরের হাড়গুলো গলে-গলে বেঁকেচুরে যাচ্ছে, সে আর দাড়িয়ে থাকতে পারবে না। একবার 
ভাবল, পালিয়ে যায়। কিন্তু পালাতেও পারল না। এ-অবস্থায় মেয়েটাকে ফেলে যাওয়া যায় না। 
চারদিকটা দ্রুত একবার দেখে নিয়ে শ্বাস-ানার মতো শব্দ করে জোহন ডাকল, “আযাই__' 

মেয়েটির দিক থেকে সাড়া পাওয়া গেল না। 

এবারও মেয়েটার উত্তর নেই। 

আচমকা জোহনের খেয়াল হল, মেয়েটা মরে যায়নি তো? ভাবতেই মেরুদন্ডের মধ্য দিয়ে 
ঠান্ডা স্রোতের মতো কিছু নেমে গেল। নিজের অজান্তেই কাধ, কপাল এবং বুকে আঙুল ঠেকিয়ে 
একটা ক্রস আঁকল সে। তারপর ঘাড় থেকে ফ্লুটেব বাক্সটা রাস্তায় নামিয়ে রেখে হাটু মুড়ে অন্ধকারেই 
আন্দাজে-আন্দাজে মেয়েটার মুখের ওপর ঝুঁকল। লাইটারটা আরেকবার জেলে রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে 
উলটোপালটা বাতাসে যাতে নিভে না যায়, বাঁহাত দিয়ে তাই আডাল করে রাখল, আর ডান হাতটা 
মেয়েটার নাকের কাছে ধরে বুঝতে চেষ্টা করল শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ চলছে কি না। অনেকক্ষণ পর, 
যোহনের মনে হল, তিরতির করে একটু নিশ্বাস পড়ল হাতের ওপর। ওহ্‌ ক্রাইস্ট, মেয়েটা তবে 
এখনও মরেনি! হাসপাতালে নিয়ে গেলে কিংবা ডাক্তার-টাক্তার দেখাতে পারলে নিশ্চয়ই ওকে বাঁচানো 
যাবে। দ্রুত আরেকবার ক্রস আঁকল জোহন। তারপর আবার ডাকতে লাগল, “আ্যাই-আযাই__” 

অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পরও যখন সাড়া পাওয়া গেল না, জোহন বুঝতে পারল, মেয়েটা 
অজ্ঞান হয়ে আছে। 

এখন ওকে কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যায়ঃ যতদূর চোখ যায়, রাস্তায় লোকজন 
গাড়ি-টাডি কিছুই নেই। যে-কোনও একটা গাড়ি--প্রাইভেট কার, ট্যাক্সি, ট্রাক, ভ্যান, এমনকি বাস 
পর্যস্ত-_ দেখতে পেলে সেটা থামিয়ে ড্রাইভারের হাতে-পায়ে ধরে রাজি করিয়ে মেয়েটাকে হাসপাতালে 
নিয়ে যাওয়া যেত। একটা লোক পেলেও দুজনে ধরাধরি করে যা হোক ব্যবস্থা করতে পারত জোহন। 
যাই হোক গলা চড়িয়ে চিৎকার করে-করে সে ডাকতে লাগল, “আশেপাশে কেউ আছ? কোই হ্যায় 
ভাই? 

কেউ উত্তর দিল না। 

বান্দ্রায় ওয়াটারফিল্ড রোডে কর্পোরেশনের একটা হাসপাতাল আছে। কিন্তু সেটা প্রায় দু- 
আড়াই মাইল দূরে । একা একটা অক্জান মেয়েকে কাধে করে এতটা রাস্তা যাওয়া অসম্ভব। তা ছাড়া 
হঠাৎ মনে হল, হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে প্রচুর লাফড়ায় (ঝামেলায়) পড়তে হবে। মেয়েটা তার 
কে? কোথায় তাকে পেয়েছেঃ তার এমন অবস্থা হল কীভাবে? এ-সব প্রশ্নের জবাবদিহি করতে- 


প্রফুল্ল রায়_--পাচটি উপন্যাস--১০ 


৭৪ পাঁচটি উপন্যাস 


করতে তার লাইফ হেল হয়ে যাবে। তারপর পুলিশের লাফড়ায় পড়তে হবে কি না, কে জানে। 
তার চাইতে, জোহন স্থির করে ফেলল, আপাতত মেয়েটাকে তাদের ঝোপড়পট্রিতেই নিয়ে যাবে। 
কথাটা ভাবতে গিয়ে তার মনে পড়ল, আরে তাদের ঝোপড়পট্টিতেই তো একটা বুড়ো পার্শি ডাক্তার 
রয়েছে। লাইটারটা নিভিয়ে পকেটে পুরল জোহন। তারপর মেয়েটাকে কাধে তুলে ফ্লুটের লম্বাটে 
বাক্সটা এক হাতে ঝুলিয়ে এগিয়ে চলল। যেতে-যেতে অন্ধকারেই সে টের পেতে লাগল, মেয়েটার 
শরীর থেকে রক্ত ছুঁইয়ে-টুইয়ে তার জামা-টামা ভাসিয়ে দিচ্ছে। 


সমুদ্রের ধার ঘেঁষে অনেকটা জায়গা জুড়ে ডান্ডা কোস্টের ঝোপড়পট্টি। ভাঙাচোরা টিন, 
আযাসবেস্টসের টুকরো, টালি, প্যাকিং বাক্সের পাতলা কাঠ, বাতিল চট-_ইত্যাদি ইত্যাদি দিয়ে শুয়োরের 
খোয়াড়ের মতো একটানা সারি-সারি অগুনতি ঘর তোলা হয়েচে। এই হল ঝোপড়পট্রি। 

বোম্বাই শহরে হাজার-হাজার চোখ-ধাঁধানো বাড়ি, গন্ডা-গন্ডা স্কাইক্ক্রেপার। মডার্ন আর্কিটেকচারের 
যত নমুনা আছে, সব এখানকার রাস্তায়-রাস্তায় ছড়ানো। তবু ওগুলোর গা ঘেঁষে এই নোংরা-কুৎসিত 
ঝোপড়পট্রিগুলোও আছে। লক্ষ-লক্ষ মানুষ জীবাণুর মতো এর ভেতর গাদাগাদি করে পড়ে থাকে। 

ডান্ডা কোস্টের এই ঝোপড়পট্রির একধারে থাকে মারাঠি জেলেরা; আরেক দিকে নানা জাতের 
মানুষ-_বিহারি, বাঙালি, কেরেলি, কুর্গি, গোয়াঞ্চি ইত্যাদি-ইত্যাদি। ঝোপড়পষ্রিগুলো ছোটখাটো এক- 
একটি ভারতীয় প্রজাতন্ত্র যেন। 

ডান্ডা কোস্টের এই ঝোপড়পট্রিটার শেষ মাথায় একটা ঘরে থাকে যোহন। কিছুক্ষণ পর 
মেয়েটাকে নিয়ে তার ঘরের সামনে এসে দাড়াল সে। মেয়েটাকে কাধে রেখেই পকেট হাতড়ে চাবি 
বার করে তালা খুলল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেওয়ালের গা থেকে তারে-ঝোলানো সুইচটা 
বার করে আলো জ্বালল। ৃ 

ঝোপড়পত্রিতে বন্ধে ইলেকট্রিক সাপ্লাই, আলো-টালো দেয়নি। এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে 
কেউ-কেউ চুরি করে কর্পোরেশনের রাস্তার লাইট থেকে কানেকশান নিয়ে আলো জ্কালায়। জোহনও 
লম্বা তার-ফার লাগিয়ে একটা চোরাগোপ্তা রলানেকশান নিয়েছে। চিৎ কখনও ইলেকট্রিক সাপ্লাই 
কর্পোরেশনের লোকেরা ইন্গপেকশনে এলে পাঁচ-দশটা টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়। 

ঘরটা আলোয় ভরে গিয়েছিল। একধারে দড়ির খাটিয়ার ওপর নোংরা ধামসানো বিছানা । 
আরেক ধারে সস্তা দামের একটা টেবিলে পারা-ওঠা আয়না, চিরুনি, দাড়ি কামাবার সরঞ্জাম, দুটো 
হাতল-ভাঙা কাপ, একটা প্লাস্টিকের গেলাস এবং একটা অল্প দামের ট্রানজিস্টর। টেবিলটার তলায় 
হাট করে খোলা একটা টিনের বাক্স, এক কোণে দড়িতে ঝোলানো দুটো পায়জামা, একটা শার্ট, 
নোংরা গেঞ্জি, চিটচিটে রূমাল। এক দেওয়ালে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর ছবি, আরেক দেওয়ালে একটা হুইস্কি 
কোম্পানির ক্যালেন্ডার ঝুলছে। ক্যালেন্ডারটার গোটা পাতা জুড়ে প্রায়-উলঙ্গ একটি মেমসাহেব বিরাজ 
করছে। 

মেয়েটাকে কাধ থেকে নামিয়ে নিজের বিছানায় শুইয়ে দিল জোহন, তারপর ফ্লুটের বাক্সটাকে 
দেওয়ালের একটা হুকে ঝুলিয়ে রেখে আবার মেয়েটার কাছে এসে দাঁড়াল। এতটা র্লাস্তা একটা 
মানুষের অজ্ঞান দেহের ভার বয়ে এনেছে জোহন; দারুণ হাপাচ্ছিল সে। কপালে ঘাড়ে গলায় দানা- 
দানা ঘাম জমেছে। হাপাতে-হাপাতেই সে মেয়েটাকে দেখতে লাগল। 

অন্ধকারে স্পষ্ট বোঝা যায়নি। এখন দেখা যাচ্ছে মেয়েটার বয়স খুব বেশি হৃবে না, এই 
পঁচিশ-ছাব্বিশের মতো। মুখের গড়ন বেশ ধারালো, রং পাকা গমের মতো । চোখ বুঁজে আছে, তবু 
বোঝা যাচ্ছে সে দুটো বেশ বড়-বড় এবং তাতে লম্বাটে টান। প্রচুর চুল মেয়েটার, সরু কোমর, 
তীক্ষ নাক, দীর্ঘ আঙুল। তবে গোটা শরীরটাই প্রায় রক্কে মাখামাখি। 


হঠাৎ বসস্ত ৭৫ 


হঠাৎ কী মনে পড়তে দ্রুত একটা হাত মেয়েটার নাকের কাছে এনে নিশ্বাসপতন লক্ষ করল 
জোহন; পরক্ষণে সেই হাতটা কপালের ওপর রেখে শরীরের উত্তাপ পরীক্ষা করল। তারপর ঘর 
থেকে বেরিয়ে একরকম দৌডুতে-দৌডুতে ঝোপড়পন্টির আর-এক মাথায় একটা ঘরের সামনে এসে 
থামল। বাইরে দাড়িয়ে ডাকতে লাগল, “ডাক্তারসাব, ভাক্তারসাব-_' 

কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর ভেতর থেকে ঘুম-জড়ানো গলা শোনা গেল, “কৌন? 

“আমি জোহন, জোহন ফুলুটবালা-_” 

একটু পরেই দরজা খুলে যে সামনে দীড়াল তার নাম ডাক্তার গিল্ডার। বয়স সাতবষ্টি- 
আটযষ্রি। জাতে পার্শি। মাঝারি মাপের চেহারা । লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুটের বেশি হবে না। এত বয়স 
হয়েছে তবু স্বাস্থ্য বেশ ভালো; পেটানো মজবুত শরীর। চৌকো মুখ, ধূর্ত নীলচে চোখ। 

গিল্ডার একসময় বম্বে মেডিক্যাল কলেজের ডিগ্রিওলা ডাক্তারই ছিল। বিশ-পচিশ বছর 
আগে বেআইনি গর্ভপাত করবার সময় তার হাতে একটি মেয়ের মৃত্যু ঘটে । তাই নিয়ে প্রচুর ঝঞ্ধাট 
হয়েছে। পুলিশ এসেছে, কোর্টে তার বিরুদ্ধে কেস উঠেছে এবং মামলায় দোষী প্রমাণিত হয়ে 
দু-মাস জেলও খাটতে হয়েছে গিল্ডারকে। সেই সঙ্গে ডাক্তারি ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশন নাকচ করে 
দেওয়া হয়েছে। নামকা্টা ডাক্তার গিল্ডার জেল থেকে বেরিয়ে নানা ঘাটের জল খেয়ে শেষপর্যস্ত 
এই ডান্ডা কোস্টে এসে ঠেকেছে। এই ঝোপড়পন্টিতেই তার ষোলো-সতেরো বছর কেটে গেল। 
এখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে সে প্র্যাকটিস-্ট্যাকটিস করে। তা ছাড়া কাছাকাছি একটা বে-আইনি 
হতচ্ছাড়া চেহারার বেশ্যাপট্রি আছে, সেখানেও বেশ জমজমাট পসার গিল্ডারের। তবে পসার 
যতটা, সেই তুলনায় পয়সা নেই। এখানকার মানুষগুলো দু-বেলা পেট ভরে খেতেই পায় না, 
ডাক্তারের পয়সা দেবে কোখেকে? যে যা দ্যায়, চোখ ঝুঁজে তাই পকেটে পোরে গিল্ডার। নাম- 
কাটা ডাক্তারের ফি-র দিকে তাকালে চলে না। 

চোখ রগড়াতে-রগড়াতে ডাক্তার গিল্ডার জিগ্যেস করল, “এত রাত্তিরে! কী ব্যাপার রে? 

জোহন বলল, “ফেঁসে গেছি ডাক্তারসাব। আপনাকে একবার আমার ঝোপড়িতে যেতে হবে।' 

কী হয়েছে? 

“একটা লড়কি বিলকুল বেহোশ হয়ে রয়েছে; তাকে দেখতে হবে। 

গিল্ডারের ঘুমস্ত ভাবটা একটা ঝাকুনি খেয়ে কেটে গেল যেন। সে বলল, লড়কি! তুই 
তো শ্রিফ আকেলা নাঙ্গা আদমি; শাদি-টাদি করিসনি। লড়কি পেলি কোথায়? ভাগিয়ে এনেছিস 
নাকি? 

“আপনি চলুন, যেতে-যেতে বলছি।' 

গিল্ডার বুঝল, বেহুশ মেয়েটার জন্য অস্থির হয়ে আছে জোহন; সময় নষ্ট না করে যত 
তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে নিয়ে যেতে চায় সে। যে ঢচলঢলে প্যান্টটা পরা ছিল, তার ওপর একটা 
কৌচকানো-মোচকানো বুশ শার্ট চড়িয়ে পেটমোটা ঢাউস ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে এল গিল্ডার। দরজায় 
তালা লাগিয়ে বলল, চল-_” 

ঝোপড়পট্টির ভেতর দিয়ে আঁকাবীকা নোংরা রাস্তা দিয়ে ওরা পাশাপাশি হাটতে লাগল। 
এই রাস্তাগুলো যুগপৎ নর্দমমা এবং পায়ে চলার পথ । দু-ধারের ঝোপড়িগুলো থেকে যত ময়লা 
জল, আবর্জনা, আনাজের খোসা এখানে ছোড়া হয়। এক-এক জায়গায় তাই করা আবর্জনা পাহাড়ের 
মতো উচু হয়ে আছে। 

মেতে-যেতে সংক্ষেপে মেয়েটাকে কোথায় পেয়েছে এবং কী অবস্থায় ঝোপড়পট্টিতে তুলে 
এনেছে, বলে গেল জোহন। 

সব শুনে গম্ভীর, কার সা “তাই তো; পুলিশের ঝামেলা-ফামেলায় না 
আবার পড়ে যাস-_, 


৭৬ পাঁচটি উপন্যাস 


জোহনের গলা শুকিয়ে গেল, “কী হতে পারে ডাক্তারসাব?' 
গিল্ডার এই ঝোপড়পট্রির বাসিন্দাদের রোগ-টোগই শুধু সারায় না; সে তাদের পরামর্শদাতাও। 
কেউ বিপদে পড়লে তার কাছে ছুটে আসে। গিল্ডার আস্তে-আস্তে মাথা নেড়ে রাগের সুরে বলল, 


“ভেবে দেখতে হবে। 

একসময় ওরা জোহনের ঝুপড়িতে এসে পড়ল। 

মেয়েটাকে জোহন যেভাবে শুইয়ে রেখে গিয়েছিল, ঠিক সেইভাবেই কাত হয়ে পড়ে আছে 
সে। চোখ তেমনই বৌজা। জোহন তাকে দেখিয়ে বলল, “এই যে, এর কথা বলছিলাম-_; 

গিল্ডার ঢাউস ব্যাগটা পাশে রেখে মেয়েটার হাত তুলে নিয়ে পাল্স্‌ দেখতে লাগল। জোহন 
তার গা ঘেঁষে দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল। মিনিটখানেক বাদে মেয়েটার হাত নামিয়ে গিল্ডার 
ঘাড় ফেরাতেই জোহন শ্বাসরুদ্ধের মতো জিগ্যেস করল, “কীরকম দেখলেন ডাক্তারসাব? 

ভালো না।' 

“বাচবে তো? ঘরে এনে তোলার পর যদি মরে যায়, আমি গেছি-_, 

“ভয় নেই, বেঁচে যাবে। তবে তোকে বেশ ভোগাবে। এক কাজ কর-__খানিকটা গরম জল 
দরকার। জোগাড় করতে পারবি?' 

পারতেই হবে।, 

জোহনের এই ঝুপড়িতে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা নেই, কাজেই বাসন-কোসনও নেই। তার খাওয়া- 
দাওয়া সবই বাইরে-বাইরে, কখনও উদিপিদের লাঞ্চ হোমে; কখনও সিন্ধি, পাঞ্জাবি বা গোয়াঞ্চিদের 
হোটেলে । খিদের সময় কাছাকাছি যা পাওয়া যায়, সেখানেই ঢুকে পড়ে জোহন। 

হাড়ি-কড়া বাসন-কোসন না থাকলেও এই ঝুপড়িতে একটা পুরোনো জং-ধরা কোরোসিনের 
কুকার আছে। জোহনের দারুণ চায়ের নেশা। ঘণ্টায় দু-বার করে তার চা চাই। ঝুপড়িতে যখন 
সে থাকে কুকার ধরিয়ে চা-টা নিজের হাতেই করে নেয়। 

টেবিলের তলা থেকে কুকারটা বার করে ধরিয়ে ফেলল জোহন। তারপর দশ মিনিটের 
ভেতর টিনের মগে জল গরম করে গিল্ডারের কাছে নিয়ে এল। 

গিল্ডার তার প্রকাণ্ড ব্যাগ থেকে তুলো বার করে গরম জলে ভিজিয়ে-ভিজিয়ে মেয়েটার 
রক্ত মুছতে লাগল। ক্ষতস্থানগুলো পরিষ্কার করতে-করতে আঁতকে ওঠার মতো করে বলল, “ওহ, 
অনেক জায়গায় স্ট্যাব করেছে।' 

গিল্ডারের পাশ থেকে জোহন অস্পষ্ট গলায় বলে উঠল, “হ্যা__ 

গিল্ডার বলল, “মেয়েটার শাড়ি ব্রাউজ রক্তে মাখামাখি হয়ে আছে; এগুলো বদলাতে হবে 
2 

এবার দারুণ বিপদে পড়ে গেল জোহন। তার ঝুপড়িতে কি বিয়ে করা বউ আছে, যে শাড়ি- 
টাড়ি থাকবে? কিস্তু ওই মেয়েটার রক্তমাখা কাপড়-চোপড় বদলাবার জন্য এখন কী দেয় সে? এত 
রাতে এই ঝোপড়পন্টিতে কেউ জেগেও নেই। থাকলে না হয় কারও কাছ থেকে শার়ি-ফাড়ি চেয়ে 
আনা যেত। অনেক ভেবেচিস্তে শেষ পর্যস্ত নিজের একটা পায়জামা আর বুশ শার্ট এনে গ্ল্ডারের 
হাতে দিল যোহন। 

গিল্ডার মজার গলায় বলল, “এগুলো মেয়েরা পরে নাকি? 

ঘাড় চুলকে জোহন বলল, “আপনি তো জানেন ডাক্তারসাব, মেয়েমানুষের লাফড়া আমার 
ঘরে নেই; শাড়ি কোথায় পাব? এই দিয়েই কাজ চালিয়ে দিন।' 

“শালে হারামি-_” বলেই একটা খিস্তি দিল গিল্ডার। তার জিভ বেশ আলগা; সেখানে কিছুই 


হঠাৎ বসস্ত নথ 


আটকায় না। 

জোহন ঠোট কুঁচকে হাসল, কিছু বলল না। 

আর শিল্ডার এক কাণগুই করে বসল। জোহনের চোখের সামনে মেয়েটার শাড়ি জামা-টামা 
খুলে কাটা জায়গাগুলো সেলাই করে দিতে লাগল। 

যুবতী মেয়ের খোলা শরীর আগে আর কখনও দেখেনি জোহন। মেয়েটার জ্ঞান নেই। দেহ 
রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত আর জোহনের বয়সও কিছু কম নয়। পঞ্চাশের কাছাকাছি, তবু মেয়েটাকে 
দেখতে-দেখতে তার চোখের তারা স্থির হয়ে গিয়েছিল, নাকের ভেতর দিয়ে সোডার ঝাজের মতো 
কিছু উঠে আসছিল, তালুর কাছটা ঝা-ঝা করছিল। 

এদিকে সেলাই-টেলাই হয়ে গেলে হাত-টাত ধুয়ে গিল্ডার মেয়েটাকে পায়জামা আর বুশ 
শার্ট পরিয়ে একটা ইঞ্জেকশান দিল। ব্যাগ থেকে অনেকগুলো ট্যাবলেট বার করে কাগজে মুড়তে- 
মুড়তে বলল, "জ্ঞান ফিরলে দু-ঘণ্টা পরপর একটা করে খাইয়ে দিবি। কাল সন্ধেবেলা এসে আবার 
ইঞ্জেকশান দিয়ে যাব। রোজ একটা করে সাত দিন ইপ্তেকশান চলবে । বলতে-বলতে তার ঢাউস 
মেডিক্যাল ব্যাগটা নিয়ে উঠে দীড়াল-_“দে, ওষুধের দামটা দিয়ে দে।' 

তালুর ভেতর সেই ঝা-ঝা করা ভাবটা এখনও রয়েছে। ঘোরের মধ্যে জোহন জিগ্যেস করল, 
লে 

“দশ টাকা। 
ব্যান্ডপারটিতে একদিন বাজালে তার মজুরি কুড়ি টাকা । আজকের মজুরি থেকে এক বোতল ঠার্রা 
আর রুটি মাংস খেয়েছে সে, তাতে খরচ হয়েছে ছণ্টাকার মতো। বাকি চোদ্দোটা টাকা এখনও 
রয়েছে। পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করে গিল্ডারকে দিল জোহন। 

গিল্ডার একটু চুপ করে থেকে হেসে-হেসে বলল, “আমার ফি-টি কিছু দিবি না? 

আরও দুটো টাকা বার করে নিঃশব্দে গিল্ডারকে দিল জোহন। তার মানে আজকের মজুরির 
পুরোটাই প্রায় খতম। 

পকেটে টাকা পুরতে-পুরতে গিল্ডার দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কী মনে পড়তে ঘাড় ফিরিয়ে 
বলল, “আজকের রাতটা পারলে মেয়েটার কাছে জেগেই কাটাস। জ্ঞান ফিরে এলে ওর যদি খুব 
যন্ত্রণা হয়, আমাকে খবর দিবি।” 

জোহন ঘাড় কাত করল- _-দেবে। 

দরজার বাইরে গিয়ে গিল্ডার আবার বলল, “আরেকটা কথা-_” 

জোহন তাকিয়ে রইল। 

গিল্ডার বলতে লাগল, 'ঝোপড়পট্রির লোকেরা অবশ্য মেয়েটা তোর কে হয় জানতে চাইবে 
না। এখানে কেউ কারওকে নিয়ে মাথা ঘামায় না; কিন্তু ওর এমন অবস্থা হল কী করে যদি জিগ্যেস 
করে, তখন কী বলবি? 

জোহন প্রতিধ্বনির মতো করে বলল, “কী বলব? 

“বলবি আাকসিডেন্ট হয়েছিল। মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে ওকেও তাই বলতে বলে দিস।' 

“আচ্ছা।' 

“সত্যি কথা বললে আবার পুলিশের লোকেরা এসে যেতে পারে।' 

গিল্ডার চলে গেল। জোহন দরজা বন্ধ করে মেয়েটার কাছে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। 
মেয়েটা চোখ বুঁজে পড়ে আছে। এবার জোহনের মনে হল, আস্তে-আস্তে মেয়েটার শরীরে জীবন 
যেন ফিরে আসছে। তিরতির করে বুকটা ওঠানামা করছে। বেঁচে যাবে মেয়েটা, নিশ্চয়ই বেঁচে 
যাবে। তাকে দেখতে-দেখতে হঠাৎ জোহনের খেয়াল হল ব্যান্ডপার্টির যে ড্রেস তার গায়ে রয়েছে, 


৭৮ পাঁচটি উপন্যাস 


সেটা রক্তে মাখানো । রক্তের দাগ সহজে ওঠে না। এখনও ধুয়েনটুয়ে ফেললে ড্রেসটা খানিকটা 
হয়তো বাঁচানো যাবে। অল্প-স্বল্প দাগ থাকলেও কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। নইলে দামি নতুন 
ড্রেসটাই বরবাদ। 

ঝোপড়পন্টির মধ্যেই একটা জলের কল আছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে কোনও একটা পাইপ- 
টাইপ ফেটে যাবার জন্য দিনরাত ওটা দিয়ে জল পড়ে। জোহন ঝট করে একটা পায়জামা 
আর জালিকাটা গোলাপি গেঞ্জি গায়ে দিয়ে ব্যান্ডপার্টির ড্রেস আর মেয়েটার শাড়ি জামা-টামা 
নিয়ে কল থেকে ধুয়ে আনল। ভেজা পোশাকগুলো ঘরেই শুকোতে দিয়ে আবার মেয়েটার কাছে 
এসে বসল। 

আজ গোটা রাতই মেয়েটার পাশে বসে জেগে থাকতে হবে। ডাক্তার গিল্ডার তাই বলে 
গেছেন। ঝাড়া দশ-বারো ঘণ্টা ফুলুট বাজিয়ে হাতে-পায়ে আর জোর নেই, দারুণ খাটুনি গেছে। 
জোহন ভেবেছিল, ঝোপড়পট্টিতে ফিরেই লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বে। তারপর পরিপাটি একটি ঘুমে 
রাত কাবার করে ফেলবে। তা নয়, কী যে লাফড়া হয়ে গেল! মেয়েটাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে 
না আনলেই বোধহয় ভালো হতো। ঘুমের বারোটা তো বেজেই গেছে, মজুরির যে-টাকাটা পাওয়া 
গিয়েছিল, সেটাও মেয়েটার জন্যই প্রায় শেষ হয়ে গেল। এরপর আরও কত খরচ-টরচ, আরও 
কত ঝামেলা পোয়াতে হবে, কে জানে। 

ঝৌকের মাথায় মেয়েটাকে এনে ঢোকানো ঠিক হয়নি। নিজের ওপর বিরক্ত হয়ে উঠতে 
গিয়ে আচমকা মেয়েটার নগ্ন খেলা শরীরটা চোখের সামনে ভেসে উঠল । সঙ্গে-সঙ্গে নাকে মুখে 
সেই সোডার ঝাজটা ফের অনুভব করতে শুরু করল জোহন। 


সারা রাত চোখের পাতা টান-টান করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল জোহন। এক 
মুহূর্তের জন্যও সে ঘুমোয়নি; মাঝে-মধ্যে ঢুলুনি এলেও জোর করেই চোখ মেলে রেখেছে । 

মেয়েটা তাকাতেই জোহন তার মুখের ওপর ঝুঁকল। তার চোখ ঘোলাটে, আচ্ছন্ন। গলার 
ভেতর থেকে আবছা গোঙানির মতো শব্দ বেরিয়ে আসছিল। জোহন জিগ্যেস করল, এখন কেমন 
লাগছে?' 

মেয়েটা উত্তর দিল না; তার চোখ দুটো ক্লান্তভাবে বুঁজে গেল। কিছুক্ষণ বাদে আবার যখন 
সে তাকাল তার চোখের সেই আচ্ছন্ন ঘোলাটে ভাবটা অনেকখানি কেটে গেছে। ঝুপড়ির ভেতরটা 
দেখতে-দেখতে খুব দুর্বল গলায় বলল, “আমি কোথায় £ 

জোহন বলল, 'ডান্ডার ঝোপড়পষ্রিতে। 

“এখানে এলাম কী করে 

মেয়েটা হিন্দিতেই কথা বলছিল। তা থেকে তার দেশ কোথায়, কী জাত, বোঝা যাচ্ছিল 
না। কেন না বাঙালি-বিহারি-পাঞ্জাবি-কেরেলি সবাই বন্বেতে হিন্দি বলে থাকে। তবে মেয়েটার বলার 
ধরনে কুর্গ অঞ্চলের টান আছে। | 

জোহন বলল, “পরে শুনো। এখন শরীর কেমন লাগছে বলো-_”' 

“খুব দুব্লা, মাথা ঘুরছে। বলতে-বলতে হাতের ওপর ভর দিয়ে হঠাৎ উঠে বসতে চেষ্টা 
করল মেয়েটা। কিন্তু সে বসবার আগেই তার দু-কাধ ধরে ব্যস্তভাবে শুইয়ে দিল জোহন। “উহু- 
উহ, এখন উঠো না। চুপচাপ শুয়ে থাকো ।, 

শুয়ে-শুয়ে মেয়েটা জিগ্যেস করল, “তুমি কে?, 

'আমার নাম জোহন।' 


হঠাৎ বসস্ত ৭৯ 


“তুমিই আমাকে এখানে এনেছ? 

হ্যা।' 

“আমাকে কোথায় পেলে, 

“পরে বলব।' 

চোখ আধাআধি ঝুঁজে কিছু ভাবতে চেষ্টা করল মেয়েটা । তার কপালে এলোমেলো আঁচডের 
মতো অনেকগুলো রেখা ফুটে উঠতে লাগল। একসময় কী যেন মনে পড়ে গেল তার। জোহনের 
চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “দুটো লোক কাল রান্তিরে আমাকে ডান্ডার দিকে এনে সারা গায়ে 
ছুরি মেরেছিল। মনে আছে হাত তুলে ছুরি ঠেকাতে-ঠেকাতে অজ্ঞান হয়ে আমি রাস্তায় পড়ে 
গিয়েছিলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। একটু থেমে আবার বলল, “তুমি কি রাস্তা থেকে আমাকে 
তুলে এনেছিলে? 

হ্যা।' 

“সেই লোকদুটো তখন কোথায় ছিল?" 

ওই ব্যাপারটা নিয়ে এখন কোনও কথা বলতে চাইছিল না জোহন। প্রচুর রক্তপাতের ফলে 
মেয়েটার শরীর দুর্বল হয়ে আছে। তাছাড়া সারা রাত সে অজ্ঞান হয়ে ছিল। এখন যে-কোনও উত্তেজনা 
তার পক্ষে ক্ষতিকর। জোহন বলল, “পরে শুনো। বলতে-বলতেই গিল্ডারের কথা মনে পড়ে গেল 
তার। 

গিল্ডার বলে গিয়েছিল, জ্ঞান হবার পর মেয়েটার শরীরে যদি খুব যন্ত্রণা হয, তাকে যেন 
জোহন খবর দেয়। জোহন মেয়েটার চোখে চোখ রেখে জানতে চাইল তার কোনও যন্ত্রণা হচ্ছে 
কি না। 

মেয়েটা মাথা নাড়ল-_-হচ্ছে না। 

তার মানে গিল্ডারকে এখন খবর দেবার দরকার নেই। সন্ধেবেলা সে নিজে থেকেই এসে 
ইঞ্জেকশান দিয়ে যাবে। গিল্ডারের কথা ভাবতেই জোহনের হঠাৎ খেয়াল হল, জ্ঞান হবার পর 
মেয়েটাকে একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দিতে হবে। সে তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে ট্যাবলেট আর জল এনে 
খাইয়ে দিল। পরক্ষণেই জোহনের মনে পড়ল, আজ ফাস্ট ট্রেন ধরে তার সিটিতে যাবার কথা ছিল। 
তাদের “আনারকলি ব্যান্ড-পার্টি'-র মালিক এবং ব্যান্ড মাস্টার ইফতিকার সাহেব ভোরবেলাতেই দলের 
সবাইকে অফিসে চলে যেতে বলেছিল। আজ নতুন বাজনাব রিহার্সাল শুরু হবে। 

জোহন ভ্রত একবার ফালিমতো জানালাটা দিয়ে বাইরে তাকাল। এতক্ষণে বেশ রোদ উঠে 
গেছে। 

বাইরে ঝোপড়পন্টির মাঝমধ্যিখানে সেই একমাত্র জলের কলটা ঘিরে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু 
হয়েছে। বহ লোকের কথা বলা এবং যাতায়াতের আওয়াজ ভেসে আসছিল। জোহন ব্যস্ত হয়ে পড়ল। 
ইফতিকার সাহেব মানুষটা এমনিতে চমৎকার-_ভোলাভালা, সাদাসিধে, আকাশের মতো বিরাট দিল, 
দলের লোকেদের বিপদে-আপদে দশ হাত দিয়ে আগলায়। কিন্তু কাজের গাফিলতি দেখলে একেবারে 
খেপে যায় সে। বাপ-মা চোদ্দোপুরুষ উদ্ধার করে খিস্তি দেয়। জোহন ঠিক করে ফেলল এক্ষুনি 
বেরিয়ে পড়বে সে। কিন্তু এই মেয়েটা? একে কে দেখবে? ভারী গাড্ডায় পড়া গেল তো মেয়েটাকে 
নিয়ে। 

হঠাৎ কী মনে পড়তে জোহনের মুখ চকচক করে উঠল। মুশকিল আসানের আভাস সে 
পেয়ে গেছে। মেয়েটার দিকে ফিরে দ্রুত বলল, “তোমার নামটা কিন্তু জানা হয়নি। 

মেয়েটা বলল, 'মেরি সরোজিনী দেবাসিয়া। তবে সবাই আমাকে “মেরি” বলে ডাকে ।' 

কথা বলার ধীচ শুনে জোহন যা আন্দাজ করেছিল তা-ই, অর্থাৎ মেয়েটা কুগিই। দেবাসিয়া 
পদবি কুর্গ ছাড়া আর কোথায়ও পাওয়া যাবে না। সে অবাক এবং কিছুটা খুশিও হল এই ভেবে, 


৮০ পাঁচটি উপন্যাস 


মেয়েটা সম্ভবত ক্রিশ্চানও। মেরি নামটা অন্তত তা-ই বোঝাচ্ছে। আগ্রহের সুরে জোহন জিগ্যেস 
করল, “তুমি ক্রিশ্চান? 

হ্যা। 

“কী ক্রিশ্চান? 

ক্যাথলিক।' 

মিনিটখানেক চুপ করে থেকে জোহন এবার বলল, “তুমি একটু একলা থাকো, আমি আসছি।' 
বলেই দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। 

ঝোপড়পট্টির ভেতর দিয়ে পশ্চিম দিকে যেতে-যেতে জোহন দেখল, মেয়েমানুষ-পুরুষমানুষ- 
বাচ্চা-কাচ্চা__ এখানকার যত বাসিন্দা, কেউ আর ঝুপড়ির ভেতরে নেই। রোদ উঠতে না উঠতেই 
বেরিয়ে পড়েছে। জোহনকে ডেকে কেউ-কেউ কথা বলছিল। সে কেমন আছে, এত সকালে হনহনিয়ে 
কোথায় চলেছে, ইত্যাদি-ইত্যাদি। হাটতে-হাঁটতেই জোহন উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। তবে যত বাচ্চার 
সঙ্গে দেখা হচ্ছিল, তারা আবদারের গলায় একই কথা বলে যাচ্ছিল, “জোহন চাচা, তুমি আজকাল 
আমাদের ফুলুট শোনাও না। আজ শোনাতে হবে কিস্তু। না শোনালে ছাড়ব না।' 

জোহন সময় পেলেই ঝোপড়পট্রির কাচ্চা-বাচ্চাদের জড়ো করে ফ্লুটে নানারকম মজার মজার 
গান বাজিয়ে শোনায়-_বেশির ভাগই হিন্দি ছবির গানের সুর। বয়স্ক লোকজনের চাইতে 
ছেলেপুলেদের মধ্যেই তার খাতিরটা বেশি। যেতে-যেতে হাত তুলে-তুলে জোহন তাদের বলল, "আজ 
না, আরেক দিন শোনাব।' 

দশ মিনিটের মধ্যে ঝোপড়পষ্রির শেষ মাথায় একটা ঘরের কাছে এসে দীড়াল জোহন। 
ঘরটার সামনের দিকের বারান্দায় বসে আজবলাল আর তার বউ এখন কলাই-করা মগে করে চা 
এবং পাও (পাউরুটি) খাচ্ছে। আজবলাল ইউ পি-র লোক, এখানে সকলে তাকে বলে ভাইয়া। 
তবে বয়স পঞ্চাশ-বাহানন, গীট্রা-গোর্টা চেহারা । এই বয়সেও একটা চুল পাকেনি, গোলাকার যুখে 
বসস্তর দাগ, গায়ের রং পোড়া ঝামার মতো। লোকটা চাকরি-বাকরি বা ব্যাবসান্ট্যাবসা কিছুই করে 
না; তার একমাত্র ধান্দা হল জুয়া খেলা। পঁচিশ-তিরিশ বছর আগে বন্বে শহরে এসেছিলসে; তারপর 
থেকে জুয়া খেলা ছাড়া আর কিছুই করেনি। জগতে যত রকমের জুয়া আছে- -সাট্রা, মাটকা, তাসের 
বাজি, ঘোড়ার রেস, কোনওটাতেই আজবলালের অরুচি নেই। জুয়ার পয়সাতেই তার সংসার চলে। 
বছর দশেক আগে এক সাট্টা খেলার আড্ডাতে তার সঙ্গে জোহনের আলাপ; সেই আলাপ থেকে 
পরে বেশ গাঢ় বন্ধুত্ব হয়েছে। 

আজবলালের বউ সোমবারি বেশ গাবদা-গোবদা মেয়েমানুষ। লম্বা যতটা, চওড়াও সে প্রায় 
ততখানিই। অনেকটা জায়গা জুড়ে, প্রায় দু-তিন মিটার হবে, সে বসে আছে। গোলগাল মুখ, অর্ধেক 
চুল সাদা হয়ে গেছে। আজবলালের তুলনায় তার বয়স ঢের বেশি মনে হয়। তবে সোমবারির 
সব আকর্ষণ তার চোখে; সর্বক্ষণ সেখানে কৌতুকের ছটা ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে। ছড়া কেটে-কেটে 
তি রাতের দাতার বু ভু বরের হাতি বুরিতে লি রররেক নানা বরা 
পারে। দারুণ মজার মেয়েমানুষ। 

জোহনকে দেখে স্বামীস্ত্রী দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, “আরে আও-আও ফুলুটবালা-_' 

জোহন বারান্দায় উঠে ওদের পাশে গিয়ে বসল। আজবলাল আবার বলল, 'দু-মাস বাদে 
তোমার সঙ্গে দেখা হল। কাম-কাজ বহুত জোর চলছে না কি? 

হ্যা; এখন শাদির মরশুম তো। হাতে অনেক বায়না আছে। 

"আজ ছুটি বুঝি? 

না। এক্ষুনি সিটিতে ছুটিতে হবে।' 

“তবে এলে যে? কিছু দরকার আছে? 


হঠাৎ বসস্ত ৮১ 


হাঁ, বছত দরকার। শোন-_, 

জোহন বলতে যাচ্ছিল, তার আগে হাত তুলে সোমবারি বাধা দিল, “দরকারের কথা পরে 
হবে; আগে তো চা খাও।, 

বলেই হাতের ভর দিয়ে নিজের বিশাল শরীর টেনে তুলল। 

জোহন হাহা করে উঠল, “না ভাবী, এখন আর চা খাব না। দরকারি কথাটা সেরেই স্টেশনে 
গিয়ে ট্রেন ধরতে হবে। 

সোমবারি বলল, “চা না খেলে তোমার কোনও কথা শুনছি না। ঘর থেকে স্টোভ বার 
করে এনে চটপট চায়ের জল চড়িয়ে দিল সে। ক্ষিপ্র হাতে চা করে, সঙ্গে পাও সাজিয়ে জোহনকে 
দিতে-দিতে বলল, “এবার দরকারি কথাটা বলো-_” 

চায়ের মগে লম্বা চুমুক দিয়ে জোহন বলল, “ভাবী, আমি শ্রিফ মরে গেছি। 

ঠোট টিপে কিছুক্ষণ ছোট-ছোট চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল সোমবারি। তারপর বলল, “কোনও 
লড়কির চক্করে পড়েছ নাকি 

“তোমার জবাব নেই ভাবী, ঠিক ধরেছ।, 

“বয়েস কত মেয়েটার? 

“ঠিক জানি না; চব্বিশ-পঁচিশ হবে আর কি-_-. 

একটু চিত্তা করে সোমবারি জিগ্যেস করল, “আর তোমার? 

অবাক হয়ে জোহন বলল, “আমার বয়েস দিয়ে কী হবে 

“বলোই না 

পঁচাশের পেঞ্চাশ) মতো; দু-এক বছর কমও হতে পারে। 

সোমবারির মুখে একটা ছায়া কিছুক্ষণের জন্য অনড় হয়ে রইল। তারপর ঠোট কামড়াতে- 
কামড়াতে সে বলল, “তর তো সত্যনাশ সর্বনাশ) হো গিয়া 

এতক্ষণ চুপচাপ চা-পাউরুটি খেয়ে যাচ্ছিল আজবলাল। এবার সে বলে উঠল, 
“বিলকুল-_ 

জোহন চমকে উঠল, “ক্যা হো গিয়া 

সোমবারি বলল, “সত্যনাশ। এই বয়েসে একটা জওয়ানি ছোকরিকে খেলিয়ে তুলতে পারবে 
তো ফুলুটবালা?' 

দেখো দেখি, কী ভাবতে এরা কী ভেবে বসে আছে। জোহন বলল, 'খেলাবার কথা আসছে 
কীসে? মাজাক (ইয়ারকি) না করে আমার কথাটা আগে শুনেই নাও না-_' 

ভালোমানুষের মতো মুখ করে সোমবারি বলল, “আচ্ছা বলো-_' 

মেরির ব্যাপারটা সংক্ষেপে বলে সোমবারির মুখের দিকে তাকাল জোহন, “এবার বুঝতে 
পারছ তো, কীরকম ফেঁসেছি! তুমি আমাকে বাঁচাও ভাবী।” 

“কী করতে হবে বলো-_” 

“মেয়েটায় সবে জ্ঞান ফিরেছে। ওর কাছে একজন থাকা দরকার । এদিকে আমাকে বেরুতে 
হচ্ছে। তুমি যদি ওর কাছে থাকো, তাহলে আমি ভরসা করে বেরুতে পারি। 

তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল না সোমবারি। স্বামীর দিকে ফিরে জিগ্যেস করল, “তুমি কি আজ বেরুবে, 
না ঘরেই থাকছ?' 

আজবলাল বলল, “ঘরে বসে থাকলে চলবে? আজ মহালছমিতে ঘোড়ার রেস আছে না? 
ঘণ্টাথানেকের ভেতর বেরিয়ে পড়ব।" 

“ভালোই হল। রান্না-টান্নার ঝামেলা আর করছি না। তুমি হোটেলে খেয়ে নিও। ঘরে বাসি 
রুটি আছে, তাই দিয়ে আমি চালিয়ে নেব। এখন ফুলুটবালার সঙ্গে যাচ্ছি। বেরুবার সময় ঘরে 


প্রফুল্ল রায়__পাঁচটি উপন্যাস-_-১১ 


৮২ পাঁচটি উপন্যাস 


তালা লাগিয়ে আমাকে চাবিটা দিয়ে যেও-__” বলতে-বলতে উঠে দীড়াল সোমবারি। জোহনের দিকে 
ফিরে বলল, চলো? । 


সোমবারিকে সঙ্গে নিয়ে কিছুক্ষণ বাদে নিজের ঝুপড়িতে ফিরে এসে জোহন দেখল, মেরি 
খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি এখন বেশ স্বাভাবিক; আগের সেই আচ্ছন্নতা 
আর নেই। জোহনদের দেখে সে উঠে বসতে চাইল, জোহন উঠতে দিল না। হাতের ইশারায় তাকে 
শুয়ে থাকতে বলে সোমবারিকে দেখিয়ে বলল, “এ আমার ভাবী; তোমার কাছে থাকবে। আমাকে 
এখন কাজে বেরুতে হচ্ছে 

নিঃশব্দে ঘাড় কাত করল মেরি। 

সোমবারির দিকে ফিরে জোহন বলল, “এই হল মেরি। এর কথাই তোমাকে বলেছি ভাবী।' 

হ্যা-_” মেরির দিকে তাকিয়ে ঘাড় হেলিয়ে দিল সোমবারি। 

কোথায় মেরির ওষুধ আছে, কখন-কখন কীভাবে তা খাওয়াতে হবে, সব জানিয়ে তিনটে 
টাকা সোমবারিকে দিতে-দিতে জোহন এবার বলল, “ওর বোধহয় দুধ ফল-টল খাওয়া দরকার। 
কিনে দিও-_ 

“আচ্ছা-_" সোমবারি দড়ির খাটিয়ায় মেরির পাশে গিয়ে বসল। 

আর জোহন কাল রাত্তিরে ব্যান্ডপার্টির যে ড্রেসটা ধুয়ে শুকোতে দিয়েছিল, সেটা নিয়ে বাইরের 
বারান্দায় গিয়ে পরে ফেলল। ঘুরে-ফিরে ড্রেসটা দেখতে-দেখতে লক্ষ্য করল রক্ত ধুয়ে ফেললেও 
এখানে-ওখানে ছ্যাকরা-ছ্যাকরা দাগ রয়ে গেছে। লনড্রিতে না দিলে ওই দাগ উঠবে না। তার মানে 
পুরো পাঁচটি টাকা গচ্চা যাবে। 

পাঁচ টাকা খরচের কথা ভাবাভাবির সময় এখন নেই। চটপট ঘরে এসে চুলটা কোনও রকমে 
আঁচড়ে নিল জোহন। ফুলুটের বাক্সটা কাধে ফেলে সোমবারি আর মেরির দিকে বিদায় নেবার 
ভঙ্গিতে হাত নেড়ে তক্ষুনি বেরিয়ে পড়ল। 


গোয়ার মারমুর্গীও পোর্টের কাছে এক ছোট শহরে জোহনদের বাড়ি। খুব ছেলেবেলায় বাবার 
সঙ্গে দেশ ছেড়ে বন্ধে চলে এসেছিল সে। সেই থেকে এখানেই আছে। বন্ধে আসার বছরখানেক 
আগে, জোহনের বয়স তখন পাঁচ কি ছয়, তার মা মারা গিয়েছিল। মায়ের মুখ এতদিনে তার স্মৃতিতে 
ঝাপসা হয়ে গেছে। দেশের কথাও জোহনের তেমন মনে পড়ে না। কখনও-সখনও একা-একা চুপচাপ 
বসে থাকলে তাদের সেই শহরে পোত্তুগিজ আমলের পুরোনো বাড়ি-ঘর, আঁকা-বাঁকা পাথুরে রাস্তা, 
নীল জলে-ভরা সমুদ্রের খাড়ি, আবছা-আবছা ছবির মতো চোখের সামনে ফুটে ওঠে। 

বন্বে থেকে গোয়ার সেই ছোট্ট শহরটা মোটে দুশো মাইল দূরে। ব্যালার্ড পিয়ের থেকে 
আজ দুপুরে জাহাজে উঠলে কাল দুপুরে পৌঁছনো যায়। কিন্তু বাবার সঙ্গে সেই যে বন্ধে চলে 
এসেছিল, তারপর আর দেশে ফেরা হয়নি। 

মনে আছে, বন্ধে এসে এক রোড কন্ট্রাক্টরের কাছে মজুরের কাজ নিয়েছিল বাবা। সারাদিন 
বাবা রাস্তা তৈরি বা মেরামতের কাজ করত। আর জোহনকে একটু দূরে ছায়া-টায়া' দেখে কোনও 
গাছের তলায় বা বাড়ির নীচে বসিয়ে রাখত। বিকেলবেলা কাজকর্ম চুকিয়ে মজুরি বুঝে নিয়ে জোহনের 
হাত ধরে কটন গ্রিনের ওদিকে এক ভাঙা-চোরা বাতিল গুদাম ঘরে চলে যেত। তখন ওখানেই 
তারা থাকত। 

দু-তিন বছর এভাবে কাটবার পর দুম করে বাবা একদিন মরে গেল। তখন জোহনের বয়স 


হঠাৎ বসস্ত ৮৩ 


কতই বা, খুব বেশি হলে দশ-এগারো। বাবা মরে যাবার পর কে তাকে দেখে, কে-ই বা খাওয়ায়। 
খিদের চোটে প্রথম-প্রথম দারুণ কষ্ট পেয়েছে জোহন। ভিক্ষে করার অভ্যাস নেই; লোকের কাছে 
হাত পাততে পারত না। ইরানিদের হোটেলে, নইলে উদিপিদের লাঞ্চহোমের সামনে গিয়ে করুণ 
মুখে দাড়িয়ে থাকত। দয়া-টয়া হলে কেউ এক-আধ টুকরো ছুড়ে দিত; কেউ দাত মুখ খিঁচিয়ে তাড়িয়ে 
দিত। 

কিছুদিন পর জোহনের মনে হয়েছিল, এভাবে বাঁচা যাবে না। তার একটা ছোট মাউথ অর্গান 
ছিল। বাবা যখন পিচ গলিয়ে স্টোন চিপ্‌স্‌ মিশিয়ে রাস্তায় ঢালত, কিংবা মেরামতের জন্য গাঁইতি 
দিয়ে পুরোনো পিচের আস্তর তুলে ফেলত, তখন একধারে বসে মাঝে-মাঝে আপন মনে মাউথ 
অর্গানটা বাজিয়ে যেত জোহন। বাবার মৃত্যুর পর বুদ্ধিটা কে দিয়েছিল, নাকি নিজেরই মাথা থেকে 
ওটা বেরিয়েছিল, মনে নেই। জোহন মাউথ অর্গানে হিন্দি ছবির গান বাজিয়ে ফুটপাথে-ফুটপাথে 
ঘুরে বেড়াত। মোটামুটি ভালোই বাজাত সে। দোকানদার-টোকানদাররা তাকে ডেকে গশ্া-গণ্ডা 
মশলাদার হিন্দি ছবির গানের সুর শুনে পয়সা-টয়সা দিত। ফুটপাথে ঘুরতে-ঘুরতে পায়ধুনির কাছে 
এক ব্যান্ডপার্টির মালিকের নজরে পড়ে গিয়েছিল জোহন। সেই বাজনার দলটা-_“শবনম ব্যান্ডপার্টি' 
এবং তার মালিক মুর্তাজা সাহেব আর নেই। মুর্তাজা সাহেব মারা যাবার সঙ্গে-সঙ্গে তার ব্যান্ডপার্টি 
উঠে গেছে। তবে এই লোকটির কাছে জোহন আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। 

মুর্তাজা সাহেবের কানটা ছিল দারুণ সজাগ । জোহনের মাউথ অর্গান শুনেই সে বুঝেছিল, 
ছোকরার দমে সুর আছে; তালিম দিলে ভালোই দাঁড়াবে। সে ডেকে বলেছিল, “কার কাছে বাজাতে 

জোহন বলেছিল, “কারও কাছে না; নিজে-নিজেই শিখেছি।' 

বহুত আচ্ছা। গান শুনলেই সুর তুলতে পারিস? 

“পারি।, 

“তোল দেখি__' বলে তখনকার দিনের একটা চটকদার ছবির গানের দু-কলি গেয়ে শুনিয়ে 
দিয়েছিল মুর্তাজা সাহেব। 

দু-চারবার চেষ্টা করেই মাউই অর্গানে গানটা বাজিয়ে দিয়েছিল জোহন। 

মুর্তাজা সাহেব দারুণ অবাক এবং খুশিও। জোহনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেছিল, “শাবাশ 
বেটা, তুই দেখছি আসলি সোনা, পাকা চব্বিশ ক্যারেট। 

তখনই খাবারের দোকান থেকে পেস্তা-কিসমিল লাগানো বশ্বে হালুয়া, মোতিচুর আর ছোলার 
ডালের লাড্ডু আনিয়ে খাইয়েছিল। 

খাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে গল্পও চলছিল। জোহনের কে-কে আছে,কোথায় থাকে, ইত্যাদি শোনবার 
পর মুর্তাজা সাহেব আরও খুশি। বলেছিল, “তোর আর কাটন গিরিনের কেটন গ্রিনের) গুদামে 
ফিরতে হবে না। আমার দলে তুই ভিড়ে যা।, 

জোহন জিগ্যেস করেছিল, “আপনার দলে কী করতে হবে 

“ফুলুট (ফ্রুট) বাজাবি। আমার একটা ফুলুটবালা দরকার ।, 

“আমি কি পারব? 

“জরুর পারবি। তোর খুনে সুর আছে; যা বাজাবি তাতেই সুর বেরুবে। তা ছাড়া আমি 
তো আছি।' 

সুতরাং সেদিন সেই মুহূর্তে শবনম ব্যান্ডপার্টি'-তে ঢুকে গিয়েছিল জোহন। সেই যে একবার 
সে বাজনার দলে ঢুকল তারপর আর বেরুনো গেল না। ছত্রিশ-সাইত্রিশ বছরে ষোলো-সতেরোটা 
দল ঘুরে এখন সে "আনারকলি ব্যান্ডপার্টি-তে এসেছে। সব চাইতে বেশিদিন এখানেই তার কাটল। 
ছ-সাত বছর ধরে জোহন এই দলটায় আছে। দল উঠে না গেলে, ব্যান্ডমাস্টার-কাম-প্রোপ্রাইটর 


৮৪ পাঁচটি উপন্যাস 


ইফতিকার সাহেব কিংবা সে মরে-্টরে না গেলে এ-দলটা সে ছাড়ছে না। 

পায়ধুনিতে “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি-র অফিসে জোহন যখন পৌঁছল, আটটা বেজে গেছে। 
ফার্স্ট ট্রেন ধরে সাড়ে ছণ্টার মধ্যে তার এখানে পৌঁছবার কথা ছিল। তার মানে পুরো দেড়টি 
ঘণ্টা লেট। 

দলের আর সবাই, যারা সাইড ড্রাম, বিগ ড্রাম এবং অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজায় তারা এসে 
গেছে। ব্যান্ডমাস্টার-কাম-প্রোপ্রাইটর ইফতিকার সাহেব ছটফট করছিল আর ঘন-ঘন রাস্তার দিকে 
তাকাচ্ছিল। বয়স ষাটের কাছাকাছি। কলপ মাখার জন্য চুল, জুলপি এবং ছুঁচলো দাড়ি লালচে হয়ে 
গেছে। বেশ শৌখিন মানুষ । বাজাবার সময় ছাড়া চুস্ত আর লক্ষৌর কলিদার পাঞ্জাবি পরে। গা 
থেকে ভুর ভূর করে আতরের গন্ধ বেরোয়, চোখে সুর্মার সরু টান। 

এমনিতে লোকটা চমৎকার-_-ভোলাভালা, বিরাট দিল তার। পয়সা নিয়ে দলের বাজনাদারদের 
সঙ্গে খ্যাচাখেচি করে না। তবে প্রচুর পরিমাণে ব্যাওড়া এবং ঠার্রা দুটোই দেশি চোলাই মদ) 
খেয়ে থাকে সে। চোখদুটো সর্বক্ষণ আরক্ত, মুখ থেকে ভক-ভক করে গন্ধ বেরুতে থাকে । নেশায় 
যাতে বেশিক্ষণ ইন্টারভ্যাল না পড়ে, সেজন্য সবসময় তার পকেটে একটা ঠার্রার বোতল মজুত 
থাকে। 

এ-লাইনের সবাই ড্রিংকটা করে থাকে। ইফতিকার সাহেবও করে। ওটা এমন কিছু ব্যাপারই 
না। 

সে যাকগে, লোকটা এমনিতে ভালো ঠিকই, কিন্তু কাজকর্মের গাফিলতি করলে তার 
মাথার ঠিক থাকে না; তখন দারুণ খেপে যায়| ইফতিকার সাহেবের কথা হল, আগে কাম, 
পরে আরাম। 

জোহনকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে দাড়াল ইফতিকার সাহেব। হাত-পা ছুড়ে সমানে চেঁচাতে 
লাগল। খই ফোটার মতো চড়বড় করে তার মুখ থেকে এক ঝলক খিস্তি বেরিয়ে এল। 

জোহন চুপ করে রইল। এই খিস্তির সময়টা কেউ টু শব্দটি করে না। বাধা দিলেই খিস্তির 
মাত্রা বেড়ে যাবে। তাতে অকারণ সময় নষ্ট। তা ছাড়া ব্যান্ডপার্টির সকলেই জানে, গালাগালটা সে 
মন থেকে দেয় না। মনটা তার ধবধকে সাদা। 

তোড়ে একচোট খিস্তি দিয়ে ইফতিকার সাহেব চুপ করল। হাওয়া বেরিয়ে গেলে বেলুনের 
অবস্থা যেরকম হয়, এখন তাকে অনেকটা সেইরকম দেখাচ্ছে। আসলে খিস্তির মুখে তার উত্তেজনা 
রাগ, সব বেরিয়ে গেছে। আর ওটা একবার বেরিয়ে গেলেই সে একেবারে মাটির মানুষ। 

ইফতিকার সাহেব ব্যাওড়া-ঠার্রা যে পরিমাণে সেবা করে থাকে, সেই পরিমাণেই পান- 
জর্দা খায়। দু-তিন খিলি পান এবং এক খাবলা জর্দা একসঙ্গে মুখে পুরে চিবুতে-চিবুতে নরম গলায় 
বলল, "এখানে আয়-_ 

জোহন তার কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বলল, “ফাস টিরেন (ফার্স ট্রেন) ধবে তোর আসার 
কথা; এত দেরি করলি? 

এক মিনিট আগে ক্ষিপ্তের মতো ইফতিকার সাহেবই যে খিস্তি করছিল, ভার গলার স্বর 
শুনে এখন তা বুঝবার উপায় নেই। 

জোহন বলল, কী করব, ঝামেলায় পড়ে গিয়েছিলাম যে-_”' 

কীসের ঝামেলা? 

এত লোকের সামনে মেরির কথা বলা ঠিক হবে না। বললে, সবাই একসঙ্গে হামড়ে পড়বে। 
জোহন শুধু বলল, "তোমাকে পরে বলব চাচা ।' 

ইফতিকার সাহেব আর কিছু জিগ্যেস করল না। নিজের থেকে না বললে খুঁচিয়ে 
কিছুই সে জানতে চায় না। অকারণ কৌতুহল তার নেই। সে বলল, “ঝামেলায় পড়েছিস, আগে 


হঠাৎ বসস্ত ৮৫ 


বলিসনি কেন? 

তুমি বলতে দিলে কোথায়? আমাকে দেখেই তো খিস্তি ঝাড়তে শুরু করলে।' 

পাশ থেকে খড়কে তুলে নিয়ে দাত খুঁটতে-খুটতে সরল নিম্পাপ শিশুর মতো হাসল 
ইফতিকার সাহেব। বলল, “তা বটে, তা বটে__, বলতে-বলতেই তার চোখের দৃষ্টি আচমকা তীক্ষ 
হয়ে উঠল। কর্কশ গলায় সে বলল, 'আযাই হারামি, ড্রেসে এগুলো কী লাগিয়েছিস? কীসের দাগ 
ওগুলো?' 

চমকে জোহন লক্ষ্য করল, আঙুল বাড়িয়ে তার ড্রেসে রক্তের ছ্যাকরা-ছ্যাকরা দাগগুলো 
দেখাচ্ছে ইফতিকার সাহেব। জোহন উত্তর দেবার আগেই আরেকবার লাফিয়ে উঠল সে। হাত- 
পা ছুড়ে খানিক আগের মতো তোড়ে গালাগাল দিয়ে যেতে লাগল, “দেড়শো টাকা দিয়ে কাল নয়া 
ড্রেস বানিয়ে দিয়েছি, আজই হারামি বরবাদ করে দিলি! এ শালে কুত্তা, এ উল্লুকা পাঠঠে__; 

ব্যান্ডপার্টির ড্রেস মালিকরাই দিয়ে থাকে। অন্য দলের প্রোপ্রাইটররা এ-বাবদে কিছু-কিছু ভাড়া 
নিয়ে থাকে। ইফতিকার সাহেব কিন্তু সিকি পয়সাও নেয় না। যাই হোক চুপচাপ ইফতিকার সাহেবের 
নতুন খিস্তিগুলো শুনে যেতে লাগল জোহন। 

কিছুক্ষণ বাদে উত্তেজনা কেটে গেলে ইফতিকার সাহেব আর-এক দফা পান-জর্দা মুখে পুরল। 
চিবুতে-চিবুতে কোমল গলায় বলল, 'দাগগুলো তো ইচ্ছে করে লাগাসনি। নিশ্চয় কিছু হয়েছিল, 
তাই না রে? 

হী। 

ইচ্ছে করে যে লাগাসনি, এ-কথাটা আগে বলিসনি কেন? 

“তুমি কি আগে কারওকে কিছু বলতে দাও চাচা? 

জোহনের পিঠে চাপড় মারতে-মারতে শব্দ করে হেসে উঠল ইফতিকার সাহেব, “ঠিক 
বলেছিস। 

জোহন চুপ করে রইল। 

ইফতিকার সাহেব এবার বললেন, '“দাগটা কী' করে লাগল, বল-__' 

“পরে শুনো।, 

“আচ্ছা। এখন তাহলে রিহার্সাল দিতে চল-__' 

ব্যান্ডপার্টির অফিসটার ঠিক পেছনেই আযাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া একটা চালা আছে; 
চারদিক অবশ্য খোলা । এটাই “আনারকলি ব্যান্ডপাি'-র রিহার্সাল রুম। সবাইকে নিয়ে ইফতিকার 
সাহেব সেখানে চলে এল। বাজনদারদের লাইন করে দীড় করিয়ে বলল, “আসছে হপ্তায় কর্পোরেশনের 
যে ভোট হয়েছে, তার রিজাল (রেজাণ্ট) বেরুবে। তারপর একটা রাজনৈতিক দলের নাম করে 
বলল, “ওই পার্টির পাটিল সাহেব আমাদের ব্যান্ডপার্টি বায়না করে গেছে। রিজালেব দিন উনি জিতলে 
জুলুস বেরুবে। জুলুসের আগে-আগে আমাদের বাজিয়ে যেতে হবে। এখন একটা কথা-_- 

পাটিল সাহেব অর্থাৎ মাধবরাও পাটিলকে জোহনরা ভালো করেই চেনে । এর আগেও ওঁর 
পার্টির নানা বিজয়োৎসবে "আনারকলি ব্যান্ডপার্টি' বাজিয়ে এসেছে। সমস্বরে সবাই বলে উঠল, “কী 
কথা?, 

“পুরোনো যেসব গান আছে ওতে চলবে না। নয়া মশালাদার ফিল্মি গানের সুর বাজাতে 
হবে। 

“কোঈ বাত নেহী। নয়া গানার সুরই বাজাব। কী বাজাতে হবে বলো।' 

পকেট থেকে একগাদা হিন্দি ছবির বুকলেট বার করে ইফতিকার সাহেব তিনটে গান পড়ল 
__“প্রেমনগর হ্যায় আপনা', 'ঝুম বরাবর ঝুম শরাবি' এবং “হাম তৃম এক কামরেমে বন্ধ হো'__ 
পড়া হয়ে গেলে বাজনদারদের দিকে তাকিয়ে বলল, “এই গান কণ্টা আমি পসন্দ করেছি; তোরা 


৮৬ পাঁচটি উপন্যাস 


কী বলসি?ঃ, 

সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “ফাস কিলাস (ফাস্ট ক্লাস)।' 

ইফতিকার সাহেব দারুণ খুশি। কেন না তার নির্বাচিত গানগুলো সবারই ভালো লেগেছে। 
সে বলল, “তোরা একটু দীড়া, আমি দু-মিনিটের মধ্যে আসছি।' 

কিছুক্ষণ বাদে ব্যাটারি-দেওয়া একটা রেকর্ডপ্লেয়ার আর রেকর্ড নিয়ে এল ইফতিকার সাহেব। 
প্লেয়ারটা চালিয়ে 'ঝুম বরাবর" গানটা প্রথমে কয়েকবার শুনিয়ে দিল। তারপর সবার কানে যখন 
গানটা বসে গেছে তখন বলল, “সুরটা তুলে ফেল-_” বলেই একটা বিগ ড্রাম বুকের কাছে ঝুলিয়ে 
সামনে এসে দীড়াল, “রেডি, ওয়ান টু থ্রি 

কর্নেটওলা, ক্লারিওনেটওলা, ড্রাম-ব্রাসওলারা আস্তে-আস্তে যে-যার বাদ্যযন্ত্রে সুরটা 
বাজাতে লাগল। পুরো গানটা তুলতে দুপুর গড়িয়ে গেল। সিজনের সময় অর্থাৎ বিয়ে কিংবা 
উৎসবের মরশুমে যেদিন-যেদিন কোথাও বাজাবার অর্ডার থাকে না, সেই দিনগুলো ইফতিকার 
সাহেব দলের লোকদের নিয়ে নতুন গানের রিহার্সাল দেয়। এজন্য সবাইকে পুরো দিনের মজুরি 
দিয়ে থাকে সে। 

আজ কোথাও বাজাবার বায়না নেই; তাই নতুন গানের রিহার্সাল দিচ্ছে ইফতিকার সাহেব। 
একটা গান তুলবার পর সে বলল, “দুপুর হয়ে গেছে, যা তোরা খেয়ে-টেয়ে আয়। দুটোর সময় 
আবার রিহার্সাল শুর করব। আজকের মধ্যে বাকি গান দুটো তুলে ফেলতেই হবে। কাল থেকে 
একটানা পনেরো দিন রোজ বায়না আছে। সুরগুলো তুলে না নিলে আসছে হপ্তায় ভোটের রিজালের 
দিন নতুন গান বাজানো যাবে না।' 

বাজনদারেরা নিজের পছন্দমতো হোটেলে খেতে চলে গেল। যোহন গেল উদিপিদের লাঞ্চ 
হোমে; ওখানে সস্তায় পেট ভরে খেতে পাওয়া যায়। তবে সব খাবারই ওখানে নিরামিষ; উদ্দপিদের 
হোটেলে মাছ-মাংসের কারবার নেই। 

খাওয়া-দাওয়ার পর কাটায়-কীটায় দুটোয় রিহার্সাল শুরু হল। বাকি গানদুটো তুলতে সন্ধে 
হয়ে গেল। 

গান-টান তোলা হলে বাজনদারেরা যে যার মজুরি নিয়ে নিল। ব্যান্ডপার্টিতে সবাই এক 
মজুরি পায় না। বাদ্যযন্ত্রের গুরুত্ব অনুযায়ী কম-বেশি পেয়ে থাকে। যারা ক্ল্যারিওনেট বা ফুট বাজায়, 
তারা ড্রামওলাদের চাইতে বেশি মজুরি পায়। সেদিক থেকে জোহন দলের সবচেয়ে দামি আটিস্টদের 
একজন। 

মজুরি নিয়ে একে-একে অন্য বাজনদারেরা চলে গেল। জোহন কিন্তু গেল না। সে মজুরিও 
নেয়নি। ইফতিকার সাহেব বলল, “তোর টাকাটা নে। অফিস বন্ধ করে আমাকে বেরুতে হবে।' 

তাকে বেশ চনমন করতে দেখা গেল। 

জোহন ইফতিকার সাহেবের এই চনমনে ভাবটার কারণ জানে । লোকটা বিয়ে টিয়ে করেনি, 
তাই বলে ঝাড়া হাত-পা ফকির-টকির নয়। কোলাবার ওদিকে তার বাঁধা একটি মেয়েমানুষ আছে। 
যেদিন কোথাও বাজাবার বায়না থাকে না, সেদিন আরব সাগরে সূর্য ভুবতে-না-ডুবতেই ইফতিকার 
সাহেব কানে আতর দিয়ে, লক্ম্্রোয়ের কলিদার পাঞ্জাবিটি চড়িয়ে, চোখে সূর্মাটি টেনে, ছুঁচলো দাড়ি 
আর গোঁফ চুমরোতে-চুমরোতে একটা ট্যাব্সিতে চড়ে বসে; তারপর সিধে কোলাবা। একটা সেকেম্ডও 
তখন তাকে আটকে রাখা যায় না। 

জোহন বলল, “বাহ, এখন যাবে কী, আমার ঝামেলার কথা শুনবে না 

এবার মনে পড়ে গেল ইফতিকার সাহেবের। বলল, “হাঁ-হাঁ বল, তবে একটু তাড়াতাড়ি 
করিস। দেরি করে গেলে আওরতটা আবার হজ্জুত করে। 

ইফতিকারের মেয়েমানুষের কথা সবাই জানে। নিজেই রসিয়ে-রসিয়ে সকলকে সে বলেছে। 


হঠাৎ বসস্ত ৮৭ 


এ-বিষয়ে তার ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় নেই। 

জোহন মেরির ব্যাপারটা সংক্ষেপে জানিয়ে বলল, “এবার বুঝলে তো, সকালে আসতে কেন 
দেরি হয়েছিল আর ড্রেসে কেন দাগ লেগেছিল, 

দেরি হওয়া বা ড্রেসে দাগ লাগা, এ-সব কানে যায়নি ইফতিকার সাহেবের। মেরির নাম 
শুনেই তার চোখ গোলাকার হয়ে গিয়েছিল। এক গাদা পান জর্দা মুখ ছুড়ে দিয়ে চিবুতে-চিবুতে 
বলল, “যাক আ্যাদ্দিনে তোর একটা হিল্লে হল। শাদি করলি না, বাঁধা আওরত রাখলি না। ঠার্রা 
গিলে আর ফুলুট মুখে পুরে জিন্দেগি বরবাদ করে দিলি। যেভাবেই হোক তোর ঝোপড়িতে একটা 
মেয়েমানুষ ঢুকে পড়েছে। আমার কী ইচ্ছে করছে জানিস?, 

সন্দিক্ধ চোখে ইফতিকার সাহেবের দিকে তাকালো জোহন। বলল, “কী? 

'নাঙ্গা হয়ে পুরা বড়ী বন্দর, মেরিন ড্রাইভ, মালাবার হিল্স্‌ আর ওরলি ঘুরে আসি।' 

“যাঃ, তোমাকে নিয়ে শালা পারা যায় না।' 

ইফতিকার সাহেব হাত নেড়ে-নেড়ে বলতে লাগল, 'ড়কি একবার যখন ঢুকে পড়েছে 
আর বেরুতে দিস না। শাদি ফাদি করে যদি আটকে ফেলতে পারিস, বিশ টাকার জায়গায় পঁচিশ 
টাকা মজুরি করে দেব। 

কাধ এবং হাত ঝাকিয়ে হতাশভাবে জোহন বলল, “সব কথায় তোমার খালি মাজাক। 

“ঠিক আছে ঠিক আছে, এখন আমাকে ছেড়ে দে। তোর মেরি ভালো হয়ে উঠলে ভেবেচিস্তে 
কিছু একটা করা যাবে। এক্ষুনি আমার না বেরুলেই নয়। আওরতটা চটে গেলে দরজা খুলবে না। 
তামাম রাত বাইরে বসে থাকা এই বুড়ঢা বয়েসে পোষায়? এই নে তোর মজুরি-_' বলে কুড়িটা 
টাকা বাড়িয়ে দিল সে। 

জোহন টাকাটা নিতে-নিতে দ্রুত একবার ভেবে নিল। কাল মজুরির যে বিশ টাকা পেয়েছিল, 
তার সবটাই খরচ হয়ে গেছে। হাতে একটা পয়সাও আর নেই। আজকের মজুরির টাকাটা অবশ্য 
আছে। কিন্তু মেরির জন্য ওষুধ, ইঞ্জেকশান এবং ফল-টলের খরচা রয়েছে। কুড়িটা টাকা নিয়ে যাবার 
সঙ্গে-সঙ্গে শেষ হয়ে যাবে। ঝৌকের মাথায় মেয়েটাকে ঘরে এনে ঢুকিয়েছে, কতদিন ভোগাবে কে 
জানে। যতদিনই ভোগাক, এখন আর বার করে দেওয়া যাবে না। কী ঝঞ্জাটেই যে পড়া গেছে! 
জোহন ভেবে দেখল, কিছু বাড়তি টাকা হাতে থাকা ভালো। মেরির জন্যে কখন কী দরকার হবে 
কে জানে। 

নিজের জন্য কখনও ভাবে না জোহন। তার জমানো একটা পয়সাও নেই। কাল কী খাবে, 
কীভাবে চলবে, এসব নিয়ে তার দুশ্চিন্তা নেই। মোটামুটি আজকের দিনটা চলে গেলেই হল। কালকের 
কথা কালকে ভাবা যাবে। আসলে সে নিজের সম্বন্ধে খুবই উদাসীন। অথচ ব্যার্ডপার্টিতে ফুলুট 
বা ক্ল্যারিওনেট বাজিয়ে কম পয়সা কামায না সে। রোজ এক বোতল ঠার্রা আর দু-বেলা উদিপি 
কি সিন্ধিদের হোটেলে খেতে কত আর লাগে। বাকি পয়সা সে লোককে দিয়ে দেয়। ঝোপড়পষ্টির 
বাসিন্দা বা ব্যান্ডপার্টির বাজিয়েরা কতবার তার কাছ থেকে যে টাকা নিয়েছে, জোহনের খেয়াল 
নেই। হাত পাতলেই হল, পকেটে পয়সা থাকলে সে কারওকে ফেরায় না। আর কেউ একবার 
নিলে ফেরত দেবার নাম নেই। অবশ্য ফেরত পাবার আশা কখনও করে না জোহন। 

আজ কিন্তু মেরির কথা ভেবে, টাকার চিস্তা করতে হল জোহনকে। সে বলল, “চাচা একটা 
কথা বলছিলাম__+ 

ক্যাশবাক্সে আর বাদ্যযন্ত্রের আলমারিতে তালা লাগাতে-লাগাতে ইফতিকার সাহেব বলল, 
“বলে ফেল।' 

“আমাকে পঞ্চাশটা টাকা আযডভাব্স দাও। পাচ টাকা করে রোজ মজুরি থেকে কেটে নিও। 

কুড়ি-বাইশ বছর “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-তে বাজিয়ে যাচ্ছে জোহন। আগাম টাকা কখনও 


৮৮ পাঁচটি উপন্যাস 


সে চায়নি। ঘাড় ফিরিয়ে একটু অবাক হয়েই ইফতিকার সাহেব বলল, “আ্যাডভাব্স টাকা দিয়ে কী 
হবে? 

কারণটা বলল জোহন। : 

আবার ক্যাশবাক্স খুলে পঞ্চাশটা টাকা জোহনকে দিতে-দিতে ইফতিকার সাহেব মুখ মুচকে 
হাসল। চাপা গলায় বলল, “দরদ! শালা বিলকুল খতম হয়েগেছিস। ও লড়কি পুরা জিন্দগি তোর 
কাধেই চেপে থাকবে। কথাটা বলে রাখলাম, মনে করে রাখিস।' 

জোহন বলল, “এরকম বলে-বলে তুমিই আমাকে খতম করবে। বলে আর দাঁড়াল না। 


ব্যান্ডপার্টির অফিস থেকে বেরিয়ে প্রথমে ক্রুফোর্ড মার্কেটের পেছনে চলে গেল জোহন। 
সেখানে পাকস্থলী বোঝাই করে ঠার্রা খেয়ে মার্কেট থেকে মেরির জন্য আঙুর, মুসম্বি আর চিকু 
কিনল। তারপর ভিক্টোরিয়া টারমিনাসে গিয়ে হারবার লাইনের ট্রেনে উঠে বসল। 

ঘণ্টা দেড়েক বাদে যখন সে ডান্ডা কোস্টের ঝোপড়পন্রিতে তার ঘরটিতে পৌঁছল তখন 
রাত ন'্টা বেজে গেছে। ঠার্রার নেশাটা রক্তের ভেতর ঝুমঝুম করছিল, পা অক্নস্বল্প টলছিল; তবে 
মাথাটা পরিষ্কার আছে। এক বোতল ঠার্রা তার কাগুজ্ঞান ঝাপসা করে দিতে পারেনি। 

ঝোপড়িতে আলো জ্বলছিল। মেরি দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে আছে; সোমবারি একটা আধভাঙা 
টুলের ওপর বসে তার সঙ্গে গল্প করছিল। জোহন ঢুকতেই সোমবারি উঠে পড়ল। বলল, “এই 
যে ফুলুটবালা, সন্ধেবেলা ফেরার কথা, এত দেরি করলে? 

ফলের ঠোঙাগুলো একধারে নামিয়ে রেখে জোহন বলল, “রিহার্সাল ছিল, অনেগুলো গান 
তুলতে হয়েছে, তাই দেরি হয়ে গেল। 

“ঠিক আছে। সারাদিন তোমার জিনিস পাহারা দিয়েছি, নিজের মাল বুঝে নাও।' 

মেরিকে দেখিয়ে-দেখিয়ে কথাটা বলল সোমবারি। জোহন হাসল। 

সোমবারি এবার বলল, একটু আগে ডাক্তারসাব এসে সুই (ইঞ্জেকশান) দিয়ে গেছে। আর 
তুমি যে টাকা দিয়ে গিয়েছিলে, তার থেকে পাও, দুধ আর সাস্তারা কিনে মেরিকে খাইয়েছি। 
দু-টাকা আশি পয়সা খরচা হয়েছে। বিশ পয়সা রয়েছে, এই নাও। এবার আমাকে যেতে হবে।' 
কুড়িটা পয়সা জোহনের হাতে দিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সোমবারি। 

জোহন বলল, “এখনই যাবে? 

“সেই সকাল থেকে তোমার ঝোপড়িতে বসে আছি । আমার ঘর-সংসার নেই! সেই লোকটা 
ঘোড়ার জুয়া খেলে এসে এখন নিশ্চয়ই লাফাচ্ছে। তা ছাড়া-_” 

“তা ছাড়া কী? 

চোখ মটকে হাসল সোমবারি। অশ্লীল একটা ছড়া কেটে চাপা গলায় বলল, “তুমি এসে 
গেছ। এখন আমি থাকলে তোমার ভালো লাগবে না ফুলুটবালা। ফাকা ঘরে দুজনে এবার টমটম 
চালিয়ে যাও।' 

জোহন বলল, মাজাক করছ!” 

ডাইনে-বীয়ে জোরে-জোরে মাথা নাড়ল সোমবারি। চোখ কুঁচকে ঠোট কামড়াঁতে-কামড়াতে 
হাসতে লাগল, “মাজাক না, সচ বলছি!" 

কথা বলতে-বলতে ওরা বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। জোহন এবার জিগ্যেস করল্ল, “মেয়েটাকে 
কেমন দেখলে ভাবী? 

“একেবারে আনারের দানা। বহুত ভারী জখম হয়ে আছে। 'দেখ ফুলুটবালা, আজ রাক্তিরেই 
ওকে আবার খেয়ে ফেল না।' 


হঠাৎ বসস্ত ৮৯ 


“ফির মাজাক।' 

সোমবারি হাসতে লাগল। 

জোহন বলল, “মেয়েটার কথা কিছু জানতে পারলে? 

সোমবারি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল, “কী কথা? 

“এই কোথায় থাকে, কী করে এখানে এল, ওই লোকগুলো ছুরি মেরেছে কেন- এই সব? 

“করেছিলাম। 

দারুণ আগ্রহের সঙ্গে জোহন জিগ্যেস করল, কী বললে? 

সোমবারি বলল, “কিচ্ছু না। আমাকে বোধহয় বলতে চায় না। তুমিই ওগুলো জেনে নিও ।, 

একটু চুপ করে থেকে জোহন বলল, “সারাদিন একসঙ্গে রইলে। মুখ বুজে তো আর থাকোনি। 
কী কথা হল তবে, 

“শ্রফ তোমার কথা । তুমি ওর জান বাঁচিয়েছ, এই কথাটা হাজার বার বলেছে মেরি। আচ্ছা 
যাই-__' ঝোপড়পট্টির আঁকাবীাকা গলির ভেতর দিয়ে সোমবারি চলে গেল। 

একটুক্ষণ দাড়িয়ে রইল জোহন। তারপর ঘরে ফিরে আসতেই মেরির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে 
গেল। এখন মেয়েটাকে বেশ ভালো দেখাচ্ছে। রক্তপাতজনিত চোখমুখের সেই অসুস্থ ভাবটা 
অনেকখানি কেটে গেছে। জোহন জিগ্যেস করল, “এখন কেমন লাগছে? 

মেরি বলল, “ভালো ।” 

“ওষুধগুলো সময়মতো খেয়েছিলে তো 

হী 

“ভাবী তোমাকে রাত্তিরের খাবার খাইয়ে দিয়ে গেছে? 

হী।' 

মেরির খাওয়ার কথায় জোহনের মনে পড়ল, তার নিজেরই খাওয়া হয়নি এবেলা । অন্য 
দিন হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে ফেরে সে। 

যাক গে, পাউরুটি টুটি কিনে নিয়ে এসেছে। একটা রাত ওতেই চলে যাবে । মেরিকে আপাতত 
আর কিছু না বলে পায়জামা আর গেঞ্জি নিয়ে বাইরের বারান্দায় চলে গেল জোহন। ব্যান্ডপার্টির 
ড্রেসটা বদলে একটু বাদে আবার ঘরে এসে ঢুকল। ড্রেসটা কোণের দড়িতে ঝুলিয়ে মেরির কাছাকাছি 
সেই আধভাঙা টুলটায় গিয়ে বসল। 

মেরি কী ভাবছিল, হঠাৎ বলল, 'আমি এখানে এলাম কী করে?' 

সকালেও এই প্রম্নটা করেছিল সে। জোহন তখন উত্তরটা দেয়নি, এবার দিল। কীভাবে কোন 
অবস্থায় রাস্তা থেকে মেরিকে তুলে এনেছিল, সব জানালো। 

মেরি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর গাঢ় কৃতজ্ঞ সুরে বলল, “রাস্তা থেকে তুমি তুলে 
না আনলে মরে যেতাম।' 

যোহন লক্ষ্য করল, মেয়েটা তাকে “তুমি” করে বলছে। সে ব্যান্ডপার্টিতে ফুলুট বাজায়। সে 
শরাবি এবং ঝোপড়পষট্টিতে থাকে, খুব সম্ভব তাকে এর বেশি মর্যাদা দেবার কথা ভাবছে না মেরি। 
জোহন কিছু বলল না। 

মেরি আবার বলল, “না আনলেই ভালো করতে । মরতে পারলে বেঁচে যেতাম? 

জোহন বলল, 'কেন?' 

মেরি উত্তর দিল না। 

একটু ভেবে জোহন জিগ্যেস করল, “ওই লোক দুটো কারা? 

মেরি বুঝতে পারল যারা তাকে ছুরি মেরেছে, তাদের কথা জানতে চাইছে জোহন। সে 
বলল, “ওরা বদমাশ, ডাকু, গুন্ডা, ফরেবি__”' 


প্রফুল্ল রায়-_-পীচটি উপন্যাস-_-১২ 


৯০ পাঁচটি উপন্যাস 


এক নিশ্বাসে এতগুলো শব্দ উচ্চারণ করে উত্তেজনায় সে হাঁপাতে লাগল। 

মাথার ভেতর ঠার্রার নেশাটা ফিকে হয়ে আসছিল জোহনের। সে একটু অবাক হয়ে বলল, 
“ওরা তোমায় পেল কি করে£ 

মেরি সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর দিল না, চোখ দুটো অন্যদিকে ফিরিয়ে তাকিয়ে রইল। জোহন আবার 
বলল, “কী হল, বললে নাঃ 

মেরি মুখ ফেরাল না। একইভাবে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে মনে-মনে উত্তরটা ঠিক করে 
নিল হয়তো। তারপর বলল, “তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ। তোমার কাছে লুকোব না, আমি খারাপ মেয়ে।' 

হতভম্বের মতো মেরিকে দেখতে-দেখতে জোহন বলল, “খারাপ মেয়ে! মানে? 

একটু চুপ করে থেকে মেরি বলল, “পেটের জন্যে আমাকে নোংরা রাস্তায় নামতে হয়েছে।' 

এবার ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল। এই বোম্বাই শহরে হাজার-হাজার মেয়ে পেটের জন্য শরীর 
বেচে বেড়াচ্ছে, জোহন সে খবর রাখে। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া, নরিম্যান পয়েন্ট কি জুহুতে দশ 
গজ হাঁটলেই পাঁচটা করে এরকম মেয়ে চোখে পড়বে। সাজসজ্জা, চাউনি ইত্যাদি দেখেই তাদের 
আসল পরিচয়টা টের পাওয়া যায়। কিন্তু জোহনের একটা কথা ভেবে অদ্ভূত লাগছিল, যে-মেয়েরা 
শরীর বেচে খায়, তাদের কেউ মেরির মতো এভাবে নিজের নোংরা গ্লানিকর পেশার কথা বলে 
না। সেদিক থেকে মেয়েটা খুবই অকপট, কিংবা হয়তো নির্বিকার আর বেপরোয়াও। এমন সরল 
স্বীকারোক্তি শোনবার পর কী বলা উচিত, জোহন ভেবে পেল না। 

মেরি বলতে লাগল, ওই বদমাশ দুটো কথাবার্তা ঠিক করে আমাকে ডান্ডার দিকে নিয়ে 
যাচ্ছিল। তখন কী জানতাম ওদের মতলব অন্যরকম। সমুদ্বের দিকে আসতে-আসতে অন্ধকার রাস্তায় 
আমার ওপর আচমকা ঝাপিয়ে পড়ল ওরা, টাকাপয়সা আর একটু-আধটু গয়না যা গায়ে ছিল কেড়ে- 
কুড়ে নিতে লাগল। আমি দিতে চাইনি, হাত-পা ছুড়ে চেঁচিয়ে ওদের ঠেকাতে চেয়েছিলাম। ওরা 
তখন সোজা ছুরি চালিয়ে দিল। 

কোনও ব্যাপারেই তেমন আকর্ষণ নেই জোহনের, দারুণ উদাসীন আর নিস্পৃহ টাইপের 
মানুষ সে। পৃথিবীর বাইরের স্তরে আলতোভাবে ভেসে থাকে। কোনও কিছুতেই অভিভূত হয়ে 
পড়ে না। 

ঠার্রার নেশাটা ক্রমশ আরও ফিসুক হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছিল এমন পবিভ্রনম্পাপ 
চেহারার মেয়েটা বেশ্যা না হলেই ভালো হতো। বুকের ভেতর আবছাভাবে একটু কষ্ট অনুভব করতে 
লাগল জোহন।' 

কথা বলতে-বলতে জোহনের দিকে চোখ পড়তেই থেমে গিয়েছিল মেরি। একদৃষ্টে কিছুক্ষণ 
তাকিয়ে হঠাৎ সে বলে উঠল, “কী ভাবছ? 

জোহন দূরমনস্কর মতো বলল, কিছু না তো।' 

“খুব ঘেন্না হচ্ছে? মেরির গলা এবার চাপা এবং গভীর। 

জোহন প্রায় চমকে উঠল, “ঘেন্না হবে কেন? 

“একটা নোংরা খারাপ মেয়ে ঘরে এনে তুলেছ বলে।" 

“এসব তুমি কী যা-তা বলছ।' 

মেরি হাসল। একটু পরে বলল, “একটা সত্যি কথা বলবে? 

“কী? | 

“আমি বাজে মেয়ে, এটা আগে জানলে নিশ্চয়ই রাস্তা থেকে তুলে এনে নিজের বিছানায় 
শুইয়ে দিতে না!" 

জোহন বলল, 'তোমার এ-কথাটা ভেবে দেখিনি। যে-ই 'হোক, রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে 
থাকতে দেখলে তুলে নিয়ে আসতাম।' 


হঠাৎ বসস্ত ৯৬ 


মেরি উত্তর দিল না, পলকহীন স্থির চোখে তাকিয়ে রইল। 

জোহনের হঠাৎ কী মনে পড়ে যেতে বলল, “সকালবেলা তোমাকে একটা কথা জিগ্যেস 
করতে ভুলে গেছি।' 

“কী?, 

তুমি যে জখম হয়ে আমার এখানে আছ, এ-খবরটা কারওকে দিতে হবে? 

কাকে দেবে? 

জোহন একটু ভেবে বলল, “এই ধরো তোমার বাবা-মাকে।' 

মেরি বলল, “আমার বাপ-মা নেই। 

“তবে আর কেউ-_-ভাই, বোন, দাদা, মাসি।' 

“আমার কেউ নেই।' 

একটু চুপ। তারপর জোহন জানতে চাইল, “তুমি কোথায় থাকো? 

মেরি পাশ ফিরে তাকাল, “কেন? 

“সেখানে নিশ্চয়ই তোমাকে খোঁজাখুঁজি করছে।' 

জোহনকে বেশ চিস্তান্বিত দেখাল। 

মেরির মুখে বিষগ্ন ছায়ার মতো কিছু একটা পড়ল যেন। পরক্ষণে তীক্ষ, রিনরিনে শব্দ 
করে হেসে উঠল সে। 

জোহন বলল, 'হাসছ যে?' 

“তোমার কথা শুনে। মেয়েমানুষের মাংস না কামড়ালে যাদের চলে না- তেমন কতকগুলো 
শরাবি, লুচ্চা ছাড়া কেউ আমার খোঁজ করে না। আমার কথা যারা সত্যি-সত্যি ভাবত, তারা কেউ 
বেঁচে নেই।' 

বিমূঢের মতো বসে রইল জোহন, তার গলার ভেতর থেকে অস্পষ্ট গোঙানির মতো একটা 
শব্দ বেরিয়ে এল শুধু। 

কী ভেবে মেরি এবার বলল, “আমার থাকার কিছু ঠিক নেই। রান্তিরে যে আমাকে ধরে 
নিয়ে যায়, তার কাছেই থাকি। দিনটা নিয়েই যত ভাবনা । হাতে কিছু পয়সা জমলে কেরানি ছুকরিদের 
যে হোস্টেল আছে সেখানে চলে যাই। নইলে সস্তার কোনও হোটেলে। এখন আছি কিং সার্কেল 
স্টেশনের পাশের ঝোপড়পন্টিতে। সেখানে আর না ফিরলেও কেউ চিস্তা করবে না। 

সুতরাং এ-ব্যাপারে আর কিছু বলার বা জিগ্যেস করার মানে হয় না। বড় একটা হাই তুলে 
হাতের ভর দিয়ে উঠতে-উঠতে জোহন বলল, “দারুণ খিদে আর ঘুম পেয়েছে । তোমার তো খাওয়া 
হয়ে গেছে, আমি একটু খেয়ে নিই। 

মেরি বিব্রতভাবে বলল, “হাহা নিশ্চয়ই। দেখ দিকি, এতক্ষণ ধরে আমি বকবক 
জী 

তাকে থামিয়ে দিয়ে জোহন পাও আর চিনি দিয়ে দ্রুত রাতের খাওয়া চুকিয়ে ফেলল। তারপর 
একটা হাওয়া-বালিশ আর নোংরা চিটচিটে বিছানার চাদর নিয়ে দরজার দিকে গেল। 

মেরি ব্যস্তভাবে বলল, “এ কী, কোথায় যাচ্ছ? 

“বাইরের বারান্দায়।' 

“কেন? 

ওখানে শোব। 

“বাইরে শোবে কেন? 

“এই মানে 

চট করে মানেটা বুঝে নিয়ে মেরি বলল, “ও, আমি আছি বলে-_”' 


৯২ পাঁচটি উপন্যাস 


জড়ানো গলায় আবছাভাবে কী বলল জোহন, বোঝা গেল না। 

মেরি এবার বলল, “তুমি তো আমাকে ভারী বিপদে ফেললে। 

জোহন বলল, “কেন £ 

“তুমি ঘরবালা হয়ে বাইরে শোবে, আর আমি কোথেকে উড়ে এসে তোমার ঘরে জুড়ে 
বসলাম। আমার মাথা কাটা যাচ্ছে লঙ্জায়।” 

“আরে ঠিক আছে, ঠিক আছে।' 

“কিস্ত বাইরে না গিয়ে ঘরেও তো শুতে পার। এখানে জায়গার অভাব নেই। 

“দশ মাইল দূরে তো আর যাচ্ছি না। দরজার বাইরেই থাকছি। ঘরে শোওয়াও যা, বারান্দায় 
শোওয়াও তাই? 

তাড়াতাড়ি বারান্দায় গিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে দিল জোহন। তারপর 
বিছানার চাদরটা পেতে হাওয়া-বালিশে ফুঁ দিয়ে-দিয়ে বাতাস পুরে পরিপাটি একটি বিছানা বানিয়ে 
শুয়ে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে চোখের পাতাদুটো আঠার মতো জুড়ে আসতে লাগল। 

ঘুমটা তখনও ভালো করে সারা শরীরে ভর করেনি; আচমকা ঘরের ভেতর থেকে মেরির 
গলা শোনা গেল, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? 

জড়ানো গলায় জোহন বলল, না।' 

“আমার খুব খারাপ লাগছে। তুমি কিন্তু ঘরেই শুতে পারতে ।” 

'এ-ব্যাপারটা নিয়ে আর ভেবো না। অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ো ।" 

উত্তর না দিয়ে মেরি বলল, “বুঝেছি।' 

জোহন জানতে চাইল, 'কী£ 

তুমি খুব ভীতু, তা না হলে সাধু-মহাত্মা।' 

“আমি কোনওটাই না। কিন্তু হঠাৎ তোমার এ-কথাটা মনে হল? 

“ভীতু কিংবা সাধু-টাধু না হলে ঘরেই শুতে । 

জোহন উত্তর দিল না। ৰ 

মেরি আবার বলল, “তোমাকে বেশি কষ্ট দেব না; একটু হাটতে পারলেই আমি চলে যাব।, 

একটু পরে দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল! 


পরের দিন সকালে উঠেই স্নান-টান সেরে ব্যান্ডপার্টির ড্রেস গায়ে চাপিয়ে জোহন 
কেরোসিনের স্টোভ ধরিয়ে চা বানাল। সেই চা এবং কালকের বাসি পাও নিজে খেল, মেরিকে 
খাওয়াল। তারপর মেরিকে একটা ট্যাবলেট দিল। এক ঢোক জল মুখে পুরে ঢক করে ট্যাবলেটটা 
গিলে ফেলল মেরি। 

আজ মেরিকে অনেক তাজা দেখাচ্ছে; কালকের তুলনায় সে অনেক বেশি সুস্থ। জোহন 
বলল, “আমাকে এবার বেরুতে হবে। কাল তোমাকে বলেছি আমি ব্যান্ডপার্টিতে ফুলুট ঘাজাই। মনে 
আছে? 

মেরি মাথা নাড়ল, “আছে।' 

“আজ আমাদের ব্যান্ডপার্টি ইগতপুরী যাবে। ওখানে এক কারখানার সিলভার জুবিলি ফাংশান 
হবে; আমাদের বাজাতে হবে। আমার ফিরতে রাত হয়ে যাবে। 

'আচ্ছা। 

তুমি তো আজ ভালোই আছ। তোমার কাছে লোক থাকার দরকার আছে? 

না।' 


হঠাৎ বসস্ত ৯৩ 


“ঘরে পাও আছে, সাস্তারা আছে, আঙুর-আনার আছে-_খেয়ে নিও। ভাবীকে বলে যাব, 
মাঝে-মাঝে এসে তোমার খোঁজ নিয়ে যাবে।' 

“আচ্ছা-_-' 

জোহন বেরুতে যাবে, ঝোপড়পট্রির একগাদা মেয়েমানুষ বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে হাজির। মেরির 
খবরটা এর মধ্যে নিশ্চয়ই জানাজানি হয়ে গেছে। এমনিতে এখানে কেউ কারও ব্যাপারে মাথা ঘামায় 
না, তবু কৌতৃহল বলে বস্তুটা তো সবারই আছে। তাদের আসাটা সেই জন্যই। 

পাতলা ছিপছিপে চেহারার একটা মেয়েমানুষ, এখানকার এক মাদারি খেলোয়াড়ের আওরত 
সে-_সবার প্রতিনিধি হয়ে বলল, “তোমার ঘরে নাকি একটা লড়কি এসে ঢুকেছে ফুলুটবালা ? 

জোহন বলল, 'গন্দ পেয়ে গেছ? 

“জরুর।” ভিড়ের ভেতর থেকে সিডিঙ্গে চেহারার একটি বউ চোখ ঘুরিয়ে বলল, “আগ 
(আগুন) আর কতক্ষণ চাপা দিয়ে রাখবে! 

জোহন হাসল, “ভেতরে এসো, আলাপ-টালাপ করে যাও।? 

মেয়েমানুষগুলো হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তাদের গায়ের সঙ্গে লেপ্টে ঝুলতে- 
ঝুলতে বাচ্চাগুলোও এল। 

এই ঝোপড়পট্টিতে কে কার ঘরে এল, কে কাকে নিয়ে থাকছে, কে কাকে নিয়ে শুচ্ছে, 
এসব ব্যাপারে কেউ মাথা ঘামায় না। এখানে যে যার নিজেকে নিয়েই অনবরত চরকিকলে ঘুরে 
যাচ্ছে। কিন্তু ফুলুটবালা জোহনের কথা আলাদা । সবার সঙ্গে তার খাতির, সবাই তাকে পছন্দ করে, 
বিপদে পড়লে অনেকেই তার কাছে হাত পাতে। সুতরাং তার সম্বন্ধে কারওই মুখ ফিরিয়ে উদাসীন 
হয়ে থাকা সম্ভব নয়। বিশ-পঁচিশ বছর যে লোকটা একা-একা ঝোপড়পট্টিতে পড়ে আছে, দুম করে 
তার ঘরে একটি যুবতী মেয়ে এসে হাজির হলে কৌতুহল হবারই কথা। ঝোপড়পন্ট্রির মেয়েমানুষগ্ুডলো 
তাই ছুটে এসেছে। 

জোহন সবার সঙ্গে মেরির আলাপ করিয়ে দিল। এই মেয়েমানুষগুলো কেউ মাদারি 
খেলোয়াড়ের বউ, কারও ঘরবালা দেওয়ালে-দেওয়ালে সিনেমার পোস্টার সেঁটে বেড়ায়, কারও 
ঘরবালা সাইনবোর্ড আঁকে, ইত্যাদি-ইত্যাদি। 

সাইনবোর্ড আঁকিয়ের বউ আচমকা প্রশ্ন করল, “মেরি তোমার কে হয়? 

মেরিকে কোথায় কীভাবে পেয়েছে, সে সব গিল্ডার আর সোমবারিদের কাছে বলেছে জোহন। 
অবশ্য মেরি যে বেশ্যা, গায়ের মাংস বেচে তার পেট চালাতে হয়, এটা আর বলেনি । বলার সুযোগ 
হয়নি। কেন না কাল রাতেই মেরির আসল পরিচয়টা জানতে পেরেছে সে; তারপর সোমবারিদের 
সঙ্গে আর দেখাটেখা হয়নি। অবশ্য দেখা হলেও এ-ব্যাপারটা আপাতত গোপনই রাখবে সে। মেরিকে 
কী অবস্থায় রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনেছে এবং সে যে তার সম্পূর্ণ অচেনা, গিল্ডারদের একথা জানিয়েছে 
জোহন। তার বিশ্বাস গিল্ডাররা ব্যান্ডপার্টি বাজিয়ে এ-খবর চাউর করে বেড়াবে না। কিন্তু মেরি 
সম্বন্ধে আসল কথাটা এই মেয়েমানুষগুলোকে বলতে জোহনের আটকাল। সাইনবোর্ড আঁকিয়ের বউর 
প্রশ্নের জবাবে সে বলল, “ও আমার রিস্তাদার (আত্মীয়) হয়।, 

ডাক্তার গিল্ডার এই উত্তরটাই তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল। 
বউ গলা বাড়িয়ে জানতে চাইল। 

“এই-__' এবার তো ঝামেলায় পড়া গেল। কিন্তু ঘাবড়ে গেলে চলবে না। তা হলেই ধরা 
পড়ে যাবে, মেরি তার আত্মীয়-টাত্মীয় কিছুই হয় না। চোখ কান বুঁজে সে বলল, দূর সম্পর্কের 
রিস্তাদার। 

মেরির ব্যান্ডেজ ট্যান্ডেজ দেখিয়ে পোস্টার সাঁটানোর বউ বলল, “ওর এই অবস্থা হল কী 


৯৪ পাঁচটি উপন্যাস 


করে? 

“আ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। 

একটু চুপচাপ। তারপর জোহনই আবার বলল, “তোমরা মেরির সঙ্গে গল্প-টল্ল করো। আমাকে 
এক্ষুনি বেরুতে হবে। 

কাঠের দেওয়াল থেকে ফুলুটের বাক্স নামিয়ে কাধে ফেলল সে। 

মেয়েমানুষগুলো বলল, “এখন গল্প করার সময় নেই; রান্না-বান্না চড়াতে হবে। 

হড়মুড় করে যেমন তারা ঢুকেছিল, সেইভাবেই বেরিয়ে গেল। তাদের সঙ্গে যেতে-যেতে 
জোহন ঘাড় ফিরিয়ে মেরিকে বলল, “আমি যাচ্ছি" 


'আচ্ছা-_ 

বাইরে বেরিয়ে বাঁদিকেব রাস্তা ধরল জোহন। আগে সে যাবে সোমবারিদের ঝোপড়িতে; 
সেখান থেকে আম্বেদকার রোড ধরে বান্দ্রা স্টেশনে। 

মেয়েমানুষগুলো সঙ্গে-সঙ্গেই যাচ্ছিল। ওরা ঝোপড়পন্রির বাঁ-ধারে থাকে। যেতে-যেতে 
পোস্টার সাঁটানোর বউ হঠাৎ চাপা গলায় বলল, “একটা সত্যি কথা বলবে ফুলুটবালা? 

জোহন বলল, “কী কথা? 

“মেয়েটা তোমার রিস্তাদার হয়, না ভাগিয়ে এনেছ?' 

জোহন একেবারে হকচকিয়ে গেল। থতিয়ে-থতিয়ে বলল, 'ধুস, কী যে যা-তা বল।' 

কোমর বাঁকিয়ে চুরিয়ে চোখ নাচাতে-নাচাতে মেয়েমানুষটা অশ্লীল শব্দ করে হাসতে লাগল। 

জোহন আর কিছু বলল না; লম্বা-লম্বা পায়ে মেয়েমানুষগুলোকে পেছনে ফেলে সোমবারিদের 
ঝোপড়ির দিকে এগিয়ে গেল। 


ছ-সাত দিন কেটে গেল। এর মধ্যে অনেকটা ভালো হয়ে উঠেছে মেরি। বিছানায় আর 
তাকে শুয়ে থাকতে হচ্ছে না। গিল্ডার বলে গেছে আর ইঞ্জেকশানের দরকার নেই; তবে ট্যাবলেট 
আরও কদিন চলবে। তারপর ঘা-গুলো শুকিয়ে গেলে সেলাই কেটে দিয়ে যাবে সে। সোমবারিকেও 
নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ওষুধপত্র খাওয়াতে হচ্ছে না। ওষুধ-টযুধ নিজেই এখন খাচ্ছে মেরি। তবে 
সোমবারি দিনে দু-একবার এসে খোঁজ নিয়ে যায়। 

এ ক'দিন জোহনের সেই একইভাবে কেটে গেছে। সকালে উঠে চান-টান সেরে চা খেয়েই 
ফুলুটের বাক্স ঘাড়ে করে সে বেরিয়ে পড়েছে। ঝোপড়পট্রি থেকে মিনিট পাঁচেক গেলেই উদিপিদের 
হতচ্ছাড়া চেহারার একটা লাঞ্চ হোম। সেখানে মেরির জন্য পয়সা দিয়ে গেছে জোহন। লাঞ্*-হোমের 
একটা ছোকরা মেরিকে দুপুর-সন্ধে দু-বেলা খাবার পৌঁছে দিয়েছে। আর যথারীতি ক্রফোর্ডে মার্কেটের 
পেছনে সিদ্ধি কি ইরানিদের হোটেলে পাক্কা এক বোতল ঠার্রা গিলে এবং রাতের খাওয়া চুকিয়ে 
অনেক রাব্রে টলতে-টলতে ফিরে এসেছে। ফিরেই মেরির সঙ্গে দু-একটা এলোমেলো কথা। তার 
শরীর-টরীর সম্বন্ধে খোঁজখবর নিয়ে সেই হাওয়া-বালিশ আর চিটচিটে চাদরটা বগলে পুরে বাইরের 
বারান্দায় বিছানা পেতেই লম্বা হয়ে পড়েছে। আর সব ঠিক আছে, কিন্তু এই ব্যাপারটাতেই মেরির 
দারুণ আপত্তি। আপত্তির কারণটা হল্স, যার ঘর সে বাইরে পড়ে থাকবে, চারা নিন সারি 
মেয়ে, সে কিনা ঘর দখল করে বসে থাকবে। 

সাত-আট দিন বাদে এক সকালে ফুলুটের বাক্স কাধে চাপিয়ে বেরুতে যাবে জোহন, মেরি 
হঠাৎ বলল, 'আমার একটা কথা ছিল।' 

ব্যান্ডপার্টির অফিসে আজ তাড়াতাড়ি পৌঁছুদ্বার কথা। সেখান থেকে তাদের গোটা দলকে 
দর্শটার ভেতর কালেক্টারিতে যেতে হবে। কেন না আজই বেলা বারোটার আগে কর্পোরেশন 


হঠাৎ বসস্ত ৯৫ 


ইলেকশানের রেজান্ট বেরুবে। পাটিলসাহেব কাল রাতেও ফোন করে ইফতিকার সাহেবকে বার- 
বার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ঠিক সময়ে ব্যান্ডপার্টি যেন পৌঁছে যায়। তিনি নিশ্চিন্ত আছেন, তার 
প্রার্থী জিতবেই। রেজান্ট বেরুবার পর এক মিনিটও দেরি করবেন না তিনি; সঙ্গে-সঙ্গে ব্যান্ডপার্টি 
রিনি হিরন জারাহাগারনরানাররারারাদিতী 
কথা? 

“আমি তো এখন ভালো হয়েই গেছি। আর কদ্দিন তোমার ঘাড়ে বসে থাকব! তুমি বললে 
এবার যেতে পারি।' 

ডাক্তার এখনও তো তোমার সেলাই-টেলাই কেটে দেয়নি; তা ছাড়া ওষুধও চলছে-_” 

'সেলাই আমি কারওকে দিয়ে কাটিয়ে নেব। ওষুধের আর দরকার হবে না ।” বলতে-বলতে 
একটু থামল মেরি। পরক্ষণেই খুব গাঢ গলায় শুরু করল, “তুমি আমার জন্যে যা করলে-_”' 

হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল জোহন, “ঠিক আছে ঠিক আছে, আজকের দিনটা তুমি অস্তত 
থেকে যাও। যদি যেতেই হয় কাল যেও। আটটা চল্লিশের ট্রেনটা আমাকে ধরতেই হবে। রান্তিরে 
ফিরে আসি; তখন কথাবার্তা হবে।, 

“আচ্ছা__-' 

জোহন বেরিয়ে গেল। সাড়ে নস্টা নাগাদ ব্যান্ডপার্টির অফিসে পৌঁছে সে দেখল দলের সবাই 
হাজির হয়ে গেছে; তার জন্যই অপেক্ষা করছে। তাকে দেখে লাফ দিয়ে উঠে পড়ল ইফতিকার 
সাহেব। অফিস ঘরে তালা ঝুলিয়ে তাড়া লাগাল, “চল-চল, বেরিয়ে পড়া যাক। দশটার ভেতর 
কালেক্টারি অফিসে না পৌঁছুলে ঘাড়ের ওপর আর শিরটি থাকবে না। পার্টিল সাহেব--- এই পর্যস্ত 
বলেই হাত দিয়ে ছুরি চালাবার কায়দা দেখিয়ে গলার ভেতর চক্‌ করে একটা শব্দ করল। অর্থাৎ 
পাটিল সাহেব কচাৎ করে মুক্ডুটি নামিয়ে দেবেন। 

একটু পরেই দেখা গেল “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি” পায়ধুনি থেকে বেরিয়ে আবদুল রহমান 
স্ট্রিট ধরে ক্রফোর্ড মার্কেটের কাছে এসে পড়েছে। সবার হাতেই যার-যার নিজের বাদ্যযন্ত্র। কারও 
হাতে কর্নেট, কারও ক্লারিওনেট, কারও সোজা পুল, কারও ব্রাস, কারও কাধে সাইডড্রাম। স্বয়ং 
ব্যান্ডমাস্টার-কাম-প্রোপ্রাইটরের বুকে বিগ ড্রাম ঝুলছে। 

দূরমনক্কের মতো হেঁটে যাচ্ছিল জোহন। ওধারে একটা উঁচু বাড়ির টাওয়ার-র্ুকে পৌনে 
দশটা বেজে গেছে। এখন চারদিকে অজস্র মানুষের থিকথিকে ভিড়, হাজার-হাজার প্রাইভেট কার, 
বাস, ট্রাক, ভ্যান, ট্যাক্সি, আর আছে নানা ধরনের শব্দ, চিৎকার। কিন্তু কিছুই যেন জোহনকে 
ছুঁতে পারছিল না। বারবার মেরির মুখটা মনে পড়ে যাচ্ছিল তার। মেয়েটা মোটে সাত-আট দিন 
তার কাছে রয়েছে। সারাদিনে কণ্টাই বা কথা হয় তার সঙ্গে। সকালে সে বেরিয়ে যায়, ফেরে 
মাঝরাত্তিরে। তা ছাড়া এমনিতে জোহন, খুবই নিস্পৃহ উদাসীন ধরনের। বন্ধে শহরের লক্ষ-লক্ষ 
মানুষ, চিৎকার, হট্টগোল, কোটি-কোটি টাকার ধাঁধিয়ে দেওয়া এশ্বর্ধ, সব কিছুর ওপর শ্যাওলার 
মতো সে ভেসে বেড়ায়। তবু মেরির সম্বন্ধে কোথায় যেন মায়া অনুভব করে সে। মেরি তাকে 
জানিয়েছে, সে খারাপ মেয়ে; পেটের জন্য তাকে শরাবি-ফরেবি-চোর-জুয়াচোর নানা জাতের 
লোকের সঙ্গে শুতে হয়। তার অকপট, সরল স্বীকারোক্তি শোনার পরও ঘেন্না করতে পারেনি 
জোহন, ধীরে-ধীরে তার সম্বন্ধে কখন যেন নিজের অজান্তে খানিকটা সহানুভূতি বোধ করেছে। 
সেই মেয়েটা আজ চলে যেতে চেয়েছে। সেটাই স্বাভাবিক। জখম অবস্থায় তাকে রাস্তা থেকে 
তুলে এনেছিল জোহন; এখন সে সুস্থ হয়ে উঠেছে। তার আর থাকার মানে হয় না। তবু কথাটা 
ভাবতেই খারাপ লাগছে জোহনের। 

আচমকা গায়ের পাশ থেকে হাবিবের গলা শোনা গেল, “চাচা; 

একটু চমকে উঠল জোহন। ঘাড় ফিরিয়ে হাবিবের দিকে তাকাল, “কী বলছিস? 


৯৬ পাঁচটি উপন্যাস 


হাবিবের বয়েস খুব বেশি না-_সতেরো-আঠারো হবে। ওরা গরিব মোপ্লা অর্থাৎ মালাবারি 
মুসলমান। সুদূর মালাবার থেকে পেটের ধান্দার জন্য এই বন্বে শহরে এসেছে। এক বছর হল সে 
“আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-তে আছে। এখানে সে হোল্ডার। ব্যান্ডপার্টির নিজস্ব ইডিয়মে যাকে ফল্স্‌ 
বলে, হাবিব তা-ই। অর্থাৎ বাজনার দলে থেকেও সে বাজনদার নয়। জিলিপির প্যাচ-খেলানো যে 
বাদ্যযস্ত্রটির নাম 'সোজা পুল” বাজনার সময় ঘাড়ের ওপর সেটা তুলে মুখটা নিজের মুখের কাছে 
সেঁটে রাখে হাবিব। এটা ধাপ্লার ব্যাপার। যারা ব্যান্ডপার্টি বায়না করে নিয়ে যায়, তারা দেখে হাবিবও 
বাজাচ্ছে। আসলে সে বাজায় না, বাজাতে জানেই না। সব দলেই এরকম দু-চারটে ফল্স্‌ বা ভুয়ো 
বাজনদার থাকে। তাদের দেখিয়ে ব্যান্ডপার্টিওলা খদ্দেরের কাছ থেকে পুরো টাকা আদায় করে, অথচ 
ফল্স্কে চার-পাঁচ টাকার বেশি মজুরি দেয় না। 

হাবিব বলল, 'আমার কথাটা মনে আছে? 

জোহনের চিস্তার মধ্যে মেরির মুখ তখনও ভেসে বেড়াচ্ছিল। সে বলল, কী কথা রে? 

“বা রে, তুমি বলেছিলে না আমাকে ফুলুট বাজাতে শেখাবে।' 

এবার মনে পড়ে গেল জোহনের; শেখাবার কথা সে বলেছিল বটে। অবশ্য এর জন্য কিছুদিন 
ধরে ছোকরা খুবই ধরাধরি করছে। তার কারণও আছে। ব্যান্ডপার্টিতে ঢুকলে দু-চার বছর ফল্স্‌ 
হয়ে থাকা মানে দিনে চার-পাচ টাকা রোজগার, তা-ও যখন ব্যান্ডপার্টির হাতে বাজাবার বায়না 
থাকে। বাজাতে শিখলে মজুরি অবশ্য ঝট করে অনেকটা বেড়ে যায়। তাই ফল্স্রা দলের বাজনদারদের 
ধরে, যদি লুকিয়ে-চুরিয়ে মালিক বা ব্যান্ডমাস্টারকে না জানিয়ে বাজনাটা শিখে নেওয়া যায়। একবার 
মোটামুটি বাজনা শিখে নিতে পারলে তখন অন্য দলেও যাওয়া যায়। কিন্তু ফল্‌্সের কদর কোথাও 
নেই। তাই যে দলে ফল্স্‌ হয়ে ঢোকে, তাকে সেখানে ঘাড় গুঁজে পড়ে থাকতে হয়। 

জোহন বলল, হ্যা, আমার মনে আছে।' 

মুখটা করুণ করে হাবিব এবার বলল, “ইফতিকার সাহেব মোটে চার টাকা মজুরি দেয়। 
এই বোম্বাই শচ্রে চার টাকায় কী হয় 'বলো। দু-বেলা খেতেই চার টাকা লেগে যায়। তারপর জামা- 
কাপড় আছে বাস ভাড়া, ট্রেন ভাড়া আছে। সকালে-বিকেলে কতকাল যে টিফিন করি না।' একটু 
থেমে আবার, বলল, 'ব্যান্ডপার্টির সঙ্গে ঘুরবার পর অন্য কাজ যে করব তার সময়ও নেই। তুমি 
যদি না শেখাও বিলকুল মরে যাব চাচা!” 

“ঠিক আছে, শিখিয়ে দেব।' 

£ইফতিকার সাহেব যেন জানতে না পারে। তাকে কিন্তু বোলো না।, 

ইফতিকার সাহেব এমনিতে বেশ ভালোমানুষ, দরাজ দিল। কিন্তু লুকিয়ে একজন ফল্স্‌কে 
বাজনার তালিম দেওয়াটা বরদাস্ত করবে না। সব ব্যান্ডপার্টির মালিকেরই এক মনোভাব- রাতারাতি 
একজনকে বাজনদার বানিয়ে টং-এ চড়িয়ে দিতে নেই। তাতে মাথার ঠিক থাকে না। আগের 
বাজনদাররা যখন কষ্ট করে কোনওদিন আধপেটা খেয়ে দু-চার বছর মাটি কামড়ে পড়ে থাকার 
পর বাজনা শিখেছে, তখন আজকালকার ছোকরাদের অত তাড়াহুড়ো কীসের? একটু কষ্ট করুক 
তারা; কিঞ্চিৎ ধৈর্যের পরীক্ষা দিক। এই রীতিটা কোনও ব্যান্ডপার্টির মালিকই সহজে ভাঙতে চায় 
না। 

কিন্ত জোহনের মনটা খুব নরম। অবশ্য সে ব্যান্ডমাস্টারও না, মালিকও না। তার মনোভাবটা 
এইরকম। আমরা কষ্ট করেছি-_করেছি; তাই বলে নতুন ছোকরারা কেন কষ্ট পাবে। সে হেসে- 
হেসে বলল, “আরে না-না, ইফতিকার সাহেবকে আমি বলতে যাচ্ছি না। বললে তোর ওপর তো 
চটবেই, আমার ওপরেও খেপে যাবে।' 

হাবিব বলল, “কবে থেকে শেখাবে বলো? 

“কবে আমাদের দলের বায়না নেই জানিস? 


হঠাৎ বসত্ত ৯৭ 


“সামনের সপ্তাহে শেষ তিনটে দিন ফাকা আছে। তখন আমরা বেকার।' 

বহুত আচ্ছা ।' 

“সেই সময়টা শিখিয়ে দাও না।" 

“ঠিক আছে।' 

একটু ভেবে নিয়ে হাবিব বলল, “কোথায় শেখাবেঃ মালিকের চোখের সামনে তো হবে 
না। দলের অন্য কেউ জানলেও চলবে না; মালিকের কানে চুকলি কেটে দেবে।' 

জোহন বলল, 'আসছে সপ্তাহে ওই তিনদিন আমার ঝোপড়পট্রিতে চলে যাবি। সমুদ্রের পাড়টা 
খুব নিরিবিলি, ওখানে গিয়ে শেখাব। 

“আচ্ছা ।' 

এরপর আর কোনও কথা হল না। 

দশটার দু-তিন মিনিট আগেই “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি কালেক্টরের অফিসে পৌঁছে গেল। 

এখানে এখন দারুণ ভিড়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অগুনতি জিপ, ফ্ল্যাগ, ফেসটুন, প্রাইভেট 
কার এবং অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবকে জায়গাটা এত ঠাসা, যে ভেতরে ছুঁচ ফেলবার ফাক নেই। এরই 
মধ্যে আরও কষ্টা ব্যান্ডপার্টি দেখা গেল। “শফি ব্যান্ড”, 'এলিগেন্ট ব্যান্ড', 'এমব্যাসি ব্যান্ড” “গ্যালাক্ষি 
ব্যান্ড", “ইউসুফ ব্যান্ড” ইত্যাদি। বিভিন্ন রাজনীতিক দল এবং তাদের প্রার্থীর এজেন্টরা ওদের নিয়ে 
এসেছে। 

সবারই ধারণা এবং বিশ্বাস তাদের ক্যান্ডিডেটরা নির্বাচনে জিতবেই। ফলাফল একবার জানিয়ে 
পড়বে। 

“আনারকলি ব্যান্ডপার্টি*-র বাজিয়েরা, বিশেষ করে ইফতিকার সাহেব ডিঙি মেরে-মেরে 
ভিড়ের ভেতর পাটিল সাহেব কিংবা তার লোকজনদের খুঁজছিল। আরও অনেকবার নির্বাচনী 
বিজয়োসবের সময় পাটিল সাহেবের ডাকে তারা বাজাতে গেছে। তার দলের লোকজনদের 
অনেককেই চেনে ইফতিকার সাহেব। 

খানিকক্ষণ ডিঙি মারার পর খোদ পাটিল সাহেবের সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে “গল ইফতিকার 
সাহেবের মধ্যবয়সি, পাতলা চেহারার মানুষ পাটিল সাহেব। গায়ের রং তামাটে। চুল কীাচাপাকা। 
তিনি খুবই ব্যস্ত। একবার কালেক্টারের অফিসে যাচ্ছেন, আবার ফিরে এসে দলের কমীদের 
কী নির্দেশ দিচ্ছেন। চোখাচোখি হতেই হাত তুলে ইফতিকার সাহেবকে একটু দীড়াতে বলে পাঁচ 
মিনিটের মধ্যে চলে এলেন। বললেন, “তোমরা এসে গেছ। ভেরি গুড । তবে রেজান্ট দশটায় 
বেরুচ্ছে না; ঘণ্টাখানেক দেরি হবে! তোমরা কাছাকাছি থেকো। রেজান্ট বেরুলেই প্রসেশান 
বার হবে।' 

“জি__" ইফতিকার সাহেব মাথা হেলাল। 

“আমি যাচ্ছি-_' পাটিল সাহেব দু-হাতে ভিড় ঠেলতে-ঠেলতে চলে গেলেন। আর ইফতিকার 
জোহনদের সঙ্গে নিয়ে কাছাকাছি একফালি পার্কের কাছে চলে এল । বাদ্যযস্ত্রগুলো পার্কের রেলিঙের 
গায়ে হেলিয়ে রেখে তারা চওড়া কংক্রিটের ফুটপাথের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসল। তবে সবার 
চোখ রইল কালেক্টরের অফিসের দিকে। অন্য ব্যান্ডপার্টিগুলোও এদিকে-ওদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। তাদের 
কেউ সিগারেট ফুঁকছে, কেউ ঝিম মেরে খানিকটা ঘুমিয়ে নিচ্ছে, কেউ বা দলের অন্য বাজিয়েদের 
সঙ্গে চুটিয়ে গল্প করে যাচ্ছে। 

ঘণ্টাখানেক পর থেকেই ফলাফল ঘোষণা শুরু হল। কালেক্টর অফিসের দোতলায় একটা 
লাউডস্পিকার লাগানো রয়েছে। সেখান থেকে শোনা যাচ্ছে, অমুক কেন্দ্রে অমুক দলের অমুক 
প্রার্থী এত ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। এই কেন্দ্রের অন্যান্য প্রার্থীরা অমুক-অমুক দলের অমুক- 


প্রফুল্প রায়-_পাঁচটি উপন্যাস--১৩ 


৯৮ পাঁচটি উপন্যাস 


অমুক ব্যক্তি এই-এই ভোট পেয়েছেন। হিন্দি, মারাঠি গুজরাতি এবং ইংরেজিতে ফলাফল জানানো 

| 

যে দলের প্রার্থী জয়ী হয়েছে, রেজান্ট বেরুবার সঙ্গে-সঙ্গে তার সমর্থক এবং দলীয় কর্মীরা 
মুহ্মু জয়ধ্বনি আর ল্লোগান দিয়ে আরবসাগর থেকে উঠে আসা হু-হু বাতাসের শরীর চিরে- 
চিরে দিচ্ছে। তার পরেই দেখা যাচ্ছে প্রার্থীকে খোলা জিপে দীঁড় করিয়ে, পঞ্চাশটা জুঁই বা 
রজনীগন্ধার মালা তার গলায় চাপিয়ে আগে পিছে ব্যান্ডপার্টি বাজাতে-বাজাতে শোভাযাত্রা বেরিয়ে 
যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ঘন-ঘন পতাকারি (আতসবাজি) ফাটছে, আর রঙিন ফাগ উড়ে-উড়ে বাতাস 
লাল হয়ে যাচ্ছে। 

সাত-আটটা রেজান্ট বেরিয়ে যাবার পর একসঙ্গে দুটি পাশাপাশি কেন্দ্রের ফলাফল বেরুল। 
দুই পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক দলের দুজন প্রার্থী এই কেন্দ্র দুটিতে জিতেছেন। তাদের একজন 
হলেন পার্টিল সাহেবের পার্টির ক্যার্ডিডেট। 

রেজাণ্ট বেরুবার সঙ্গে-সঙ্গে অন্য দলের ব্যান্ডপার্টি বেজে উঠল। সেই সঙ্গে দুূমদাম 
আতসবাজি ফাটতে লাগল। একটু পর দেখা গেল গলায় ফুলের মালার পাহাড় নিয়ে, ওই দলের 
প্রার্থী খোলা জিপে এসে দীড়িয়েছেন। 

জোহনরা এখন কী করবে, ভাবছে। ইফতিকার সাহেব পায়ের বুড়ো আঙুলে ডিতি মেরে- 
মেরে কালেক্টর অফিসের সামনের দিকের ভিড়টা দেখতে-দেখতে বলতে লাগল, “পাটিল সাহেবের 
পার্টি জিতল, কিন্তু ওদের কারওকে তো দেখতে পাচ্ছি না। কেউ ডাকতেও তো এল না। 

তার কথা শেষ হতে-না-হতেই দেখা গেল বুকে পাটিল সাহেবদের পার্টির ব্যাজ আঁটা 
একটা ছোকরা উর্ধ্বশ্াসে ছুটতে-ছুটতে আসছে। সে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, চলে এসো, চলে 
এসো-_' 

দু-মিনিট বাদেই চোখে পড়ল, ইফতিকার সাহেব “আনারকলি ব্যান্ডপাি'-কে কালেক্টরের 
অফিসের সামনে সৃশ্ঙ্খলভাবে দীড় করিয়ে নিয়ে ব্যান্ডমাস্টার হিসেবে বিগ ড্রামে ঘা দিতে-দিতে 
বলছে, “বাজাও ভাই__ঝুম বরাবর ঝুম শরাবি-_” 

ফল্স্রা বাদে অন্য বাজিয়েরা যে"যার বাদ্যযন্ত্র বাজাতে লাগল। পা্টিল সাহেবদের প্রার্থীও 
মালা ঘাড়ে করে ফাগ বৃষ্টির মধ্যে জোড়হাতে একটা জিপে এসে দীঁড়িয়েছেন। তার পাশে স্বয়ং 
পাটিল সাহেব। তাদের দলের কর্মী এবং সমর্থকরাও পটকা ফাটিয়ে আর উন্মাদের মতো জয়ধ্বনি 
দিয়ে-দিয়ে কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে। 

একটু পর ব্যান্ডপার্টি বাজাতে-বাজাতে দুই দলের দুই বিজয়ী প্রার্থীর জুলুস বেরুল। দু-দলের 
নির্বাচন কেন্দ্র পাশাপাশি। আপাতত তারা নিজের-নিজের কেন্দ্রে গিয়ে ভোটদাতাদের ধন্যবাদ এবং 
কৃতজ্ঞতা জানাবে। 

কালেক্টরের অফিস থেকে বেরিয়ে শোভাযাত্রা দুটো গা-ঘেঁষাঘেঁষি করে চলেছে। পি-এম মেটা 
রোড, দাদাভাই নওরোজি রোড পেরিয়ে কারনাক রোড আর ক্রফোর্ড মার্কেট পিছনে ফেলে 
ঘণ্টাখানেক পর তারা সেনট্রাল বন্বেতে এসে পড়ল। তাদের নির্বাচন কেন্দ্র এখানেই। 

এতক্ষণ তারা সৎ প্রতিবেশীর মতো পাশাপাশি ভালোই এসেছিল। কালেক্টরের অফিস থেকে 
এতদূর পর্যস্ত রাস্তা ছিল বেশ চওড়া। দুই জুলুস পাশাপাশি আসতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু এবার 
সামনে একটা সরু গলি পড়ল। এই গলি দিয়ে কিছুটা গেলে পাটিল সাহেবদের বিজয়ী প্রার্থীর নির্বাচন 
কেন্দ্র। সেটা পার হলে অন্য বিজয়ী প্রার্থীটির কনস্টিটিউয়েলসি। 

এখন প্রশ্ম, কার জুলুস আগে গলিতে ঢুকবে? পাটিল সাহেবের সমর্থকরা চায় তাদের 
শোভাযাত্রা আগে যাবে; অন্য দলটির সমর্থকরা চাইছে তাদের শোভাযাত্রা আগে যাবে। এই নিয়ে 
তর্কাতর্কি চিৎকার শুরু হয়ে গেল। ক্রমশ উত্তেজনা চরমে উঠল। কোনও দল অন্য দলটিকে আগে 


হঠাৎ বসস্ত ৯৯ 


যেতে দেবে না। 

পাটিল সাহেবের মতো অন্য দলটিতেও বয়স্ক ঠান্ডা মাথার লোক আছে। এই সামান্য কারণে 
তারা ঝামেলা ঝঞ্জাট চান না। দু-হাত তুলে তারা টেঁচিয়ে-চেচিয়ে বলতে লাগলেন, “কী হচ্ছে এসব? 
শাস্ত হও-_; 

কিন্ত কমবয়েসি মাথা-গরম সমর্থক এবং কর্মীদের কানে এসব ঢুকল না। ফুটপাথের ওপর 
রাস্তা মেরামতের জন্য বড়-বড় পাথরের টুকরো স্তবপাকার হয়ে ছিল। আচমকা দুই দলই পাথর 
তুলে ছুড়তে লাগল। মুহূর্তে একটা লগুভগ্ু ব্যাপার বেধে গেল। যে যেদিকে পারছে এখন ছুঁটছে। 
জোহন হঠাৎ লক্ষ করল, তার আশেপাশে “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র একটি বাজনদারও নেই। সবাই 
ছটহাট সরে পড়েছে। দূর থেকে ইফতিকার সাহেবের গলা একবার শোনা গেল, 'জোহন পালা, 
লা 

উড়স্ত চাকির মতো চারদিক থেকে পাথরের চাইগুলো ছুটে আসছিল। দিশেহারার মতো 
এক দিকে_ উত্তর না দক্ষিণ, পুবে না পশ্চিমে, জোহন জানে না, দৌড় লাগাল। কিন্তু দশ গজও 
যায়নি, তার আগেই মনে হল, মাথায় ধা করে এক কেজি ওজনের কিছু একটা এসে লাগল। 
সঙ্গে-সঙ্গে জোহনের চোখের সামনে কয়েক কোটি হলুদ ফুল ফুটে উঠেই সব অন্ধকার হয়ে গেল। 
মাথার যেখানটায় লেগেছে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়ে একবার ছুঁল সে; টের পেল ফিনকি দিয়ে 
রক্ত বেরিয়ে আসছে। টলতে-টলতে আরও দু-পা এগিয়ে যেতেই, মুখের ওপর আবার একশো 
মাইল স্পিডে আরেকটা পাথরের টুকরো এসে পড়ল। জোহনের মনে. হল তার নাকটা ছ'ইঞ্চি 
ভেতরে বসে গেল। পরক্ষণে হুড়মুড় করে রাস্তার ওপর ঘাড়মুখ গুঁজে পড়ে গেল সে। তারপর 
আর কিছু মনে নেই। 


জোহনের যখন জ্ঞান ফিরল, বেশ রাত হয়েছে। সে দেখল, ঝোপড়পণ্টিতে নিজের দড়ির 
খাটিয়ায় সে শুয়ে আছে, আর তাকে ঘিরে অনেকে বসে আছে। যেমন ইফতিকার সাহেব, ডাক্তার 
গিল্ডার, ব্যান্ডপাটির দুজন বাজনদার, সোমবারি আর মেরি। 

ন্নাযুণগ্ডলো এখন খুবই দুর্বল আর ক্লান্ত, তবু আস্তে-আস্তে টুকরো টুকরোভাবে পাটিল সাহেব, 
জুলুস, ব্যান্ডপার্টি, সেনট্রাল বন্ধের সেই সরু গলি, দু-দলের সমর্থকদের পাথর ছোড়াছুড়ি, সব মনে 
পড়ে গেল। জোহন আন্দাজ করল, অজ্ঞান হবার পর ইফতিকার সাহেবরাই তাকে ডান্ডা কোস্টের 
এই ঝোপড়পন্ট্রিতে নিয়ে এসেছে। 

ইফতিকার সাহেব বলল, “যাক, জ্ঞান ফিরেছে, বাঁচলাম।' 

বলতে-বলতেই ডাক্তার গিল্ডারের দিকে তাকাল, ভয়ের কিছু নেই তো ডাক্তারসাব?' 

গিল্ডার বলল, “না। পাচ-সাতদিন শুয়ে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে। তবে ঠিকমতো ওষুধ- 
টোষুধ খেতে হবে, আর ঠার্রা একেবারেই না।' 

পুরোনো আমলের একটা ঢাউস পকেটঘড়ি আছে ইফতিকার সাহেবের। সেটা বার করে 
এক পলক দেখে সে বলল, “সাড়ে নস্টা বাজে। অনেক রাত হল, এবার উঠি।” জোহনকে বলল, 
“কিচ্ছু চিস্তা নেই, আমি আবার এসে দেখে যাব__, বলতে-বলতে উঠে পড়ল। তারপর আচমকা 
কী মনে পড়তেই পকেটে হাত পুরে একতাড়া নোট বার করে জোহনের বালিশের তলায় গুঁজে 
দিয়ে বলল, 'শ' দেড়েক আছে। দরকার হলে পরে আবার দিয়ে যাব।' 

ইফতিকার সাহেব তার ব্যান্ডপার্টির অন্য দুই বাজনদার স্টিফেন আর আবদুলকে নিয়ে চলে 
গেল। 

গিল্ডার বলল, 'আমিও এবার যাই। বলেই সোমবারির দিকে ফিরল, “ফুলুটবালাকে একটু 


১০০ পাঁচটি উপন্যাস 


দেখো, ঠিক সময়ে ওষুধ খাইয়ে দিও। ও শালা যা শরাবি, নজর রেখো। উঠে গিয়ে যেন আবার 
ভাটিখানায় না ঢোকে।' 
হলে সোমবারিই দেখাশোনা করে থাকে। 

সোমবারি ঠোট কামড়ে বলল, “আমি কেন, ফুলুটবালার ঘরে ওষুধ খাওয়াবার লোক তো 
আছে__' চোখের কোণ দিয়ে মেরিকে দেখিয়ে দিল সে। 

একটু থতিয়ে গেল গিল্ডার। দ্রুত একবার মেরিকে দেখে নিয়ে বলল, “ও, তাহলে তো-_ 
আচ্ছা, ঠিক আছে। রাত হল, আমিও যাই।” সে চলে গেল। 

ঘরের ভেতর এখন জোহন, মেরি এবং সোমবারি ছাড়া আর কেউ নেই। সোমবারি 
উত্তরপ্রদেশের মজাদার অল্লীল একটা ছড়া কেটে চোখ নাচিয়ে বলল, “তোমরা কিন্তু বেশ লাগিয়েছ 
ফুলুটবালা__ 

দুর্বল গলায় জোহন জানতে চাইল, “কী লাগিয়েছি? 

“একবার তোমার মেরি জখম হয়ে আসছে, একবার তুমি জখম হয়ে আসছ। মেরিকে আমি 
দেখাশোনা করেছি। মেরি এবার তোমার দেখাশোনা করুক। রোজ-রোজ নিজের ঘর-সংসার ফেলে 
আমি তোমার ঝোপড়িতে এসে বসে থাকতে পারব না।' বলতে-বলতে একটু থামল সোমবারি। 
পরক্ষণে নিজের স্বামীর কথা তুলে আবার শুরু করল, “যাই, জুয়াড়িটা সাট্টা-ফান্টা খেলে এতক্ষণে 
নিশ্চয়ই ঘরে ফিরে এসেছে। সে যা-ই হোক, শরাবি-ফরেবি-জুয়াড়ি, তবু তো আপনা মরদ, ঘরবালা। 
তাকে দানাপানি দিতে হবে।' সোমবারি চলে গেল। 

কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপর মেরি বলল, “তোমার জন্যে ভাবী দুধ কিনে রেখে গেছে। খেয়ে 
ঘুমিয়ে পড়ো।' 

জোহন কিছু বলল না। 

ওধারে সেই সম্তা টেবিলটার ওপর প্লাস্টিকের একটা মগে দুধ ছিল। কেরোসিনের স্টোভ 
ধরিয়ে সেই দুধটা গরম করে জোহনকে খেতে দিল মেরি। খাওয়াবার পর বলল, তুমি আমাকে 
ফাসিয়ে দিলে ফুলুটবালা ?' 

জোহন জানতে চাইল, “কীরকম?, 

“ভেবেছিলাম কাল সকালে চলে যাব। আর তোমার ঘাড়ে বসে থাকব না। কিন্তু তুমি যা 
কান্ড বাধিয়ে এলে তাতে যাই কী করে? 

জোহনের ক্লান্ত, নিবি চোখ জোড়া পলকের জন্য চকচকিয়ে উঠল, “তোমাকে কে যেতে 
বলছে? 

দ্রুত ঘাড় ফেরাল মেরি। একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর চাপা গলায় বলল, 
“থেকে যেতে বলছ? 

হা 

“কদ্দিন?' 

“তোমার যদ্দিন ইচ্ছে। 

“কোথাও থাকতে পেলে তো আমি বেঁচে যাই। কিন্তু-_' মেরিকে খুবই বিধাধিত দেখাল। 

কী? আস্তে করে জিগ্যেস করল জোহন। 

মেরি একটু চুপ করে থেকে বলল, 'তোমাকে তো বলেছি আমি খারাগ মেরে 

“ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। 

“তাছাড়া আর-একটা কথা-_হুট করে আমি তোমার কাছে এলাম, থাকছি, লোকে কী বলবে? 

*ঝোপড়পত্রির লোকেদের এ-সব নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় নেই।' 


হঠাৎ বসত ১০১ 


কিছুক্ষণ চুপ। তারপর মেরি হঠাৎ বলল, “আগে তুমি ভালো হয়ে ওঠ। তারপর ভেবে 
দেখব কী করা যায়।' 

জোহন উত্তর দিল না। 

মেরি কী চিস্তা করে বলল, “আমি যখন জখম হয়েছিলাম ঘরে শুয়েছি; তুমি শুয়েছ বাইরে। 
তোমার তো এখন নড়াচড়ার সাধ্যি নেই। আমি বাইরে শুতে যাচ্ছি।' 

'না-না, তুমি মেয়েমানুষ; খোলা বারান্দায় শোওয়া ঠিক না। 

“তাহলে % 

জোহন চোখ-কান বুঁজে বলে ফেলল, “তুমি এই ঘরেই থাকো, নীচে বিছানা করে নাও ।' 


সেই যে জোহন জখম হয়ে এসেছিল, সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে তার বেশ সময় লেগে গেল। 
এই অবস্থায় তাকে ফেলে মেরির পক্ষে চলে যাওয়া সম্ভব হল না। যে লোকটা একদিন রাস্তা থেকে 
তার রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত শরীর তুলে এনে প্রাণে বাঁচিয়েছে, তাকে এভাবে ফেলে যাওয়া যায় না। 

যাই হোক কোনদিনই নিয়ম-টিয়মের ধার ধারে না জোহন। আজ বেলা বারোটায় খেল, 
তো কাল খেল বিকেল পাঁচটায়, পরশু হয়তো খেলই না আর খাওয়াটাও কি রোজ একরকম জোটে! 
একদিন উদ্দিপিদের লাঞ্চ হোমে খেলে, পরের দিন সে ইরানি কিংবা পাঞ্জাবিদের হোটেলে গিয়ে 
ঢোকে, তার পরের দিন হয়তো যায় গুজরাতিদের শাকাহারী ভোজনালয়ে। মোট কথা, তার যে- 
ধরনের কাজ, তাতে জীবনটাকে ঠিকঠাক নিয়মে বাঁধা যায় না। যতরকম অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা 
থাকতে পারে, তার মধ্যে দিয়ে জীবনের অনেকগুলো বছর কেটে গেছে জোহনের। তা ছাড়া আরও 
একটা ব্যাপার আছে, ওষুধ-টোধুধ খেতে চিরদিনই তার দারুণ আপত্তি। 

কিন্ত তার আপত্তি শুনছে কে? ডাক্তার গিল্ডার যেমন-যেমন বলে গেছে, ঠিক সেইভাবে 
ঘড়ির কাটা ধরে গাদা-গাদা ট্যাবলেট আর মিক্সচার খাইয়ে যাচ্ছে মেরি। শুধু কি তাই, সকাল সাতটায় 
দুধ আর পাও, বারোটায় উদিপি হোটেলের অর্ধেক ভাত, অর্ধেক পুরি, বিকেল চারটেয় ফল আর 
দুধ, রাত্রি নপ্টায় উদিপি হোটেলের চাপাটি তরকারি খেতে হচ্ছে 

এত নিয়মে চলা জোহনের ধাতে নেই। তার প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। 
কিন্ত আপত্তি করলেই কখনও বালিকা-বধূর মতো গাল ফুলিয়ে, কখনও বহুকালের অভিজ্ঞ ঝানু 
হাউস-ওয়াইফের মতো ধমকে -ধামকে খাইয়ে যাচ্ছে মেরি। এরকম শেকলে বাঁধা থাকার জন্য খুবই 
অস্বস্তি হচ্ছে জোহনের। তবু ভালোই লাগছে ব্যাপারটা । তার জীবনে এটা একেবারে নতুন। মেরির 
মতো এভাবে রাগ বা অভিমান করে কিংবা ছেলে-ভুলনোর মতো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে গভীর মমতায় 
কেউ তাকে কাছে বসিয়ে কখনও খাওয়ায় নি। মেয়েটা বিলকুল তার ক্যারেক্টার খারাপ করে দিচ্ছে। 

এরই মধ্যে দিনে তিনবার করে সোমবারি আসছে। চোখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে একবার মেরিকে 
দেখে সে, আর-একবার দেখে জোহনকে। তারপর উত্তরপ্রদেশের অশ্লীল একটি ছড়া কেটে বলে, 
“ভালোই চালাচ্ছ ফুলুটবালা।' বলেই একচোখ বুঁজে, ঠোট কামড়ে, হাসতে-হাসতে চলে যায়। 

ইফতিকার সাহেবও রোজ একবার করে আসে । তবে তার আসার নির্দিষ্ট সময় নেই। কোনও- 
কোনও দিন সকালের দিকে আসে সে, কোনওদিন বা বায়না অনুযায়ী ব্যান্ড বাজাবার পর মাঝ 
রান্তিরে এসে হাজির হয়। তাকে কাছে বসিয়ে জোহন বলে, 'আজ কোথায় বাজাতে গিয়েছিলে? 

ইফতিকার সাহেব বলে, 'যোগেশ্বরীতে। এক গুজরাটি শেঠের মেয়ের সাল-গিরা (জন্মদিন) 
ছিল।' 


“আজকাল সাল-গিরাতেও ব্যান্ডপার্টিও ডাকছে নাকি? জোহন অবাক হয়। 
চড়বড়িয়ে একনাগাড়ে খানিকক্ষণ খিস্তি করল ইফতিকার সাহেব। খিস্তিটার কোনও কারণ 


১০২ পাঁচটি উপন্যাস 


বা গুরুত্ব নেই। ওটা তার কথার মাত্রা। খিস্তি-ফিস্তির পর জানালা দিয়ে পিচিৎ করে পানের পিক 
ফেলে এসে বলল, “বিয়ে শাদি, ভোটের রিজাল (রেজান্ট), এসব তো আছেই। মানুষ মরে গেলেও 
এখন সামনে-পেছনে ব্যান্ড বাজিয়ে গোরস্থানে কি শ্মশানে নিয়ে যাবে। একটু থেমে আবার বলল, 
“এরপর দেখবি বড়লোকদের পেচ্ছাপ পেলেও ব্যান্ডওলাদের ডাক পড়বে।' 

জোহন অন্যমনক্কের মতো বলল, “হাঁ । আচ্ছা চাচা, আমার জায়গায় এখন কে ফুলুট 
বাজাচ্ছে? 

“আসলাম ।' 

কে আসলাম? “নৰি ব্যান্ডপার্টি'-র সেই দুব্লা পাতলা ছোকরাটা নাকি? 

হ্ঁ। তুই নেই, কাজ চালাবার জন্যে ওকে ধার করে এনেছি।' 

“কীরকম বাজাচ্ছে? 

“শালে হারামি কী বাজাবে! “নবি ব্যান্ড'-এর ব্যান্ডমাস্টার মুবিন নবি নিজে কিছু বাজাতে 
জানে যে ওর দলের লোক বাজাবে! ঢল নামানোর মতো একগাদা খিস্তি করে ইফতিকার সাহেব 
বলল, "তুই জখম হয়ে বিছানায় পড়ে আছিস; ওকে ঠেকা দেবার জন্যে আনতে হল। নইলে ওর 
যা বাজনা, ওতে আমি পেচ্ছাপ করে দিই। ছোঃ-_" বলেই আবার পানের পিচ ফেলে এল! 

জোহন বলল, “জখম হয়ে তোমাকে ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি, তাই না চাচা 

“তা একটু ফেলেছিস। কিন্তু ও-নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। মেহেরবানি করে তাড়াতাড়ি 
সেরে ওঠ। তুই খাড়া হলে আমি বেঁচে যাই।” বলতে-বলতে একটু থামে ইফতিকার সাহেব। তারপর 
আবার বলে, “তুই যা হারামি, গাধ্ধেকা পাঠ্‌ঠে, ঠিকমতো ওষুধ-টোযুধ খাচ্ছিস£' 

মেরিকে দেখিয়ে দিয়ে জোহন বলে, “এর পাল্লায় পড়েছি, না খেয়ে উপায় আছে! লাইফ 
একেবারে আসিড করে দিচ্ছে।' 

এতক্ষণ যেন মেরিকে দেখতে পায়নি ইফতিকার সাহেব। চোখের কোণ দিয়ে দ্রুত একপলক 
তাকে দেখে মুখটা জোহনের কানের কাছে নিয়ে এল সে। চাপা গলায় বলল, “ওহী লড়কি£ 

হা, 

“এখনও আছে?' 

ঘাড় চুলকোতে-চুলকোতে জোহন বলে, 'হা। 

ইফতিকার সাহেব বলল, “বিলকুল জমে গেছিস মনে হচ্ছে। শালে শুয়ারকা বাচ্চা, ছোকরি 
যখন তোর ঝোপড়িতে ঢুকেই পড়েছে, আর ছাড়িস না।' বলেই ঝট কর খাড়া হয়ে সে মেরিকে 
বলল, “এ চিটমবাজ ছোকরি__' চিটমবাজ কথাটার কী অর্থ একমাত্র ইফতিকার সাহেবই বলতে 
পারবে! খিস্তি-টিত্তির ব্যাপারে নতুন কিছু-কিছু শব্দ সে উদ্ভাবন করেছে। মানে থাক বা না-ই থাক, 
কথায়-কথায় সেগুলো সে অনর্গল বলে যায়। 

মেরি ভয়ে-ভয়ে তাকিয়ে বলে, “কী বলছেন? 

“জোহন শালেকে জলদি সারিয়ে তোলো। যদি সাতদিনে সেরে ওঠে, তোমাকে একটা দারুণ 
তওফা ডেপহার) দেব।' 

বলেই চোখের তারা দুটো দ্রুত একবার এ-কোণে, একবার ও-কোণে নিঘে জোহন আর 
মেরিকে দেখে নিল। 

মেরি উত্তর দিল না। 

ইফতিকার সাহেব আবার বলল, “আর এখানে এসে যখন একবার ঢুকেছ, এখানেই জমে 
যাও। সমবী?' 

মেরি এবারও চুপ। 

ইফতিকার সাহেব বলতে থাকে, 'অনেক রাত হল। ট্যাক্সি ধরে এখন আমাকে কোলাবা 


হঠাৎ বপত্ত ১০৩ 


ছুটতে হবে। বারোটার সময় সেই আওরতটার কাছে পৌঁছনোর কথা।' বুক পকেট থেকে চেনে- 
বাধা ঢাউস-পকেট ঘড়িটা বার করেই আঁতকে উঠল ইফতিকার সাহেব, “আরে বাপ, পৌনে বারোটা 
বাজে। আমার বারো বাজ গিয়া। আজ বাকি রাত মাগিটা জরুর আমাকে দরজার বাইরে ফেলে 
রাখবে। যাই রে, কাল আবার আসব।” যাবার আগে মেরির থুতনিতে টোকা দিয়ে বলে যায়, “চিটমবাজ 
ছোকরি, আমার কথাটা ইয়াদ রাখিস, 


সোমবারি বা ইফতিকার সাহেবই না, সোমবারির ঘরবালা জুয়াড়ি রেসুড়ে আজবলাল, ডাক্তার 
গিল্ডার, “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র সেই ফল্স্‌ বাজনদার ছোকরা হাবিব এবং ঝোপড়পন্রির অন্যান্য 
লোকজনও জোহনের খোঁজখবর নিতে আসে। 

দিন কয়েকের মধ্যে অনেকটা ভালো হয়ে উঠল জোহন। তবে প্রচুর রক্তপাতের ফলে শরীরটা 
এখনও বেশ দুর্বল। একটু চললে ফিরলেই মাথা ঘোরে। নাকে-মুখে এবং মাথায় ব্যান্ডেজটা আছেই। 
গিল্ডার বলে গেছে এখনও অস্তত পনেরো দিন তার ঘর থেকে বেরুনো চলবে না। 

এখন সকাল সাতটার মতো বাজে । দড়ির খাটিয়ায় নিজের বিছানাটার ওপর বসে ছিল জোহন। 
নীচে বসে একটা আযালুমিনিয়ামের বাটিতে দুধ গরম করছিল মেরি। হঠাৎ সে বলল, “এভাবে আমার 
ভালো লাগছে না।' 

একটু অবাক হয়েই জোহন তাকাল। মেরি কী বলতে চায় সে বুঝতে পারছে না। 

মেরি আবার বলল, “রোজ-রোজ উদিপিদের হোটেল থেকে খাবার দিয়ে যাচ্ছে, এর কোনও 
মানে হয়? 

জোহন বলল, “উদিপিদের খাবার তোমার ভালো না লাগলে এক কাজ করি। একটু দূরে 
একটা খালসা হোটেল আছে। তাদের বরং খাবার দিয়ে যেতে বলি।, 

“আমি কী বললাম আর তুমি কী বুঝলে! হোটেল থেকে কিছু আনতে হবে না।' 

জোহন বিমূঢের মতো জিগ্যেস করল, “তা হলে? 

মেরি বলল, “কাজ নেই, কর্ম নেই, দিনরাত হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকে বাতে ধরে গেল? 

“কী করতে চাও?' 

তক্ষুনি উত্তর দিল না মেরি। একটু চুপ করে থেকে বলল, “কোরোসিন স্টোভ তো আছেই। 
আমাকে হাঁড়ি-কড়া আর দু-একটা বাসন-কোসন কারোকে দিয়ে কিনিয়ে দাও না। টাকা-পয়সা দিলে 
আমিও কিনে আনতে পারি।' 

একটু অবাক হয়ে জোহন বলল, “রান্নাবান্না শুর করবে নাকি 

কত আর বেকার বসে থাকা যায়!' 

সতি-সত্যিই জোহনকে দুধ-পাও এবং ওষুধ খাইয়ে কিছু টাকা চেয়ে নিয়ে তিন মাইল দূরের 
খারের বাজার থেকে বাসন-কোসন, প্লাস্টিকের বালতি, চাল-ডাল আর কিছু সবজি কিনে আনল 
মেরি। খানিকক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে কোমরে শক্ত করে শাড়ি জড়িয়ে, প্রথমে ঝোপড়পষ্টির মাঝখানের 
সেই কলটা থেকে জল নিয়ে এল। তারপর সামনের ঘেরা বারান্দাটার একধারে কেরোসিনের স্টোভ 
ধরিয়ে রান্না চড়িয়ে দিল। 

দড়ির খাটিয়ায় বসে অবাক চোখে দেখেই যাচ্ছে জোহন, দেখেই যাচ্ছে, আর যত দেখছে 
বিম্ময়টা ততই বেড়ে যাচ্ছে। কুডি-বাইশটা বছর ঝোপড়পট্রির এই ঘরে কেটে গেল তার। কিন্তু 
এই দৃশ্যটা জোহনের কাছে একেবারে নতুন এবং চমকপ্রদও। কোনও মেয়ে তার ঘরে এসে এভাবে 
রেঁধে-বেড়ে খাওয়াবে, কোনওদিন সে এসব ভেবে দেখেনি। 

ঘণ্টাখানেকের মধ্যে রান্না হয়ে গেল মেরির। ভাত-ডাল ইত্যাদি বাটি এবং ডেকচিতে করে 


১০৪ পাঁচটি উপন্যাস 


ঘরের ভেতর এনে রাখল মেরি। স্টোভটা নিভিয়ে দিয়েছে; আপাতত সেটা বারান্দাতেই থাকল। 

হাতের কাজ-টাজ শেষ করে মেরি জোহনের দিকে তাকাল। তার কপালে এবং গলায় দানা- 
দানা ঘাম জমেছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছতে-মুছতে একটু হাসল সে। বলল, “ডেকচি-কটোরা, 
থালা-গেলাস কিনে তোমার অনেক খরচ করিয়ে দিলাম।' 

জোহন জখম হয়ে আসার পর, বেশ কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিল ইফতিকার সাহেব। তার 
থেকে ষাট-সন্তরটা টাকা খরচ করেছে মেরি। যোহন বলল, “আরে না-না-_- 

মেরি বলল, "খরচ তোমার একদিনই একটু বেশি হল। তারপর দেখবে ঘরে রান্না করে 
খেলে হোটেলের চাইতে ঢের সস্তায় হবে? 

“আমার পয়সা বাঁচাবার জন্যে বুঝি তোমার ঘুম হচ্ছিল না? 

তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ। তোমার কথা আমার তো একটু ভাবতেই হবে।' 

ঠিক এরকম স্পষ্টাম্পষ্টি জবাব আশা করেনি জোহন। তবু তার ভালোই লাগল। 

মেরি আবার বলল, “ঠিক পয়সা বাঁচাবার জন্যে নয়; আসলে আমার একটা কাজ তো দরকার। 
দেখ তো কণ্টা বাজে? 

জোহন যেখানে বসে আছে তার বাঁ-পাশের ছোট জানালা দিয়ে দূরে একটা গির্জার মাথায় 
টাওয়ার-ক্ুক দেখা যায়। চট করে ঘড়িটা একবার দেখে নিয়ে জোহন বলল, “বারোটা বাজতে দশ 
মিনিট__” 

মেরি ব্যস্ত হয়ে উঠল, “বারোটায় তোমার খাবার সময়। যাই, চানটা সেরে আসি-_' বলেই 
কোণের দিকে টাঙানো দড়িটা থেকে একটা বিছানার চাদর আর বড়সড় পুরোনো একটা তোয়ালে 
নিয়ে কাধে চাপাল। 

হঠাৎ জোহনের মনে পড়ে গেল, মেরি যে শাড়ি-ব্রাউজ পরে আছে সেগুলো ছাড়া তার 
আর বাড়তি পোশাক নেই। যেদিন রাস্তা থেকে তাকে তুলে এনেছিল, সেদিনও এগুলোই তার গায়ে 
ছিল। একটা শাড়ি আর একটা ব্লাউজ দিয়ে 'দিনের-পর-দিন চালানো যায়? তা ছাড়া ওগুলোর যা 
হাল! রক্তের দাগড়া-দাগড়া ছোপ লেগে রয়েছে। জোহন লক্ষ্য করেনি। তবে তার মনে হল, মেয়েটা 
চান-টান করে বিছানার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বসে থাকে; তারপর শাড়ি শুকোলে পরে নেয়। 
এত কষ্ট করার কোনও মানে হয়! সে বলল, “তুমি কী বলো তো! 

মেরি হতভম্বের মতো বলল, “কী আমি!” 

“খারে গিয়ে গোটা বাজারটাই কিনে আনলে। আর আসল জিনিসটাই আনতে ভুলে গেলে? 

“মানে? 

“নিজের জন্যে শাড়ি-ব্লাউজ তো কিনে আনবে । আমার ঘরে কি মেয়েমানুষ আছে যে এসব 
ব্যাপারে আমার হুশ থাকবে; তোমাকে কিনতে বলে দেবার কথা কি “আমার মাথায় ছিল? এক 
শাড়ি এক ব্লাউজে কি চালানো যায়।, 

মেরি জানালো, নতুন শাড়ি-টাড়ি কেনবার দরকার নেই। কিং সার্কেল স্টেশনের গায়ে যে 
ঝোপড়পট্রিটা, সেখানে তার অনেক জামাকাপড় রয়েছে। সে ভেবেই রেখেছিল একটু ভালো হয়ে 
উঠলে তার জিনিসপত্র নিয়ে আসবে। আজ তো জোহন অনেকটা সুস্থ, আজই দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার 
পর সে কিং সার্কেলে যাবে। 

পৃথিবীর কোনও কিছু সম্বন্ধে বিশেষ টান বা আকর্ষণ বোধ করে না জোহন। তবু এই মুহূর্তে 
তার মনে হল, বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে যাচ্ছে। সে বলল, “তুমি ফিরে আসবে তো? 

তার বলার ভঙ্গিতে উদ্বেগের মতো কিছু একটা জড়ানো। 

মেরি হাসল, “তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ; তোমাকে এভাবে ফেলে আমি পালাব না। তবে 
তুমি একেবারে ভালো হয়ে গেলে আর থাকা কি ঠিক হবে?” 


হঠাৎ বসস্ত ১০৫ 


জোহনের চোখ এবার চকচকিয়ে ওঠে । সে বলল, “তখনকার কথা তখন ভাবা যাবে। যাও, 
চান করে এসো। 

মেরি চলে গেল। কিছুক্ষণ বাদে বেড কভারে গা ঢেকে ফিরে এল সে। ভেজা শাড়ি আর 
জামাটা শুকোতে দিয়ে চুল-টুল আচড়ে জোহনকে খেতে দিল। 

খাবারের আয়োজন সামান্যই। ভাত, আমটি টেক ডাল), কিছু ভাজা-টাজা আর পাঁপড়। 

জোহন মনে করতে পারছে না, কেউ কখনও এভাবে নিজের হাতে রেঁধে-টেধে কাছে বসে 
তাকে খাইয়েছে কি না। বাবা বেঁচে থাকতে ডক ইয়ার্ড রোড স্টেশনের গায়ের সেই ঝোপড়পট্রিটায় 
যখন তারা থাকত তখন কচড়া জ্বালিয়ে বেশিরভাগ দিন তাকেই রীধতে হয়েছে। বাবা মরে গেলে 
পাঞ্জাবি-গুজরাতি-সিদ্ধি-ইরানি-উদিপি নানা জাতের হোটেলে খেয়ে-খেয়েই তিরিশ-বত্রিশটা বছর 
কাটিয়ে দিল সে। নিজের ঘরে বসে একটি যুবতী মেয়ের রান্না ভাত-সবজি সে কোনওদিন খেতে 
পাবে, কখনও কি তা ভাবতে পেরেছিল! অদ্ভুত এক আবেগ ফুটস্ত দুধের মতো বুকের ভেতর উথলে- 
উথলে উঠতে লাগল জোহনের। 

মেরি বলল, “কি হল, চুপচাপ বসে কেন? খাও-_' 

জোহন গাঢ় গলায় বলল, “হা, খাচ্ছি। বলেই আমটির বািটা ভাতের ওপর ঢেলে দিল। 

মেরি এবার বলল, “তোমার হোটেলে খাওয়া অভ্যেস; আমার রান্না নিশ্চয়ই ভালো লাগবে 
না।' 

ভাত মুখে দিয়ে জোহন বলল, “কোন শালে বললে ভালো লাগবে না! ফাইন রেঁধেছ। তোমার 
হাত দুটো চব্বিশ ক্যারেট সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে।” 

মেরি খুবই আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করছিল। খুশিতে তার মুখটা ঝকমকিয়ে উঠল। কিছু না 
বলে একটু লাজুক হাসি হাসল সে। হোটেলে এর চাইতে অনেক ভালোই খায় জোহন। কিন্তু মেরির 
এই রান্না, কাছে বসিয়ে খাওয়ানো উদিপি হোটেলের গাদা-গাদা লোকের ভিড়, ভনভনে হট্টগোল 
কিংবা বয়দের ছোটাছুটি আর দায়সারা সারভিসের ভেতর পাওয়া যায় না। খুব ভালো লাগছে তার, 
খুবই ভালো লাগছে। 

জোহনের খাওয়া হয়ে গেলে নিজেও খেয়ে নিল মেরি। এর মধ্যে তার শাড়ি-টাড়ি শুকিয়ে 
গিয়েছিল। বারান্দার কোণে গিয়ে বেড-কভার ছেড়ে শাড়িটা পরে নিল। তারপর ঘরে এসে জোহনকে 
বলল, “আমি তা হলে কিং সার্কেল থেকে ঘুরে আসি 

জোহন ঘাড় কাত করল, “আচ্ছা 

ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই একটা ঢাউস কাপড়ের ব্যাগে যাবতীয় জামাকাপড় এবং অন্যান্য 
টুকিটাকি জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে এল মেরি। 


সেই যে মেরি রান্না-বান্না শুরু করেছিল, এখন সেটা দু-বেলাই চালিয়ে যাচ্ছে। ভোরে উঠে 
প্রথমেই সে ঘর-টর পরিষ্কার করে ফেলে। তারপর ঝোপড়পষট্রির কল থেকে জল নিয়ে আসে। 
এসেই আধ মাইল দূরে মিক্ক বুথ থেকে, দুধ আর বাজার থেকে পাও কিনে আনে । তারপর দুধ- 
টুধ গরম করে জোহনকে খেতে দেয়, নিজেও এক কাপ চা করে খেয়েই ছোটে খারের বাজারে। 
তবে বাজারে সে রোজ যায় না; একদিন অস্তর যায়। যেদিন বাজারে যায় সেদিন ফিরে এসে খানিকক্ষণ 
জিরিয়ে রান্না চাপায়। যেদিন যায় না সেদিন টুকিটাকি ঘরের কাজ সেরে কিংবা জোহন ও তার 
ময়লা কাপড়-চোপড় কাচাকাচি করে রীধতে বসে। 

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বড় জোর ঘণ্টাখানেক শুয়ে নেয় মেরি। তারপরেই আবার স্টোভ 
ধরিয়ে এটা-সেটা করে জোহনকে খাওয়ায়। সন্ধে হতে-না-হতেই আবার রাতের খাবার তৈরি করতে 


প্রফুল্ল রায় পাঁচটি উপন্যাস-_-১৪ 


১০৬ র্পীচটি উপন্যাস 


বসে। নণ্টা বাজতে-না-বাজতেই জোহনকে খাইয়ে জোর করে শুইয়ে দ্যায়। 

জোহন অবাক চোখে মেয়েটাকে শুধু দেখেই যাচ্ছে, দেখেই যাচ্ছে। মেরি তাকে বলেছে, 
সে খুবই বাজে মেয়ে। এই বন্ধে শহরে কোলাবা থেকে বোরিভিলি পর্যস্ত যে কয়েক হাজার বেশ্যা 
পোকার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে__মেরি তাদেরই একজন। সে একটা নোংরা ফ্লাইং প্রস্টিটিউট। যত 
রাজ্যের বদমাশ-লম্পট-গুন্ডার সঙ্গে তার নাকি কারবার। কিস্তু এই মেয়েটা যে রীধে-বাড়ে এবং 
পরম মমতায় জোহনকে খাওয়ায়, তার সঙ্গে শরাবি-ফরেবিদের সঙ্গিনী বেশ্যা মেরির আদৌ কোনও 
মিল নেই। ঝোপড়পট্রির পেটা টিন আর প্যাকিং বাক্সের এই ঘরটায় একটু-একটু করে গভীর আবেগে 
একটা সংসারের ছাদ ফুটিয়ে তুলছে সে। 

জোহনের ভালোই লাগছে। তার জীবনে এ-এক নতুন এবং আশ্চর্য অভিজ্ঞতা । এক-এক 
সময় জোহন ভাবে সে পুরোপুরি সুস্থ হলে মেয়েটা হয়তো চলে যাবে। তাকে চিরকাল তো আর 
আটকে রাখা যাবে না। তবু যঙ্গিন থাকে এই নোংরা জঘন্য গন্ধা ঝোপড়পষ্টরিতে সে নিজের মনে 
ফুল ফুটিয়ে যাক। 

দেখতে-দেখতে আরও দিনসাতেক কেটে গেল। জখম হয়ে আসার পর জোহন তার দড়ির 
খাটিয়াটায় শুতো, আর মেরি নীচে বিছানা পেতে নিত। কিন্তু জোহন এখন অনেক সুস্থ। দু-তিন 
দিন ধরে রাত্রিবেলা সে বাইরের বারান্দায় শুচ্ছে, মেরি থাকছে ঘরে। 

মেরির অবশ্য এতে খুবই আপত্তি। সে বলেছে, “এটা কী হচ্ছে ফুলুটবালা!" 

ঝোপড়পট্ির অন্য সবার দেখাদেখি আজকাল জোহনকে সে ফুলুটবালাই বলে থাকে। 

জোহন হেসে-হেসে বলেছে, “ঠিক আছে, ঠিক আছে।' 

“দেখ ফুলুটবালা, তোমার এখানে আসার আগে এই বন্ধে শহরের কয়েক হাজার লোকের 
সঙ্গে এক বিছানায় রাত কাটাতে হয়েছে আমাকে। তুমি আর আমি একঘরে থাকলে আমার গায়ের 
চামড়া অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।' 

ঠিক এই কথাগুলোই আরও একবার বলেছিল মেরি। কিন্তু হাজার আপত্তি বা জোর করেও 
রাত্রিবেলা জোহনকে ঘরে শোওয়ানো যায়নি। 

যাই হোক, এরই মধ্যে একদিন দুপুরের দিকে ইফতিকার সাহেব আর সেই ফল্স্‌ বাজনদার 
ছোকরা হাবিব এসে হাজির। ইফতিকার সাহেব মাঝখানে বেশ কয়েকদিন আসেনি। খুব সম্ভব নানা 
জায়গায় বাজাতে গিয়ে আসার সময় করে উঠতে পারেনি। 

মেরি তখন বারান্দায় বসে রান্না করছিল। কোমরে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ তাকে ঘুরে-ফিরে 
দেখল ইফতিকার সাহেব। দেখতে-দেখতে একচোট বগবগিয়ে হাসল। তারপর আচমকা এক হ্যাচকায় 
হাসিটা থামিয়ে দিয়ে গমগমে গলায় বলে উঠল, “বাহ্‌, বহুত আচ্ছা 

ক'দিন যাতায়াতের ফলে মেরির সঙ্গে তার ভালোই আলাপ হয়েছে। মেরি বুঝে ফেলেছে 
লোকটা আমুদে, হাসিখুশি আর দারুণ মজাদার। ঘাড় ফিরিয়ে সে বলল, “কী বহুত আচ্ছা? 

ইফতিকার সাহেব বলল, “এই যে রান্না করে ওই শালেকে খাওয়াচ্ছিস। আজ মেরিকে “তুই' 
করেই বলতে শুরু করে দিল সে, “চিটমবাজ ছোকরি, চালিয়ে যা টমটম, চালিয়ে যা-_ 

মেরি হাসতে-হাসতে বলল, “দেখা যাক।' 40555455055958585 
“এবার কিন্তু তুমি অনেকদিন পর এলে চাচা। 

ইফতিকার সাহেব বলল, 'হী, রোজ সকাল থেকে মাবারাতির অলি দু-শিফটে বাজাতে হয়েছে। 
আসি কী করে? সেই গাধ্ধে কা পাঠঠেটা কোথায়? 

এই মধুর সম্ভাষণটা কার উদ্দেশ্যে মেরি বুঝতে পারল। বলল, “যাও, ঘরেই আছে। চা আর 
পকোড়া নিয়ে যাচ্ছি। 

ঘরে গিয়ে ঢুকল ইফতিকার সাহেব। তার পিছু-পিছু ছুঁচের পেছনে সুতোর মতো হাবিবও। 


হঠাৎ বসস্ত ১০৭ 


ঘরে ঢুকেই চড়বড়িয়ে মিনিট তিনকে খিস্তি দিয়ে গেল ইফতিকার। তারপর জানলা দিয়ে পানের 
পিচ ফেলে এসে বলল, “এখন কেমন আছিস? 

জোহন বলল, “অনেক ভালো।" 

“তা তো দেখতেই পাচ্ছি। ছোকরিকে নিয়ে রোল্স্‌ রয়েস চালিয়ে যাচ্ছ। 

কিন্তু চাচা, একটা ঝামেলা হয়েছে। ক'দিন ধরে গলায় এক ফোটা ঠার্রা পড়ছে না। জিভ- 
টিভ শুকিয়ে ঝামা হয়ে আছে। 

“শালে উল্লু-কা-বান্দর! ঠিক আছে, তোর ঠার্রার বন্দোবস্ত করে যাব। লেকিন আমার কী 
হবে? কবে বাজাতে আসছিস?, 

জোহন কী বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই আরেক প্রস্থ খিস্তি দিয়ে ইফতিকার সাহেব আবার 
যা বলল তা এইরকম-_নবি ব্যান্ড'-এর সেই ক্লারিওনেটওলাকে কাজ চালাবার জন্য ডেকে এনে 
দলের মান ইজ্জত ডুবতে বসেছে। শালার কলিজায় না আছে দম, গলায় না আছে সুর। সে একটা 
ফুঁ দিলে ক্ল্যারিওনেট থেকে একসঙ্গে বাইশ রকম আওয়াজ বেরোয়। এই নিয়ে তিন চার জায়গায় 
যা-তা কাণ্ড হয়ে গেছে। কাস্টমাররা দলের পাওনা টাকা থেকে টাকা কেটে নিতে চেয়েছে। কাটার 
কথাই। নগদ পয়সা দেবে; বাজনা খারাপ হলে তারা ছেড়ে দেবে কেন? তিন-চার জায়গায় খিস্তি 
করে-করে কাস্টমাররা তার বাপ-মা-চোদ্দো-পুরুষকে জীহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা কি ইফতিকার 
সাহেবের বাপের সম্বন্ধী না ভায়রাভাই, যে যা বাজাবে তাতেই তাদের মেজাজ তর হয়ে যাবে! 
এখন মেহেরবানি করে জোহন যদি বাজাতে যায় তো দলের মুখরক্ষা হয়। আর সে গেলেই “নবি 
ব্যান্ড-এর ওই গাধ্ধেকা পাঠঠের পাছায় গুনে-গুনে বারোটা লাথি হাঁকিয়ে ভাগিয়ে দেবে। 

সব শুনে চুপ করে রইল জোহন। কেন না আজই সকালে ডাক্তার গিল্ডার এসে বলে গেছে, 
আরও আট-দশ দিন তার বেরুনো চলবে না। ক্ল্যারিওনেট বাজানো খুবই পরিশ্রমের কাজ। ফুসফুস 
থেকে হাওয়া বের করে একনাগাড়ে সাত-আট ঘণ্টা বাজাতে হলে মাথার দুর্বল শিরাগুলো ছিড়ে 
যেতে পারে। কিন্তু ওদিকে “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র সুনাম যেতে বসেছে। 

ইফতিকার সাহেব এবার অসহিষুঃভাবে বলল, “কি রে, ক্রু দিয়ে মুখটা আটকে রাখলি যে। 
কিছু বলবি তো-_” 

জোহন খানিকটা ইতস্তত করে কীচমাচু মুখে গিল্ডারের কথাগুলো বলে একটু থামল। তারপর 
বলল, 'এখন তুমি আমাকে কী করতে বলো?” 

তিন মিনিট ধরে নতুন উদ্যমে তার স্বভাবসিদ্ধ খিস্তিটিস্তি করে ইফতিকার সাহেব বলল, 
'কুত্তাকে বক্রা, আমি একটা মানুষ না জানোয়ার__ আগে তাই বল? 

জোহন হকচকিয়ে গেল, 'কী বলছ চাচা!" 

কিন্ত কে কার কথা শোনে, ইফতিকার সাহেব চিৎকার করে সেই একই কথা বলে গেল। 
অর্থাৎ সে মানুষ না জানোয়ার, এই প্রশ্নটার উত্তর জোহনকে দিতেই হবে। জোহনকে স্বীকার করতেই 
হল, ইফতিকার সাহেব অবশ্যই একটা মানুষ, জানোয়ার নয়। 

ইফতিকার সাহেব এবার বলল, “আমি যদি মানুষই হই তোকে এই অবস্থায় যেতে বলতে 
পারি? যদ্দিন ডাক্তার তোকে বাজাতে না দিচ্ছে, তদ্দিন বাজাতে হবে না। এতে যদি আমার ব্যান্ডপার্টি 
উঠে যায় তো যাবে।, 

কৃতজ্ঞতায় চোখে প্রায় জল এসে গেল জোহনের। সে কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না। 

ওদের কথাবার্তার মধ্যেই একসময়. চা-পকোড়া দিয়ে গেল মেরি। 

আরও কিছুক্ষণ গল্পটল্ল করে জোহনকে গোটা পঞ্চাশেক টাকা দিয়ে একসময় উঠে পড়ল 
ইফতিকার সাহেব। যখনই সে আসে, কিছু টাকা দিয়ে যায়। 

একধারে চুপচাপ বসে ছিল হাবিব। ইফতিকার সাহেব তাকে বলল, চল আমার সঙ্গে। 


১০৮ পাঁচটি উপন্যাস 


তারপর জোহনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছোকরাকে নিয়ে গেলাম। আধঘণ্টার মধ্যে ওকে দিয়ে 
একটা জিনিস পাঠিয়ে দিচ্ছি। 

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বিমূঢটের মতো যোহন বলল, “কী জিনিস? 

'শালে গাধ্ধে কা পাঠুঠে। বলেই ঝপ করে গলার স্বরটা নামিয়ে দিল ইফতিকার সাহেব, 
“তখন বলছিলি না গলা শুকিয়ে ঝামা হয়ে গেছে। একটা ঠার্রার বোতল দরকার হবে না?' 

“চাচা তোমার জবাব নেই।' জোহন হাত বাড়িয়ে ইফতিকার সাহেবের কোমরটা জড়িয়ে 
ধরল। 

আলতো করে চুলের ঝুঁটি ধরে ঝীকিয়ে দিল ইফতিকার সাহেব। আদরের সুরে বলল, “কুত্তা 
কা বকরি! ছোড় শালে, ছোড়।” 

একটু পরে হাবিবকে নিয়ে চলে গেল ইফতিকার সাহেব। আধঘন্টা নয়, পুরো ঘণ্টা দেড়েক 
বাদে খবরের কাগজে মুড়ে একটা পেটমোটা ঠার্রার বোতল হাতে ঝুলিয়ে ফিরে এল হাবিব। এর 
মধ্যে জোহনদের খাওয়া-দাওয়া হয়ে গিয়েছিল। জোহন তার দড়ির খাটিয়াটায় শুয়ে জানলার ফাক 
দিয়ে দূরে ছবির মত ধূ-ধূ সমুদ্র দেখছিল; দিগন্তের ফ্রেমে আটকানো একটা নীল কাচের মতো 
সেটা পড়ে আছে। অগুনতি জেলে নৌকো, দু-চারটে স্পিড বোট-_যতদূর চোখ যায় কালো-কালো 
ফুটকির মতো ছড়িয়ে আছে। আর দেখা যাচ্ছে সি-গাল পাখিগুলোকে। ঝকঝকে নীলাকাশে দুপুরের 
ঝলমলে রোদ গায়ে মেখে পাখিগুলো দীড়ের মতো ডানা ছড়িয়ে দিয়ে বাতাস কেটে-কেটে উড়ছিল। 
মেরি বাইরের বারান্দায় তেরপলের একটা টুকরো পেতে শুয়ে পড়েছে। দিনের বেলাটা মেরি বাইরের 
বারান্দায় শোয়; তখন ঘরে থাকে জোহন। রাত্রে অবশ্য তারা জায়গা বদলে নেয়। এখন এটাই 
নিয়মে দীড়িয়ে গেছে। 

হাবিব ঘরে ঢুকে ঠার্রার বোতলটা জোহনের হাতে দিয়ে খাটিয়ার একধারে হাত-পা গুটিয়ে 
বসল। 

কাগজের মোড়ক খুলে বোতলটা বার করে সমন্নেহে হাত বোলাতে লাগল জোহন। জখম 
হয়ে ঝোপড়পন্টিতে ঢোকার পর এই প্রথম সে মদের বোতলের চেহারা দেখল। ঠার্রার অভাবে 
এ ক'দিন সে সাধু-মাহাত্বার জীবন যাপন করছিল। ইফতিকার চাচার দারুণ বিবেচনা; ঠার্রা বিহনে 
তার যে খুবই অসুবিধা হচ্ছে, সেটা ঠিকই ধরে ফেলেছে সে। এইজন্যে লোকটাকে তার এত ভালো 
লাগে। যাক, অনেকদিন বাদে আজকের সন্ধেটা জমবে ভালো। 

কিছুক্ষণ হাত-টাত বুলিয়ে বোতলটা খাটিয়ার তলায় রাখল জোহন। তারপর হাবিবের দিকে 
ফিরে বলল, “তোর খবর বল।' 

হাবিব বলল, “আমার সব খবরই তো তুমি জানো; নতুন কিছু নেই।' একটু থেমে আবার 
বলল, “চার টাকা মজুরি পাই; এতে কী হয় বলো। নিজে খাব, না বাড়িতে পাঠাব? বাড়িতে কিছু 
না পাঠালে বাপ-মা ভূখা মরে যাবে।' 

এসব খবর জোহন জানে। তবু নতুন করে ছেলেটার জন্য আর-একবার সহানুভূতি বোধ 
করল পে। : 

হাবিব এবার বলল, 'এখন তুমিই ভরোসা চাচা। তুমি যদি তাড়াতাড়ি তালিম দিয়ে ফুলুট 
বাজনাটা শিখিয়ে দাও বেঁচে যেতে পারি; নইলে খুদকুশি (আত্মহত্যা) হয়ে মরতে হবে। 

একটু চুপ করে থেকে জোহন ভাবলপ। তারপর বলল, “ঠিক আছে, তোকে তালিম দেব। 
যে কদিন ঘরে আটকে আছি, রোজ আসতে পারবি? 

“আসছে সপ্তাহে দু-দিন দলের বায়না আছে। একদিন বাজাতে যেতে হবে কল্যাণ, আর- 
একদিন অন্বরনাথ, তার পরের সপ্তাহে বায়না নেই। ওই দু-দিন .বাদ দিয়ে দু-সপ্তাহের সব দিন 
আসতে পারব। তবে এর মধ্যে যদি নতুন বায়না এসে পড়ে তো আসা যাবে না।' 


হঠাৎ বসন্ত ১০৯ 


“ঠিক আছে, দু-দিন বাদ দিয়ে আপাতত আসতে থাক। নতুন বায়না এলে পরে ভাবা যাবে। 

হাবিবের দু-চোখ আশায় খুশিতে চকচক করতে লাগল। ঝুঁকে জোহনের পা ছুঁয়ে সে বলল, 
চাচা গোটা জিন্দেগি আমি তোমার গোলাম হয়ে থাকব।' 

দু-কাধ ধরে হাবিবকে তুলতে-তুলতে জোহন বলল, 'গোলাম আবার কী। তুই তালিম নিয়ে 
পয়সা কামাতে শিখলেই আমি খুশি। তবে একটা কন্ডিশান__+ 

এই হাজার জাতের কসমোপলিটান বন্বে শহরে সবাই কথায় কথায় ইংরেজির খই ফোটায়। 
জোহন গোয়াঞ্চি ক্রিশ্চান অর্থাৎ পিদ্রু। ইংরেজিটা আজন্ম তার রক্তের মধ্যেই রয়েছে, তবে সেটা 
ভুল-ভাল ইংরেজি। অন্য সবার মতো ইংরেজি মেশানো হিন্দিটাই সে বেশি বলে থাকে। 

হাবিব বলল, “তুমি যে কন্ডিশান বলবে, আমি তাতেই রাজি।, 

“আমি তোকে তালিম দিচ্ছি একথা যেন কেউ জানতে না পারে। জানিসই তো এ-লাইনে 
এভাবে কেউ তালিম দেয় না; দু-চার বছর মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয়। ইফতিকার চাচার কানে 
যদি কথাটা যায় দারুণ ঝামেলা হয়ে যাবে। আমি সাদাসিধা ভোলাভালা একটা লোক। আমি কিন্তু 
কোনও লাফড়ায় যেতে পারব না।' 

হাবিব বলল, “ব্যান্ড বাজিয়ে হয়ে আমি ইফতিকার চাচাকে একথা বলতে যাব, এটা তুমি 
ভাবতে পারলে! আমার কি মাথা খারাপ! কীসে আমার ভালো, কীসে বুরা (মন্দ), জানি না! 

“ঠিক আছে, কাল সকালে চলে আসিস। দুপুরে ফিরতে হবে না। আমার এখানেই খাবি।' 

কৃতজ্ঞতায় চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল হাবিবের। জোহনের মনে হল, ছোকরা 
বোধহয় কেঁদেই ফেলবে। বুঝবার সঙ্গে-সঙ্গেই সে বলল, “যা, এবার ভাগ, আর হাঁ-_একটা কথা, 
তোর ফুলুট আছেঃ, 

পয়সা জমিয়ে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড ফুলুট কিনেছি, তবে খুব ভালো না-_” 

“ভেরি গুড । ওতেই চলবে। 

হাবিব চলে যাবার পর জানালার বাইরে আবার তাকাল জোহন। তারপর সমুদ্র আর আকাশের 
ফ্রেমে আটকানো একটু আগের সেই ছবিটা দেখতে-দেখতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। 


টানা একটা ঘুম লাগিয়ে জোহন যখন উঠল, তখন সন্ধে হয়ে গেছে। ডান্ডা কোস্টের এই 
দিকটার ওপর পাতলা ওড়নার মতো আবছা অন্ধকার নেমে এসেছে। সমুদ্র বা আকাশ, কিছুই পরিষ্কার 
দেখা যাচ্ছে না; সব ঝাপসা। 

সে উঠবার সঙ্গে-সঙ্গে মেরি খুট করে আলো জেলে দুধ-টুধ খেতে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে ঠার্রার 
বোতলটার কথা জোহনের মনে পড়ল। খাটিয়ার তলায় সেটি মজুত রয়েছে। ঘরে আত্ত একটা 
বোতল থাকতে দুধ খেতে কারও ভালো লাগে, না দুধ খাওয়ার মানে হয়? কিন্তু সে-কথাটা 
মেরিকে বলা গেল না। কেন না এই ক'দিনের মধ্যেই সে বুঝে ফেলেছে, মেয়েটা ভীষণ একরোখা 
আর জেদি। সে যা বলবে তাই করতে হবে, যা করবে তাই মেনে নিতে হবে। তবে এখন পর্যস্ত 
অন্যায় বা অসঙ্গত কোনও জেদ সে ধরেনি। যেটুকু করেছে সবই জোহনকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করবার 
কথা ভেবে। 

বাইরে থেকে মুখ-টুখ ধুয়ে এসে জোহন গুচ্ছের চিরতা গেলার মতো মুখ করে এক নিশ্বাসে 
দুধটা খেয়ে ফেলল; তারপর শুকনো স্টোন চিপ্স্‌ চিবুনোর মতো করে চিকু আর পেঁপে খেতে 
লাগল। 

জোহনকে খেতে দিয়ে মেরি এক কাপ চা আর কড়কড়ে টোস্ট বিস্কুট নিয়ে মেঝেতে বসে 
ছিল। দু-জনের খাওয়া হয়ে গেলে আযলুমিনিয়মের প্লেট গেলাস-টেলাস নিয়ে বাইরে চলে গেল। 


১১০ পাঁচটি উপন্যাস 


একটু পর জোহন দেখতে পেল মেরি বারান্দায় বসে রান্নার জোগাড়যন্ত্র করছে। 

খাটিয়া থেকে নেমে বাইরে বেরিয়ে এল জোহন। মেরির সঙ্গে এলোমেলো দু-একটা কথা 
বলে ঝোপড়পট্রির রাস্তায় গিয়ে নামল। 

মেরি পিছন থেকে বলল, “কোথায় যাচ্ছ? 

জোহন বলল, “সারাদিনই তো ঘরে বসে আছি, একটু ঘুরে-টুরে আসি। হাত-পায়ে জং ধরে 
যাচ্ছে। 

“বেশি দূরে যেয়ো না।' 

“আরে না-না__ 

ঝোপড়পট্রির ভেতর এলোমেলো ঘুরতে লাগল জোহন। এর মধ্যে ঘরে-ঘরে এবং দূরে 
রাস্তায় কর্পোরেশনের আলো জলে উঠেছে। ঘুরতে-ঘুরতে মাদারি খেলোয়াড়ের ঘরে একবার টু মারল 
জোহন। মাদারি খেলোয়াড় নেই, তার বউ রয়েছে। তার সঙ্গে দু-একটা মজার কথা বলে পোস্টার 
সীটিয়ের ঘরে উকি দিল। সেখানে এক কাপ চা খেয়ে গেল সোমবারিদের ঘরে। খানিকক্ষণ বসে 
পান-টান খেয়ে আবার নিজের আস্তানার দিকে চলল। 

ঘুরছে-ফিরছে লোকের সঙ্গে গল্প-টল্প করছে, মজার-মজার কথাও বলছে, তবু মাথার মধ্যে 
সেই ঠার্বার বোতলটা আটকে আছে। দুধ খেয়েই ওটার ছিপি খুলবে ভেবেছিল; কী ভেবে খোলেনি। 
এখন মুখ থেকে দুধের গন্ধ মিলিয়ে গেছে। ঝুপড়িতে ফিরে এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করবে না 
জোহন, বোতল খুলে ফেলবে। 

ঘরে এসে সত্যি-সত্যিই বোতলটা খুলে ফেলল জোহন। টেবিলের ওপর একটা হাতল-ভাঙা 
কাপ উপুড় করা ছিল, সেটা চিত করে ঠার্রা ঢেলে নিল। তারপর মেরিকে ডেকে পাঁপড় সেঁকে 
সঙ্গে পেঁয়াজ কুচিয়ে দিতে বলবে, ঠিক সেই সময় মেরি নিজে এসেই হাজির। খুব সম্ভব রান্নার 
জন্য মশলাপাতি নিতে ঘরে ঢুকেছে সে। কাপ-ভর্তি ঠার্রা এবং পাশে একটা খোলা বোতল দেখে 
প্রথমে চক্ষুস্থির। পরমুহূর্তে আঙুল বাড়িয়ে ঠার্রা দেখিয়ে বলল, “ওটা কী? 

জোহন এ-কান থেকে ও-কান পর্যস্ত বিশাল ভূভাগ হাসিতে ভরিয়ে দিয়ে বলল, “ওটার 
জন্যেই তোমাকে ভাকতে যাচ্ছিলাম; তার "আগেই গড় তোমাকে পাঠিয়ে দিলে। এক কাজ করো, 
চট করে কণ্টা পাঁপড় সেঁকে, পেয়াজ কুচিয়ে নিয়ে এসো” 

চোখ দুটো এখনও স্থির হয়েই আছে মেরির। সে বলল, 'ার্রা পেলে কোথায়? 

“সে পেয়েছি 

“ওটা কেনবার জন্যেই বুঝি বাইরে যাওয়া হয়েছিল? 

“আরে না-না, ওটা ঘরেই ছিল।' 

“ঘরে এল কী করে- উড়ে? বোতলটার ডানা আছে নাকি 

জোহন ভেতরে-ভেতরে টের পেল, লক্ষণ ভালো নয়। সে মিটিমিটি হাসতে লাগল; তবে 
তার সঙ্গে একটু ভয়ের ভাবও মেশানো। 

মেরি এবার বলল, ডাক্তার না তোমাকে সেদিন বলে গেল এখন শরাব খাবে না!ঃ 

মেয়েটার স্মৃতিশক্তি তো দারুণ। গিল্ডার সত্যি-সত্যি তাকে ঠার্রা-ফার্রা খেতে বারণ করে 
রাহে রিড ছেরে টার ই হার হারা চরে রাহ 
মতো গলায় জোহন বলল, “বারণ করেছিল নাকি? 

“মনে পড়ছে না? সোজাসুজি জোহনের দিকে তাকাল মেরি। 

জোহন উসখুস করতে লাগল, 'না ঠিক, তবে” 

এবদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মেরি জিগ্যেস করল, 'তবে কী? 

“বললেও গিল্ডার ডাক্তারের কথা মেনে চলার দরকার নেই। 


হঠাৎ বসস্ত ১১১ 


নো 
শরাবিকে শরাব খেতে বারণ করছে, একথা মানতে হবে? তা ছাড়া ও নাম-কাটা ডাক্তার। 
ওর রেজিস্ট্রেশন কেড়ে নিয়েছে। ওর সব কথা না মানলেও চলে ।।” 

এবার চাপা গলায় মেরি বলল, “তোমার মতলব খুব খারাপ।, 

দম-আটকানো স্বরে জোহন জিগ্যেস করল, “কেন? 

“ভেবেছিলাম, তুমি আর-একটু ভালো হয়ে উঠলেই চলে যাব। ভালো হবার কোনও ইচ্ছাই 
তোমার দেখছি না। ঠার্রা গিলে আবার শরীর খারাপ করে বোসো; তা হলেই আমাকে আরও 
কিছুদিন ফাসাতে পারো। কিন্তু ও চালাকি তোমার চলবে না।, 

এই ঝোপড়পষ্টিতে এসে বেশ পোষ মেনে যাচ্ছিল মেরি। এতদিন কোলাবা থেকে বোরিভিলি 
পর্যস্ত শরাবি-ফরেবি-গুভ্ডা-বদমাশদের সঙ্গে ঘুরে-ঘুরে বেড়াত সে; সেই উডুক্ু ভাবটা ক্রমশ কেটে 
যাচ্ছিল তার। এখানে, এই নোংরা জঘন্য কুৎসিত ঝোপড়িতে একটা সংসারের চেহারা একটু-একটু 
করে ফুটিয়ে তুলতেও শুরু করেছিল। আচমকা আবার এখান থেকে চলে যাবার কথা কেন বলছে, 
কে জানে! মনটা হঠাৎ ভারী হয়ে গেল জোহনের। সে কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই দুম করে 
এক কান্ড করে বসল মেরি; ঠার্রার বোতলটা তুলে জানলা দিয়ে বাইরে ছুড়ে দিল। তারপর কাপটা 


পরের দিন সকালে আটটা বাজতে না বাজতেই হাবিব তার সেকেন্ড হ্যান্ড ব্ল্যারিওনেটখানা 
নিয়ে হাজির। আসামাত্র দেরি করল না জোহন; নিজের ক্ল্যারিওনেটের বাঝ্সটা কাধে ঝুলিয়ে বলল, 
“চল, সি-র ধারে যাই। 

জোহনের ইচ্ছা, সমুদ্রের পাড়ে নিরিবিলিতে হাবিবকে তালিম দেবে। তা ছাড়া ঝোপড়পষ্টিতে 
বাজনা শেখাতে বসলে লোকের চোখে পড়বে। জানাজানি হতে-হতে হয়তো ইফতিকার সাহেবের 
কানে চলে যাবে খবরটা। তাছাড়া দূম করে ইফতিকার সাহেব নিজেই কখন এসে হাজির হয়। 

জোহনরা যখন ঘর থেকে বেরুতে যাচ্ছে, মেরি বলল, “কোথায় চললে? 

জোহনের হঠাৎ খেয়াল হল, মেরিকে হাতে রাখা দরকার। সংক্ষেপে হাবিবের ব্যাপারটা 
জানিয়ে সে মেরিকে বলল, “সমুদ্রের দিকে যাচ্ছি। হাবিবের তালিম নেবার কথা কারওকে বোলো 
না। 

“আচ্ছা। কিস্তু ডাক্তার বলছিল, ফুলুট বাজালে মাথার শিরে চোট লাগবে? 

“অনেকক্ষণ বাজালে চোট লাগবে বলেছে। হাবিবকে একটু-আধটু দেখিয়ে দেব। খুব আস্তে- 
আস্তে বাজাব__ নিজেকে বাঁচিয়ে। তুমি ভেবো না।' 

মেরি আর কিছু বলল না। হাবিবকে নিয়ে জোহন ঝোপড়পট্রির ভেতর দিয়ে সি-কোস্টের 
দিকে চলল। তার কাধে ক্ল্যারিওনেটের বাজ্স দেখে ঝোপড়পট্টির দু-ধারের ঘর থেকে গাদা-গাদা 
বাচ্চা ছুটে এসে তাকে মাছির মতো ছেঁকে ধরতে লাগল। তাকে ঘিরে ধরে যেতে-যেতে ভ্যানভেনে 
গলায় বলতে লাগল, 'জোহনচাচা, আজ কিন্তু বাজনা শোনাতে হবে। কিছুতেই তোমাকে ছাড়ছি 
না। 

সময় পেলেই ঝোপড়পন্রির, বাচ্চাদের সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে গিয়ে ক্ল্যারিওনেট শোনায় জোহন। 
মাঝখানে “আনারকলি ব্যান্ড'-এর হাতে এত বায়না ছিল যে, অনেকদিন ওদের নিয়ে সমুদ্রের ধারে 
যাওয়া হয়নি। জোহন বলল, “আচ্ছা চল। কিন্তু একটার বেশি গান বাজাব না কিস্তু। আমাদের 
কাজ আছে।' 

ছেলের দল তাতেই রাজি। 


১১২ পাঁচটি উপন্যাস 


সি-কোস্টে এসে প্রথমে একটা চটকদার হিন্দি ছবির গান বাজিয়ে শোনাল জোহন। একাট 
গান বাজিয়েই বেশ হাঁপিয়ে গেল সে। মাথার পিছন দিকটা দপদপ করছে। নাঃ, শরীরটা ভালো 
রকমই জখম হয়েছে। শিল্ডার গ্রিকই বলেছে, আরও কিছুদিন তাকে ঝোপড়পন্টিতে চুপচাপ পড়ে 
থাকতে হবে। 

খানিকটা জিরিয়ে দমবন্ধ ভাবটা আর মাথার দপদপানি কমলে বাচ্চাগুলোকে আগে 
ঝোপড়পন্রিতে পাঠিয়ে দিল জোহন। তারপর ছোট্র একটা গত বাজিয়ে হাবিবকে বলল, “বাজা-_' 

একবারেই সুরটা তুলতে পারল না হাবিব। তিন-চারবার দেখাবার পর সুরটা তুলে নিল। 

ইতিমধ্যে বেলা বেশ চড়ে গেছে। আকাশের খাড়া দেওয়াল বেয়ে-বেয়ে সূর্যটা অনেকখানি 
ওপরে উঠে এসেছে। ভোরবেলা যে জেলে-নৌকা আর স্পিডবোটগুলো বেরিয়ে পড়েছিল, সমুদ্রের 
দুর দিগন্ত থেকে সেগুলো একে-একে ফিরে আসতে শুরু করেছে। আকাশের কোথাও একটা সি- 
গাল দেখা যাচ্ছে না; সাগরপাখিগুলো অনেক আগেই উধাও হয়ে গেছে। আরবসাগর এই মুহূর্তে 
জুন মাসের গনগনে রোদ ফিরিয়ে দিচ্ছে। সেদিকে কেউ তাকিয়ে থাকবে, সাধ্য কী। 

জোহন বলল, চল, এবার ফেরা যাক। ওবেলা আবার আসব।, 

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিল জোহন। হাবিবের দুপুরে ঘুমনোর অভ্যেস 
নেই। সে মেঝেতে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে গেল। তারপর বেলা হেলে যাবার সঙ্গে-সঙ্গে রোদের 
রং যখন ঘন হয়ে এল, সূর্য যখন আরবসাগরের জল ছুঁই-ছুঁই করছে, সেই সময় ঘুম ভাঙল জোহনের। 
তাড়াতাড়ি মুখ-টুখ ধুয়ে হাবিবকে নিয়ে আবার সমুদ্রের পাড়ে এল। তাকে অন্য একটা গত তালিম 
দিতে-দিতে সন্ধে হয়ে গেল। একসময় ক্ল্যারিওনেটখানা মুখ থেকে নামিয়ে বাক্সে পুরতে-পুরতে জোহন 
বলল, “আজ থাক, কাল আবার আসিস।' 

হাবিবও তার ক্ল্যারিওনেটটা খাপে পুরে বলল, “নিশ্চয়ই আসব, তবে খাব না।' 

জোহন হাসল, “কেন রে? 

একে তো বাজনা শেখাচ্ছ। তার ওপর রোজ-রোজ খেলে তোমার ওপর জুলুম করা হবে 
চাচা। তা আমি পারব না।' 

“বহুত পয়সা হয়েছে বুঝি তোর? টিকিট কেটে ভেল্ডিবাজার থেকে এখানে আসছিস; তার 
ওপর হোটেলে খাবি! একটা কথা শুনে রাখ উল্লুকা বান্দর-__,গালাগালটা ইফতিকার সাহেবকে নকল 
করেই দিল জোহন। 

“কী কথা?__ভয়ে-ভয়ে তাকাল হাবিব। 

“যদি না খাস, তালিম দিতে পারব না। সাফ বাত।' 

“ঠিক আছে, খাব।” ঘাবড়ে গিয়ে এবার বলে ফেলল হাবিব। 

“বহুত আচ্ছা-__' হাবিবের পিঠে একটা চাপড় বসিয়ে দিল জোহন। 

একটু পর দেখা গেল ঝোপড়পন্রির কাছাকাছি এসে বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে সোজা ঘোড়বন্দর 
রোডের দিকে চলে গেল হাবিব। ওখান থেকে বাসে উঠে সোজা বান্দ্রা স্টেশনে গিয়ে হারবার 
লাইনের ট্রেন ধরবে। আর জোহন ক্ল্যারিওনেটের বাক্সখানা কাধে চাপিয়ে দৃর্মনক্কর মতো হাঁটতে- 
হাটতে ঝোপড়পষ্রিতে এসে ঢুকল। নিজের ঘরের কাছে আসতেই তাকে থমকে দীড়িয়ে পড়তে হল। 
ঘরের ভেতর তার ট্রানজিস্টর রেডিওটা চলছে হয়তো। আশ্চর্য সুরেলা একটা গান সেখান থেকে 
ভেসে আসছে। মেরিকে বারান্দায় দেখা গেল না। খুব সম্ভব ঘরে বসে ট্রানজিস্টরটা চালিয়ে দিয়ে 
সে শুনছে। 

বাইরে থেকে জোহন আন্তে করে ডাকল, “মেরি_” ডেকেই সে বারান্দায় উঠে এল। 

সঙ্গে-সঙ্গে গানটা থেমে গেল। আর ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল মেরি। 

জোহন বলল, 'এ কী, রেডিওটা বন্ধ করে দিলে কেন! ফাইন গান হচ্ছিল। 


হঠাৎ বসস্ত ১১৩ 


একটু অবাক হয়ে মেরি বলল, “রেডিও বাজছিল না।' 

হঠাৎ জোহনের মনে পড়ে গেল, রেডিওটা চলার কথা নয়। কয়েক মাস আগে ওটার ব্যাটারি 
নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর আর নতুন ব্যাটারি কিনে এনে লাগানো হয়নি। ওই অবস্থাতেই ওটা টেবলে 
পড়ে আছে। বিমুঢ়ের মতো জোহন বলল, “তা হলে? 

“তা হলে কী? 

“গান শুনলাম যে!ঃ 

মেরি দ্রুত একবার জোহনের দিকে তাকিয়েই মুখ নামিয়ে নিল। তৎক্ষণাৎ ব্যাপারটা বুঝে 
ফেলল জোহন। সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে বিস্ময়ের সুরে বলল, “তুমি গাইছিলে নাকি! 

মেরি উত্তর দিল না। তার মুখটা এখন দেখার মতো । লজ্জায় সেখানে লালচে ছোপ ধরেছে। 
যে মেয়ে অকপটে নিজের গ্লানিকর পেশার কথা বলেছে, বেপরোয়া ভঙ্গিতে যে জানিয়েছে সে 
একটা দারুণ খারাপ মেয়ে, একটা বাজে টাইপের প্রস্টিটিউট-_তার এখনকার মুখ দেখে কিন্তু 
অবাক হতে হয়। আচমকা তার সব চাইতে গোপন লজ্জার কারণটা যেন জোহনের কাছে ধরা 
পড়ে গেছে। 

জোহন আবার বলল, “চুপ করে আছ কেন? তুমিই গাইছিলে? 

মুখ তুলল না মেরি। সেই অবস্থাতেই আধফোটা গলায় বলল, হ্যা ।' 

হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে হাতের মুঠোয় গাদা-গাদা সোনার মোহর পেয়ে গেলে যেমন হয়, 
জোহনের এখনকার মনের অবস্থা অনেকটা সেইরকম। মেরির দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে তার 
চোখ যেন ধাঁধিয়ে যেতে লাগল। মিনিটখানেক এইভাবেই কাটল। তারপর মেরির একটা হাত ধরে 
তাকে প্রায় উড়িয়েই ঘরের ভেতর নিয়ে এল জোহন। কাধ থেকে ক্ল্যারিওনেটের বাক্সটা নামিয়ে 
রেখে মেরিকে খাটিয়ায় বসিয়ে দিল। পরক্ষণে নিজের কোমরে হাত দুটো রেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে 
বলল, “এটা কীরকম হল? 

প্রশ্নটা বুঝতে না পেয়ে মেরি জিগ্যেস করল, “কোনটা % 

_ পিনেরো-ষোলো দিন তুমি এখানে আছ। কই আমাকে বলোনি তো এত ভালো গাইতে পারো 

তুমি! 

লাজুক হেসে মেরি বলল, “যাঃ! একে আবার ভালো গাওয়া বলে নাকি!” 

মোটা এবং গাঁট-পাকানো তর্জনীর ডগা দিয়ে মেরির থুতনিটা তুলে ধরে জোহন বলল, 
“তোমার গলায় আনারের দানা বসানো আছে। তুমি গাইলে লতা মঙ্গেশকর আর আশা ভোসলের 
মতো নাম করতে পারবে।' 

জোহনের আঙুলটা সরিয়ে দিয়ে মেরি বলল, “কী যে বল! কাদের সঙ্গে কার তুলনা । তোমার 
মাথা খারাপ ।” 

জোহন বলল, “আমি একটা গরিব আদমি__এ পুর ম্যান। ব্যান্ডপার্টিতে ফুলুট বাজাই, 
ঠার্রা খাই আর ঝোপড়পন্রিতে পড়ে থাকি বলে আমার কথা কানে তুলতে চাইছ না। কিন্তু একটা 
কথা মনে রেখো ছোকরি-_দিস ম্যান, দিস “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র ফুলুটবালা, হা করে একটা 
আওয়াজ বার করলে বলে দিতে পারে, কার গলায় সুর খেলবে, আর কার গলায় খেলবে না। 

রগড়ের গলায় মেরি এবার বলল, “তুমি দেখছি খুব সমঝদার আদমি।' 

'জরুর, হাজারবার। একটু আগে যে গানটা গাইতে-গাইতে থেমে গিয়েছিলে, সেটা পুরো 
গেয়ে ফ্যালো দেখি।, 

হ্যা, এটা তো গান গাইবারই সময়। আমার বলে এখন রান্না চড়াতে হবে।' বলেই উঠে 
পড়ল মেরি। 

তার দু-কাধ ধরে আবার বসিয়ে দিল জোহন। বলল, “রান্না-টান্না ফায়ার করে দাও। নো 


প্রফুল্ল রায়- পাঁচটি উপন্যাস--১৫ 


১১৪ পাঁচটি উপন্যাস 


কুকিং বিজনেস নাউ, এখন শুধু গান__স্টার্ট। 

“তুমি কি খেপে গেলে ফুলুটবালা?% 

হ্যা, খেপেই গেলাম-_ স্টার্ট ।' 

খানিকক্ষণ জোরজার করতে সেই গানটা গোটা গেয়ে ফেলল মেরি। ফিল্মেরই গান ওটা-_ 
শ্লিগ্ধ প্রেমের গান। রেকর্ডে রেডিওতে আগেও গানটা শুনেছে জোহন। কিন্তু ফিল্মে যে প্লেব্যাক 
করেছিল, তার চাইতে ঢের ভালো গাইল মেরি। প্লে-ব্যাকে প্রচুর মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার 
করা হয়েছে। কিন্তু খালি গলায় গেয়ে তার চাইতে অনেক বেশি এফেক্ট এনে দিয়েছে মেরি। 

চোখ বুঁজে শুনে যাচ্ছিল জোহন। তার সমস্ত স্নায়ুর ওপর দিয়ে প্রথম বর্ষার বৃষ্টিপাতের 
মতো রিম-ঝিম করে কী বেজে যাচ্ছিল। গান থামলে চোখ মেলে সে বলল, “ফার্্স ক্লাস! 

মেরি একটু হাসল। 

জোহন বলল, “আর একটা হোক।' 

মেরি এবার আপত্তি করল না। তার সংকোচ বা লজ্জা অনেকটাই কেটে গেছে। 

মেরির দ্বিতীয় গানটাও ফিল্মের গান এবং প্রেমেরও। এটাও দারুণ গাইল সে; চড়ায় এবং 
খাদে দু-জায়গাতেই তার গলায় সমান কারুকাজ। 

দ্বিতীয় গানটি শোনার পর জোহন বলল, “কামাল করে দিয়েছ ছোকরি।, 

প্রশংসার কথাটা ভালো লাগল মেরির। এবারও সে হাসল, কিছু বলল না। জোহন আবার 
বলল, “তুমি কার কাছে গান শিখেছ?, 

মেরি বিষাদের সঙ্গে কৌতুকের ঝাজ মিশিয়ে বলল, “ভালো কথাই বলছ! খেতে পেতাম 
না, তার ওপর আবার গান শিখব! যেটুকু শিখেছি রেডিও কি মাইকে রেকর্ড বাজানো শুনে।' 

বলতে-বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল মেরির। ঈষৎ গলা চড়িয়ে দিল সে, "ও ভালো 
কথা-_ 

“কী? 

“বছর কয়েক আগে ইউ-পির এক পয়সাওলা ঘরের রইস ছোকরা ব্যান্ড স্ট্যান্ডে আযাপার্টমেন্ট 
ভাড়া করে আমাকে রেখেছিল। ছোকরার গান-বাজনার ঝৌক ছিল; আটিস্টিক মেজাজ । আমার 
গান শুনে দূম করে একটা গানের মাস্টার রেখে দিয়েছিল; সঙ্গে একটা তবলচি। গদগদ হয়ে সব 
সময় সে বলত, আমাকে লতা মঙ্গেশকর বানিয়ে ছাড়বে । তখন কিছুদিন গানের তালিম নিয়েছিলাম।' 

তারপর- 

“তারপর আর কী। আমি তো তখন সুখের বাতাসে ডানা মেলে উড়ছি। কিন্তু ডানাটা একদিন 
আচমকা বিনা নোটিশেই কাটা গেল; আর আমি ঝুপ করে আবার ব্যান্ড স্ট্যান্ডের ফোলো-তলা 
বাড়ির মাথা থেকে যে ফুটপাথে ছিলাম, হাড়গোড় ভেঙে সেই ফুটপাথেই এসে পড়লাম।' 

তার মানে? 

“তার মানে হল, কীভাবে খোঁজখবর করে ছোকরার বাপ ইউ-পি থেকে ব্যান্ড স্ট্যান্ডের সেই 
আযাপার্টমেন্টে এসে হাজির। তখন গানের জমজমাট আসর চলছে। সেই ছোকরার ৰাপ ওখানকার 
এক বড় বিজনেসম্যান, বিরাট পাকানো গৌফ, বাঘের মতো চোখ, ঘাড়ে গর্দানে ঠাসা, প্রায় সাত 
ফুট লম্বা-_-আমার চুলের ঝুঁটি ধরে পেছনে তিনটে লাথি মেরে বাইরে বের করে 'দিল। তারপর 
তবলচি আর গানের মাস্টার লাথি খেয়ে ছিটকে বেরিয়ে গেল। সেদিন আবার লিফটে কী একটা 
গোলমাল ছিল; আমরা তিনজন প্রসেশান করে ষোলো-তলা থেকে নীচে নেমে এলাম বলতে- 
বলতে একটু থামল মেরি। এক নাগাড়ে এতগুলো কথা বলে তার হাঁফ ধরে গিয়েছিল। দম নিয়ে 
সে আবার বলল, “সেই আমার প্রথম আর শেষ গান শেখা।' 

জোহন খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। বলল, দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো। 


হঠাৎ বসস্ত ১১৫ 


মেরি উত্তর দিল না। 

একটু চিন্তা করে জোহন এবার জিগ্যেস করল, “কোনও মিউজিক্যাল ইনস্ট্রমেন্ট, যেমন ধরো 
সেতার, সরোদ, ভায়োলিন-__এই সব বাজাতে পারো? 

মেরি বলল, 'ব্যান্ড-স্ট্যান্ডে থাকার সময় ওই তিনমাসে হারমোনিয়াম বাজাতে শিখেছিলাম।' 

“ওতেই হবে। 

“কী হবে? 

দাড়াও, একটু ভেবে দেখি।' 


রাস্তিরে খাওয়া-দাওয়ার পর অলিখিত চুক্তি অনুযায়ী জোহন আজও বাইরের বারান্দায় 
শুয়েছে, মেরি শুয়েছে ঘরে। 

অনেকক্ষণ শুয়ে থাকার পরও ঘুম আসছিল না জোহনের। মেরির সেই দুটো গানের আশ্চর্য 
সুর তার রক্তের মধ্যে, স্নায়ুর মধ্যে এখনও বেজে যাচ্ছে। সে গান-বাজনার লোক । যদিও সাদাসিধে 
ভোলাভালা বাউন্ডুলে এবং শরাবি, জগতের সব ব্যাপারেই উদাসীন, নির্লিপ্ত, তবু তার মনে হচ্ছিল 
মেরির গলাটা নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। এমন সুরেলা কণ্ঠস্বর হাজারে একটি মিলবে কি না সন্দেহ। 
এপাশ-ওপাশ করতে-করতে হঠাৎ জোহন ডাকল, “মেরি__ 

সাড়া পাওয়া গেল না। 

জোহন আবার ডাকল, “এই মেরি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? 

এবার ঘুমজড়ানো গলায় মেরি জবাব দিল, “কী বলছ? 

“তোমার ব্যাপারে একটা কিছু করা দরকার ।' 

“কী করবে? 

“অলমাইটি তোমার গলায় এমন খুশবু ঢেলে দিয়েছে। ঝোপড়পন্ট্রিতে পড়ে থেকে ওটা 
নষ্ট হয়ে যাক_ এ আমি চাই না।' 

'কী চাও তা হলে? 

“হোল ওয়াল্ড তোমার গান শুনুক।' 

মেরি এবার বলল, “মাথায় বুঝি পোকা কামড়াচ্ছে। অনেক রাত হল, এবার চুপচাপ ঘুমিয়ে 
পড় তো। বেশি রাত জাগলে শরীর আবার খারাপ হবে।" 

জোহন অসহিষুঃ হয়ে উঠল, “হচ্ছে একটা কাজের কথা। তার ভেতর ঘুম এনে ঢোকাতে 
বলেছে কে? আরে বাবা হোল লাইফ, ঘুম তো আছেই, কিন্তু কাজের কথাটা তো বসে থাকবে 
না। 

“আচ্ছা, কী বলতে চাইছ বলো।' 

“তোমার গান রেকর্ডে রেডিওতে সবসময় বাজবে, এটা আমি দেখতে চাই।' শব্দ করে হেসে 
উঠল মেরি। 

জোহন রেগে উঠল, “হাসলে যে! এটা কি হাসির কথা হল? 

হল না!' 

“কেন হল, সেটা মেহেরবানি করে বুঝিয়ে দাও দিকি।' 

“আরে বাবা, তুমি হলে ব্যান্ডপার্টির ফুলুটবালা, আর আমি হলাম দশ টাকা মজুরির এক 
বেশ্যা। দু-জনে দশ জন্ম চেষ্টা করলেও আমার গান রেডিও কি রেকর্ডে বাজবে না। স্বপ্ন-টগ্ন একটু- 
আধটু আমিও দেখতাম; তাই বলে তুমি হাওয়ায় এয়ার ইন্ডিয়া বিল্ডিংয়ের মতো একটা বাড়ি বানিয়ে 
ফেলবে? 


১১৬ পাঁচটি উপন্যাস 


এবার উত্তেজিতভাবে উঠে বসল জোহন। ঘরের দরজাটা ভেজানো থাকে। যদিও সে মেরিকে 
ওটা বন্ধ করে খিল আটকে শুতে বলেছে, মেরি তা করে না। মেরির মনোভাব এইরকম-__ 
পুরুষমানুষকে তার ভয় নেই; দেহের ক্ষতি যেটুকু হবার তা আগেই হয়ে গেছে। তবে জোহনের 
মনোভাবটা এইরকম- শরীর বলে কথা। কখন কোনও উত্তেজনার মুহূর্তে সে ঘরে ঢুকে পড়বে। 
তারপর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাক আর কি। অবশ্য তেমন দুর্ঘটনা এখনও খধটেনি। এখন উত্তেজিত 
হয়েই আছে জোহন; তবে সে উত্তেজনাটা অন্যরকম। 

যাই হোক, ঝড়াং করে ঘরে ঢুকে আলো জেলে ফেলল জোহন। বলল, “তোমাকে নিয়ে 
আমি চারদিক তোলপাড় করে ফেলব- দেখি কিছু হয় কি না। ওয়াল্ডঁটা এখনও বিলকুল বুরা (খারাপ) 
হয়ে যায়নি; সাচ্চা জিনিসের দাম চেষ্টা করলে আজও পাওয়া যায়।” 

আলো জ্বালতেই মেরি দ্রুত উঠে বসেছিল। কয়েক পলক জোহনের দিকে তাকিয়ে থেকে 
গলার স্বরে মজা এবং বিদ্রুপ মিলিয়ে বলল, “তাই নাকি 

£ইয়েস। তার আগে তোমাকে তালিম নিয়ে তৈরি হতে হবে।, 

“কে তালিম দেবে? 

“সেটা কাল বলব।” আলো নিভিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল জোহন। 


কথামতো পরের দিন সকালে হাবিব আবার এল। আসামাত্র যোহন তাকে নিয়ে সমুদ্বের 
পাড়ে চলে গেল। ঝোপড়পট্রির কাচ্চাবাচ্চারা আজও বাজনা শোনার বায়না ধরেছিল; জোহন তাদের 
সঙ্গে নেয়নি। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঝোপড়পট্রিতেই রেখে গেছে। 

দুপুর পর্যস্ত তালিম দিয়ে দুটো গত্‌ হাবিবকে মোটামুটি শেখাতে পারল জোহন। তারপর 
ঝোপড়পষ্টিতে ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বলল, “আজ আর ওবেলা শেখাচ্ছি না; তুই এখন 
ভেম্ডিবাজারে ফিরে যা। 

আসলে মেরির চিস্তাটাই তার মাথার ভেতর কাল থেকে আটকে আছে। নেহাত হাবিবকে 
কথা দিয়েছে তালিম দেবে, তাই শেখানো। “তা ছাড়া ছোকরা দারুণ আশা করে আছে-_ ক্ল্যারিওনেট 
বাজাতে শেখাটা তার কাছে বাঁচা-মরার প্রশ্ন। ওটা তাকে শেখাতেই হবে। জোহন ঠিক করে নিয়েছে, 
যে ক'দিন ঘরে পড়ে আছে সকালের দিকটা হাবিবকে তালিম দেবে আর দুপুর থেকে রাত পর্যস্ত 
খাওয়া-দাওয়া এবং ঘুমের কয়েক ঘণ্টা বাদ দিলে, বাফি যে সময় থাকে, সে সময়টা মেরির পেছনে 
লেগে থাকবে। 

হাবিব চলে যাবার পর জোহন মেরিকে বলল, “নাও, শুর করো। 

একটু অবাক হয়েই মেরি জিগ্যেস করল, “কী? 

কী আবার-_গান। কাল রাত্তিরে তোমার সঙ্গে সেই কথাই তো হল।' 

সূর্যটা আকাশের খাড়া দেওয়াল বেয়ে-বেয়ে এখন সোজা বন্ধে শহরের মাথার ওপর এসে 
উঠেছে। জুন মাসের এই গোড়ার দিকটায় রোদের তেজ সাংঘাতিক; চারদিক ঝলসে খাঁচ্ছে। সকালে 
সমুদ্রের দিক থেকে উলটোপালটা ঝোড়ো হাওয়া ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে 
হাওয়াটা পড়ে গেছে। অসহ্য গুমোটে ঝোপড়পট্টির এই ঘরে বসে গলগল করে থামতে-ঘামতে 
কেউ যে গান গাইবার কথা বলতে পারে, শুনেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না মেরি। সে বলল, 
“এই গরমে গান গাইব! তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? 

এই ঝলসে-যাওয়া দুপুরে মেরিকে দিয়ে কিছুতেই গান গাওয়ানো গেল না। কিন্তু বিকেলে 
তাকে ছাড়ল না জোহন। দু-চারটে গান শোনার পর সে বুঝতে. পারল এ-সবই ফিল্মের গান। 
রেকর্ড কিংবা রেডিওর বিবিধ ভারতীতে শুনে-শুনে গলায় তুলে নিয়েছে মেরি। কিন্তু অন্যের 


হঠাৎ বসস্ত ১১৭ 


গান নকল করে তো নাম করা যাবে না। নকলনবিশকে কে আর শিল্পীর সম্মান দেয়, তার জন্য 
নিজস্ব কিছু দরকার। এই কথাগুলো ঠিক এইভাবে ভাবেনি জোহন, তার নিজের মতো করে নিজের 
নিয়মে ভেবেছে। সে জিগ্যেস করল, “আচ্ছা, যে-কোনও গান শুনলে তুমি গলায় তুলে নিতে 
পারো? 

মেরি ঘাড় হেলিয়ে দিল, অর্থাৎ পারে। তারপর বলল, “হারমোনিয়াম পেলে গানটা বাজাতেও 
পারি।' 

“ভেরি গুড। একটা হারমোনিয়াম শিগগিরই জোগাড় করে ফেলছি।” একটু চুপ করে থেকে 
কী ভাবল জোহন। তারপর বলল, "লিখতে পড়তে পারো? 

একটু-আধটু পারি। এক সময় অরফ্যানেজে ছিলাম, সেখানে ট্র-প্থি স্টান্ডার্ড পর্যস্ত পড়েছি।' 

জোহনের চোখ শ্রদ্ধায় এবং খুশিতে চকচকিয়ে উঠল, “আরে, তুমি তো দারুণ বিদ্বান দেখছি। 
আমার পেটে আস্ত একখানা ড্যাগার চালিয়ে দিলেও এ-বি-সি-ডি”র পর আর কিছু বেরুবে না।' 

মেরি হেসে ফেলল। জোহন আবার বলল, “কাগজ আর ডট পেন নাও।' 

মেরি কাগজ-কলম নিয়ে বসল। 

খুব ছেলেবেলায় অর্থাৎ বাপ মারা যাবার পর জোহন যখন রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, 
তখন প্রায়ই তার চোখে পড়ত ইউ-পি থেকে, এম-পি থেকে, রাজস্থান কি গুজরাট থেকে নানা 
গান-বাজনার দল বন্বে সিটিতে এসে হাজির হতো। সেই সব দলে মেয়ে এবং পুরুষ দুই-ই থাকত। 
আজাদ ময়দান, ক্রস ময়দান কিংবা ওভাল অথবা গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার কাছে রাস্তার ধারে ওরা 
রাত কাটাত। আর দিনের বেলাটা দলবল নিয়ে মেরিন ড্রাইভ, চৌপট্টি, বড়ীবন্দর কিংবা ভেন্ডিবাজারে, 
যখন যেখানে সুবিধা গানের আসর বসিয়ে দিত। ওরা ফিল্মটিল্মের গান গাইত না; তখনকার দিনে 
ফিল্মের এত হুজুগও ওঠেনি। ওরা ওদের নিজেদের বাঁধা গান নিজেরাই সুর দিয়ে গাইত। কিছুদিন 
ওই সব দলে ভিড়ে গিয়েছিল জোহন। অবশ্য এক দলে সে বেশিদিন থাকত না। দশ দিন হয়তো 
এ দলে, পনেরো দিন ওই দলে__এই করে করেই কেটে যেত। সেই ছেলেবেলা থেকেই স্মৃতিশক্তিটা 
তার ভালো। একবার যা শুনত, তা আর ভুলত না। সুর বোঝার মতো কান ছিল জোহনের, গানের 
দলগুলোর সঙ্গে ঘুরতে -ঘুরতে প্রচুর গান এবং সেই সব গানের সুর মনে করে রেখেছিল সে, 
পরে ক্ল্যারিওনেট বাজাতে শিখে সুরগুলো তুলে নিয়েছিল। এখনও সেই-সেই গানগুলো এবং তাদের 
সুর তার স্পষ্ট মনে আছে। জোহন বলল, “লেখো-_ও পুরবৈয়া মাত যা, মাত যা_+ 

এই গানটা তার সবচাইতে প্রিয়। প্রিয় গানটা দিয়েই সে শুরু করল। তারপর আরও তিন- 
চারটে গানের কথা বলে গেল। 

গানগুলো লিখে নেবার পর জোহন বলল, আমি তো আর গেয়ে শোনাতে পারব না; 
হাঁ করলে আমার গলা থেকে আঠারো রকমের আওয়াজ এক সঙ্গে বেরিয়ে আসবে। ফুলুটে সুরগুলো 
বাজাচ্ছি, গানের কথাগুলো দেখে গানগুলো গলায় তুলে নাও--- বলেই প্রথম গানটার সুর আস্তে- 
আস্তে ক্ল্যারিওনেটে বাজাতে লাগল। 

খুব মন দিয়ে সুরটা শুনল মেরি। তারপর বার দুই তিন জোহনের ক্ল্যারিওনেটের সঙ্গে 
গেয়ে সুরটা তুলে ফেলল। শুধু একটা নয়, পর পর চাবটে গানই তুলল; এবং জোহনের সাহায্য 
ছাড়া একা গেয়ে শুনিয়েও দিল। 

জোহন খুশিতে কী যে করবে, প্রথমটা ভেবে পেল না। পরক্ষণেই প্রায় ছৌ মেরে মেরিকে 
কাধে তুলে এক চক্কর ঘুরিয়ে বলল, “তুনে, কামাল কর দিয়া, কমপ্লিট কামাল কর দিয়া-_” 

ঘুরপাক খেতে-খেতে মেরি ঠেঁচাতে লাগল, “ছাড়ো-ছাড়ো, পড়লে হাড় গোড় ভেঙে যাবে।' 

মেরিকে নামিয়ে দিয়ে জোহন বলল, 'একদিনে পীচটা গান তুলেছ, দেখেশুনেও বিশ্বাস হচ্ছে 
না। আমার মাথাটা তুমি বিলকুল ঘুরিয়ে দিয়েছ। 


১১৮ পাঁচটি উপন্যাস 


পরের দিন থেকে সকালে হাবিবকে তালিম দিয়ে বিকেল থেকে মেরিকে নিয়ে পড়ল জোহন। 
এবং চোদ্দো দিনে ইউ পি, এম পি-র সেই পরিচয়হীন ভবঘুরে গানের দলগুলোর কাছ থেকে যত 
গান মনে করে রেখেছিল, সব মেরিকে শিখিয়ে দিল। 


পুরো একুশ দিন বাদে ডাক্তার গিল্ডারের কাছ থেকে আবার ব্যান্ডপার্টিতে বাজাবার অনুমতি 
পাওয়া গেল। এখন জুনের মাঝামাঝি । আরব সাগর পাড়ি দিয়ে বন্ধে সিটিতে বর্ধা এসে গেছে। 
প্রায়ই ঝৌপে-ঝৌপে বৃষ্টি আসছে। আকাশ জুড়ে চাংড়া-চাংড়া জলবাহী ভারী মেঘ অনড় হয়ে আছে। 
এ-সময়টা ব্যান্ডওলাদের পক্ষে অফ সিজন অর্থাৎ ব্যাবসাপত্র খুবই মন্দা চলছে। এখন কচিৎ কখনও 
এক-আধটা বায়না আসে। যা-ও আসছে, বর্ষাটা পুরোদমে শুরু হয়ে গেলে তা-ও আসবে না। জোহন 
এবং আর দু-চারজন বাজিয়ে ছাড়া বাদবাকিদের পীঁচ-সাতদিনের মধ্যেই ছাড়িয়ে দেবে ইফতিকার 
সাহেব। সেদিকে এখন আর মন নেই জোহনের। মেরিকে নতুন গান-টান কী শেখানো যায়, সেই 
চিন্তাটাই সর্বক্ষণ তাকে পেয়ে বসেছে। অবশ্য এনিয়ে অনেক ভেবেছে সে এবং কিছু-কিছু উপায়ও 
ঠিক করে ফেলেছে। 

এর মধ্যে মেরিকে ইনস্টলমেন্টে একটা হারমোনিয়াম কিনে দিয়েছে জোহন। আর যেদিন 
ব্যান্ডপার্টির বায়না থাকে, সেই দিনগুলো বাদে অন্য দিনগুলো নতুন গানের জন্য গোটা বন্ে শহর 
চষে বেড়ায় সে। কোথাও গানের আসর বসেছে খবর পেলেই হল। সময় পেলে মেরিকে সঙ্গে 
নিয়েই সেখানে চলে যায়; নইলে একাই ছোটে। অবশ্য কোনও আসরেই তারা ঢুকতে পায় না। 
তার মতো ব্যান্ডপার্টির এক ফুলুটবালার পক্ষে টিকিট কেটে গানের আসরে ঢোকা সম্ভব নয়। তবে 
সব আসরেই মাইক-টাইক লাগানো থাকে। যারা টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতে পারে না, তাদের 
জন্য এই ব্যবস্থা। এর জন্য আসরের উদ্যোক্তাদের মনে-মনে হাজারবার ধন্যবাদ দেয় জোহন। যেদিন 
সে একলা আসে বাইরে কোনও নির্জন কোণে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে-ভিজতে খাপ থেকে 
ক্লযারিওনেটখানা বার করে আন্তে-আস্তে বাজিয়ে গানটা তুলে নেয়। তারপর ঝোপড়পষ্টিতে ফিরে 
মেরিকে শিখিয়ে দেয়। যেদিন মেরিকে সঙ্গে আনে, সেদিন আসরের গায়ক বা গায়িকার সঙ্গে নীচু 
গলায় গেয়ে-গেয়ে গানটা তুলে নিতে বলে। 

নতুন গানের সন্ধানে শুধু আসরে-আসরেই ঘুরে বেড়ায় না জোহন। বম্বে শহরে এখনও 
ভবঘুরে গানের দল ইউ পি, এম পি বা রাজস্থান থেকে এসে হাজির হয়। রাস্তা, ময়দান বা বাহাত্তর 
ইঞ্চি জলের পাইপের ভেতর থেকে তাদের খুঁজে-খুঁজে বার করে গান তুলে আনে । তা ছাড়া তাদের 
আনারকলি ব্যান্ডপার্টিতে হরিয়ানার একটা বাজনদার আছে। জোহনেরই সমবয়সি হবে, নাম শৈলেন্দ্। 
দলে সে সাইড ড্রাম বাজায়। শৈলেন্দ্রর একটা বড় গুণ, সে ভালো গান লিখতে পারে। তার খাতা 
থেকে গাদা-গাদা গান লিখিয়ে এনে, মেরি আর সে দুজনে মিলে সুর দিয়ে নিয়েছে। এতেও খুশি 
না জোহন। মেরির জন্য আরও-_আরও আরও নতুন ধরনের, নতুন মেজাজের গান তার চাই। 
তারই খোঁজে সে আরও অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। একদিন এই নিয়ে একটা কাণ্ড ঘটে গেল। 

জোহন খবর পেয়েছিল বন্বের এক ক্রোড়পতি বিজনেসম্যান পালি হিলের. এক বাংলো 
বাড়িতে লক্ষৌয়ের এক খুবসুরত বাঈজিকে এনে রেখেছে। সন্ধ্যায় সেখানে গঞ্জল আর ঠুংরি গানের 
আসর বসে। শোনামাত্র জোহন আর দেরি করল না। ক্ল্যারিওনেটের বাক্সটি কাধে চাপিয়ে সেখানে 
হানা দিল। বিরাট কম্পাউন্ডওলা বাংলোটার চারধারে খাড়া পাঁচিল। লোহার ফটকে রাইফেল ঘাড়ে 
সাত ফুট লম্বা, ইয়া চওড়া, গালে গালপাট্টা এক রাজপুত দারোয়ান খাড়া দাড়িয়ে আছে। সুতরাং 
এরি রীতি রসে রিযাগ্রারারাররািনরারা রা রা 
জমে | 


হঠাৎ বসস্ত ১১৯ 


অস্থিরভাবে বাড়িটার চারপাশে বার দুই চক্কর দিল জোহন। তারপর ফটকটা যেদিকে, তার 
উপ্টোদিকের কম্পাউন্ড-ওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ল। 

বাংলোটা একতলা, ওপরে টালির ছাদ। সামনের দিকের একটা গোটা ঘরের সবটুকু মেঝে 
জুড়ে লাল গালিচা পাতা । তার মাঝখানে চৌধবি কি টাদের মতো বসে লম্ষ্মৌবালী বাঈজি একটা 
চটকদার ঠুংরি গাইছিল। তার দু-ধারে দুই সারেঙ্গিদার আর তবলচি। বাঈজির সামনে ক্রোড়পতি 
ব্যাবসাদার আর তার দু-চারজন বন্ধুবান্ধব; সবারই হাতে হুইস্কির গেলাস। 

বাইরে কেয়ারি করা ফুলের বাগান, চমৎকার লন, পাম আর ঝাউ গাছ, নানারকম অর্কিড 
আর দুষ্প্রাপ্য ক্যাকৃটাস। 

একটা বড় সিলভার পামের আড়ালে দাড়িয়ে ভেতরে একবার উকি দিল জোহন। তার 
পক্ষে বাঁচোয়া, বাইরের লনে বা বাগানে এখন আলো-টালো জুলছে না। 

দারুণ গাইছে বাঈজি। গলায় আতশবাজির ফুলকি না কি খুসবুওলা রক্তগোলাপ ফুটিয়ে 
যাচ্ছে সে। সম্মোহিতের মতো ক্ল্যারিওনেটটা বার করে আস্তে-আস্তে বাজিয়ে গান এবং সুর তুলতে 
লাগল জোহন। তুলতে-তুলতে এমন বুঁদ হয়ে গেল যে, কোথায় কীভাবে এসে ঢুকেছে সব বেমালুম 
ভূলে গেল। প্রায় নাচের ভঙ্গিতে দুূলে-দুলে এবং বেশ -জোরে-জোরেই বাজাতে লাগল সে। 

জোহনের ক্ল্যারিওনেটের বাজনা বোধহয় ভেতরের লোকেরা শুনতে পেয়েছিল। কেউ একজন 
ভারী মোটা জড়ানো গলায় ঠেঁচিয়ে উঠল, “কৌন রে-_' 

নেশাচ্ছন্্নের মতো বাজিয়ে যাচ্ছিল জোহন। মুখ থেকে ক্ল্যারিওনেটটা নামিয়ে সে বলল, 
'ম্যায়__জোহন ফুলুটবালা। বাহ্‌, ক্যা সঙ্গীত! ওয়ান্ডারফুল!' বলেই ক্ল্যারিওনেটটা তুলে আবার 
বাজাতে শুরু করল। 

পাচ সেকেন্ডও কাটল না, বাইরের লনে বাগানে পীচশো ওয়াটের দশ-বারোটা আলো পটাপট 
জুলে উঠে জোহনের চোখ ধাঁধিয়ে দিল। পরক্ষণেই অনেক লোকের চিৎকার টেঁচামেচি শোনা গেল। 
দেখা গেল, বিজনেসম্যান এবং তার বন্ধুরা টলতে-টলতে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তারা টেচাচ্ছিল, 
“এ শুয়ারকা বাচ্চা, কৌন তু? এ দারোয়ান চোট্টা ঘুষা। পাকড়ো শালেকো, সন অফ বিচকো। ফায়ার__ 
শুট হিম” 

ওধার থেকে সাত ফুট লম্বা রাজপুত দারোয়ান রাইফেল উঁচিয়ে হই-হই করতে-করতে ছুটে 
আসছে। 

প্রচণ্ড একটা ঝাকুনি ঘেয়ে আচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল জোহনের। ক্ল্যারিওনেটটা আর খাপে 
পোরার সময় পাওরা গেল না; কোনওরকমে সে দুটো কাধে ফেলে উর্ধ্বশ্বাসে ফুলবাগান মাড়িয়ে 
অর্কিডের মাথা গুঁড়িয়ে পেছন দিকে ছুটল; তারপর পাঁচিল টপকে বাইরের রাস্তায়। রাস্তায় নেমেও 
সে থামল না। প্রায় মাইলখানেক দৌড়ে সমুদ্রের ধারে এসে জলের কাছাকাছি একটা উচু টিবির 
ওপর বসে আধঘণ্টা হাপাল। তারপর পুরো ঘটনাটা আগাগোড়া একবার ভেবে নিয়ে খুব একচোট 
হাসল। 


জুনের মাঝামাঝি থেকে গোটা আগস্ট মাস অর্থাৎ বম্বে শহরে বর্ষার আয়ু মোট আড়াই 
মাস। দেখতে-দেখতে এ বছরের মতো এ-শহর থেকে বর্ষা বিদায় নিল। এই আড়াই মাসে কয়েক 
শো গান শিখেছে মেরি। আর বর্ধা কাটবার পর, আবার ব্যান্ডপার্টিগুলোর নতুন মরশুম শুরু হয়েছে। 
দুটো একটা করে বায়না আসছে। তার মানে মেরির গান-টানের ব্যাপারে এখন রোজ সময় দিতে 
পারছে না জোহন। 

একদিন কল্যাণে জোহনদের দল বাজাতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ঝোপড়পন্টরিতে ফিরতে 


১২০ পাঁচটি উপন্যাস 


বেশ রাত হয়ে গেল। খাওয়া-দাওয়ার পর যথারীতি সে বাইরের বারান্দায় শুয়েছে, মেরি শুয়েছে 
ঘরের ভেতরে। 

রোজই ঘুমিয়ে পড়ার আগে দুজনে দু-জায়গায় শুয়ে কিছুক্ষণ গল্প-টল্স করে। ব্যান্ডপার্টির 
সঙ্গে বাজাতে বেরিয়ে কোথায় তারা গিয়েছিল, সারাদিনে কী-কী ঘটেছিল, রাত্রে শুয়ে-শুয়ে সব 
মেরিকে বলে জোহন। 

আজ কল্যাণের যাবতীয় ঘটনা বলে যাচ্ছিল জোহন। সেখানে এক মাড়োয়ারি শেঠের নাতনির 
জন্মদিনে তারা বাজাতে গিয়েছিল। সেখানে কী-কী মজাদার ঘটনা ঘটেছে, তার ফিরিস্তি দিতে-দিতে 
হঠাৎ তার মনে হল মেরি বোধহয় শুনছে না। একটু থেমে সে বলল, “কি, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? 

মেরি উত্তর দিল না। 

আরও দু-চারবার ডাকাডাকির পর মেরির যখন সাড়া পাওয়া গেল না, তখন চুপ করে 
গেল জোহন। পাক্কা বারো ঘণ্টা পরিশ্রমের পর তার চোখ বুঁজে আসছিল। নেহাত সারাদিনের ঘটনা 
মেরি জানতে চায় বলেই সে বলে যাচ্ছিল। এখন মেরিই ঘুমিয়ে পড়েছে; কাকে আর বলবে। 

ঘুমটা যখন প্রায় গাঢ় হয়ে এসেছে, সেইসময় কানের কাছে অস্পষ্ট স্বর শুনতে পেল জোহন, 
“এই ফুলুটবালা, ঘুমোলে নাকি? 

ধড়মড় করে উঠে বসল জ্বোহন। চোখ রগড়াতে-রগড়াতে জড়ানো গলায় কিছুটা উদ্বেগ 
মিশিয়ে বলল, “কী হয়েছে? 

“কিছু হয়নি। 

প্রায় তিন মাসের মতো এই ঝোপড়পন্রিতে তার এই ঘরখানায় আছে মেরি। একটা পলকা 
ভেজানো দরজার এধারে ওধারে দুজনে শুয়ে থাকে। কিন্তু কোনও দিনই দরজা খুলে রাত্রিবেলা বেরিয়ে 
আসেনি মেরি। আজ কী হয়েছে তার? বিমূঢের মতো জোহন জিগ্যেস করল, “তা হলে? 

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল মেরি। তারপর বলল, “তোমার সঙ্গে একটা কথা আছে।' 

“বলো। তার আগে আলোটা জেলে দাও।, 

“আলো জ্বাললে বলতে পারব না।' 

হতভন্বের মতো জোহন এবার জিগ্যেস করল, “কী এমন কথা যে আলোতে বলা যায় না? 

আবার খানিকক্ষণ চুপ। তারপর মেরি বলল, “তোমার কাছে অনেকদিন থেকে গেলাম। 
ভেবেছিলাম, তুমি ভালো হয়ে গেলে চলে যাব। কিন্তু গান-টান শিখতে-শিখতে যাবার কথা মনে 
ছিল না। এখন আমি কী করব? 

“কী আবার করবে, আমি কি তোমাকে যেতে বলেছি! 

“কিন্তু আমাব এভাবে থাকতে ইচ্ছে করছে না।' 

“তবে কীভাবে গ'কল্ত চাও? 

বলতে সাহস হচ্ছে না! 

হঠাৎ জোহনের মনে শ্ড়ল, এই আড়াই মাসে গান 'শেখাবার ফাকে-ফাকে অন্যমনক্কর মতো 
তাকিয়ে থেকেছে মেরি এবং কী যেন বলতে চেয়েছে । তখন খেয়াল করেনি জোছন। সে বলল, 
“আমি আবার একটা মানুষ! আমাকে যা ইচ্ছে বলা যায়।' 

'তুমি তো শুনেছ আমি খুব খারাপ। তবু মেয়েই তা। আমার কি কোনও সাধ-টাধ থাকতে 
নেই?, 


বুঝতে না পেরে অন্ধকারে অবাক তাকিয়ে রইল জোহন। 

মেরি যেন ঘোরের মধ্যে বলে যেতে লাগল, “এতগুলো বছর চোর-গুন্ডা-বদমাশদের সঙ্গে 
ঘুরে-ঘুরে নষ্ট হয়ে গেছে। তোমার এখানে আসার পর দিনের পর দিন ভাবছি, অন্য মেয়েদের 
মতো আমারও তো ঘর-সংসার হতে পারে। আমার মতো একটা নোংরা গান্ধা মেয়েকে তুমি বাঁচাবে 


হঠাৎ বসস্ত ১২১ 


ফুলুটবালা? 

জোহন অন্ধকারেই তার কাধ ছুঁয়ে বলল, “তুমি কি বিয়ের কথা বলছ?” 

আচমকা একরোখা জেদী পোড়-খাওয়া মেরি জোহনের বুকে মুখটা ঘবতে-ঘবতে ফুঁপিয়ে 
উঠল, “হাঁ হাঁ হী, 

জোহনের কাছে এসে যে মমতা, যে নিরাপত্তা সে পেয়েছে, তা আর ছেড়ে যেতে চায় 
না। বহুকাল অবরুদ্ধ হয়ে থাকার পর তার সাধ আর ইচ্ছা বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়েছে। 

জোহন হকচকিয়ে গেল। সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ বছরের জীবনে কোনও যুবতী মেয়ে তাকে 
এ-জাতীয় কথা কখনও বলেনি । প্রথম চমকটা কেটে যাবার পর, জলোচ্ছাসের মতো দুরস্ত এক 
আবেগ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল যেন। সে বলল, “কিন্তু আমি একটা ওল্ড ম্যান, চুল 
দাড়িতে পাক ধরে গেছে। ক'দিনই বা বাঁচব! 

হাত দিয়ে জোহনের মুখটা চেপে মেরি বলল, "ওসব কথা বলতে হবে না; ওল্ড ম্যানই 
আমার ভালো । তুমি যদি বিয়ে না করো বুঝব আমি খারাপ মেয়ে বলে তুমি আমাকে নফরত (ঘেন্না) 
করছ।' 

“আরে না-না। তোমাকে আমি নফরত করব! কী বলছ মেরি! জখম হয়ে আসার পর আমার 
জন্যে তুমি যা করেছ, কেউ কখনও তা করেনি। কিন্তু আমি যে অন্য কথা ভাবছিলাম-_”' 

“কিছু ভাবতে হবে না। আগে আমাকে কথা দাও” 

জোহন বার-বার বোঝাতে চেষ্টা করে সে বুড়ো মানুষ, জীবনের লম্বা দৌড় প্রায় শে করে 
এনেছে, মেরির মতো একটা টাটকা তাজা কলাকার মেয়ের উচিত হবে না তার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। 
তাকে বিয়ে করা মানে জীবনটাকে ডাহা নষ্ট করা। জোহনই একটা ভালো রোজগেরে যুবক খুঁজে 
পেতে মেরির বিয়ে দেবে। ঝৌকের মাথায় কোনও কাজ করা ঠিক না। কিন্তু কে কার কথা শোনে। 
মেরি ক্রমাগত জোহনের বুকে মুখ ঘষতে-ঘবতে বলে যেতে লাগল, “কথা দাও, আগে কথা দাও । 
একটা একরোখা দুঃখী মেয়ের প্রবল ইচ্ছা আর জেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে-করে একসময় হেরে গেল 
সে। হাল ছেড়ে দেবার মতো করে বলল, “ঠিক আছে, কথা দিলাম। পরে কিস্ত তোমাকে আপশোশ 
করতে হবে। আর একটা কথা-_ 

“কী? 

“বিয়েটা কিন্ত এখন হবে না।' 

বুকের ভেতর থেকে মুখটা বার করে এনে উৎকঠিতের মতো তাকাল মেরি। জোরে শ্বাস 
টেনে বলল, “কবে হবে 

জোহন বলল, “এত গান শিখলে, এখনও তো অনেক কাজ বাকি।' 

“কী কাজ?, 

তুমি যে এত ভালো গাও, সেটা তো শুধু আমি একলা জানি। হোল ওয়াল্ডকে তা জানাতে 
হবে না? বিয়ে-ফিয়ের চক্করে এখনই ফেঁসে গেলে এতদিনের এত খাটুনি সব জলে যাবে । 

কী করতে চাও তুমি? 

এখনও ভেবে উঠতে পারিনি । দেখি কিছু একটা প্ল্যান এসে যাবে। যাও, অনেক রাত হয়েছে, 
এখন শুয়ে পড়ো গিয়ে।” 


মেরির ভাবনাটা ক'দিন ধরে অস্থির করে রেখেছে জোহনকে। ডান্ডা কোস্টের ঝোপড়পন্ট্রিতে 
ষাট স্কোয়ার ফুটের একটা ঝোপড়িতে ওইরকম চমৎকার একটা গানের গলা নষ্ট হয়ে যাবে, কিছুতেহ 
সে এটা মেনে নিতে পারছিল না। এই আশ্চর্য সুরেলা করঠস্বরটিকে সারা ইন্ডিয়ার ঘরে-ঘরে পৌঁছে 


প্রফুল্ল রায়- পাঁচটি উপন্যাস-_-১৬ 


১২২ পাঁচটি উপন্যাস 


না দেওয়া পর্যন্ত, কোনও কিছুতেই জোহন আরাম বোধ করছিল না। কিন্তু তার মতো ব্যান্ডপার্টির 
এক নগণ্য ফুলুটবালার পক্ষে কতটুকু কী করাই বা সম্ভব! ভাবতে-ভাবতে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো 
পাটিল সাহেবের কথা মনে পড়ে গেল। “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র ইফতিকার সাহেবের দৌলতে 
তার সঙ্গে জোহনের আলাপ হয়েছে। পার্টিল সাহেব একটা রাজনৈতিক দলের লিডার স্থানীয় লোক; 
বড়-বড় জায়গায় তার যাতায়াত; অনেক মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার যোগাযোগ। জোহনকে 
তিনি ভালোই চেনেন; বহুবার তার বাজনার তারিফ করেছেন। 

মনে-মনে সঠিকভাবে একটা কিছু ভেবে প্রভাদেবীতে পাটিল সাহেবের বাড়ি গিয়ে হাজির 
হল জোহন। পাটিল সাহেব বাড়িতেই ছিলেন এবং মেজাজটাও তার তখন বেশ ভালোই মনে হচ্ছিল। 
তবে জোহনের বেশ ভয় হচ্ছিল পাটিল সাহেব এখন তাকে চিনতে পারবেন কি না। নিজের অভিজ্ঞতা 
থেকে জোহন জেনেছে অনেকে বাইরে একরকম, বাড়িতে আরেক রকম। বাইরে হেসে-হেসে কথা 
বললেও বাড়িতে গেলে বিরক্ত হন। সেই কারণে তার বুকটা টিবটিব করছিল। 

কিন্ত জোহনের ভয়ের কোনও কারণ পাটিল সাহেবের ক্ষেত্রে অস্তত ছিল না। দেখামাত্রই 
তিনি তাকে চিনতে পারলেন এবং একটু অবাকও হলেন। জোহন যে তার বাড়ি পর্যস্ত আসতে 
পারে, এটা বোধহয় কখনও তিনি ভাবেননি। 

যাই হোক হাসিমুখেই পাটিল সাহেব বললেন, “আরে জোহন যে! আয়-আয়, বোস।' 

পাটিল সাহেব তার বসবার ঘরে একটা সোফায় বসেছিলেন। জোহন মেঝেতে পাটের তৈরি 
কার্পেটের ওপর বসল। 

পাটিল সাহেব এবার বললেন, শুনেছিলাম ইলেকশানের রেজাণ্ট বেরুবার দিন পাথরের 
ঘায়ে তুই জখম হয়েছিলি। এখন কেমন আছিস? 

“ভালো।' 

“আমার কাছে কিছু দরকার আছে? 

“জি।, | 

বলে ফ্যাল।' 

মেরিকে নিজের বিস্তাদার অর্থাৎ আস্ত্রীয় এই পরিচয় দিয়ে, জোহন সংক্ষেপে তার গানের 
গলা সম্বন্ধে দশগুণ রং চড়িয়ে উচ্ছৃসিতভাবে বলে গেল। এই ভূমিকাটুকু করে সেই সঙ্গে যা জুড়ে 
দিল, তা এইরকম-_তারা নেহাতই গরিব মানুষ, ভেরি পুওর পিপল। সে কারণে মেরি কোথাও 
কোনও সুযোগ পাচ্ছে না। এখন মেহেরবানি করে পাটিল সাহেব যদি একটা সুযোগ করে দেন 
তো, তারা চিরদিন তার গোলাম হয়ে থাকবে। এই জন্যেই সে তাকে বিরক্ত করতে এসেছে। 

সব শুনে পাটিল সাহেব বললেন, “কিন্তু তুই তো জানিস আমি পলিটিক্যাল ওয়ার্কার, পার্টি- 
টা্টি করে বেড়াই। গান-বাজনার ব্যাপার কিছুই জানি না।” 

“আপনার সঙ্গে তো অনেকের আলাপ। মেহেরবানি করে যদি কোনও বেকর্ড কোম্পানি 
কি সিনেমার মিউজিক ডিরেক্টরকে বলে দ্যান। একটা চাল পেলে মেরি কামাল করে দেবে। 

“রেকর্ড কোম্পানি বা ফিল্মের মিউজিক ডিরেক্টর কারও সঙ্গেই তো আমার জানাশোনা 
নেই রে।' 

অনেক আশা নিয়ে পাটিল সাহেবের কাছে ছুটে এসেছিল জোহন। তার কথায় অত্যন্ত অসহায় 
বোধ করল সে। হতাশ সুরে বলল, “তা হলে? 

পাটিল সাহেব উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন। আচমকা কী মনে পড়তে একটু থেমে বল্লেন, “এক 
কাজ কর না__, 

জোহন উৎসুকভাবে তাকাল। 

পার্টিল সাহেব বলতে লাগলেন, “ “বু হেভেন' হোটেলের নাম শুনেছিসঃ 


হঠাৎ বসস্ত ১২৩ 


“ওরলির সেই বিরাট হোটেলটা তো? 

হ্যা। ওর ম্যানেজার সামতানি সাহেব আমার খুব বন্ধু। তাকে একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি; 
মেরিকে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা কর। হোটেলে তো ক্রুনার মানে গাইয়ে-টাইয়ে দরকার হয়। দ্যা 
যদি একটা গাইয়ের কাজ ওখানে হয়ে যায়। নানা ধরনের লোক হোটেলে আসে, তেমন কারও 
নজরে পড়ে গেলে বড় চান্স পেয়ে যাবে। তখন তোরা, যা চাস তাই হতে পারে।' 

পাটিল সাহেবের এই কথাটা মনে ধরল জোহনের। ঝোপড়পষ্রিতে পড়ে থাকার চাইতে 
হোটেলে গাইলেও, অনেক লোক মেরির গান শুনতে পাবে। মেরি যে একজন দারুণ গুণী কলাকার, 
সে-কথা সবাই একসঙ্গে জানতে না পারলেও কিছু লোক অন্তত জানুক। অত্যন্ত আগ্রহের সুরে 
সে বলল, নিশ্চয়ই হতে পারে। আপনি মেহেরবানি করে চিঠিটা লিখে দিন।' 


দিনতিনেক বাদে মেরিকে সঙ্গে করে ওরলির “হোটেল ব্লু হেভেনে'-র সামনে এসে হাজির 
হল জোহন। নতুন এই হোটেলটার নামই শুনেছে সে, চোখে এই প্রথম দেখল। আর দেখেই ভিরমি 
খাবার জোগাড় । কেন না ফাইভ স্টার এই হোটেলটা প্রকাণ্ড এবং ফুল্লি এয়ার কন্ডিশন্ড। জোহন 
গুনে-গুনে দেখল বাড়িটা আঠারো তলা। গোনা শেষ হলে নিজের দিকে তাকাল সে; গায়ে রক্তের 
ছ্যাকড়া দাগ ধরা ব্যান্ডপার্টির সেই ড্রেসটা রয়েছে। এই পোশাকে ভেতরে যাওয়া যাবে কি না, 
ভাবতে-ভাবতে গলগল করে ঘামতে লাগল জোহন। আড়চোখে সে লক্ষ করল মেরিও ভীষণ নার্ভাস 
হয়ে পড়েছে, সেও দারুণ ঘামছিল। 

জোহন একবার ভাবল ফিরেই যায়। পরক্ষণে তার মনে হল, এতদূর যখন চলে এসেছে 
দেখাই যাক কী হয়। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে হয়তো বার করে দিতে পারে, কিন্তু মেরে তো আর ফেলবে 
না। বুক, কপাল আর বাহুসন্ষি ছুঁয়ে গুনে-গুনে বার তিনেক ক্রস এঁকে, ভেতরে-ভেতরে খানিকটা 
শক্তি সঞ্চয় করে নিল সে। তারপর মেরির একটা হাত ধরে হোটেলের বিশাল ফটকে চলে এল। 
দারোয়ানরা কিন্তুৃত পোশাকের জোহনকে কিছুতেই ভেতরে ঢুকতে দেবে না; জোহনও ঢুকবেই। শেষ 
পর্যস্ত পাটিল সাহেবের চিঠিখানা মুশকিল আসানের কাজ করল। ওটার জোরেই ম্যানেজারের বিশাল 
কম্পার্টমেন্টে ঢুকতে পারল জোহনরা। 

ম্যানেজার সামতানি সাহেবের বিশাল মাংসল শরীর, চৌকো মুখ, গোল চোখ, লালচে পাতলা 
চুল, ভারী থুতনি, হাত-পায়ের হাড় মোটা-মোটা, গায়ের রং লালচে। দেখেই বোঝা যায় লোকটার 
হাই ব্লাড প্রেসার। 

জোহন এবং মেরির পা থেকে চুলের ডগা পর্যন্ত দ্রুত একবার দেখে নিয়ে সামতানি সাহেব 
বললেন, “তুমি জোহন আর তুমি মেরি? 

“জি-_' মেরি ও জোহন মাথা নাড়ল। 

“পাটিল সাহেব কাল আমাকে তোমাদের সম্বন্ধে ফোন করেছিলেন। আজই এবং এখনই মেরির 
দু-একটা গান শুনতে চাই; মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে গাইতে হবে। জানোই তো, হোটেলের ক্রুনারদের 
কাস্টমারদের সামনে মাইকে দাড়িয়ে গাইতে হয়। যাক, যদি গান ভালো লাগে, আজই আ্যাপয়েন্টমেন্ট 
পেয়ে যাবে। ভালো না লাগলে কিন্তু আমার পক্ষে কিছু করা সম্ভব হবে না।' 

চিঠি লেখার পরও পাটিল সাহেব সামতানি সাহেবকে ফোন করেছিলেন। এর জন্য কৃতজ্ঞতা 
বোধ করল জোহন। কিন্তু সেই সঙ্গে বুকের ভেতর টিবটিবানিটা হঠাৎ বেড়ে গেল। মেরির গান 
যদি সামতানি সাহেবের ভালো না লাগে? ঘাড় ফিরিয়ে জোহন দেখল, মেরির কপালে ঘাড়ে গলায় 
এই এয়ার-কন্ডিশভ্ড ঘরে বসেও দানা-দানা ঘাম জমে উঠেছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে তাড়াতাড়ি মুছে 
ফেলছে সে; পরক্ষণেই আবার ঘামের দানা জমে উঠছে। মেয়েটা খুবই নার্ভাস হয়ে পড়েছে, বোঝা 


১২৪ পাঁচটি উপন্যাস 


যাচ্ছে। তাকে সাহস দেবার জন্য তার কানের কাছে মুখ নিয়ে জোহন বলল, “ঘাবড়াবার কিছু নেই৷ 
আরে আমি তো সঙ্গে আছি।' বলতে-বলতে নিজেরই গলাটা শুকিয়ে কেমন যেন বেখাপ্লা শোনাতে 
লাগল। 

ওদিকে সামতানি সাহেব টেলিফোনের ইন্টারন্যাল কানেকশনে কাকে যেন কী নির্দেশ দিলেন। 
তারপর দু-মিনি্ট যেতে-না-যেতেই যোহনের দিকে ফিরে বললেন, “এসো আমার সঙ্গে। 

সামতানি সাহেবের গায়ের সঙ্গে ছায়া হয়ে একটা লিফটে কিছুক্ষণের মধ্যে জোহনরা যেখানে 
এসে ঢুকল, সেটা ছ'ইঞ্চি পুরু কার্পেটে মোড়া একটা ব্যাঙ্কুয়েট হল। আপাতত সেখানে একজন 
তবলচি, একজন হারমোনিয়ামওয়ালা এবং একটা মাইক রয়েছে। ডাইনে-বাঁয়ে এবং সামনের দেওয়াল 
ঘেঁষে সারি-সারি ফোমের চেয়ার! 

মাইকের উলটোদিকের একটা চেয়ারে গিয়ে বসলেন সামতানি। মেরিকে বললেন, “মাইকে 
গিয়ে গাও 

অর্থাৎ এখন তিনি মেরির ভয়েস টেস্ট করে নিতে চান। 

জোহন একধারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল; তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। মেরি এক পলক 
তার দিকে তাকাল। নিজের অবস্থাই তার শোচনীয়, তবু তারই মধ্যে ঈষৎ মাথা হেলিয়ে জোহন 
সাহস দেবার ভঙ্গিতে বলল, ঠিক আছে, গাও।, 

বলেই নিজেই অজান্তে কপাল বুক ছুঁয়ে ক্রস আঁকল। 

মেরি মাইকের পেছনে গিয়ে খানিকক্ষণ দম বন্ধ করে রইল; তারপর চোখ বুঁজে জোহনের 
সেই প্রিয় গানটা “ও পুরর্বৈয়া মাতৃ যা, মাত্‌ যা” দিয়ে শুরু করল। প্রথম দিকে দু-এক সেকেন্ডের 
জন্য তার স্বরটা কেঁপে উঠেছিল; তারপরেই তার গলায় কে এক জাদুকরী ভর করে ম্যাজিক দেখিয়ে 
যেতে লাগল। 

মেরির দিক থেকে চোখে সরিয়ে কদ্ধম্ীস সামতানি সাহেবের দিকে তাকাল জোহন। তাঁর 
ওপর মেরির গানের প্রতিক্রিয়াটা কী হচ্ছে সেটাই জানার ইচ্ছা আর কি। দেখা গেল চোখ বুঁজে 
সামতানি সাহেব গানের সঙ্গে তাল দিয়ে পা দোলাচ্ছেন। অর্থাৎ লোকটা ইদূুরকলে পড়ে গেছে; 
সেখান থেকে আর বেরুবার উপায় নেই। 

গান থামলে সামতানি সাহেব চোখ বুঁজেই বললেন, “আরেকটা হোক-__' 

আরেকটাই শুধু নয়, পরপর আরও সাতটা গান গাইতে হল মেরিকে। তারপর সামতানি 
সাহেবের সঙ্গে আবার তারা নীচে তার কম্পার্টমেন্টে এল। সামতানির মনোভাবটা কী ঠিক বোঝা 
যাচ্ছে না বলেই জোহনের শ্বাস-প্রশ্থীস স্বাভাবিক হতে পারছে না। এই শহরে আরব সাগরের এত 
অফুরস্ত বাতাস, তবু জোহনের মনে হচ্ছে বুক ভরে শ্বাস টানার পক্ষে তা যথেষ্ট নয়। 

নিজের কম্পার্টমেন্টে এসে প্রথমেই জোহনরা কোথায় থাকে, তাদের ঠিকানা কী, মেরির 
পুরো নাম ইত্যাদি জেনে নিয়ে ইন্টারন্যাল কানেকশনে কাকে যেন কী নির্দেশ দিলেন সামতানি। 
তারপর জোহনদের দিকে ফিরে বললেন, কী খাবে বলো? সফ্ট ড্রিংক আনতে বলি? 

লক্ষণগুলো ভালোই মনে হচ্ছে। বুক ভরে শ্বাস টেনে জোহন বিগলিত হাসল, “স্যার, আপনি 
যা খাওয়াবেন, তাই খাব।, | 

সামতানি সাহেব বোতাম টিপে একটা বয়কে ডেকে সফট ড্রিংক দিয়ে যেতে ৰললেন। তার 
একটু রাদেই একটা মধ্যবয়সি লোক টাইপ-করা একটা কাগজ নিয়ে এল। ম্যানেজার তাতে সই করে 
মেরিকে দিতে-দিতে বললেন, “এটা তোমার আ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। তিন মাস তোমার ট্রেনিং পিরিয়ড, 
এখন চারশো টাকা করে পাবে। তারপর দু-মাস প্রবেশনার হয়ে থাকবে। সেটা কাটাবার পর তোমাকে 
পার্মানেন্ট করে নেওয়া হবে। প্রবেশনার হিসেবে তোমার মাইনে হবে ছ*শো, পার্মানেন্ট হলে আটশো। 
উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক। 


হঠাৎ বসস্ত ১২৫ 


রে খুশিতে উত্তেজনায় মেরি এবং জোহন একইসঙ্গে বলে উঠল, “থ্যাংক ইউ স্যার, থ্যাংক ইউ 
ভেরি মাচ।' 

সামতানি সাহেব খুব একটা উচ্ছাস দেখালেন না। সহজভাবে -বললেন, “ডিউটি আওয়ার্সটা 
মনে রাখবে; বিকেল পাঁচটা থেকে রাত এগোরোটা। 

মেরি জোহন সমস্বরে এবারও বলল, "ও-কে স্যার। 

এবার সোজা জোহনের দিকে তাকালেন সামতানি সাহেব, “আ্যান্ড ইউ-_-তোমাকে একটা 
কথা বলে দিচ্ছি। আমার এই হোটেলটা ফাইভ-স্টার। তোমার এই ইউনিফর্ম পরে এখানে আসা 
চলবে না কিন্তু। 

জোহন তৎক্ষণাৎ বলল, "আমার ভেতরে ঢোকার কী দরকার। আমি স্যার, উলটোদিকের 
ফুটপাথে এসে বসে থাকব। মেরির ডিউটি শেষ হলে ও আমার কাছে চলে আসবে । 

“ও-কে।' 

কিছুক্ষণ পর বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডের দিকে যেতে-যেতে মেরি বলল, “এ 
সবই তোমার জন্যে। শরাবি-ফরেবি-গুন্ডা-বদমাশদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। নরক থেকে তুমি আমাকে 
কোথায় তুলে এনেছ!' 

জোহন জোরে-জোরে হাত এবং মাথা নেড়ে বলল, “ছাড়ো ওসব কথা । আজ আমার কী 
আনন্দ যে হচ্ছে! ইচ্ছা করছে তোমাকে কাধে তুলে নাচতে-নাচতে ঝোপড়পন্রিতে ফিরে যাই।' 

নকল ভয়ে মেরি বলল, “আরে বাপরে, অমন ইচ্ছায় দরকার নেই।' 

বাস স্ট্যান্ডে এসে লম্বা কিউর পিছনে দাঁড়িয়ে পড়ল জোহনরা। 

মেরি গলা নীচু করে বলল, “সেই কথাটা মনে আছে তো? 

“কোনটা £ 

“তোমরা ইচ্ছা তো পূর্ণ হয়েছে; আমীর গান এবার লোকে শুনতে পাবে। যত তাড়াতাড়ি 
সম্ভব ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসে গিয়ে সব ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে কিস্তু।' 

সবে তো তোমার চাকরি হল। রেকর্ড হোক, রেডিওতে গাও, সিনেমায় প্লেব্যাক করো। 
তারপর তো আমার ইচ্ছা পূর্ণ হবে। 

মেরি রেগে গেল, “আমি তোমার কোনও কথা শুনব না। এক মাসের মধ্যে বিয়েটা যদি 
না হয়, আমি ঠিক চলে যাব।” 

মেয়েটা যেমন জেদী আর একরোখা, তেমনি অদ্ভুত এক ছেলেমানুষিও আছে তার। জোহনের 
বেশ ভালোই লাগল। এই মেয়েটা তাকে যেন ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে। এই ভেবে কিছুটা মজাও 
অনুভব করল সে। কিছু না বলে জোহন হেসে ফেলল। 

মেরি ঝাঝিয়ে উঠল, "হাসলে চলবে না। যা বললাম মনে রেখো।' 

জোহন তখনও হাসতেই লাগল। 


চাকরি হবার পর রোজ বিকেলে মেরি হোটেলে চলে আসে। যেদিন ব্যার্ডপার্টির কোনও 
বায়না থাকে না, সেদিন মেরির সঙ্গেই ঝোপড়পট্রি থেকে বেরিয়ে পড়ে জোহন। তারপর এদিক- 
সেদিক ঘুরে রাত এগোরোটা নাগাদ উলটোদিকের ফুটপাথে এসে দাঁড়ায়। আর যেদিন ব্যান্ডপার্টির 
বায়না থাকে, সেদিন বাজিয়ে-টাজিয়ে কথামতো ঠিক এগোরোটাতেই চলে আসে। 

চাকরি পাবার পর রাতের খাবারটা হোটেল থেকেই দেবার কথা। হোটেলে বসে খায় না 
মেরি। প্যাকেটে করে নিয়ে আসে। তারপর জোহনের সঙ্গে ঝোপড়পন্টিতে ফিরে গিয়ে দুজনে 
ভাগাভাগি করে খায়। হোটেল থেকে যে খাবারটা দেওয়া হয় একজনের পক্ষে তা যথেষ্টই। ওই 


১২৬ পাঁচটি উপন্যাস 


খাবারে মোটামুটি দুজনের কুলিয়ে যায়। 

দিন দশেক কাটবার পর হোটেল ম্যানেজার মেরিকে একটা রেকর্ড প্লেয়ার আর কিছু ওয়েস্টার্ন 
মিউজিকের রেকর্ড দিয়ে বলেছিল, “মেরি. যে ধরনের গান গায় সেগুলো খুবই ভালো, তবে হোটেল 
কাস্টমারদের ঝৌক উগ্র ওয়েস্টার্ন সং এবং মিউজিকের দিকে। ওই রেকর্ডগুলো থেকে সুরটুর চুরি 
করে মেরি যদি তার গানে ওয়েস্টার্ন টাচ দিতে পারে, তা হলে মাত করে দিতে পারবে।' 

রেকর্ড পাবার পর মেরি আর জোহন যতক্ষণ বাড়িতে থাকে, ততক্ষণ রেকর্ডপ্লেয়ার বাজিয়ে 
যায়। জোহন তার দলের সেই লোকটিকে দিয়ে, যার নাম শৈলেন্দ্র, অনেক গান লিখিয়ে এনেছে। 
তারপর সেই গানগুলোতে ওয়েস্টার্ন ঢঙে মিউজিক বসাচ্ছে। দিনকতক পর সেই সব গান হোটেলে 
গেয়ে দারণ নাম করে ফেলল মেরি। 

এ-সবের ফাকে-ফাকে মেরি কিন্তু সেই কথাটা ভোলেনি। ম্যারেজ রেজিক্ত্রীরের অফিসে বিয়ের 
নোটিশ দেবার জন্য রোজ জেদ ধরছে। 

শেব পর্যস্ত মেরির ইচ্ছাই জয়ী হল। সাস্তাক্রুজে এক ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন অফিসে গিয়ে 
বিয়ের নোটিশ দিয়ে এল জোহন। আর দিয়েই প্রথমে খবর দিতে গেল ইফতিকার সাহেবকে । 
ইফতিকার সাহেব সব শুনে প্রথমে একচোট হেসে নিল। তারপর বলল, “বহুত খুশিকা বাত। লেকিন 
গাধ্ধে কা পাঠ্‌ঠে একটা ছোকরিকে হাতের মুঠোয় পেয়েও নোটিশ দিতে চার মাহিনা কাটিয়ে দিলি!” 

জোহন ঘাড় চুলকোতে লাগল। 

ইফতিকার সাহেব আবার বলল, 'শাদি করছিস, ঠিক আছে। লেকিন এইটা তো দরকার।' 

আঙুল দিয়ে টাকা বাজাবার ভঙ্গি করল সে। 

জোহন হাসল, “হাঁ চাচা, ওটা ছাড়া কিছু হয় নাকি? 

“কোই বাত নেই, হাজার রুপেয়া আযাডভান্স পাবি। আর শাদির পরে পাঁচ রুূপেয়া করে 
মজুরি বাড়িয়ে দেব।, 

কৃতজ্ঞতায় গলা বুঁজে গেল জোহনের। কিছু একটা বলতে চেষ্টা করল সে, পারল না। 

ইফতিকার সাহেবের পেটে কোনও কথা থাকে না। মুহূর্তে তার মারফত এই খবরটা গোটা 
“আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'“ত ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে-সঙ্গে অন্য বাজিয়েরা তাকে ছেঁকে ধরল এবং 
নাচানাচি আর হুলুস্থুল জুড়ে দিল। সবাই দারুণ খুশি। 

সমস্বরে তারা টেঁচাতে লাগল, 'শাদি মুবারক হো, লেকিন ভোজটা না খাওয়ালে ছাড়চি 
না চাচা-_” 

যোহনকে দলের অন্য বাজনদাররা চাচা বলেই ডাকে। 

হেসে-হেসে জোহন বলল, “ঠিক আছে, ভোজ দেব।' 

এরপর ঝোপড়পষ্টিতে ফিরে সে সোমবারিকে খবরটা দিতে গেল। সব শুনে গালে একটা 
হাত রেখে চোখ গোল করল সোমবারি, “হাঁ! 

জোহন হেসে মাথা নাড়ল, 'হা।, 

উত্তর প্রদেশের একটা অশ্লীল ছড়া কেটে সোমবারি বলল, “তা হলে শেষ পর্যস্ত ফেঁসে গেলে 
ফুলুটবালা! আমি কিন্তু পয়লা দিনই বলেছিলাম, মনে আছে? 

'আছে।' 

সোমবারির পর গিল্ডারকে খবরটা দিয়ে নিজের ঝোপড়িতে ফিরল জোহন। ফিরেই মেরিকে 
বলল, “একটা কাগজ কলম নাও। 

মেরি অবাক। বলল, “কেন? 

বিয়ের নোটিশের খবরটা দিয়ে জোহন বলল, 'কাকে-কাকে ইনভাইট করবে, কী-কী খরচ 
হবে, তার লিস্ট করতে হবে না? 


হঠাৎ বসস্ত ১২৭ 


দুজনে মিলে অনেক খেটে-খুটে একটা তালিকা করে ফেলল। তারপর মেরি বলল, “আমি 
একটা কথা ভেবে রেখেছি।, 

“কী?, 

“বিয়েটা হয়ে গেলে তোমাকে আমি ব্যান্ডপার্টি থেকে ছাড়িয়ে আনব। আর ওই ব্যান্ডপার্টির 
ড্রেসটা পরে ঘুরে বেড়াতে দেব না। 

“ও ক্রাইস্ট, ব্যান্ডপার্টি ছাড়লে খাব কী!” 

“আমাদের হোটেলের ম্যানেজারকে বলে মিউজিক হ্যান্ডের একটা চাকরি জোগাড় করে দেব।' 

“মরে যাব। জোহন বলতে থাকল, “বিলকুল ডেথ্‌ হয়ে যাবে আমার। ব্যান্ডপার্টি ছাড়া 
লাইফে আর কিছু জানি না। এখন যদি অত বড় হোটেলে বাজাবার চাকরি নিই, স্রেফ দম আটকে 
যাবে।' 

“সে দেখা যাবে।' 


বিয়ের আর দিন পনেরো বাকি। 

১৯1-১১৯৯৭৭ নৃহনিনির ন্দ্র্রস্রররালানার 
রেজিস্ট্রেশন অফিসে চলে যাবে। এ-বিয়ের তিনজন সাক্ষী থাকবে-_ডাক্তার গিল্দার, আজবলাল আর 
ইফতিকার সাহেব। তারা অবশ্য যে-যার সুবিধামতো ম্যারেজ রেজিক্ট্রারের অফিসে চলে যাবে। সেখানে 
সই সাবুদ চুকিয়ে সবাই যাবে মাহিম চার্চে। চার্চে ব্যান্ডপার্টির লোকেরা এবং অন্যান্য গেস্টরা এসে 
অপেক্ষা করবে, শুভেচ্ছা জানাবার জন্য । সেখান থেকে সবাই যাবে মাঝারি গোছের একটা হোটেলে। 
ভোজ-টোজের ব্যবস্থা সেখানেই। 

দিনগুলো যেন নেশার ঘোরে কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু বিয়ের ঠিক পনেরো দিন আগে হঠাৎ 
তাল কেটে গেল। 

সেদিন রাত এগারোটায় “বু হেভেন হোটেল-এর উলটোদিকে যথারীতি দাড়িয়ে ছিল জোহন। 
মেরি তার ডিউটি শেষ করে বেরিয়ে এল। রাস্তা পেরিয়ে এধারে আসার আগেই জোহন দেখতে 
পেল, খুশি আর উত্তেজনায় মেরির চোখ চকচক করছে। ইদানীং সর্বক্ষণই দারুণ এক আনন্দের 
জোয়ারে ভাসছে মেরি। কিন্তু তার এই উত্তেজনাটা অন্যরকম। স্থির নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল 
জোহন। 

রাস্তা পেরিয়ে এপারে এল মেরি। জোহন কিছু বলবার আগেই উচ্ছাসের গলায় সে বলে 
উঠল, “জানো ফুলুটবালা, আজ একটা দারুণ ব্যাপার হয়েছে। তোমার আমার দু-জনের লাক এবার 
খুলে যাবে। 

“আচানক (হঠাৎ) কী ব্যাপার ঘটে গেল!” 

জোহন রীতিমতো অবাক। 

মেরি বলল, "আন্দাজ করো না।' 

“পারছি না। 

“আজ এক রেকর্ড কোম্পানির ম্যানেজার হোটেলে এসেছিল। আমার গান শুনে সে একেবারে 
যাকে বলে ম্যাড। তার ইচ্ছে আমাকে দিয়ে রেকর্ড করাবে।' 

জোহনের ইচ্ছা হল, সে এখুনি এই রাস্তায় হাত-পা ছেড়ে বন-বন করে কয়েক পাক নেচে 
নেয়। দারুণ খুশিতে তার হৃৎপিণ্ড যেন লাফাতে লাগল। সে বলল, “সছ্‌! 

“সচ্‌।" মেরি ঘাড় হেলিয়ে দিল, “সেবাস্টিয়ান সাহেব আমাদের ঠিকানা নিয়েছে। দু-চার দিনের 
মধ্যে কনট্রাক্ট করতে আসবে।' 


১২৮ পাঁচটি উপন্যাস 


জোহন বলল, “মেরি, তোমাকে কাধে তুলে নেচে নেব? 
“এই না-না, খবরদার না। 


দু-চারদিন পর নয়, ঠিক তার পরের দিনই একটা দামি বিদেশি গাড়িতে করে সেবাস্টিয়ান 
সাহেব সকালের দিকে জোহনদের ডান্ডা কোস্টের ঝোপড়পট্রিতে এসে হাজির। গাড়িটা অবশ্য 
ঝোপড়পট্টির ভেতর পর্যস্ত আসতে পারেনি। কেন না এখানকার গলি এত সরু যে, অত বড় 
ইমপোর্টেড কার ঢোকার মতো জায়গা নেই। তা ছাড়া ঝোপড়পট্রিটা এমনই নোংরা আর আবর্জনায় 
বোঝাই যে, নাকে রুমাল চাপা দিয়ে তাকে আসতে হয়েছে। 

আজ জোহন ঝোপড়পট্রিতেই ছিল। কারণ “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র হাতে আজকের দিনটার 
কোনও বায়না নেই। থাকলে ঢের আগেই সে বেরিয়ে যেত। 

সেবাস্টিয়ান সাহেবের বয়েস তিরিশ-বত্রিশ। গায়ের রং বেশ কালো। লম্বাটে মুখ। প্রায় 
ছ*ফুটের মতো হাইট। মেরুদণ্ড টান-টান। আজকালকার ছোকরাদের মতো চওড়া জুলপি তার, ঘাড় 
পর্যস্ত ঝাপিয়ে পড়া বড়-বড় চুল, পরনে দামি বেল-বট্স ও হাওয়াই শার্ট। লোকটা কেরালার ক্রিশ্চান। 

সেবাস্টিয়ান সাহেবকে কোথায় বসাবে, তাঁকে নিয়ে কী করবে, প্রথমটা ভেবে পেল না জোহন। 
একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে সে। ঘরের একমাত্র হাতল-ভাঙা চেয়ারটাকে ভালো করে মুছে- 
টুছে শেষ পর্যস্ত তাতেই তাকে বসিয়ে দৌড়ে কাছের একটা দোকান থেকে সফ্ট ড্রিংকের বোতল 
আর স্ট্রনিয়ে এল। 

সেবাস্টিয়ান সাহেব কিছুতেই খাবেন না। জোহন বলল, “প্রথম দিন এলেন, এটা না খেলে 
আমরা খুব দুঃখ পাব।' 

এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে “হোটেল বু হেভেন'-এর মতো একটা ফাইভ-স্টার হোটেলের রূপসি 
ক্রুনার মেরি যে থাকতে পারে, নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সেবাস্টিয়ান 
সাহেব। যাই হোক, জোহনের বারবার অনুরোধে বিষ গেলার মতো করে সফ্‌ট ড্রিংকটা গিলতে 
হল ত্বাকে। | 

এতক্ষণ জোহন তাকে নিয়ে এতই ব্যস্ত হয়ে ছিল যে, সেবাস্টিয়ান সাহেব বিশেষ কোনও 
কথা বলার সুযোগ পাননি। এবার মেরির দিকে তাকিয়ে জোহন সম্বন্ধে জিগ্যেস করলেন, ইনি 
কে? 

মেরি জোহনের পরিচয় দিয়ে জানাল, “সে তার ভাবী স্বামী ।” 

সেবাস্টিয়ান সাহেব অত্যন্ত তীক্ষ চোখে জোহনের পা থেকে মাথা পর্যস্ত দ্রুত একবার মেপে 
নিল। তারপর বলল, “ভাবী স্বামী বলতে-__বিয়ে হয়নি? 

মেরিই উত্তরটা দিল, “না। তবে শিগগিরই হচ্ছে।' 

জোহন বাজাতে বেরোয়নি, তার পরনে আধময়লা একটা পাজামা আর গেঞ্জি। সেবাস্টিয়ান 
তার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন, বিয়ে হয়নি অথচ এই দুটি অসমবয়সী মারী-পুরুষ একসঙ্গে 
ঝোপড়পট্রির এই ঘরে থাকে কি না। কিন্তু এ-সন্বন্ধে প্রশ্ন করা অশোভন। তাই কিছুক্ষণ চুপ করে 
থেকে বললেন, “আপনি কি করেন? ৰ 

জোহন উত্তর দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মেরি বলে উঠল, “উনি খুব বড় মিউজিসিয়ান, 
বন্বের সবচেয়ে নাম করা ব্যান্ডপার্টিতে ক্ল্যারিওনেট বাজান।' 

সেবাস্টিয়ান সাহেবের চোখে তাচ্ছিল্যের মতো কিছু ফুটে উঠল। কিন্তু মুখে তিনি বললেন, 
“আপনার মতো একজন গুণী লোকের সঙ্গে আলাপ করে বড় আনন্দ হল। যাক, এবার কাজের 
কথাটা সেরে ফেলি।' 


হঠাৎ বসস্ত ১২৯ 


খুব আগ্রহের গলায় জোহন বলল, “হা-হা, নিশ্চয়ই।' 

আর কোনওরকম ভণিতা-টণিতা না করে সেবাস্টিয়ান সাহেব যা বললেন, তা মোটামুটি 
এইরকম। মেরিকে তাদের কোম্পানি তিন বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ করতে চান। এর জন্যে মাসে তারা 
দেড় হাজার টাকা করে দেবেন। অবশ্য এই শর্তে রাজি হলে মেরিকে হোটেলের চাকরিটা ছাড়তে 
হবে। 

দেড় হাজার টাকা। বিমুঢের মতো জোহন মেরির দিকে তাকাল। মেরির চোখেও সেই একই 
.বিমৃঢ়তা। কথাটা নিজেদের কানে শুনেও তারা যেন বিশ্বাস করে উঠতে পারছে না। 

সেবাস্টিয়ান জিগ্যেস করলেন, “কি, রাজি? 

জোহন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে যেন লাফিয়ে উঠল, “নিশ্চয়ই রাজি । হাজার বার রাজি। 

“আরেকটা কথা-_' 


'বলুন__" 

“মেরিজির নামটা ভারী সিম্পল, তেমন ড্র নেই। রেকর্ড বাজারে বেরুবার আগে নামটা 
বদলে দিতে হবে।, 

সেবাস্টিয়ান সাহেবের সব কথা বুঝতে পারল না জোহন। তবে এটুকু আন্দাজ করল, নাম 
করার খাতিরে মেরির নতুন নামকরণ দরকার।' 

সেবাস্টিয়ান সাহেব আবার বললেন, “ভাবছি মেরিজির নাম বদলে সুজাতা রাখব। আপনি 
কি বলেন জোহন সাহেব? 

মেরির ভালো হলে সব কিছুতেই রাজি জোহন। সে প্রায় লাফিয়ে উঠল, “দারুণ খুবসুরত 
নাম। আপনি ওই নাম দিয়ে দিন।” 

“ভেরি গুড-_” সেবাস্টিয়ান সাহেব খুশি হয়ে পকেট থেকে ছাপানো কনট্রাক্ট ফর্ম বার করে 
মেরিকে বলল, “এটা পড়ে নীচে একটা সই করে দিন।' 

জোহন ব্যস্তভাবে বলল, “পড়বার দরকার নেই। মেরি, সই লাগাও” 
পড়লেন। মেরির হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঝাকিয়ে দিয়ে বললেন, “কনগ্রাচলেশনস! আমার 
বিশ্বাস এক বছরের মধ্যে হোল ইন্ডিয়া আপনার নাম জেনে ফেলবে। উইশ ইউ বেস্ট অফ লাক।' 
জোহনের দিকে ফিরে বললেন, “আচ্ছা চলি। আবার দেখা হবে? 

সেবাস্টিয়ান সাহেব চলে গেলে মেরি আর জোহন একটা অলৌকিক স্বপ্নের মধ্যে যেন দীড়িয়ে 
রইল। 


রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী হোটেলের চাকরিটা ছেড়ে দিতে হবে মেরিকে। এ 
মাস ফুরোতে সামান্য ক'টা দিন বাকি। মেরি সেবাস্টিয়ান সাহেবকে বলে দিয়েছে, মাসের এ কটা 
দিন কাজ করেই হোটেলের চাকরিটা ছেড়ে দেবে। 

যাই হোক, চুক্তিতে সই করার পর তিনটে দিন কেটে গেছে। আজও ঘড়ির কাটার মতো 
ঠিক রাত এগোরোটায় জোহন হোটেল ব্লু হেভেন'-এর উলটোদিকের ফুটপাথে দীড়িয়ে আছে। হঠাৎ 
সে দেখল, সেবাস্টিয়ান সাহেবের সঙ্গে মেরি বেরিয়ে আসছে। মেরি জেব্রা লাইন দিয়ে রাস্তা পার 
হয়ে এপারে চলে এল। সেবাস্টিয়ান সাহেব কিন্তু এলেন না। তার গাড়ি রাস্তার গা ঘেঁষে পার্ক 
করা ছিল; উঠে কাম্বালা হিলের দিকে চলে গেলেন। 

জোহন জিগ্যেস করল, “সেবাস্টিয়ান সাহেবকে তোমার সঙ্গে দেখলাম না 

মেরি আস্তে করে মাথা নাড়ল, 'হা-_" বলেই জোহনের দিকে এক পলক তাকিয়ে মুখ নামাল। 


প্রফুল্ল রায় পাঁচটি উপন্যাস-_-১৭ 


১৩০ পাঁচটি উপন্যাস 


অন্যদিনের মতো তাকে হাসিখুশি দেখাচ্ছে না। কেমন যেন একটু চিস্তিত আর বিষগ্ন মেরি। 

জোহন তাকে লক্ষ করতে-করতে বলল, 'কী ব্যাপার, তোমাকে কীরকম দেখাচ্ছে। শরীর 
খারাপ নাকি? 

না।' 

“তবে 

“চলো, বাড়ি ফিরে বলব।' 

বাসে উঠে চুপচাপ পাশাপাশি বসে ওরা ঝোপড়পট্রিতে ফিরে এল। সারাটা রাস্তা দারুণ 
এক উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে জোহনের। তার ভয়, রেকর্ড কোম্পানি এর মধ্যে মেরি সম্বন্ধে মত 
বদলে ফেলেছে কি না। তা হলে যে সুযোগটা এসেছিল, সেটা কি হাতছাড়া হয়ে যাবেঃ ঘরে ঢুকেই 
জোহন বলল, “কী হয়েছে এবার বলো।' 

তক্ষুনি কিছু বলল না মেরি। জোহনের উদ্বেগ দশগুণ বাড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল । 
তারপর বলল, “সেবাস্টিয়ান সাহেব একটা কথা বলছিল-_' 

কী? 

শুনলে তোমার মন খারাপ হয়ে যাবে । আমি কী যে করব ভেবে পাচ্ছি না। কথাটা তোমাকে 
বলতে সাহস হচ্ছে না, আবার না বললেও নয়।' 

জোহন শ্বাসরদ্ধের মতো বলল, “ওরা তোমাকে দিয়ে গান গাওয়াবে না? 

মেরি বলল, “না-না, সেসব কিছু নয়।” 

তা হলে? 

“সেবাস্টিয়ান সাহেব এখন আমাদের বিয়েটা বন্ধ রাখতে বলছেন।' 

“কেন? 

মেরি এবার যা বলল, সংক্ষেপে এইরকম। সেবাস্টিয়ান সাহেব বলেছেন, মেরি বিয়ে না 
করলে রেকর্ড কোম্পানির পক্ষে খুবই সুবিধা হয়। কেন না গায়িকা যদি রূপসি এবং তরুণী হয়, 
তাতেই লোককে আকর্ষণ করা যায়। তার ওপর অবিবাহিত হলে তো কথাই নেই। মেরি এমনিতেই 
সুন্দরী, যুবতী এবং ভালো তো গায়ই। এখন সেবাস্টিয়ান সাহেবের অনুরোধ রেখে, সে যদি বিয়েটা 
অস্তত বছর দুয়েকের জন্য স্থগিত রাখে, রেকর্ড কোম্পানি তা হলে কুমারী মেরির রূপ-যৌবন 
ইত্যাদিকে গ্ল্যামার হিসাবে কাজে লাগাতে পারে। এমন স্টান্ট তারা দেবে, যাতে হু-্থু করে মেরির 
রেকর্ড বাজারে পড়তে-না-পড়তেই বিক্রি হয়ে যাবে। সেইসঙ্গে দেশ জুড়ে রাতারাতি তার নামও 
হবে। 

হৃৎপিণ্ডের তলায় কোথায় যেন তীক্ষ ব্যথার মতো অনুভব করল জোহন। কিন্তু মেরির 
যাতে ভালো হয়, তার জন্য সব কিছুতেই সে রাজি। হেসে-হেসে দারুণ উৎসাহের গলায় বলল, 
“এই ব্যাপার? আমি ভেবেছিলাম না জানি কি। সেবাস্টিয়ান সাহেব যা বলেছে, তাই হবে। এতে 
যখন তোমার ভালো হচ্ছে, ওদেরও সুবিধে হচ্ছে, বিয়েটা দু-বছর পিছিয়ে দিতে আমার আপত্তি 
নেই। + 
“কিন্ত আমার খুব খারাপ লাগছে। তা ছাড়া-_' এই পর্যস্ত বলে চুপ করে গেল মেরি। 
জোহন জিগ্যেস করল, “তা ছাড়া কী? 
“আমাদের বিয়ের কথা সবাই জেনে গেছে। অনেককে নেমস্তন্নও করা হয়েছে। এখন বিয়েটা 
না হলে লোকে কী বলবে!' 

এর জন্যে ভেবো না। সবাইকে বুঝিয়ে আমি ম্যানেজ করে নেব।' 

এ-ব্যবস্থায় সায় দিতে পারছিল না মেরি। সে বলল, “তার চাইতে হোটেলের চাকরিটাই 
আমার থাক। সেবাস্টিয়ান সাহেবকে বলে দেব রেকর্ড করে আমার দরকার নেই।' 


হঠাৎ বসস্ত ১৩১ 


জোহন প্রায় আঁতকে উঠল, “ও কাজও কোরো না-_-ফর গডস্‌ সেক। সুযোগ বারবার আসে 
না মেরি। 

মেরি কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তাকে কিছুই বলতে দিল না জোহন। 

পরের দিন ব্যান্ডপার্টির হাতে বায়না-টায়না ছিল না। তবু জোহন ঘুম থেকে উঠেই বেরিয়ে 
পড়ল। বিয়েতে যাদের-যাদের নেমন্তন্ন করে এসেছিল, তাদের সবার কাছে গিয়ে জানিয়ে এল, 
আপাতত এ-বিয়ে হচ্ছে না। তাই নেমস্তর্নটা নাকচ করতে হচ্ছে। মেহেরবানি করে তারা যেন ক্ষমা 
করে দেয়। 

সবাই বিয়ে পেছোবার কারণ জিগ্যেস করল। স্পষ্ট করে কোনও উত্তর দিল না জোহন। 
তবে সোমবারি আর ইফতিকার সাহেবকে কারণটা খুলে বলল। সব শুনে ইফতিকার সাহেব একদমে 
মিনিট পাঁচেক খিস্তি করে বলল, শালা গাধ্ধে কি পাঠ্‌ঠে। ভয়েস গাড়িকা ভয়েস। ঘাড়ে করে 
তোর শকৃকর (চিনি) টেনে বেড়ানোই সার। সেই শক্কর খাবে আরেকজন । 

সোমবারিও দাঁতের ফাক দিয়ে পানের পিচ কেটে চোখ. কৌচকাল। তারপর চাপা গলায় 
বলল, “আমার সন্দেহ হচ্ছে তুমি একটা পুরুষ মানুষ কি না। হিজড়ে-টিজড়ে নও তো? নইলে 
হাতের খাবার নিজের মুখে না পুরে কেউ অন্যের মুখে ঢোকায়! শালে ক্যা মুরদ রে-_' 

বলেই ভারী কোমরে অশ্লীল লছক তুলল। জোহন হকচকিয়ে গেল। তারপর বলল, “কী 
যা-তা বলছ ভাবী। কারও খাবারে কেউ দীত বসাতে পারবে না। মেরি যেমন আছে, তেমনই থাকবে। 
তবে বিয়েটা এখন না হলে ওর পক্ষে ভালো হবে কিনা, তাই।' 

“ভালো হলেই ভালো।” সোমবারি দুটো হাতের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, দ্যাখো শেষ 
পর্যস্ত এ-দুটো যেন চুষতে না হয়।' 


দেখতে-দেখতে মাসটা কাবার হয়ে গেল। আর নতুন মাসের পয়লা তারিখেই হোটেলের 
চাকরিটা ছেড়ে দিল মেরি। চাকরি ছাড়ার পরদিন থেকেই রেকর্ড কোম্পানির রিহার্সাল শুরু হল। 

কোলাবার কাছে কোম্পানির একটা রিহার্সাল রম আছে। রোজ সকালে সেবাস্টিয়ান সাহেব 
নিজে এসে ঝোপড়পষ্ট্রি থেকে মেরিকে সেখানে নিয়ে যান; আবার রাত্রে নিজে ফেরত দিয়ে যান। 
এই নিয়ে আসা এবং পৌঁছে দেবার কাজটা কোম্পানির যে-কোনও ড্রাইভার বা একজন সাধারণ 
কর্মচারীর ওপর ছেড়ে দেওয়া যায়। তার মতো একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির পক্ষে একাজ খুবই দৃষ্টিকটু । 
কিন্তু সেবাস্টিয়ান সাহেবের মতে মেরি একজন নতুন শিল্পী; তাকে সর্বক্ষণ সঙ্গ এবং উৎসাহ দেওয়া 
একাস্ত প্রয়োজন। সেই কারণে তিনি নিজেই ছুটে-ছুটে আসেন। 

যেদিন ব্যান্ডপার্টির বায়না থাকে, সেদিন ভোরেই বেরিয়ে যেতে হয় জোহনকে। সেদিন আর 
সেবাস্টিয়ান সাহেবের সঙ্গে দেখা হয় না। কেন না সে বেরুবার পর সেবাস্টিয়ান সাহেব আসেন। 
রাতে ফিরে অবশ্য মেরিকে ঝোপড়পট্রিতে দেখতে পায়। দু-একটা কথাও হয় তার সঙ্গে। উদ্দীপনা 
ভরা গলায় জোহন জিগ্যেস করে, আজ কীরকম রিহার্সাল হল, সেবাস্টিয়ান সাহেব কী বললেন, 
কার-কার সঙ্গে দেখা হয়েছে, ইত্যাদি। 

তবে যেদিন ব্যান্ডপার্টির বায়না থাকে না, সেদিন সেবাস্টিয়ান সাহেবের সঙ্গে দেখা হয়। 
মেরি যখন তার সঙ্গে ঝোপড়পট্রির বাইরে গিয়ে গাড়িতে ওঠে, সেও সঙ্গে-সঙ্গেই যায়। তারপর 
ওরা চলে গেলে হঠাৎ যেন বুকের মধ্যে রেমন এক শুন্যতা অনুভব করে জোহন। 

পুরো দেড় মাস রিহার্সালের পর মেরি__না-না মেরি নয়, সুজাতার রেকর্ড বেরুল। আর 
তার আগে খবরের কাগজে তার ছবি দিয়ে, রেডিওতে পাবলিসিটি করে বাজার গরম করে রেখেছিলেন 
সেবাস্টিয়ান। সত্যি-সত্যিই রেকর্ডটা বেরুতে না বেরুতেই হু-হু করে বিক্রি হয়ে গেল। চাহিদা মেটাবার 


১৩২ পাঁচটি উপন্যাস 


জন্য নতুন করে আবার রেকর্ডটার প্রিন্ট করতে হলে। দু-পিঠে দু-খানা গান দিয়ে রেকর্ড করেছিল 
মেরি। প্রথম গানটা হল-_ও পুরবৈয়া মাত্‌ যা, মাত্‌ যা--। দ্বিতীয় গানটা হল-_“আচানক এক 
মুসাফির আয়া থা, ও চলে গয়ে-_। দুটো গানই তাকে শিখিয়েছিল জোহন। 

রেকর্ডটা যাতে বাজারে চলে, যাতে মেরির খুব নাম হয়, সেইজন্য মাহিম চার্চে পর-পর 
চার বুধবার জোহন মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে এসেছে, আর ঈশ্বরের কাছে বার-বার প্রার্থনা করেছে। 

যাই হোক, রেকর্ড বেরুবার পর সত্যি-সত্যি দারুণ নাম হয়ে গেল মেরির। কাগজগুলো 
লিখল, এমন “গোল্ডেন ভয়েস” গত পঁচিশ বছরে শোনা যায়নি।। 

মেরি খুবই অভিভূত। সে জোহনকে বলে, “আমার এই নাম, এই খাতির-_সব, সব তোমার 
জন্যে। 

জোহন যেমন খুশি তেমনই উত্তেজিত। মেরিকে কাধে তুলে নাগরদোলার মতো সে বন- 
বন পাক খেতে থাকে। এদিকে সেবাস্টিয়ান সাহেবও দারুণ উত্তেজিত। রেকর্ড বেরুবার তিন দিন 
বাদে ঝোপড়পন্রিতে এসে তিনি বললেন, "পুরোনো কনট্রাক্টুটা বাতিল করতে হবে।' 

মেরি আর জোহন চমকে উঠল, “কেন? 

প্রথম রেকর্ড বেচে কোম্পানি কম'করে এক লাখ টাকা প্রফিট করবে। আপনাকে মাসে 
দেড় হাজার টাকা দিয়ে কোম্পানি ডিপ্রাইভ করতে চাইছে না। ভাবছি, এখন থেকে মাসে চার হাজার 
টাকা পাবেন আর লাভের ওপর ফাইভ পারসেন্ট।, 

জোহন ও মেরি বিমুঢের মতো তাকিয়ে থাকল। সেবাস্টিয়ান সাহেব পুরোনো চুক্তিপত্র ছিঁড়ে 
ফেলে নতুন কনট্রাক্টে সই-টই করিয়ে নিলেন। তারপর বললেন, 'এক রেকর্ডেই আপনার নাম হয়ে 
গেছে; পিপ্ল এখন আপনাকে চায়। এই সুযোগ ছাড়া হবে না। এখন রেকর্ডের পর রেকর্ড বাজারে 
ছাড়তে হবে। 

জোহন প্রতিটি অক্ষরে জোর দিয়ে দিয়ে উচ্চারণ করল, “নিশ্চয়ই।' 

“এবার আমার একটা কথা আছে।' 

“কী? 

বিলতে লজ্জা হচ্ছে জোহন সাহেব। তবে আপনি বুদ্ধিমান লোক, সব দিক দিয়ে বিবেচনা 
করে দেখবেন।' 

জোহন বলল, “আপনি বলুনই না। 

সেবাস্টিয়ান সাহেব বললেন, 'মেরিজির এখন নাম হয়েছে, আরও হবে। সিনেমার লোক, 
রেডিওর লোক, টেলিভিশনের লোক ঝাক বেঁধে তখন ওঁর কাছে আসতে থাকবে। এই ঝোপড়পন্রিতে 
আমি আসি কারণ, আমি আপনাদের ঘরের লোক হয়ে গেছি। কিন্তু অন্য লোকেরা একদিন এলে, 
আর দ্বিতীয় দিন আসতে চাইবে না। এতে মেরিজির ক্ষতি হবে। তাই ভাবছিলাম__+ 

“কী? 

“মেরিন ড্রাইভে আমাদের কোম্পানির একটা ফ্ল্যাট আছে। মেরিজি যদি সেখানে থাকেন, 
সব দিক থেকেই সুবিধে হয়। আপনি কী বলেন? 

শ্বাসরুদ্ধের মতো কিছুক্ষণ চুপ করে রইল জোহন। তারপর বলল, “ঠিক আছে, আপনি 
যখন বলছেন-__, 

মেরি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “ফুলুটবালা সেখানে যাবে তো 

সেবাস্টিয়ান সাহেব থতিয়ে গেলেন। বিব্রতভাবে বললেন, “রোজ নিশ্চয়ই ওখানে একবার 
করে যাবে। তবে ওটা তো কাজের জায়গা । মানে বেশি লোক থাকলে-_, বলতে-বলতে থেমে 
গেলেন। : 

মেরি বলল, “তাহলে আমি ওখানে কী করে থাকব? ফুলুটবালা এখানে থাকবে, আমি 


হঠাৎ বসন্ত ১৩৩ 


অত দূরে-_ 

জোহন শ্বাসরদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। মেরির জীবনে যে সুযোগ এসেছে, তার জন্যে সেটা 
নষ্ট হয়ে যাক, সে তা চায় না। দ্রুত বলে উঠল, “সেবাস্টিয়ান সাহেব,.মেরির কথা আপনি শুনবেন 
না। এটা যখন বিজনেসের ব্যাপার, ও মেরিন ড্রাইভে গিয়ে থাকবে। আগে কাজ, তারপর অন্য 
কথা ।' 

সেবাস্টিয়ান সাহেব বললেন, "থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। এই তো বুদ্ধিমান লোকের মতো 
কথা। 

জোহন এবার বলল, "আমি কিন্তু রোজই একবার করে যাব।' 

“সে তো আমি আগেই বলেছি। আপনি যাবেন, মেরিজিও রোজ একবার করে এখানে 
আসবেন। আচ্ছা, আজ চলি।' 

এর দিন তিনেকের মধ্যে মেরিন ড্রাইভের ফ্ল্যাটে চলে গেল মেরি। ওখানে যাবার পর 
সমস্ত জীবনটাই যেন শুন্য মনে হতে থাকে জোহনের। এতদিন সে ছিল ভবঘুরে, চালচুলোহীন 
বাউন্ডুলে । তার দিনগুলো ছিল নারীসঙ্গহীন, নিরুৎসাহ। দুম করে এই মেয়েটা ক'দিনের জন্য এসে 
সব ওলট-পালট করে দিয়ে গেছে। ঝোপড়পন্টিতে এই নোংরা ঘরটা জুড়ে যেন ছড়িয়ে ছিল মেরি। 
সে চলে যাবার পর অনুভব করা যাচ্ছে, কতটা জায়গা সে ফাকা করে দিয়ে গেছে। 

যাই হোক, প্রথম দিকে রোজই একবার করে মেরিন ড্রাইভের ঝকঝকে দামি ফ্ল্যাটে গেছে 
জোহন। যখনই গেছে চোখে পড়েছে, সেবাস্টিযান সাহেব ওখানেই আছেন। আর দেখা গেছে গান- 
টানের ব্যাপারে মেরি খুবই ব্যস্ত। এখন রিহার্সাল-টিহার্সাল ওখানেই হচ্ছে। তার নিশ্বাস ফেলার 
সময় নেই। তবু তার মধ্যে কাছে ছুটে এসেছে মেরি। সামনে বসিয়ে গল্প করেছে, দামি-দামি খাবার 
খাইয়েছে। জানিয়েছে, এভাবে তার ভালো লাগছে না। জোহন তাকে বুঝিয়েছে, এখান থেকে চলে 
যাওয়া ঠিক হবে না। তাতে সেবাস্টিয়ান সাহেব চটে যাবেন, সুযোগটা হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে 
যাবে। চারদিকে নাম আরও ছড়িয়ে যাক, পয়সা-টয়সা হোক, তখন দু-জনে একসঙ্গে থাকার অসুবিধে 
হবে না। 

কিন্ত কিছুদিন পর মেরির কাজকর্মের চাপ এত বেড়ে গেল যে, তাকে ধরাই মুশকিল। দশ 
দিন এলে একদিন হয়তো দেখা হয়। বাকি দিনগুলো এসে জোহন শোনে, সেবাস্টিয়ান সাহেবের 
সঙ্গে বেরিয়ে গেছে মেরি। ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা বসে থেকেও তাকে ধরা যায় না। 

এর মধ্যে মেরির আরও রেকর্ড বেরিয়েছে; রেডিওতে তার গান শোনা যাচ্ছে। টি-ভি 
প্রোগ্রামেও তার ডাক পড়ছে। টেলিভিশনে তার চেহারা এখন দেখা যায়। তা ছাড়া প্রে-ব্যাকের 
জন্য সিনেমার লোকেরা হানা দিচ্ছে । সিনেমার পত্রিকাগুলোতে, ফ্যাশন বা ইভ ম্যাগাজিনে আর 
দৈনিক পত্র-পত্রিকার ফিল্ম বা গান-বাজনার জন্য নির্দিষ্ট কলামে তার ইন্টারভিউ ও ছবি বেরুচ্ছে। 

জোহন জানে চারদিকে মেরির এত নামের মূলে রয়েছে একটি মাত্র লোক-_তিনি সেবাস্টিয়ান 
সাহেব। সে খবর পেয়েছে সেবাস্টিয়ান সাহেব নাকি এখন মেরির বিজনেস ম্যানেজার। রেডিও- 
টিভি-ফিল্ম-__যেখান থেকেই লোকজন আসুক না, সেবাস্টিয়ান সাহেবই তাদের সঙ্গে ব্যাবসা-সংক্রাস্ত 
কথা বলে থাকেন। 

জোহন অনুভব করতে থাকে, মেরির যতই নাম হচ্ছে, ততই সে যেন দূরে সরে যাচ্ছে। 
যে মেরিকে জোহন একদিন রাস্তা থেকে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তুলে এনেছিল, যে মেরি ডান্ডা 
কোস্টের ঝোপড়পষ্টিতে একদিন তাকে ঘিরে ছোট্ট একটা সংসার পাতার স্বপ্ন দেখেছিল, সে যেন 
অন্য কেউ। একেক দিন ঝোপড়পট্রিতে সোমবারির সঙ্গে আচমকা দেখা হলে সে বিদ্রুপের সুরে 
বলে, শাদিটা কবে হচ্ছে? 

জোহন বিব্রত হয়, উশখুশ করতে থাকে। কোনও উত্তর দেয় না। 


১৩৪ পাঁচটি উপন্যাস 


অশ্লীল ছড়া কেটে আঙুলের ডগা দিয়ে জোহনের থুতনিটা নাড়তে-নাড়তে সোমবারি এবার 
বলে, 'প্যানটুল-পাজামা ছেড়ে এবার ঘাঘরা আর শাড়ি পরো ফুলুটবালা। শালে ক্যায়সা মরদ তুমি! 
জওয়ান লড়কিটাতে হাতের ফাক দিয়ে গলে যেতে দিলে! 

ব্যান্ডপার্টির ইফতিকার সাহেবের সঙ্গে যখনই দেখা হয়, তখনই এক কথা বলে যায় সে, 
'গাধ্ধে কা পাঠৃঠে, ভয়েস গাড়ি-কা-ভয়েস, ঘাড়ে করে গুড়ই বয়ে গেলি! আর সেই গুড় খাচ্ছে 
এখন অন্য লোকে । তখন বিয়েটা করে ফেললে রাজার হালে থাকতে পারতিস। শালে উল্লুকা বান্দর ।" 

জোহন উত্তর দেয় না। সোমবারি বা ইফতিকার সাহেবের মতো করে না বললেও, চেনাশোনা 
লোকেরা তাকে দেখলেই মুখ টিপে হাসে। 


দেখতে-দেখতে একটা বছর কেটে গেল। এর মধ্যে আরও নাম হয়েছে মেরির। এখন রেডিওর 
বিবিধ ভারতী খুললেই তার গলা শোনা যায়, টিভি খুললেই তার মুখ, পত্র-পত্রিকায় আর পোস্টারে- 
পোস্টারে তার ছবি, ফিল্মের হিরোইনদের গলায় তার গান। ফিল্মের গান বাদ দিলে অন্য সব গানই 
জোহনের শেখানো গান। আশ্চর্য, আজকাল আনারকলি ব্যান্ডপার্টিকে যারা বায়না করতে 
আসে, তারা সুজাতা অর্থাৎ মেরির গানই বাজাবার কথা বলে। যে হাউহটাকে জোহন আকাশে 
উড়িয়ে দিয়েছিল, ক্রমশ সেটা অনেক__অনেক দূরে চলে গেছে। এখন আর তাকে কোনওরকমেই 
ছোঁয়া যাবে না। 

অবশ্য এই এক বছরে বেশ কয়েকবার মেরিন ড্রাইভে এসেছে জোহন। যতবার এসেছে, 
সে জানে এই গাড়িগুলো যাদের, তারা মেরির কাছেই এসেছে। এই সব চোখ-ঝলসানো গাড়ি দেখবার 
পর ব্যান্ডপার্টির ড্রেস পরে জোহন ভেতরে যেতে ভরসা পায়নি; বেশির ভাগ দিনই রাস্তায় দাঁড়িয়ে 
থেকেছে সে। তারপর বাইরে থেকেই ফিরে গেছে। এক আধদিন সাহসে ভর করে ভেতরে ঢুকলেও 
মেরির সঙ্গে কচিৎ কখনও দেখা হয়েছে। যখনই সে সাহস করে ওপরে এসেছে, সেবাস্টিয়ান সাহেবের 
সঙ্গে দেখা হয়েছে। সেবাস্টিয়ান সাহেব তাকে দেখলে ইদানীং খুবই বিরক্ত হচ্ছেন। রূঢভাবে বলেছেন, 
“মেরি এখন ব্যস্ত আছে। তার সঙ্গে দেখা হবে না।' 

জোহন কষ্ট পেয়েছে, তবু এসেছে। মেরির সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে সে অবশ্য বিরক্ত হয়নি, 
এসো। 

জোহন টের পাচ্ছিল, প্রচুর টাকা, প্রচুর নাম আর গ্ল্যামার মেরিকে একটু-একটু করে যেন 
বদলে দিচ্ছে। সে ঠিক করে ফেলেছিল, মেরিন ড্রাইভে আর যাবে না। কী হবে গিয়ে? সত্যি-সত্যিই 
এক বছর বাদে যাওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছে জোহন। 


সেবাস্টিয়ান সাহেব মেরিকে সেই যে ঝোপড়পট্রি থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন তারপর দু-বছর 
কেটে গেছে। 

এই দ্ব-বছরে জোহনের চেহারায় হঠাৎ যেন বয়সের ছাপটা বড় বেশি কয়ে পড়ে গেছে। 
পিঠটা ঈষৎ বেঁকে গেছে, চুলের বেশির ভাগই সাদা, চামড়া কুচকে মুখে এখন অসংখ্য রেখা। 
চোখদুটো ঘোলাটে আর বিষপ্ন দেখায়। 

জীবনটা মেরি আসার আগের সেই পুরনো দিনগুলোর মতোই আজকাল কেটে যাচ্ছে। যেদিন 
ব্যান্ডপার্টির বায়না থাকে, সেদিন সকালে উঠেই স্নান-টান করে বেরিয়ে পড়ে জোহন। আগের মতোই 


হঠাৎ বসস্ত ১৩৫ 


দুপুরে ইরানি কি পাঞ্জাবিদের হোটেলে খেয়ে নেয়। তারপর রাব্রেও হোটেলে গিয়ে এক বোতল 
ঠার্রা এবং রুটি মাংস কিংবা ইডলি সম্বর খেয়ে লাস্ট ট্রেনে ঝোপড়পট্রিতে ফিরে আসে । আর 
যেদিন বাজাবার ব্যাপার থাকে না, ঝোপড়পন্টিতেই পড়ে থাকে সে। অবশ্য এই অলস দিনগুলোতে 
বস্তির বাচ্চাকাচ্চারা তাকে ধরে সমুদ্রের পাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে জোহনকে একটা-না-একটা 
ফিল্মের গান বাজিয়ে শোনাতে হয়। আর সেই গানগুলোর বেশির ভাগই মেরির গাওয়া। কিন্তু 
এতে আর কতটা সময় কাটে! কিছুক্ষণ বাদে ঝোপড়পন্রিতে ফিরে দড়ির খাটিয়ায় চুপচাপ শুয়ে 
থাকে জোহন। মেরি চলে যাওয়ার পর এই ঝোপড়িতে রান্না-বান্নার পাট চুকে গেছে। যেদিন সে 
ঘরে থাকে, উদপিদের সেই হোটেলটা থেকে দু-বেলা খাবার দিয়ে যায়। 

মেরি চলে গেছে ঠিকই কিন্তু এখানে তার কিছুদিন কাটিয়ে যাবার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, 
আযলুমিনিয়ামের বাসন-কোসন, দু-চারটে শাড়ি-জামা-টামা পড়ে আছে। দড়ির খাটিয়ায় শুয়ে-শুয়ে 
সেগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে মনটা ভারী হয়ে যায় জোহনের। বুকের গভীর তলদেশ 
থেকে নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস নানা স্তর ঠেলে-ঠেলে উঠে আসে। 

এইভাবেই চলছিল। হঠাৎ একদিন জোহনদের বাজনার দল পেডার রোডের এক বিয়ে বাড়িতে 
বাজনার বায়না পেল। 

সকালে নয়, বিকেলের কিছু আগে তাদের বাজাতে যেতে হবে। 

বিকেলবেলা “আনারকলি ব্যান্ডপার্টি'-র সঙ্গে পেডার রোডে এসে অবাক হয়ে গেল জোহন। 
দারুণ ভিড় চারদিকে। ডজন-ডজন ইম্পোর্টেড দামি কার এখানে ওখানে পার্ক করা রয়েছে। ভিড়ে 
এবং গাড়িতে ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গেছে। চারপাশের স্কাই-স্রেপারগুলোর ব্যালকনি আর জানলায় 
অগুনতি মুখ দেখা যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে কোনওরকমে একেকটা গাড়ি থেকে দু-একজন নাম-করা 
ফিল্মস্টার নেমেই ছুটে সামনের একটা ত্যাপার্টমেন্ট হাউসে ঢুকে যাচ্ছে। কিছু যুবক-যুবতী হল্লা করে 
তাদের পিছুপিছু ছুটছে। 

যে ত্যাপার্টমেন্ট হাউসে ফিল্মস্টাররা ঢুকছে, সবার দৃষ্টি সেদিকেই। বাড়িটা আলো আর ফুলে 
চমতকার করে সাজানো । দেখেই বোঝা যায় এটা উৎসবের বাড়ি । জোহনরা এখানেই বাজাতে এসেছে। 

কার বিয়ে, কে ইফতিকার সাহেবকে বায়না দিয়ে গেছে, কিছুই জানে না জোহন। ভিড়ের 
ভেতর পথ করে-করে ইফতিকার সাহেবের পিচু-পিছু ছুঁচের পেছনে সুতোর মতো, তারা অ্যাপার্টমেন্ট 
হাউসটার ভেতর ঢুকে পড়ল। 

ভেতরে বিরাট ব্যাপার। বিশাল প্যান্ডেলে গেস্টদের অনেকেই এসে গেছে। জোহনরা অবশ্য 
প্যান্ডেলে ঢুকতে পেল না। একটা লোক এগিয়ে এসে তাদের উলটোদিকে একটা শামিয়ানার নীচে 
অপেক্ষা করতে বলল। সেখানে আরও চার-পাঁচটা ব্যান্ডপার্টি বসে ছিল। লোকটা বলল, “আমি 
যখন বাজাতে বলব, তখন বাজাবে। 

বলেই চলে গেল। 

জোহনরা বসেই আছে, বসেই আছে। চারদিকে ভিড়, চিৎকার এবং জ্যাম বেড়েই চলেছে। 
ইফতিকার সাহেব হঠাৎ বলল, “বসে-বসে বাত ধরে যাবে দেখছি; উঠে একটু ঘুরে-টুরে আসি।” 
বলে চলে গেল। 

দশ মিনিটও কাটল না, উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটতে-ছুটতে চলে এল ইফতিকার সাহেব। এসেই 
জোহনের হাত ধরে এক টানে তুলে ফেলল তাকে। বলল, আজ আর তোকে এখানে বাজাতে 
হবে না; তুই ঝোপড়পন্ট্রিতে ফিরে যা।' 

জোহন অবাক। বলল, “বাজাব না কেন? 

“পরে শুনিস, এখন চলে যা__" 

জোহন কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল; তার আগেই চারপাশের হই-চই পঞ্চাশ গুণ বেড়ে গেল, 


১৩৬ পাঁচটি উপন্যাস 


অনেক লোক একসঙ্গে সামনের দিকে দৌড়ে গেল। মিনিট দুয়েকের মধ্যে দেখা গেল ভিড়ের ভেতর 
দিয়ে একটা প্রকাণ্ড ইমপোর্টেড গাড়ি পথ করে খুব আস্তে-আস্তে এগিয়ে আসছে। গাড়িটার পিছনের 
সিটে সেবাস্টিয়ান আর মেরি। তাদের দু-ধারে দুজন নাম-করা চিত্রতারকা। মেরি আর সেবাস্টিয়ান 
সাহেবের পরনে বিয়ের পোশাক; গলায় ধবধবে জুঁইয়ের মালা। সম্ভবত ওরা চার্চ থেকে আসছে। 

শরীরের সব রক্তক্নোত যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল জোহনের। আরব সাগরের কূলে 
এত পর্যাপ্ত বাতাস, তবু তার মনে হল শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। 

হঠাৎ পাশ থেকে ইফতিকার সাহেব খুব চাপা গলায় বলে উঠল, চলে যা জোহন, চলে 
যা। কার বিয়েতে বাজাতে এসেছি আগে জানলে, কিছুতেই বায়না নিতাম না। যা, এখনই চলে 
যা।' 

জোহন যেতে পারল না, শ্বাসরুদ্ধের মতো দাঁড়িয়ে থাকল। 

এদিকে গাড়িটা প্যান্ডেলের কাছে এসে থামল। সেবাস্টিয়ান সাহেবের সঙ্গে নামতে-নামতে 
হঠাৎ মেরির চোখ এসে পড়ল জোহনের দিকে। কয়েক সেকেন্ড সে যেন নিশ্চল দাঁড়িয়ে গেল, 
তারপরেই মুখ নামিয়ে সেবাস্টিয়ান সাহেবের পিছুপিছু প্যান্ডেলে গিয়ে ঢুকল। 

প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই সেই লোকটা দৌড়তে-দৌড়তে এসে দারুণ তাড়া লাগাল, “বাজাও, বাজনা 
শুরু করে দাও--_' 

ইফতিকার সাহেব জোহনকে বারবার চলে যেতে বলেছে; জোহন কিন্তু যায়নি। ব্যান্ডপার্টির 
বাজনদারদের মধ্যে দীড়িয়ে সে প্রায় উন্মাদের মতো ক্ল্যারিওনেট বাজিয়ে গেল। 

ব্যান্ডমাস্টার কাম-মালিক ইফতিকার সাহেব তাকে লক্ষ করতে-করতে ভাবতে লাগল, গাধধে 
কা পাঠঠের মাথাটা খারাপ হয়ে গেল কি না। 


তারপর সময় কাটতে থাকে। শরীর ভাঙতে থাকে জোহনের। মুখটা রেখায়-রেখায় আরও 
জটিল হয়ে যায়; পিঠ ধনুকের মতো বেঁকতে থাকে। কিন্তু জীবন পুরোনো নিয়মেই বয়ে যায়। তবে 
একেকদিন মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে ঝোপড়পট্রির লোকেরা শুনতে পায়, জোহন ক্ল্যারিওনেটে 
সেই গান দুটো বাজাচ্ছে__ | 

“আচানক এক মুসাফির আয়া থা, ও চলে গয়ে” কিংবা “ও পুরবৈয়া মাত্‌ যা, মাতৃ 
যা, 

বিষাদ-মাখানো এই করুণ গান দুটো জোহন মেরিকে প্রথম শিখিয়েছিল। আর এই গানের 
রেকর্ড করেই রাতারাতি মেরির নাম হয়ে গেছে। 

মাঝরাতে জোহনের ক্ল্যারিওনেটের সুর বিশাল বম্বে শহরের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে যেতে থাকে। 
হঠাৎ একসময় বাজনা থামিয়ে জোহন ভাবতে থাকে, সত্যিই কি তার জীবনে কেউ কিছুক্ষণের 
জন্য এসেছিল! আগাগোড়া সব ব্যাপারটাই তার কাছে একটা ঝাপসা হয়ে-আসা বিষপ্তর স্বপ্নের মতো 
মনে হয়। 





প্রফুল্ল রায় _পীচটি উপন্যাস-_-১৮ 


ছাড়তে খুব একটা দেরি নেই; বড়জোর চার-পাঁচ মিনিট। একটা ফার্স্ট ক্লাস কামরার ক্যুপের 

জানলার ধার ঘেঁষে বসে থাকতে-থাকতে রীতিমতো অস্থির হয়ে উঠছিলেন মণিমোহন। কবজি 
উলটে দ্রুত একবার প্রকাণ্ড চৌকো ঘড়িটা দেখে নিলেন; তারপর মুখের মোটা সিগারটা দীতে চেপে 
বাইরে তাকালেন। 

মণিমোহনের বয়স ষাট-বাধণ্ট্রি, তবে অতটা দেখায় না। গায়ের রং লালচে, চামড়া প্রায় 
নিরভীজ, মেরুদণ্ড টান-টান, হাইট ছ'ফুটের মতো, চোখের তারা নীলাভ। এক গ্রাম বাজে চর্বি নেই 
কোথাও । চওড়া-চওড়া হাড়ের ফ্রেমে দৃঢ় মজবুত শরীর তার, চ্যাটালো বুক, মাংসল কীধ। পাতলা 
করে ছাঁটা কাঁচা-পাকা চুল সযত্তে ব্যাক-ব্রাশ করা। লম্বাটে মুখ তার, খাড়া নাক, চোখে মোটা ফ্রেমের 
বাই-ফোকাল চশমা। সব মিলিয়ে মণিমোহনকে অভারতীয় মনে হয়। 

ক্যুপের বাইরে বোম্বাইয়ের সুবিশাল স্টেশন ভিক্টোরিয়া টারমিনাসের আধমাইল লম্বা 
প্ল্যাটফর্মে এখন গাদা-গাদা মানুষের ভিড়। মণিমোহনদের এই গাড়িটা অর্থাৎ ক্যালকাটা মেলে যত 
যাত্রী উঠেছে তার দশগুণ লোক এসেছে সি-অফ করতে । একটু আগেও এই ট্রেনের সবকণ্টা কামরা 
বোঝাই করে আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের ঘিরে ওরা বসে বা দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রেন ছাড়ার মুখে-মুখে 
নেমে গেছে কিন্তু স্টেশন থেকে চলে যায়নি। ক্যালকাটা মেল ছাড়ার পর রুমাল উড়িয়ে তবে 
ফিরবে। 

দূরে স্টেশনের ঘড়িতে এখন সাতটা বেজে একান্ন। আরব সাগরের পারের এই শহরে এক 
ঘণ্টা আগে সন্ধ্যা নেমে গেছে। এখন গোটা স্টেশন জুড়ে যেদিকে যতদূর চোখ যায় নিওন সাইনে 
বড়-বড় কোম্পানি আর তাদের প্রোডাক্টের চোখরধাঁধানো বিজ্ঞাপন। ডানপাশে উঁচু রেলিং-এর ওধারে 
সাবার্বন ট্রেনের জন্য সারি-সারি প্ল্যাটফর্ম। সবকণ্টা প্ল্যাটফর্মের মাথায় কালো বোর্ডে কমপিউটারে 
ট্রেন ছাড়ার সময় ফুটে উঠছে। ওখানে শহরতলির হাজার-হাজার প্যাসেঞ্জার উধর্শ্বাসে ছুটছিল। 
কে আগে ট্রেন ধরতে পারে তার জন্য একটা উন্মত্ত ডগ-রেস' চলছে যেন। 

মণিমোহন বিজ্ঞাপনের আলো, কমপিউটারে সাবার্বন ট্রেনের সময়-সংকেত বা চারিদিকের 
থিকথিকে ভিড়, কিছুই দেখছিলেন না। অগুনতি মানুষের ভেতর একজনকেই শুধু খুঁজছিলেন। কিন্তু 
না, তাদের এই ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেন্টে সেই লোকটিকে উঠতে দেখা যাচ্ছে না। খানিকটা চিস্তাগ্রস্তের 
মতো কামরার ভেতরে মুখ ফেরালেন মণিমোহন। সিগারটা মুখ থেকে নামিয়ে বললেন, “নাঃ, ভদ্রলোক 
বোধহয় এলেন না।' 

উলটোদিকের একটা সিটে বসে বাবার অস্থিরতা লক্ষ করে যাচ্ছিল সুজয়া। দারুণ মজা 
লাগছিল তার, চোখের তারায় এবং ঠোটে কৌতুকের একটু আভা চকচকিয়ে উঠেছিল। সুজয়া আস্তে 
করে বলল, “তোমার ভীষণ একটা ক্ষতি হয়ে গেল।' 

সুজয়ার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ। বাঙালি মেয়েদের তুলনায় সে যথেষ্ট লম্বা; প্রায় পাঁচ ফুট 
সাত-আট ইঞ্চি । গায়ের রং আশ্থিনের রৌদ্রঝলকের মতো, মসৃণ ত্বক, ঘন পালকে ঘেরা টানা চোখ, 
পাতলা ফুরফুরে নাকটা সটান কপাল থেকে নেমে এসেছে। সোনার ফুলদানির মতো গলা, ছোট্ট 
কপালের ওপর থেকে কৌকড়ানো ঘন চুলের ঘের। সারা শরীরে অজস্র স্বাস্থ্য । এই স্বাস্থ্য তার 
সবচাইতে দামি অলঙ্কার। 

সুজয়ার পরনে মেরুন রঙের মাইশোর সিক্ক, কানে দক্ষিণীদের মতো সাদা পাথরের কানফুল, 
আঙুলে সাদা পাথরের লম্বা আংটি, বাঁহাতে সোনার ব্যান্ডে গোল ঘড়ি, ডান হাতে একটা মাত্র 


আপন মনে ১৩৯ 


রূলি। সব মিলিয়ে তাকে অলৌকিক মনে হয়। 

মণিমোহনের সিগার নিভে গিয়েছিল। ধরিয়ে নিয়ে বললেন, “ক্ষতি, ক্ষতি আবার কি? এতটা 
রাস্ত যাব। একজন বাঙালির কোম্পানি পাওয়া যাচ্ছিল, গল্প করতে-করতে যাওয়া যেত। 

সুজয়া হাসল, কিছু বলল না। 

মণিমোহন ফের বললেন, “কতদিন কলকাতার বাইরে পড়ে আছি। ভদ্রলোককে পেলে 
ওখানকার খবরটবর জানতে পারতাম।' 

সুজয়া এবার বলল, “ছত্রিশ ঘণ্টা পরেই তো আমরা কলকাতা পৌঁছে যাচ্ছি। একটু ধৈর্য 
ধরে থাকো না। একবার কলকাতায় পৌঁছুলে অন্যের মুখ থেকে খবর শুনবার দরকার হবে না।' 

“তা যা বলেছিস। তবু-_" মণিমোহন আন্তে করে সিগারে টান দিলেন। 

সুজয়া বলল, “ধরো যদি ভদ্রলোক আমাদের মতো কলকাতার বাইরের লোক হন 

“সেটা অবশ্য অসম্ভব নয়। কোয়াইট পসিবল। তবু একজন বাঙালিকে সঙ্গী পেলে আমি 
কমফোর্টেবল ফিল করব। আই মিন কমুনিকেশনের অনেক সুবিধা হয়।” 

সুজয়া হেসে ফেলল, “তুমি ভীষণ সেকটারিয়ান বাবা।' 

মণিমোহন হাসতে-হাসতে বললেন, “আই আযাডমিট। ওই দেখ-_" বলেই আঙুল বাড়িয়ে 
সামনের একটা বার্থ দেখিয়ে দিলেন। 

এটা চার বার্থের ক্যুপ। মণিমোহন আর সুজয়া ছাড়া আপাতত আরও একজন এখানে রয়েছে। 
লোকটা গোয়াঞ্চি পিদ্রু; নাম যোহন সেবাস্টিয়ান, বয়স চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন। গাড়িতে উঠেই লোকটা জানিয়ে 
দিয়েছিল সে ভয়ানক ঘুমকাতুরে। তার ওপর ট্রেনে চড়লেই ঘুমটা দশ-পনেরো গুণ বেড়ে যায়। 
কলকাতা পর্যস্ত সে যাবে এবং রাস্তার ছত্রিশটা ঘণ্টা টানা ঘুম লাগাবে। একমাত্র ট্রেনে আগুন না 
লাগলে বা অন্য কোনও আযাকসিডেন্ট-্যাকসিডেন্ট না ঘটলে কোনও কারণেই তাকে যেন ডিসটার্ব 
করা না হয়। বলেই টান-টান হয়ে শুয়ে পড়েছিল। 

সুজয়া মুখ ফিরিয়ে একবার যোহন সেবাস্টিয়ানকে দেখল, তারপর হাসতে লাগল। 

মণিমোহন বললেন, এরকম একজন থাকলে গোটা জার্নিটাই মাটি । তুই-ই বল এমন লোকের 
সঙ্গে র্যাপোর্ট হয়? হরিবল! 

সুজয়া বলল, “তুমি যার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছ তিনিও তো এঁর কার্বন কপি হতে পারেন।' 

“ডোন্ট বি পেসিমিস্ট।' 

সুজয়া উত্তর দিল না, হাসতেই লাগল। 

আসলে মণিমোহন যাঁর সম্বন্ধে এত আগ্রহান্বিত, তাকে কিন্তু আগে কখনও দেখেননি । তার 
এই আগ্রহের একমাত্র কারণ লোকটা বাঙালি। 

ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার। 

মণিমোহন মানুষ হিসেবে কিছুটা অদ্ভুত ধরনের। পঁচিশ বছর বয়সে রেকর্ড মার্ক পেয়ে 
এমবিবিএস পাস করেছিলেন। তারপর মিলিটারিতে বড় চাকরি পেয়ে পুণায় চলে যান। সেটা উনিশশো 
পঁয়তাল্লিশ; দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। 

সেই যে পুণায় গিয়েছিলেন, তারপর ছত্রিশটা বছর কেটে গেছে। মিলিটারির মেডিক্যাল 
সারভিসে অনেকগুলো প্রমোশন পেয়েছেন মণিমোহন। ক্যাপ্টেন হয়েছেন, মেজর হয়েছেন। শেষ 
পর্যস্ত কর্নেলের র্যাঙ্কও পেয়েছিলেন। 

দক্ষিণ কলকাতায় ঢাকুরিয়ার কাছে গথিক পিলার-বসানো পুরোনো আমলের প্রকাণ্ড বাড়ি 
তাদের। তিন বিঘে জায়গা জুড়ে বিশাল কম্পাউন্ড। সেখানে মা-বাবা-ভাইরা থাকতেন। মা-বাবা 
অনেকদিন আগেই মারা গেছেন, তবে ভাইরা আছেন। 

মিলিটারিতে ছুটিছাটা নেই বললেই হয়; ছত্রিশ বছরে পীচ-সাত বারের বেশি কলকাতায় 


১৪০ পাঁচটি উপন্যাস 


আসতে পারেননি মণিমোহন। মা-বাবার মৃত্যুতে দু-বার এসেছিলেন, নিজের বিয়ে এবং ছোট তিন 
ভাইয়ের বিয়ে, মোট চারটে বিয়ে ছাড়া আরও চার বার এসেছিলেন। অন্য কোনও পারিবারিক 
শোকে বা উৎসবে আর এসেছেন কিনা এতকাল পর মণিমোহনের মনে নেই। 

যাওয়া-আসা না থাকলেও তেরোশো মাইল দূরে থেকেও কলকাতা বা বাংলাদেশের সঙ্গে 
যোগাযোগটা তিনি বারবরই রেখে গেছেন। কলকাতায় যতগুলো মাসিক বা সাপ্তাহিক পত্রিপত্রিকা 
বেরোয়, মণিমোহন তার সবগুলোর নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। প্রিয় কোনও কবি বা ওপন্যাসিকের 
বই বেরুলে ভিপি করে তিনি তক্ষুনি আনিয়ে নিতেন। এ ছাড়া সে-আমলের কনক দাসের, মালতী 
ঘোষালের, পঙ্কজ মল্লিকের রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড কিংবা আঙ্ডুরবালা-ইন্দুবালা-কমলা ঝরিয়া- 
শচীনদেবের গানও আনতেন। এ-আমলের গুণী গাইয়েদের মধ্যে তাঁর প্রিয় হচ্ছেন সুচিত্রা মিত্র, কণিকা, 
অশোকতরু, দেবব্রত বিশ্বাস এবং আরও অনেকে। তাদের কত যে লং প্লেয়িং রেকর্ড তিনি কলকাতা 
থেকে আনিয়েছেন তার হিসেব নেই। শুধু কি রবীন্দ্রসংগীত, অতুলপ্রসাদ-রজনীকাত্ত-নজরুল থেকে 
ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, গম্ভীরা, বাউল- বাংলাদেশের নরম মাটি থেকে যতরকমের গান উঠে এসেছে 
তার প্রায় সবই রয়েছে মণিমোহনের সংগ্রহে। 

যুদ্ধের পরপর সেই সময়টায় পুণা আর কতটুকু শহর! ক'জন বাঙালির মুখই বা তখন 
দেখা যেত! চারিদিকে তখন পাহাড়, জঙ্গল, নির্জনতা । কল নেই, কারখানা নেই, কর্কশ চিৎকার 
বা ভিড় নেই। শুধু অগাধ প্রাগাঢ় প্রশান্তি আর ঘুম। সেই ঘুমস্ত শহর তার প্রাটীন বাসিন্দা কিছু 
চিৎপাবন ব্রান্মণ নিয়ে চুপচাপ পড়ে থাকত। 

বাংলায় একটু কথা বলার জন্য প্রায়ই মণিমোহন ছিয়ানব্বই মাইল পাড়ি দিয়ে চলে যেতেন 
বোম্বাই। বোম্বাইতেও সে আমলে বাঙালি খুব একটা ছিল না; বড়-বড় কোম্পানির বড়-বড় কিছু 
অফিসার; এ ছাড়া মুশ্বাদেবীর মন্দিরের কাছে ছিল বাঙালি জহুরিদের উপনিবেশ। সারাদিন তাদের 
সঙ্গে চুটিয়ে গল্পটল্প করে রাত্রে আবার পুণা। 

কয়েক বছর বাদে সব কিছু বদলে গেল। ততদিনে দেশ ভাগ হয়ে গেছে। কলকাতা থেকে 
হড়মুড় করে বাঙালিরা ছুটে যাচ্ছিল বোনম্বাই-এর দিকে, পুণার দিকে। তখন এ-দুটো শহর ঘিরে 
দেশের সবদিক থেকে ইন্ডিয়ান ক্যাপিটাল জড়ো হতে শুরু করেছে। আজ যেখানে মাঠ কি পাহাড়, 
কি আশ্চর্য, কাল সকালে চোখ মেলতেই দেখা খাচ্ছিল একটা কারখানা গজিয়ে উঠেছে; মাটি ফুঁড়ে 
তার লম্বা চিমনি সোজা আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। বোম্বাই আর পুণা তখন বছরে তিন মাইল করে 
তার শরীর বাড়াতে শুরু করেছে। 

ততদিনে হিন্দি ফিল্মের টানে কলকাতা থেকে বোম্বাইতে চলে গেছেন শচীনদেব বর্মন, গেছেন 
বিমল রায়, নীতিন বসু এবং নিউ থিয়েটার্সের আরও অনেকে। পুণার তিন হাজার ফুট উচ্চতা 
থেকে তাদের আকর্ষণে আরব সাগরের পারে বোম্বাই নামে সেই শহরে নেমে আসতেন মণিমোহন। 
নিজেই তাদের সঙ্গে আলাপ করে নিয়েছিলেন; প্রীতি এবং বন্ধুত্বের সম্পর্কও হয়েছিল। এর পুরো 
কৃতিত্ব তার। তা ছাড়া উনপঞ্যাশ পঞ্চাশ থেকে কলকাতার ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান কি এরিয়ান 
ক্লাব ওখানে রোভার্স খেলতে যেত। শস্তু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র তাদের বহুরূপী গ্রুপ নিয়ে ঘ্বক্তকরবী 
কি রাজা' অয়দিপাস করতে যেতেন। কলকাতার নাটক বা ফুটবল এলে যত জরুরি বাদ্দ থাক, 
মণিমোহন বোম্বাই ছুটতেন। তা ছাড়া শিবাজি পার্কের বেঙ্গলি ক্লাবে দুর্গাপুজোর পাঁচটা দিন তিনি 
ওখানে থাকতেনই। ূ 

আসল কথা বাংলা গান, বাংলা কালচার, বাংলা থিয়েটার, বাংলা লিটারেচার--এই সব 
কিছু নিয়েই মণিমোহনের প্রচণ্ড মাতামাতি । এমনকী রাজশেখর বসুর চলস্তিকায় যে-নত্ুন শব্দটি 
যুক্ত হয়েছে বা তরুণ লেখকের লেখায় কলকাতার এখনকার ছোকরাদের মুখে যে ইডিয়ম ব্যবহার 
করা হয়েছে তার খবর পর্যস্ত তিনি রাখেন। মণিমোহনের এই ব্যাপারটাকে কেউ বলবে পাগলামি, 
কেউ বা বলবে বাতিক। অন্য প্রভিন্সের বন্ধুরা মজা করে বলতেন, “তুমি ফ্যানাটিক বেঙ্গলি ।' মণিমোহন 


আপন মনে ১৪১ 


হাসতেন, উত্তর দিতেন না। 

দীর্ঘকাল কলকাতা থেকে অনেক দূরে নানা জাতের পাঁচমিশালি মানুষের মধ্যে থাকলে যে 
কেউ খানিকটা কসমোপলিটান হয়ে যায়। সেদিক থেকে মণিমোহনের কোনওরকম সংস্কার নেই। 
মিলিটারি সার্ভিসে ভারতবর্ষের সব প্রভিল্সের মানুষই রয়েছে। তাদের ভাষা, কালচার, সামাজিক 
রীতিনীতি, সব কিছু সম্পর্কেই মণিমোহনের গভীর শ্রদ্ধা। তবু তার মধ্যে বাংলাদেশ কী আশ্চর্যভাবেই 
না কাজ করে যায়। পুণায় থাকলেও তাঁর শিকড় বাংলাদেশের মাটিতেই থেকে গেছে। 

জীবনের প্রথম পঁচিশটা বছর মণিমোহন কলকাতায় কাটিয়েছেন। তার চাইতে অনেক বেশি, 
পুরো ছত্রিশ বছর থেকেছেন পুণায়। পুণা কিন্তু আগের পঁচিশটা বছর রবার ঘষে-ঘষেও মুছে দিতে 
পারেনি। সেই পঁচিশ বছরের রং খুবই পাকা। 

নিজের ভেতরকার এই বাঙালিয়ানা আর বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা, স্ত্রী এবং 
মেয়ের মধ্যেও সংক্রামক কোনও ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে দিয়েছেন মণিমোহন। স্ত্রী অবশ্য অনেক 
কাল আগেই মারা গেছেন, তখন সুজয়ার বয়স মোটে আট। 

সুজয়াকে নিজের রুচি, ইচ্ছা এবং পছন্দের মাপে একট্র-একটু করে তৈরি করে নিয়েছেন 
মণিমোহন। পুণায় ইংলিশ মিডিয়াম মিলিটারি স্কুলে বাংলা পড়ার সুযোগ ছিল না। তিনি ঈশ্বরচন্দ্রের 
প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ আনিয়ে বাড়িতে সুজয়াকে বাংলা শিখিয়েছেন। সুনীতি চাটুজ্জের বাংলা 
ব্যাকরণ মুখস্থ করিয়েছেন। কলকাতা থেকে স্কুল-কলেজের কোশ্চেন পেপার আনিয়ে নিয়মিত বাংলার 
পরীক্ষা নিতেন মণিমোহন। 

পার্টিশনের পর হু-হু করে যখন বোম্বাইতে বাঙালি বাড়তে লাগল তখন কয়েকটা 
রবীন্দ্রসংগীতের স্কুলও খোলা হল। ফি সপ্তাহে একবার করে সুজয়াকে রবীন্দ্রনাথের গান শেখাবার 
জন্য বোম্বাই নিয়ে আসতেন মণিমোহন। সুজয়া রবীন্দ্রসংগীত ভালোই শিখেছে; তার গলা ভরাট 
এবং মিষ্টি। 

এমনিতেই বোম্বাইয়ের ওপর বহুকাল ধরে ইউরোপের হাওয়া বয়ে আসছে। বোশ্বাইকে তো 
বলাই হয় ওয়েস্টার্ন সিটি অফ ইন্ডিয়া। স্বাধীনতার পর করাচি থেকে সিদ্ধিরা যখন এসে হাজির 
হল তখন সেই পশ্চিমা বাতাস আরও জোরদার হয়ে উঠল। সেই হাওয়ায় মেয়েকে ভেসে যেতে 
দেননি মণিমোহন। বাবার জন্যই প্যারালাল আর বেলবটম পরে ম্যাক্সফ্যাক্টরে নখ-মুখ পেইন্ট করে 
নিজেকে একটি বিচিত্র জীব তৈরি করেনি সুজয়া। 

তীর মৃত্যুর পর হাসপাতালের ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার, রোগী ইত্যাদি বাদ দিলে বাংলা 
কালচার আর মেয়েকে নিয়েই কেটে গেছে মণিমোহনের। সপ্তাহখানেক আগে তিনি রিটায়ার করেছেন। 
আর রিটায়ারমেন্টের পরই ঠিক করেছেন কলকাতায় ফিরে যাবেন। জীবনের শেষ বছরগুলো 
কলকাতায় কাটিয়ে দেবেন। 

তিনদিন আগে সব লাগেজ “বুক' করে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছেন মণিমোহন। আজ 
সুজয়াকে নিয়ে ডেকান কুইনে দুপুরবেলা বোম্বাই এসেছেন। তারপর মেরিন লাইনসের একটা ভালো 
রেস্তোরীয় লাঞ্চ সেরে এদিক-ওদিক খানিকক্ষণ ঘুরে ভিক্টোরিয়া টারমিনাসে চলে এসেছেন। ক্যালকাটা 
মেলে তাদের এই রিজার্ভ-করা কামরায় উঠবার সময় চোখে পড়েছিল বাইরে প্যাসেঞ্জারদের একটা 
লিস্ট টাঙানো রয়েছে। তাতে এই ক্যুপের চারজন যাত্রীর নামও আছে। মণিমোহন, সুজয়া এবং 
যোহন সেবাস্টিয়ান ছাড়া কলকাতার চতুর্থ যাত্রীটির নাম এইচ মুখার্জি। এই বাঙালি নামটি দেখেই 
লাফিয়ে উঠেছিলেন মণিমোহন। 


বাইরে গার্ডের হুইসিল শোনা গেল। এখনই ট্রেন ছেড়ে দেবে। 
সুজয়া মণিমোহনকে মজা করে কী বলতে যাচ্ছিল, সেই সময় কনডাক্টুর গার্ড সাতাশ-আটাশ 


১৪২ পাঁচটি উপন্যাস 


বছরের একটি যুবককে সঙ্গে করে নিয়ে এল। বলল, “হিয়ার ইজ ইওর ক্যুপ__' 

যুবকটি বলল, 'থ্যাঙ্কস। 

কনডাক্টর গার্ড আর দীড়াল না; মাঝখানের করিডর ধরে কামরার শেষ প্রান্তে চলে গেল। 
আর যুবকটি ততক্ষণে ক্যুপের ভেতর ঢুকে পড়েছে। তার এক হাতে ফোমের দামি সুটকেস আরেক 
হাতে হোল্ড-অল। শেষ মুহূর্তে ট্রেন ধরার জন্য খুব সম্ভব পোর্টার-টোর্টার ডাকতে পারেনি; নিজের 
মালপত্র নিজেই হাতে ঝুলিয়ে নিয়ে এসেছে! 

মণিমোহন এবদৃষ্টে যুবকটিকে লক্ষ করছিলেন। যার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন হঠাৎ সে আসায় 
তিনি খুশি হয়েছেন। তার চোখ চকচক করছিল। পরিষ্কার বাংলায় মণিমোহন বললেন, “আপনি 
নিশ্চয়ই এইচ মুখার্জি-_” 

যুবকটির চোখেমুখে চমক খেলে গেল। মণিমোহনের দিকে ফিরে সে বলল, হ্যা, আমি 
হীরক মুখার্জি। কিন্ত আমার নাম আপনি জানলেন কি করে? 

মণিমোহন উত্তর দিতে যাচ্ছিলেন; তার আগেই হীরক হেসে ফেলল, “ও বুঝেছি, প্যাসেঞ্জার 
লিস্টে আমার নাম দেখেছেন।' 

“একজাক্টলি।” মণিমোহনও হাসলেন। 

হীরক মণিমোহনের সম্বন্ধে খানিকটা উৎসুক হয়ে উঠেছিল। কিছু একটা জিগ্যেস করতে 
যাচ্ছিল সে, তাকে থামিয়ে দিয়ে মণিমোহন বললেন, “মালপত্র হাতে ঝুলিয়ে কথা হয় নাকি? আগে 
ওগুলো নামান। ছত্রিশ ঘণ্টা একসঙ্গে যাব। গল্প করার অনেক সময় হাতে আছে।' 

হীরক খুবই স্মার্ট। হেসে বলল, 'রাইট।' 

মোট চারটি বার্থ এই ক্যুপেতে। ওপরে দুটো, নীচে দুটো। নীচের বার্থ দুটো সুজয়া আর 
মণিমোহনের। সুজয়ার মাথার ওপরকার বার্থটা দখল করে আছে যোহন সেবাস্টিয়ান। মণিমোহনের 
মাথার ওপরেরটা এখনও ফাঁকা। ফাঁকা বার্থের একধারে সুটকেসটা রেখে হোল্ড-অল খুলে চটপট 
বিছানা পেতে ফেলল হীরক। তারপর মণিমোহনের দিকে ফিরে বলল, 'এত তাড়াতাড়ি ওপরে উঠে 
শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে না। নীচে আপনার কাছে বসলে অসুবিধা হবে? 

মণিমোহন ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, “অসুবিধা! অসুবিধা কীসের? ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম। 
আসুন আসুন-_' নিজে সরে অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে বললেন, “আরাম করে বসুন-_, 

বসতে-বসতে হীরক বলল, 'ধন্যবাদ।' একটু হেসে আবার বলল, “আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট 
লো, 

মণিমোহন তার মুখের দিকে তাকালেন, হ্যা, নিশ্চয়ই__” 

“আপনি আমার চাইতে বয়েসে অনেক বড়। এলডারলি লোকেরা “আপনি-আপনি” করে 
বললে আমি ভীষণ আনকমফোর্টেবল ফিল করি।' 

ঠিক আছে, “তুমি” করেই বলব। 

হীরক একটু হাসল। 

মণিমোহন আবার বললেন, “লিস্টে তোমার নামটা দেখার পর থেকে তোমার জম্যে আমরা 
ভীষণ কিউরিয়াস হয়েছিলাম। ভালো কথা, আমাদের পরিচয়টাই তোমাকে দেওয়া হায়নি। আমি 
মণিমোহন বসু, ইন্ডিয়ান আর্মির একজন রিটায়ার্ড ডাক্তার। আর ও আমার মেয়ে সুজয়া; পুণা 
ইউনিভার্সিটি থেকে মডার্ন হিস্ট্রিতে এবছর এমএ পাস করেছে।' 

সংক্ষেপে মণিমোহন এটাও জানিয়ে দিলেন একটানা ছত্রিশ বছর বাদে জন্মভূমির টানে 
কলকাতায় ফিরে যাচ্ছেন। এখন থেকে জীবনের বাকি অংশটা ওখানেই কাটাবেন। 

হীরক সুজয়ার দিকে ফিরে দু-হাত জড়ো করল। সুজয়াও নিঃশব্দে প্রতি নমস্কার জানাল। 
হীরককে প্রথম থেকেই লক্ষ করছিল সে। মণিমোহনের চাইতেও হীরক লম্বা। বাঙালিদের মধ্যে এরকম 


আপন মনে ১৪৩ 


হাইট সহজে চোখে পড়ে না। মুখচোখ কাটা-কাটা, নাকটা খাড়া কপাল থেমে নেমে এসেছে। শরীর 
বেতের মতো নমনীয় অথচ দৃঢ়, চওড়া কাধ, হাত দুটো খুব সম্ভব হাটু ছাড়িয়ে নেমে গেছে। গায়ের 
রং পালিশ-করা ব্রোঞ্জের মতো চকচকে। পাশ থেকে প্রোফাইল দেখলে তাকে গ্রিক বলে মনে হয়। 
বাঙালিদের মধ্যে মোঙ্গলীয়, গোর্তৃগিজ, স্প্যানিশ, ব্রিটিশ-_কত রকমের চেহারা যে রয়েছে ভাবা 
যায় না। 

হীকের পরনে “মড' যুবকদের মতো পোশাক- পায়ের দিকে ছত্রিশ ইঞ্চি ঘেরের টু-পিস 
ট্রাউজার্স আর ইজিপসিয়ান কটনের ফ্যাশনেবল স্পোর্টস গেঞ্চি, কোমরে চওড়া বেণ্ট, পায়ে উঁচু 
হিলের শ্যু। হীরক ঝকঝকে স্মার্ট মড যুবক। তাকে দেখতে বেশ ভালো লাগছিল সুজয়ার। তবে 
জন্মের পর থেকে বাইরে-বাইরে পুরোপুরি ওয়েস্টার্ন আটমসফিয়ারে বড় হয়ে উঠলেও সুজয়া কিছুটা 
চাপা ধরনের মেয়ে। বেশ অস্তমূখী; ইংরেজিতে যাকে বলে ইনট্রোভার্ট। ভেতরে তার যা-ই থাক, 
যে শ্বোতই বয়ে যাক, বাইরে এতটুকু ঢেউ নেই। সুজয়া হুদের ওপরে নিস্তরঙ্গ জলের মতো। 

মণিমোহন ওপাশ থেকে আবার বলতে লাগলেন, “তুমি কি বন্বেতে থাকো?, 

হীরক সুজয়ার দিক থেকে চোখ ফেরাল। মণিমোহনকে দেখতে দেখতে বলল, 'না। কেন 
বলুন তো 

বন্ধে থেকে যাচ্ছ; তাই জিগ্যেস করলাম।' 

“আমি কলকাতায় থাকি। একটা ব্যাপারে বন্ধে এসেছিলাম; আজ ফিরে যাচ্ছি।” 

“কোনও কাজ এসেছিলে? 

কাজ? না, তেমন কিছু নয়। প্রত্যেক বছর বন্ধে টু গোয়া মোটর রেসিং হয়; আমি তাতে 
নাম দিয়েছিলাম ।' 

গলার স্বরে খানিকটা বিস্ময় মিশিয়ে বেশ জোর দিয়েই মণিমোহন বলে উঠলেন, “আচ্ছা! 
দেন ইউ আর আ স্পোর্টসম্যান__' 

হীরক হাসল; কিছু বলল না। 

মণিমোহন খুব উৎসুকভাবেই জিগ্যেস করলেন, 'রেসিং-এ কী হল?" 

হীরক বলল, “আমি সেকেন্ড প্রাইজ পেয়েছি। 

মণিমোহন প্রায় উচ্ছৃসিতই হয়ে উঠলেন, “কনগ্র্যাচলেশনস। কলকাতা থেকে একটি ছেলে 
এসে এখান থেকে ট্রফি নিয়ে যাচ্ছে। আমি রিয়েলি হ্যাপি, ভেরি হ্যাপি। 

থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।' 

সুজয়া এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। নিজের অজান্তেই সে হঠাৎ বলে উঠল, “জানেন, বাবা 
ভীষণ সেকটারিয়ান। কলকাতার কেউ কিছু একটা করে ফেললে একেবারে নাচানাচি জুড়ে দেয়।' 

হীরক হাসতে লাগল, “তাই নাকি? 

এদিকে ট্রেনটা অনেকক্ষণ আগেই ছেড়ে দিয়েছিল। মাঝখানে বোন্বাইয়ের মাঝামাঝি দাদারে 
মিনিট পাঁচেকের জন্য থেমেই আবার দৌড় লাগিয়েছে। 

বোম্বাই শহরের তো শেষ নেই। অফুরস্ত শহরতলি আর ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়ার মধ্যে সেটা 
ছড়িয়ে আছে। দু-ধারে ঝলমলে আলোকিত মেট্রোপলিস আর বিরাট-বিরাট সব স্কাইক্রেপার কিংবা 
গভর্নমেন্ট হাউসিং ক্কিমের হাজার-হাজার বাড়ি এবং বিশাল-বিশাল ফ্যাক্টরির কম্পাউন্ড। মাঝখান 
দিয়ে ক্যালকাটা মেল প্রকাণ্ড সরীসৃপের মতো ছুটে যাচ্ছিল। 

মণিমোহন বললেন, “তুমি কি এখনও স্টুডেন্ট? 

হীরক মাথা নাড়ল, 'না। বছর চারেক আগেই ওই ব্যাপারটা শেষ হয়ে গেছে। আমি যাদবপুর 
থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর একটা ডিগ্রি কোনওরকমে জুটিয়ে নিতে পেরেছি।' বলে হাসল 
সে। 


১৪৪ রাচটি উপন্যাস 


গুড। সারভিসে আছ? 

'না। হাওড়ায় আমাদের ফ্যাক্টরি আছে। নানারকম ইলেকট্রিক্যাল কমপোনেন্ট তৈরি হয়। 
মাঝেমধ্যে ওখানে যাই। তবে সময়-টময় একদম পাই না।” 

মণিমোহন সন্নেহে বললেন, “সময় পাও না কেন? 

হীরক বলল, “স্পোর্টস আর হান্টিং, এ-দুটো আমার 'হবি”। ওই নিয়েই বছরের দশ মাস 
কেটে যায়! ফ্যাক্টরিতে যাব কখন?, 

“আই সি।' হীরককে মণিমোহনকে বেশ ভালো লাগছিল। ছেলেটি বেশ সরল আর অকপট। 
যা সে করে সোজাসুজি তাই বলে; কোনওরকম লুকোচুরি নেই। একটু ভেবে মণিমোহন জিগ্যেস 
করলেন, "শিকারের কথা বলছিলে; সবই বিগ গেম?' 

“ঠিক নেই কিছু, যখন যা পাই। তবে গভর্নমেন্ট শিকারের ব্যাপারে যেরকম রেসদ্্রিকশান 
চাপিয়েছে, তাতে ওর মজা আর নেই? 

একটু চুপচাপ। তারপর মণিমোহন জিগ্যেস করলেন, “এবার কলকাতার খবর বলো।' 

“তেমন কোনও খবর নেই। যেমন চলছিল তেমনই চলে যাচ্ছে।' 

কয়েক বছর আগে তো খুবই গোলমাল খুনোখুনি গেছে।” 

হ্যা; সমস্ত পলিটিক্যাল ব্যাপার। তবে এখন সেসব ডিসটারব্যান্স আর নেই।' 

“ওই সময়টায় বড়-বড় অনেক ইন্তাস্ট্রি আর অফিস বন্বেতে উঠে এসেছিল। ওয়েস্ট বেঙ্গ 
লের তাতে প্রচুর ক্ষতি করে গেছে বলে আমার মনে হয়।' 

“হ্যা, তা হয়েছে। সিকিউরিটির তখন অভাব ছিল।, 

'যাই হোক, খবরের কাগজে প্রায়ই পড়ি-_-আজকাল ক্যালকাটার প্রচুর ডেভলাপমেন্ট হচ্ছে। 
কথাটা ঠিক? 

“হ্যা; নানারকম কাজকর্ম চলছে।, 

“ওখানে লোক অনেক বেড়ে গেছে, না? 

হ্যা, প্রায় এইট মিলিয়ন।' 

ইট*স আ প্রবলেম। ভেরি বিগ প্রবলেম? 

হীরক বলল, “এত বড় সিটি, এত পপুলেশন, প্রবলেম তো হিউজ হবেই 

আন্তে-আস্তে ঘাড় হেলালেন মণিমোহন, “রাইট।” একটু থেমে, ভেবে নিয়ে আবার বললেন, 
ক্যালকাটার ফুটবলের স্ট্যান্ডার্ড এখন কেমন?" 

'অনেক নেমে গেছে। তবু ইন্ডিয়ার বেস্ট।' 

“ফুটবল নিয়ে মাতামাতি কীরকম? 

'দারুণ। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের খেলা হলে এসপ্ল্যানেডে তিন ঘণ্টা ট্রাফিক জ্যাম থাকে।' 

মণিমোহন বললেন, “মাতামাতিটাই শুধু আছে। রহিম-রশিদ-মুর্গেশ-লল্ষ্মীনারায়ণ-কে. দত্ত- 
পি চক্রবর্তী মান্নাআগ্লারও, এদের মতো প্লেয়ার আর হল না।' 

হীরক হাসল, 'আমি ওদের খেলা দেখিনি। কমপেয়ার করা আমার পক্ষে মুশকিল।' 

কারেক্ট। তবু আমার কথা যদি শোনো, বলব ক্যালকাটা ফুটবলের গোল্ডেন এজ হচ্ছে 
নাইনটিন থার্টি ফোর থার্টি ফাইভ থেকে ফর্টিফাইভ সিক্সটি পর্যস্ত। | 

উলটো দিকের সিট থেকে সুজয়া লক্ষ করল, হীরক কোনওরকম তর্কবিতর্কে গেল না। 
বয়স্ক মানুষদের নস্টালজিয়া সম্পর্কে এক ধরনের দুর্বলতা আছে। হীরক তাকে সম্মান দিতে জানে। 
সুজয়ার মনে হল ছেলেটি ভদ্র। 

মণিমোহন এবার বললেন, “যাই বলো, ক্রিকেটে কিন্তু ক্যালকাটার স্ট্যান্ডার্ড খুবই পুওর।' 

সঙ্গে-সঙ্গে কথাটা স্বীকার করে নিল হীরক বলল, “হ্যা। অল ইন্ডিয়া, পারটিকুলারলি বন্ধে 


আপন মনে ১৪৫ 


দিল্লি কি মাদ্রাজ যতটা এগিয়েছে আমরা তার কাছাকাছিও যেতে পারিনি । 

“আমার খুব খারাপ লাগে কখন জানো? 

ধলা 

'যখন দেখি টেস্ট টিমে ভাস্ট ইস্টার্ন জোন থেকে একজনও রিপ্রেজেনটেটিভ নেই। পঙ্কজ 
রায়ের পরই সব শেষ।, 

হীরক কী বলবে, চুপ করে থাকল। 

মণিমোহন বলতে লাগলেন, 'আসলে ক্যালকাটা ক্রিকেটকে সেইভাবে নেয়নি। বন্বেতে সারা 
বছর ক্রিকেট চলে। এনি সিজন অফ দা ইয়ার ইউ কাম, দেখবে আজাদ ময়দান, ক্রস ময়দান, 
ওভাল আর যত জিমখানা আছে-_হিন্দু, পার্শি, খার-_সব জায়গায় ক্রিকেট চলছে। কলকাতাতেও 
সারা বছর ক্রিকেট প্র্াকটিসের আ্যারেঞ্জমেন্ট থাকা দরকার। নইলে ভালো প্লেয়ার তৈরি হবে না। 
তুমি আমার সঙ্গে একমত? 

“নিশ্চয়ই-? 


ওদের কথার মধ্যেই রেলওয়ে কেটারিং-এর উর্দি-পরা বেয়ারা এসে হাজির। ডিনারের অর্ডার 
নিতে এসেছে। 

হীরক কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই মণিমোহন বলে উঠলেন, “কী তোমার পছন্দ বল-_ 
ইওরোপিয়ান, না ইন্ডিয়ান ডিশ? 

মণিমোহনের মনোভাবটা বুঝতে পেরেছিল হীরক। বিব্রতভাবে বলল, না, মানে 

তাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে মণিমোহন বললেন, “আজ রান্তিরে তুমি আমার গেস্ট-_ 
একটু থেমে, প্রায় তক্ষুনি আবার বললেন, 'শুধু আজই না, পরশু ভোরে হাওড়ায় পৌঁছনো পর্যন্ত 
তুমি আমাদের সঙ্গে খাবে” 

“কস্ত-_? 

“সংকোচের কারণ নেই। তোমাকে আমাদের ভালো লেগেছে। খাওয়ার সময়ে তোমাকে পেলে 
আরও ভালো লাগবে। যদি রিফিউজ করো, খুব দুঃখিত হব।' 

স্রোতে হাত-পা ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে হীরক বলল, “ঠিক আছে। কলকাতায় গিয়ে আমাদের 
বাড়িতে কিন্তু একদিন আপনাদের আসতে হবে।' 

মণিমোহন গলার স্বরে অনেকখানি জোর দিয়ে বললেন, 'অবশ্যই। এবং উইদ প্লেজার। ইন 
ফ্যাক্ট, তুমিই প্রথম ক্যালকাটান যে আমাদের নেমন্তন্ন করল। নেমন্তন্ন আমরা মিস করি না।' বলেই 
সুজয়ার দিকে ফিরলেন, “না কি বলিস--” 

সুজয়া হাসল শুধু। 

হীরক বলল, "আপনার যা ইচ্ছে। আই হ্যাভ নো চয়েস।' 

নিজের মনের কি একটু চিস্তা করে পুরো ভারতীয় ডিনারের অর্ডার দিলেন মণিমোহন। 
বেয়ারাটা নোটবুকে টুকে নিয়ে বলল, “সাব, আপলোগোকা খানা কামরেমে সার্ভ করেগা, ইয়া 
আপলোগ রেস্টুরেন কামরা পর যায়েঙ্গে £ 

মণিমোহন বললেন, “তোমাকে আর খানা আনতে হবে না; আমরা রেস্তোরা কারেই যাব।' 

“ন' বাজে খানা লাগায়েগা-_ 

“ঠিক হ্যায়__+ 

বেয়ারা চলে গেল। 


প্রফুল্ল রায়__-পাঁচটি উপন্যাস__-১৯ 


১৪৬ পাঁচটি উপন্যাস 


খানিকক্ষণ চুপচাপ। তারপর মণিমোহন আবার শুরু করলেন, “সত্যজিৎ রায়ের লাস্ট ছবি 
কী? 

হীরক বলল, “জন অরণ্য । 

“এখন উনি কী করছেন?" 

“আমি ঠিক জানি না।, 

“আচ্ছা, কোন গ্রুপ থিয়েটারগুলো 'এখন ভালো ড্রামা করছে? 

“আমার কোনও আইডিয়া নেই।' 

“তুমি বোধহয় সিনেমা থিয়েটারের ব্যাপারে তেমন ইনটারেস্টেড নও ।' 

হীরক কিছুটা বিব্রতভাবে বলল, 'না। মানে ওসব তেমন একটা দেখা হয়ে ওঠে না। তবে 
আমার এক বন্ধু আছে মৃণাল। তার সঙ্গে আপনাদের আলাপ করিয়ে দেব। সে এসব বিষয়ের 
অথরিটি।' 

মণিমোহন উৎসাহের সুরে বললেন, “নিশ্চয়ই আলাপ করিয়ে দেবে। কত কাল বাংলা ছবি, 
বাংলা নাটক দেখি না।' 

“আমার বন্ধু মৃণাল কলকাতার যত কালচারাল ব্যাপার আছে, সব খবর রাখে। ব্রিলিয়ান্ট 
স্টডেন্ট ছিল; প্রফেসরি করে। লিটারেচার থেকে শুরু করে ফোক মিউজিক পর্যস্ত, যা বলবেন সমস্ত 
কিছুর এনসাইক্লোপিডিয়া।" 

“ফাইন। তোমার বন্ধুকে কলকাতায় আমাদের কালচারাল আ্যাফেয়ার্সের গাইড করে নেব। 
না কি বলিস টুকু বলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন মণিমোহন। 

সুজয়াও হাসল, “ভালোই তো।' 

হীরক বলল, “ওর সঙ্গে আলাপ হলে আপনাদের ভীষণ ভালো লাগবে। হি ইজ সো নাইস।" 

মণিমোহন বললেন, “বন্ধুর হয়ে ঢালাও পাবলিসিটি দিচ্ছ? 

হীরক খুব আস্তরিক গলায় জোর দিয়ে বলল, “একটুও বাড়িয়ে বলছি না। মৃণালের মতো 
কালচার্ড, ডিসেন্ট, সোবার, হৃদয়বান ছেলে আমি আর দেখিনি । আলাপ হলে দেখবেন আমার কথার 
প্রত্যেকটা সিলেবল সত্যি।, 

তুমিও নাইস বয়।' 

“ওর সঙ্গে আমার কোনও তুলনাই হয় না।' 

“সেটা কলকাতায় গিয়ে আমরা বিচার বিবেচনা করে দেখব।' 

“আমার কথা বিশ্বাস করুন।' 

আদরের ভঙ্গিতে হীরকের পিঠে একটা হাত রেখে মণিমোহন বললেন, “অবিশ্বাস তো করছি 
না। তবে এমন করে যে অন্যের প্রশংসা করতে পারে সেও খুব ভালো।' 

হীরকের মতো ঝকঝকে স্মার্ট ছেলেও একটু লজ্জা পেয়ে গেল। 

উলটো দিকের সিটে বসে সুজয়ারও বেশ ভালো লাগছিল হীরককে। হীরক সম্পর্কে তার 
মনোভাব মণিমোহনের মতোই। যে নিজের জন্য হাতে কিছু না রেখে বন্ধু সম্বন্ধে এ্সন ঢালাও 
সার্টিফিকেট দিতে পারে তার হৃদয় যথেষ্টই উদার। | 

কথায়-কথায় নস্টা বেজে গিয়েছিল। মণিমোহন হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সচেতন হয়ে 
উঠলেন, চলো, রেস্তোরা-কারে যাওয়া যাক ডিনারের সময় হয়ে গেছে। বলতে বলতে উঠে 
দাড়ালেন। 

দেখাদেখি সুজয়া আর হীরকও উঠে পড়ল। 

দু-ধারে পরপর ক্যুপ। মাঝখানে টানা সরু করিডর। কিছুক্ষণ পর করিডর হয়ে তিনজনে 
রেস্তোরী-কারে এসে পড়ল। 


আপন মনে ১৪৭ 


এর মধ্যেই এখানে বেশ ভিড় জমে গেছে। তবু এক কোণে জানলার ধার ধেঁষে ওরা একটা 
ফাকা টেবল পেয়ে গেল। 

একদিকে সুজয়া একা বসেছে। টেবলের উলটোদিকে মুখোমুখি বসেছেন মণিমোহন আর 
হীরক। ওরা বসবার পীচ মিনিটের মধ্যেই লিস্ট মিলিয়ে বেয়ারা খাবার দিয়ে গেল। 

খেতে-খেতে কলকাতা আর পশ্চিম বাংলা সম্পর্কে নানারকম প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন 
মণিমোহন। | 

বোম্বাইয়ের রাস্তায় আট-দশটা পাহাড়ি টানেল পড়ে। ট্রেন এক-একটা টানেলের ভেতর ঢুকছে; 
সঙ্গে-সঙ্গে গম্ভীর গমগম শব্দ এবং তার প্রতিধ্বনি টানেলের দেওয়ালে-দেওয়ালে আর আবদ্ধ বাতাসে 
ধাকা মেরে যেতে লাগল। 

খাওয়া-দাওয়ার মধ্যেই সবগুলো টানেল আর বোম্বাই শহরের সীমানা পেরিয়ে ক্যালকাটা 
মেল বিশাল মাঠের মাঝখানে এসে পড়ল। ্‌ 

এখন পূর্ণিমা চলছে। রুপোর থালার মতো গোল একটি চাদ দিগন্তের তলা থেকে কখন 
লাফ দিয়ে আকাশের মাঝমধ্যিখানে উঠে এসেছে এতক্ষণ টের পাওয়া যায়নি । জ্যোতশ্নার ঢল নেমেছে 
চারিদিকে। আর তাতে মহারাষ্ট্রের ধু-ধু মাঠ, মাঝে-মাঝে ছোট-ছোট পাহাড়, তাদের উপত্যকা, বুনো 
গাছের জটলা-_সব একাকার হয়ে কোনও এক অলৌকিক পরির দেশ হয়ে গেছে। 

নিজেই প্রায় সব কথা বলে যাচ্ছিলেন মণিমোহন। ফাকে-ফাকে উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল হীরক। 
হঠাৎ কি মনে পড়তে মণিমোহন সুজয়ার দিকে ফিরলেন, “দিস ইজ ব্যাড টুকু।” সুজয়ার ডাকনাম 
টুকু। 

সুজয়ার চোখ মণিমোহনদের দিকেই ছিল। ত্বার কথা বুঝতে না পেরে সে জিগ্যেস করল, 
“কী হয়েছে বাবা 

হীরক আমাদের গেস্ট। তুই কিন্তু তার সঙ্গে একটা কথাও বলছিস না।' 

“তুমিই তো বলছ। আমি আর কি বলব? 

'যা হোক কিছু।' 

“ফর্মালিটি!” 

মণিমোহন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, “না না, ফর্মালিটি করতে হবে কেন? ক্যালকাটা, বেঙ্গল__ 
এসব সম্পর্কে তো ওর কাছে কিছু জানতেও পারিস।' 

সুজয়া হেসে ফেলল, “তুমি জিগ্যেস করছ, উনি উত্তর দিচ্ছেন। মাঝখান থেকে আমার জানা 
হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর আমি যদি আবার কোশ্চেন পেপার সাজিয়ে বসি, উনি ডেফিনিটলি বিরক্ত 
হবেন।' 

হীরক ব্যস্তভাবে বলে উঠল, “না না, বিরক্ত হব কেন? 

সুজয়া উত্তর দিল না, সামান্য হাসল। 

হীরক জিগ্যেস করল, 'আপনি আগে আর কখনও কলকাতায় গেছেন? 

“ছেলেবেলায় তিন-চারবার বাবার সঙ্গে গেছি। আমার একটা আবছা ইমপ্রেশান আছে।' 

এলোমেলো আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলল। তার ফাকে রাতের খাওয়া শেষ করে ওরা 
নিজেদের ক্যুপেতে যখন ফিরে এল, দশটা বাজে। 

মণিমোহন বললেন, "রাত হয়ে গেছে। তোমার ওপর অনেক উৎপাত করেছি। এবার শুয়ে 
পড়ো। কাল সকালে আবার কথা হবে। গুড, নাইট।” আসলে কাটায়-কাটায় দশটায় শুয়ে পড়ার 
অভ্যাস মণিমোহনের। এ-ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি নিয়মতান্ত্রিক। 

হীরক প্রথমে মণিমোহনের, পরে সুজয়ার দিকে ফিরে বলল, "গুড নাইট।' তারপর ওপরে 
তার বার্থে উঠে গেল এবং টান-টান হয়ে শুয়ে পড়ল। 


১৪৮ পাঁচটি উপন্যাস 


নীচে মণিমোহন তার বিছানায় শুয়ে পড়েছেন; সুজয়াও একটু পরে শুয়ে পড়ল। 

শোওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে চোখ জুড়ে আসছিল মণিমোহনের। ঘুমটা তার চোখের পাতায় বসানোই 
থাকে। বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ামাত্র ঘুমিয়ে পড়তে পারেন। জড়ানো গলায় বললেন, “বেশি 
পাওয়ারের আলোটা নিভিয়ে জিরো পাওয়ারেরটা জ্বেলে দাও হীরক। চোখে ভীষণ লাগছে। 

হীরকের মাথার কাছেই সুইচ বোর্ড। হাত বাড়িয়ে বোতাম টিপে একটা আলো জ্বালল সে, 
আরেকটা নেভাল। জিরো পাওয়ারের নীলাভ আবছা আলোয় গোটা ক্যুপটা মুহূর্তে ভরে গেল। 

ট্রেন চলছে তো চলছেই। কল্যাণ, ইগতপুরী এবং আরও গোটাকয়েক স্টেশন অনেকক্ষণ 
আগেই পার হয়ে গেছে। এরপর হয়তো নাসিক। 

নীচের বার্থে শুয়ে-শুয়ে কিছুতেই ঘুম আসছে না সুজয়ার। সে মণিমোহনের উলটো। এত 
তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস তার কোনওকালেই নেই। রান্তিরে বারোটা-একটা পর্যস্ত চিরকালই সে 
কিছু না কিছু পড়ে। সুজয়া রাত জাগলে মণিমোহন অবশ্য রেগে যান। তাই লুকিয়ে-চুরিয়ে তাকে 
পড়তে হয়। 

আলো নিভে গেছে; এখন আর পড়ার উপায় নেই। এদিকে ঘুমও আসছে না। একধারে 
কাত হয়ে সে চোখ বোজার চেষ্টা করল। কিন্তু ট্রেনের একটানা দোলানিতে ঘুমের কোনও আশাই 
নেই। মনে হচ্ছে সে যেন উঁচু-নীচু ঢেউ-এর মাথায় ভাসছে। তা ছাড়া ওধার থেকে মণিমোহনের 
নাক ডাকার শব্দ ভেসে আসছে। হারমোনিয়ামের রিডগুলো খাদে বাজালে যেরকম হয়, মণিমোহনের 
নাক থেকে সেইরকম আওয়াজ বেরিয়ে আসছে। ওপরে যোহন সেবাস্টিয়ানের নাকও ডাকছে। 
হারমোনিয়াম চড়ায় তুলে বাজালে যেমন হয় সেবাস্টিয়ানের নাকের আওয়াজ অনেকটা সেইরকম। 
দুই নাকের মিলিত অর্কেন্ট্রায় ক্যুপের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। 

প্রাগিতিহাসিক আদিম কোনও একরোখা গোয়ার জন্তুর মতো গাক-গাক করতে-করতে রাতের 
ক্যালকাটা মেল মহারাষ্ট্রের প্রান্তর চিরে বেরিয়ে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে ছোট-বড় ওভারব্রিজ. পড়ে। 
ট্রেনের আওয়াজ তখন দশগুণ বেড়ে যায়। কর্কশ ঝড়াং ঝড়াং শব্দটা তখন কানের পরদা ছিড়ে 
দিতে থাকে। 

ওপাশ থেকে এপাশে ফিরল সুজয়া। তারপর ক্রমাগত এপাশ-ওপাশ করতে লাগল। এইভাবে 
হঠাৎ একসময় তার চোখ পড়ল কোনাকুনি উলটোদিকের ওপরের বার্থে। আবছা আলোতেও সে 
দেখতে পেল হীরক একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হল, অনেকক্ষণ ধরেই ওইভাবে সে 
তাকে লক্ষ করছে। 

কিছুটা অবাকই হল সুজয়া। সে জানে যে-কোনও যুবক তাকে একবার দেখলে চোখ ফেরাতে 
পারে না। কলেজে বা ইউনিভারসিটিতে যখন পড়েছে অগুনতি মুগ্ধ এবং লোভী চোখ সবসময় 
তার গায়ে আটকে থাকত যেন। শুধু তাদের ক্লাসের ছেলেরাই নয়, সিনিয়ার ক্লাসের ছেলেরা এবং 
তরুণ কোনও-কোনও প্রফেসর তাকে খুশি করার বা তার চোখে পড়ার জন্য দাতে দাত চাপা অদৃশ্য 
খ্যাপাটে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেত। ছাত্র এবং অধ্যাপকদের মধ্যে তাকে ঘিরে এক ধরনের ডগ- 
রেস চলতে থাকত যেন। সুজয়া কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় যত প্রেমপত্র, পেয়েছে 
সেগুলো ছাপালে পাঁচ ভলুমের বই হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সুজয়া কাউকে পাস্তা দেয়নি। কুকুরের 
মতো হ্যাংলামি, লালা-ঝরানো লোভ সে ঘৃণা করে। তার মধ্যে আশ্চর্য এক মর্যাদাবোধ, দৃ্টতা এবং 
আভিজাত্য রয়েছে। আর আছে রহস্যময় এক দূরত্ব। নিজের চারপাশে পরিখা তৈরি করে সে সবার 
নাগালের বাইরে থাকে। সুজয়া উত্তেজিত বা বিচলিত হয় না; মাছির মতো ভ্যানভেনে কোনও 
স্তাবকদের কথাতেই সে ভেসে যায় না। শান্ত, শীতল উপেক্ষায় সবকিছু সে দূরে সরিয়ে রাখতে 
জানে। পৃথিবীকে অবজ্ঞা করার মতো বিপুল শক্তি তার মধ্যে রয়েছে। 

সুজয়ার মনে পড়তে লাগল, হীরক এই ট্রেনে ওগ্রার পর বাবার সঙ্গে অনর্গল কথা বলে 


আপন মনে ১৪৪৯ 


গেছে। তার সঙ্গেও অল্প্বল্প দু-একটা কথা বলেছে। কিন্তু কখনও তার দিকে অন্যদের মতো তাকিয়ে 
থাকেনি। হীরককে অত্যন্ত শোভন, ভদ্র এবং মার্জিতই মনে হয়েছে তার। কিন্তু রাতের অন্ধকারে 
দুরস্ত গতিতে ছুটে যাওয়া ট্রেনের এই ক্যুপেতে সবাই যখন গভীর ঘুমে ডুবে আছে তখন তাকে 
লুকিয়ে না দেখে পারছে না হীরক। সুজয়া আপন মনেই হাসল। তবে একটুও রাগল না বা উচ্ছৃসিত 
হল না। এভাবে না দেখলে হীরককে কিছুটা অস্বাভাবিকই মনে হত সুজয়ার। 

হীরক কিন্তু বিন্দুমাত্র বিব্রত হল না। সহজভাবে বলল, “ঘুম আসছে না। এপাশ-ওপাশ 
করছিলাম; দেখি আপনিও এপাশ-ওপাশ করছেন? 

সুজয়া বলল, “আমি এভাবে ঠিক ঘুমোতে পারি না? 

“তবু ঘুমের চেষ্টা করতে হবে।' 

এলোমেলো আরও দু-একটা কথার পর হীরকের চোখ এবং গলার স্বর ক্রমশ জড়িয়ে আসতে 
লাগল। আরও কিছুক্ষণ বাদে সুজয়াও একসময় ঘুমিয়ে পড়ল। 


দুই 


ছত্রিশ ঘণ্টা কতটুকু আর সময়! দুটো গোটা রাত এবং একটা গোটা দিন। হীরকের সঙ্গে গল্প করে 
করেই কাটিয়ে দিলেন মণিমোহন। সুজয়া বেশির ভাগ সময় চুপচাপ ওঁদের কথা শুনে গেছে, নিজে 
বলেছে খুব কম। তবে প্রথম রাতের মতো দ্বিতীয় রাতেও সে লক্ষ করেছে ক্যুপের আলো নিভে 
গেলে জিরো পাওয়ারের আবছা নীলাভ অন্ধকারে ওপরের বার্থে শুয়ে-শুয়ে হীরক তার দিকেই তাকিয়ে 
থেকেছে। প্রথম রাতের মতোই দ্বিতীয় রাতেও দু-একটা এলোমেলো কথা তার সঙ্গে হয়েছে। তারপর 
দুজনেই ঘুমিয়ে পড়েছে। 

একটানা এই ছত্রিশ ঘণ্টা সময়ের মধ্যে ক্যুপের চার নম্বর যাত্রী গোয়াঞ্চি পিদ্রু যোহন 
সেবাস্টিয়ানের অস্তিত্ব খুব বেশি টের পাওয়া যায়নি। বার দুই-তিন টয়লেটে যাওয়ার জন্য সে 
উঠেছে এবং তখনই দ্রুত নাকে মুখে কিছু গুঁজে আবার সটান শুয়ে পড়েছে। ছত্রিশ ঘণ্টার মধ্যে 
দু-ঘণন্টাও সে চোখ মেলে থেকেছে কি না সন্দেহ। 


দেড় দিন বাদে ক্যালকাটা মেল এইমাত্র হাওড়া পৌঁছে গেল। 

এখন অক্টোবরের মাঝামাঝি। বাংলা ক্যালেন্ডারে খুব সম্ভব আশ্বিন মাস শেষ হয়ে আসছে। 

কিছুক্ষণ আগেই সকাল হয়েছে; প্ল্যাটফর্মের উচু শেডের ফাক দিয়ে উজ্জ্বল সোনালি রোদের 
ঢল নেমে এসেছে। 

মণিমোহন এই বয়সেও খুবই চ্টপটে এবং ব্যস্তবাগীশ মানুষ। আর্মির মেডিক্যাল ইউনিটের 
তিনি কর্নেল। তবু নিজের কাজ নিজের হাতে করতে ভালোবাসেন; কারও জন্য কিছু ফেলে রাখেন 
না। প্রায় আধ ঘণ্টা আগে, ট্রেন যখন সীত্রাগাছিরও অনেক ওধারে, হোল্ড-অল বেঁধে, শেভ করে 
ফিটফাট হয়ে বসে আছেন। হীরকও এর মধ্যে উঠে পড়েছিল। সেও তার মালপত্র গোছগাছ করে 
ফেলেছে। 

ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকার পর যোহন সেবাস্টিয়ানের ঘুম ভেঙেছিল। আস্তে-আস্তে উঠে 
আড়মোড়া ভেঙে এখন সে তার লাগেজ-টাগেজ গোছাচ্ছে। দীর্ঘ ছত্রিশ ঘণ্টার মেয়াদি ঘুমের পর 
এই প্রথম টের পাওয়া গেল, ঘুম, খাওয়া এবং টয়লেটে যাওয়া ছাড়া তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আরও কিছু 
কাজকর্ম করতে পারে। 


১৫০ পাঁচটি উপন্যাস 


মণিমোহন জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ছিলেন। বাড়িতে ভাইদের খবর দেওয়া আছে; তাঁরা 
নিশ্চয়ই নিয়ে যাওয়ার জন্য স্টেশনে আসবেন। মণিমোহন তাদের খুঁজছিলেন। 

উলটোদিকের বার্থ থেকে সুজয়া বাবার কাছে উঠে এসে জানলার ধার ঘেঁষে বসে ছিল। 
সেও বাইরে মুখ বাড়িয়ে আছে। যদিও বাংলা দেশেরই মেয়ে সে, তার জন্ম. পুণায়। জীবনের প্রথম 
পঁচিশ-ছাব্বিশটা বছর সেখানে কাটিয়ে সুজয়া কলকাতায় এল। এর আগে বাবার সঙ্গে বার তিন- 
চারেক এখানে এসেছে। কোনওবারই চার-পাঁচ দিনের বেশি থাকা হয়নি। তবে ঠাকুমা-ঠাকুরদার 
মৃত্যুর সময় দু-বারে পনেরো দিন পনেরো দিন করে থেকে গিয়েছিল। কয়েকবার এলেও কলকাতা 
সম্পর্কে তার কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। এ-শহর তার কাছে ভূগোল বা ইতিহাসে-পড়া অন্য কোনও 
দূরদেশের একটি নগরের মতোই আধ-চেনা, অস্পষ্ট। 

এতদিন পর এখানে তারা থাকতে এসেছে। নিজের মধ্যে আশ্চর্য এক উত্তেজনা অনুভব 
করছিল সুজয়া। 

প্ল্যাটফর্মে গাদা-গাদা মানুষের ভিড় । অনেকে তাদের আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে 
যেতে এস্ছে। তা ছাড়া গলগল করে লোক নামছিল। মণিমোহন বললেন, “একটু লক্ষ রাখ। অবু, 
বিজু, কি রামুকে দেখলে ডাকবি।' 

মণিমোহনের তিন ভাইয়ের নাম অবনীমোহন, রামমোহন এবং বিজয়মোহন। ডাকনাম অবু 
বিজু আর রামু। 

সুজয়া তিন কাকাকেই চেনে । ফি বছরই ছুটিছাটায় তিন কাকার কেউ না কেউ পুণায় যেতেনই। 
তা ছাড়া মণিমোহন তাদের ফ্যামিলিতে আরেকটা ব্যাপার চালু করেছেন। প্রত্যেক বছর ভাইদের 
এবং তাদের স্ত্রী-ছেলেমেয়ের গ্রুপ ফোটো তুলে তার কাছে পাঠাতে হত। মণিমোহন নিজেও তার 
এবং সুজয়ার ফোটো পাঠাতেন। যতদিন সুজয়ার মা বেঁচে ছিলেন তার ফোটোও কলকাতায় পাঠিয়ে 
গেছেন মণিমোহন। কার চেহারা বদলে কীরকম দীড়াল, এইসব ফোটো থেকে তা শনাক্ত করা যায়। 

চোখের পাতা টান করে থেকেও ভিড়ের ভেতর কাকাদের কাউকে দেখতে পেল না সুজয়া। 

এদিকে লাল জামা-পরা ঝাকে-ঝীাকে কুলি কামরায়-কামরায় হানা দিতে শুরু করেছিল। দুটো 
নাছোড়বান্দা কুলি ট্রেন থামার সঙ্গে-সঙ্গে সুঞ্জয়াদের ক্যুপেতে ঢুকে পড়েছিল। ওরা তাদের আর 
হীরকের মালপত্রের গায়ে মাছির মতো আটকে আছে আর সমানে নামার জন্য ডুয়েটে তাড়া দিয়ে 
যাচ্ছে। কিন্তু ভাইদের না-দেখা পর্যস্ত মণিমোহন নামতে পারছেন না। 

হঠাৎ মণিমোহনের মনে হল, তাদের জন্য খুব সম্ভব হীরক আটকে আছে। দ্রুত ঘাড় ফিরিয়ে 
বললেন, “তোমাদের বাড়ি থেকে কেউ তোমাকে নিতে আসবেন? 

হীরক বলল, “গাড়ি পাঠাবার কথা আছে। অবশ্য যদি আমার টেলিগ্রাম পেয়ে থাকে__” 

“আমাদের বাড়ি থেকেও ভাইদের আসার কথা আছে। কিন্তু কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছি 
না। ভাবছি আরেকটু ওয়েট করে একটা ট্যাক্সি নেব। তুমি কী করবে? 

“আমার খুব তাড়া নেই। আর কিছুক্ষণ ওয়েট করে দেখি।, 

মিনিট দুয়েক কাটল না, জানলার ওধারে প্ল্যাটফর্মের দিক থেকে সরু খ্যানখেনে গলার ডাক 
ভেসে এল, “ছোটা সাব আয়ে হ্যায়? ছোটা সাব আয়ে হ্যায়__' 

গলা শুনেই হীরক চিনে ফেলেছিল-__তাদের ড্রাইভার লাখু সিং। হীরক ঠেচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, 
“এই যে লাখু, এই ক্যুপেতে__" বলেই মণিমোহনের দিকে ফিরল, “আমার লোক এসে গেছে। 

ততক্ষণে জানলায় ডিগডিগে ঢ্যাঙা চেহারার লাখু সিং তার লম্বাটে চোয়াড়ে মুখ, মোটা 
গোঁফ, সরু চোয়াল এবং গোলাকার চোখ নিয়ে দেখা দিয়েছে। আর তার ঠিক গা ধেঁষেই আরেকটি 
যুবকের মুখ চোখে পড়ল। হীরক তাকে দেখে প্রায় চেঁচিয়েই উঠল, “মৃণাল, তুই! লাখু তোকে কোথায় 
পেল? 


আপণ মনে ১৫১ 


তার গলার স্বরে একই সঙ্গে খুশি এবং বিম্ময়। 

মৃণাল বলল, দাঁড়া, আসছি।' 

একটু পর মৃণাল আর লাখু সিং ক্যুপের ভেতর চলে এল। 

মৃণাল হীরকেরই সমবয়সি। হাইট অতটা না হলেও বেশ লম্বাই। রোগা পাতলা চেহারা। 
নাকমুখ কাটাকাটা। গায়ের রং কালোও না, ফরসাও না-_দুয়ের মাঝামাঝি । চওড়া কপাল মৃণালের।' 
অনেকদিন চুল কাটা হয়নি; অযত্তে এবং অবহেলায় সেগুলো উলটে দেওয়া । ঘন জোড়া ভুরু । পরনে 
ধুতি আর বাফতার পাঞ্জাবি 

সব চাইতে আশ্চর্য মৃণালের চোখ । অত্যন্ত সরল, নিষ্পাপ এবং অন্যমনক্ক। এক পলক দেখেই 
টের পাওয়া যায় তার চোখেমুখে, সমস্ত চেহারায় কি এক পবিত্রতা যেন মাখানো রয়েছে। তবে 
সে ভীষণ রোগা । আর তাকে এক ধরনের বিষগ্নতা যেন ঘিরে আছে। 

মৃণাল বলল, “কাল তোদের বাড়িতে ফোন করেছিলাম। মাসিমা বললেন, তুই আজ বন্ধে 
থেকে আসবি; লাখু সিং তোকে নিতে স্টেশনে আসবে! আমি বললাম, লাখু যেন হাওড়ায় আসার 
সময় আমাকে তুলে আনে। সে আমাকে নিয়ে এল।' 

“এসে খুব ভালো করেছিস। কেমন আছিস?' 

“ভালোই তো।" 

“ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেকআপ করাবার কথা ছিল? 

করিয়েছি।, 

“রিপোর্ট ভালো।' 

“ভালোই। তারপর তোর খবর বল। মোটর র্যালিতে কী হল? 

“সেকেন্ড প্রাইজ ।' 

“ফার্স্স হতে পারলি না!” 

'না। বাঙ্গালোরের একটা মেয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে ফাস্ট হয়ে গেল। ড্রাইভিং-এ দারুণ 
হাত মেয়েটার। তেমনি এলার্ট । 

বলতে-বলতে হঠাৎ কী মনে পড়ে গেল হীরকের, ব্যস্তভাবে বলে উঠল, “তোর সঙ্গে এঁদের 
আলাপ করিয়ে দিই। ইনি কর্নেল মণিমোহন বোস, ইনি কর্নেল বোসের মেয়ে সুজয়া বোস-_; 

আলাপ-পরিচয়ের পর মণিমোহন বললেন, “তুমিই তা হলে মৃণাল? ভারী খুশি হলাম তোমাকে 
দেখে, তোমার কথা আগেই শুনেছি। 

একটু অবাক হয়েই মৃণাল বলল, “আমার কথা আগে শুনেছেন!” বলেই অল্প হাসল, “বুঝেছি, 
হীরক বলেছে।' 

মণিমোহন বললেন, “তোমার বন্ধুটি তো তোমার কথা শুরু করলে আর থামতেই চায় না। 
বন্ধে টু ক্যালকাটা, থার্টি-সিক্স আওয়ার্স আমরা একসঙ্গে এলাম। এর মধ্যে তোমার সম্বন্ধে কম করে 
ছত্রিশটা সার্টিফিকেট দিয়েছে।" 

মৃণাল লাজুক হাসল। বলল, “ও আমার সম্বন্ধে সবসময় বাড়িয়ে বলে। হাইপারবোল। আসলে 
ও নিজে এত ভালো-_' 

তাকে থামিয়ে দিয়ে মণিমোহন বললেন, “ব্যাপারটা কী বল তো? তোমরা কি নিজেদের 
মধ্যে প্যান করে নিয়েছ? 

বুঝতে না পেরে মৃণাল কিছুটা হকচকিয়ে গেল। বলল, “আজ্ঞে 

“বলছিলাম, তোমরা চুক্তি করেছ একজন আরেকজনকে ঢালাও সার্টিফিকেট" দিয়ে যাবে; এই 
তো? 

কিছু বলতে গিয়ে হেসে ফেলল মৃণাল। হীরকও ঠোট কামড়ে কামড়ে হাসছিল। 


১৫২ পাঁচটি উপন্যাস 


একপাশে মণিমোহনের বার্ধে বসে ছিল সুজয়া। এই সকালবেলায় মৃণালের পবিত্র নিষ্পাপ 
চোখ এবং সরল হাসি তার বুকের গভীরে কোথায় যেন আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মণিমোহনের 
মজার কথায় সবাই যখন হাসছে তখন তার চোখে এবং ঠোটে হাসির একটি কুঁড়ি ফুটি-ফুটি করছিল । 

মণিমোহন এবার বললেন, “ঠিক আছে। তোমাদের আর আটকাব না। পরে নিশ্চয়ই দেখা 
হবে। আমাদের বাড়ি হল ঢাকুরিয়ায়। তোমরা দুজনেই ওখানে আসছ। আমার এবং অন বিহাফ 
অফ মাই ডটার তোমাদের নেমস্তন্ন রইল। কবে আসবে বলো? 

হীরক বলল,শিগগিরই একদিন যাব।, 

উহ, ওভাবে বললে চলবে না। স্পেসিফিক ডেট দাও।” 

হীরক মৃণালের দিকে ফিরে বলল,তুই কবে যেতে পারবি? 

মৃণাল বলল, “আমি, মানে 

মণিমোহন বললেন, “নো, ডোন্ট ট্রাই টু আ্ভয়েড।' 

হীরক বলল, “ও কোথায়ও যেতেটেতে চায় না। ঠিক আছে, পরশুদিন আমরা আপনাদের 
বাড়ি যাচ্ছি। আমি ওকে নিয়ে যাব।' 

“পরশু কখন? 

“বিকেলে ।' 

“আমরা অপেক্ষা করব।” বলে ঢাকুরিয়ায় তাদের বাড়ির ঠিকানা লিখে দিলেন মণিমোহন। 

হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে যেতে হীরক জিগ্যেস করল, “আমরা তো চলে যাচ্ছি, কিন্তু 
আপনাদের যাওয়ার কী হবে? 

“তাই তো ভাবছি। বাড়ি থেকে এখনও কেউ এল না কেন বুঝতে পারছি না। আরেকটু 
দেখে একটা ট্যাক্সি নিয়ে নেব।' 

“আপনি যদি পারমিশান দ্যান একটা কথা বলব? 

'পারমিশানের কী আছে, বলো না-_” 

“আমাদের সঙ্গে গাড়ি আছে। যদি বলেন আপনাদের পৌঁছে দিয়ে যাই। 

“তোমরা কোথায় থাকো? 

“আমরা সন্টলেকে নতুন বাড়ি করেছি। আর মৃণাল কাছেই উলটোডাঙীয় থাকে। 

মণিমোহন বললেন, “সন্টলেক কোনদিকে জানি না; তবে উলটোডাঙার কথা জানা আছে। 
সে তো এক্সট্রিম নর্থ। আমরা থাকি এক্সট্রিম সাউথে। তোমাদের অনেক অসুবিধ। হবে? 

“একটুও না। আপনি আমাদের জন্যে ভাববেন না।' 

কী ভেবে মণিমোহন বললেন, “ঠিক আছে; চলো তা হলে। কতক্ষণ আর স্টেশনে ওয়েট 
করব। মনে হচ্ছে আমার টেলিগ্রাম বাড়িতে পৌঁছয়নি। নইলে অন্য কোনও গগুগোল হয়েছে।' 

সেই নাছোড়বান্দা কুলি দুটোর মাথায় মালপত্র চাপিয়ে একটু পর সবাই লম্বা প্ল্যাটফর্ম এবং 
হাওড়া স্টেশনের বিশাল চত্বর পেছনে ফেলে বাইরে আসতেই দেখা গেল তিনজন মধ্যবয়সি পুরুষ 
এবং তিনজন মোটাসোটা ফরসা সুখী চেহারার মধ্যবয়সি মহিলা ওধারের পার্কিং জোন থেকে প্রায় 
দৌডুতে-দৌডুতে মণিমোহনের দিকে এগিয়ে এলেন। পুরুষদের চেহারা মণিমোহনের মতোই। দেখেই 
বোঝা যায় ওঁরা তার ভাই। মহিলারা তাদের স্ত্রী। 

সুজয়া কাকা এবং কাকিমাদের চিনতে পেরেছিল। সে জানে কাকীরা সবাই খুব কৃতী এবং 
জীবনে প্রতিষ্ঠিত। বড় কাকা অবনীমোহন, বাবা ধাকে অবু বলেন, একটা মাশ্টিন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং 
ফার্মের ওয়ার্কস ম্যানেজার। মেজোকাকা বিজয়মোহন (ডাকনাম বিজু) নামকরা সলিসিটর, ছোটকাকা 
রামমোহন (ডাকনাম রামু) একটা কলেজের প্রিজিপাল। 

কাকা-কাকিমারা কাছে এসে গিয়েছিলেন। তারা সবাই মণিমোহনকে প্রণাম করলেন। সুজয়াও 


আপনলন মনে ১৫৩ 


কাকা-কাকিমাদের প্রণাম করল। এর ফাঁকে-ফাঁকে কথা হচ্ছিল। 

অবনীমোহন বলছিলেন, “ট্রেন কখন এসেছে, 

মণিমোহন বললেন, “অনেকক্ষণ। তোদের জন্যে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট ওয়েট করেছি। ভাবলাম 
শেষ পর্যস্ত আর এলিই না। আমার টেলিগ্রাম পাসনি? 

“পেয়েছি।, 

“তা হলে? 

“বাড়ি থেকে দুটো গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছিলাম। রাস্তায় একটা গাড়ির এঞ্িন এমন ট্রাবল 
দিতে লাগল যে দেরি হয়ে গেল। অবশ্য একটা ভুল হয়ে গেছে। 

“কী? 

ট্রাবল-ফ্রি ভালো গাড়িটা নিয়ে কেউ চলে এলেই হতো ।” 

হীরক আর মৃণাল কাছেই দাড়িয়ে ছিল। তাদের দেখিয়ে মণিমোহন বললেন, “কতক্ষণ আর 
ওয়েট করব। তোদের দেরি দেখে এদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। এরা আমাদের ঢাকুরিয়া পৌঁছে 
দিতে যাচ্ছিল।” বলতে-বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, “ওই দ্যাখ, তোদের সঙ্গে আলাপই করিয়ে দেওয়া 
হয়নি। এ হচ্ছে__ 

ভাই এবং তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে হীরক এবং মৃণালের পরিচয় করিয়ে দিলেন মণিমোহন। তারপর 
হীরকের দিকে ফিরে বললেন, এরা এসে গেছে। তোমাদের আর কষ্ট দেব না। 

হীরক হাসল, “ঠিক আছে। আজ তা হলে চলি। পরশু বিকেলে আসছি কিস্তু__' বলেই 
সুজয়ার দিকে তাকাল, "চললাম।' 

সুজয়া আস্তে ঘাড় হেলিয়ে দিল। 

মৃণাল কিছু বলল না। মণিমোহনের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তারপর হীরকের পাশাপাশি 
হাটতে-হাটতে ওধারের “কার পার্কিং জোন” এর দিকে চলে গেল। 

হীরকদের ড্রাইভার লাখু সিং আগেই গাড়ির ক্যারিয়ারে মালপত্র ঢুকিয়ে স্টিয়ারিং ধরে বসে 
ছিল। 


এধারে হাওড়া স্টেশনের গায়ে দীড়িয়ে সুজয়া লক্ষ করল গাড়িতে উঠবার আগে হীরক 
একবার তার দিকে মুখ ফেরাল; কয়েক পলক তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে-আত্তে ভেতরে টুকল। 
মনে-মনে হেসে ফেলল সুজয়া। 

হীরকের পর মৃণাল গাড়িতে উঠল। সে কিন্তু একবারও এধারে মুখ ফেরাল না। সুজয়া 
আবছাভাবে ভাবতে চেষ্টা করল, মৃণাল কি খুবই লাজুক? নাকি সুন্দরী মেয়েদের উপেক্ষা করার 
মতো অহংকারী? কিন্তু তার পবিত্র নিষ্পাপ মুখ দেখে এসব মনে হওয়া উচিত নয়। 

একটু পর হীরকদের গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। 

এদিকে মেজোকাকা বিজয়মোহনের গলা শোনা গেল, “এখানে দীড়িয়ে থেকে কী হবে, 
উল 

সবাই রাস্তার ওধারে পার্কিং জোন-এ চলে এল। পুরোনো আমলের একটা ঢাউস ফোর্ড 
গাড়ি আর নতুন মডেলের ঝকঝকে একটা ফিয়েট সেখানে অপেক্ষা করছিল। কোনও গাড়িতেই 
ড্রাইভার নেই; ভাইরাই চালিয়ে নিয়ে এসেছেন। 

ঠিক হল মণিমোহনরা চার ভাই বড় ফোর্ড গাড়িটা করে ঢাকুরিয়া যাবেন। আর তিন 
কাকিমা সুজয়াকে নিয়ে যাবেন ফিয়েটে করে। ছোট কাকিমার ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে; ফিয়েট 
গাড়িটা তিনিই চালাবেন। 
'._ দু-দলে ভাগ হয়ে সুজয়ারা দুই গাড়িতে উঠল। ফোর্ড গাড়িটা আগে ছিল; বড়কাকা 
অবনীমোহন সেটা মুখ ঘুরিয়ে নতুন সাবওয়ে ঘুরে এগিয়ে চললেন। তার পেছনে চলল ফিয়েটটা। 


প্রফুল্ল রায়-_ পাঁচটি উপন্যাস-_২০ 


১৫৪ পাঁচটি উপন্যাস 


সুজয়াদের গাড়ির ফ্রন্ট সিটে রয়েছেন ছোট কাকিমা মণিকা আর সুজয়া নিজে। পেছনের 
সিটে বড় কাকিমা দীপ্তি এবং মোজো কাকিমা শোভা। 

তিন কাকিমাই- দীপ্তি, শোভা আর মণিকা দারুণ ফরসা, রূপসি এবং মোটাসোটা । তবে 
তুলনায় মণিকা অন্য দুই জায়ের মতো অতটা মোটা নন। দীপ্তি আর শোভার পরনে মুগার পাড় 
আর জলচুড়িবসানো ধবধবে সাদা খোলের টাঙ্গাইল শাড়ি। আর দুধ-রং গরদের ব্লাউজ । কপালের 
মাঝখানে সূর্যোদয়ের মতো সিঁদুরের প্রকাণ্ড টিপ; সিঁথিতেও ডগডগে সিঁদুর। হাতে গোছা-গোছা 
সোনার চুড়ি, গলায় পুরোনো আমলের সীতাহার। কানে মুক্তোর টাব, নাকে হীরের নাকফুল। মণিকা 
কিন্তু তার বড় দুই জায়ের মতো নন। তার সাজপোশাক অনেকটা একালের “মড' মেয়েদের মতো; 
ঘাড় পর্যস্ত ছাটা চুল, শ্লিভলেস ব্রাউজ, পায়ে উচু হিলের জুতো। জবড়জং গয়না পছন্দ করেন 
না মণিকা। গয়না বলতে তার গলায় সরু হার, বাঁহাতে সোনার ব্যান্ডে ঘড়ি, ডান হাতে একটা 
রুলি, কানে বা নাকে কিছু নেই। তিন কাকিমার পোশাক-রুচি আলাদ হলেও, সুজয়া জানে তারা 
সবাই খুব ভালোমানুষ-__সরল, স্ত্রেহপ্রবণ। কারও মধ্যেই তেমন ঘোরপ্যাচ নেই। 

সুজয়া জানে, এ-আমলে সব ফ্যামিলিই যখন ভেঙে-চুরে টুকরো-টুকরো হয়ে গেছে তখন 
কাকারা একই বাড়িতে একই ছাদের তলায় পুরোনো কালের জয়েন্ট ফ্যামিলির যাবতীয় মর্যাদা বজায় 
রেখে চলেছেন। এটা সম্ভব হয়েছে কাকিমারা মানুষ ভালো বলে। নইলে কবেই তাদের ফ্যামিলি 
চার টুকরো হয়ে যেত। প্রায় ছত্রিশ বছর বাদে মণিমোহন যে দেশে পৈতৃক বাড়িতে ফিরে এসে 
পুনর্বাসন পাচ্ছেন সেটাও কাকিমারা ভালোমানুষ বলেই সম্ভব হয়েছে। মণিমোহন প্রায়ই গর্ব করে 
বলেন, "পুরোনো আমলের যা কিছু বড় সবই তো ধ্বংস হয়ে গেছে-_বড় মানুষ, বড় প্রাণী, বড় 
কনসেপ্ট, বড় ফ্যামিলি, বড় আইডিয়াল। এখন মিডিওকার আর মিনিকিনদের রাজত্ব। এর মধ্যে 
আমাদের ফ্যামিলি একসেপশান। ইট*স স্পেসিমেন অফ দা গোল্ডেন পাস্ট। ফ্যামিলির প্যাটার্ন কী 
হওয়া উচিত, একালের ছেলেছোকরাদের আমাদের বাড়ি এসে দেখা উচিত। 

সুজয়া জানে, বড় কাকার একটিমাত্র ছেলে- -সম্ভীব, ডাকনাম নানু। নানু তার চাইতে দু- 
বছরের ছোট। তার মানে এখন তার বয়স চব্বিশের মতো। দু-বছর আগে সে স্কলারশিপ নিয়ে 
আমেরিকায় গেছে। মেজো কাকার এক ছেলে, এক মেয়ে। শান্তনু আর কাকলি। ডাকনাম শানু আর 
কলি। শানুর বয়স উনিশ-কুঁড়ি, কলির চোদ্দো-পনেরো। শানু খড়গপুরে আই আই টিতে মেকানিক্যাল 
এঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে; এটা থার্ড ইয়ার। কলি আসছে বার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবে। ছোট কাকার 
ছেলেপুলে নেই। 


গাড়ি দুটো সাবওয়ে ঘুরে বুকে হেঁটে-হেঁটে হাওড়া ব্রিজে উঠে এসেছিল। সুজয়ার চোখ 
উইন্ডক্কিনের বাইরে ফেরানো। 

এখন সাড়ে আটটার মতো বাজে। শেষ আশ্বিনের অঢেল মায়াবী রোদ চারিদিকে ছড়িয়ে 
আছে। তলায় গঙ্গা এখন জোয়ারের জলে ফেঁপে উঠেছে। দূরে পাতলা সিক্ষের মতো আবঙ্া কুয়াশায় 
বড়-বড় ক'টা জাহাজ। ক্যালকাটা পোর্টের ওপাশে বিরাট-বিরাট স্কাইন্রেপারগুলো সিল্গুয়েট ছবির 
চেহারা নিয়ে দীড়িয়ে আছে। হাওড়া ব্রিজ এই সকালবেলাতেই রীতিমতো জমজমাট। সুজয়াদের 
রিকশা ঢলের মতো আসছে যাচ্ছে। আর দু-পাশের ফুটপাথে হাজার-হাজার মানুষের স্রোত বয়ে 
যাচ্ছে। 

কাকা-কাকিমাদের বাদ দিলে এই শহরের কিছুই প্রায় চেনে না সুজয়া। অথচ এখানেই সে 
চিরকালের জন্য থাকতে এসেছে। উইন্ডস্ক্রিনের বাইরে তাক্ষিয়ে এই অপরিচিত শহরের যতটুকু চোখে 


আপন মনে ১৫৫ 


পড়ে, দেখে যাচ্ছিল সুজয়া। দেখতে-দেখতে এক ধরনের উত্তেজনাও অনুভব করছিল। 

এদিকে কাকিমারা, বিশেষ করে বড় কাকিমা দীপ্তি অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলেন। হাওড়া 
ব্রিজ, দূরে নিউ সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং, ক্যালকাটা পোর্ট, ওপারে বড়বাজার- গাইডের মতো সব 
চিনিয়ে-চিনিয়ে দিচ্ছিলেন সুজয়াকে। অন্যমনস্ককের মতো চারিদিকের দৃশ্যাবলি দেখতে-দেখতে 
হুঁহাী করে যাচ্ছিল সুজয়া। 

দীপ্তি একটু থামলে মেজো কাকিমা শোভা খুব আস্তরিক গলায় বলে উঠলেন “বড়দা আর 
তুই এখন থেকে আমাদের কাছে থাকবি, কি ভালো যে লাগছে! এত কাল পুণায় ছিলি, আমাদের 
ভীষণ খারাপ লাগত।” একটু থেমে আবার বললেন, “তোরা এলি, শুধু বড়দিই আর বাড়ি ফিরতে 
পারল না।' র 

বড়দি বলতে সুজয়ার মা। তার কথায় সবার মুখে বিষণ্ন ছায়া পড়ল। 

দীপ্তি গভীর গলায় এবার বললেন, “বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে যখন এলাম তার আগেই 
বড়দি পুণায় চলে গেছে। বড়দিকে নিয়ে একসঙ্গে এক বাড়িতে কোনওদিন আর থাকা হল না।' 

মায়ের কথা উঠলেই চোখে জল এসে যায় সুজয়ার। পারতপক্ষে সে তাই মায়ের প্রসঙ্গ 
তুলতে চায় না। কথাটা অন্যদিকে ফেরাবার জন্য বলল, “নানু এখনও আমেরিকাতেই আছে, বড় 
কাকিমা? 

দীপ্তি বললেন, হ্যা । 

“তিন বছর হয়ে গেল, না? 

না রে, চার বছরের স্কলারশিপ নিয়ে যা পড়তে গিয়েছিল সেই কোর্সটা শেষ করে একটা 
চাকরি পেয়েছে। পঁচিশ হাজার টাকা মাইনে ।” 

“কবে ফিরছে? 

দীপ্তি বললেন, “আরও এক বছর বাদে। তবে দেশে আসতে চায় না। যতবার আসার কথা 
লিখি ও জবাব দ্যায়, দেশে গেলে এত টাকার চাকরি কোথায় পাব? আমি বলেছি সেটি হবে না; 
ঘরের ছেলে ঘরে ফিরতেই হবে । আমার তাড়ায় শেষ পর্যস্ত রাজি হয়েছে।' একটু থেমে বললেন, 
“কলকাতাতেই একটা আমেরিকান ফার্মে লেখালিখি করে কথা আদায় করেছে এক বছর পর একটা 
ভালো ভ্যাকাঙ্সি হবে। তখন আসবে। হাজার দশেকের মতো মাইনে । আমি বলি যথেষ্ট।” 

ঠোট কামড়ে হাসতে-হাসতে পেছনের সিট থেকে শোভা বললেন, “জানিস টুকু, মেজদির 
প্রোমোশন হয়েছে।' 

বুঝতে না পেরে ঘাড় ফিরিয়ে সুজয়া বলল, “কী ব্যাপার % 

“মেজদি শাশুড়ি হয়েছে। 

“তাই নাকি! 

হ্যা রে, নানু একটা আমেরিকান মেয়েকে বিয়ে করেছে।' 

সুজয়া বলল, 'কই, আমাদের জানাওনি তো? 

দীপ্তি বললেন, “জানাব কি করে? দিন চারেক আগে তো হতভাগা ছেলের চিঠি পেয়েছি। 
লিখেছে বিয়ে করে বসে আছে। ভাবলাম তোরা তো ক'দিন বাদে আসছিসই; তখন জানাব।' একটু 
ভেবে, পরক্ষণে দ্রুত বলে উঠলেন, 'হিন্দুমতেই বিয়েটা করেছে; চার্চে গিয়ে না, নিউইয়র্কে আর্য 
সমাজিদের যে মন্দির আছে সেখানে রীতিমতো মন্ত্রতন্ত্র পড়ে বিয়ে হয়েছে। চিঠির সঙ্গে বিয়ের 
ছবিও পাঠিয়েছে। বাড়ি গিয়ে দেখাব। 

শোভা পেছন থেকে আবার বললেন, “জানিস টুকু, মেজদি এর ভেতর এক কাণ্ড করে 
বসেছে। 

সুজয়া জিগ্যেস করল, “কী? 


১৫৬ রশীচটি উপন্যাস 


“মেমসাহেব বউয়ের সঙ্গে কথা বলবার জন্যে স্পোকেশ ইলিংশের স্কুলে ভরতি হয়ে গেছে।' 

সুজয়া হাসতে লাগল। 

দীপ্তি বললেন, “আহা ।” বলেই হেসে ফেললেন, “তোরাই বল, হাজার হলেও ছেলের বউ, 
তার সঙ্গে দু-একটা কথা তো বলতে হবে। আমি বাপু বোকা বনতে রাজি নই। এক বছর আগে 
থেকেই তাই তৈরি হয়ে নিচ্ছি।' 

সুজয়া হাসতে-হাসতে এবার শোভার দিকে ফিরল, শানু আর কলি কেমন আছে মেজো 
কাকিমা? 

শোভা বললেন, "শানু ভালোই আছে। ও তো এখন খড়গপুরে। পুজোতে এসেছিল, ক'দিন 
থেকেই চলে গেল। কী একটা পরীক্ষা নাকি হবে। কলিটার তিন দিন ধরে জ্র। স্টেশনে আসবার 
জন্যে ঘ্যান ঘ্যান করছিল; আমি আনিনি।' 

মণিকা এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি স্টিয়ারিং যার হাতে তীর পক্ষে অন্যমনস্ক হওয়া 
বিপজ্জনক। সুজয়াদের দিকে তার কান থাকলেও চোখ ছিল উইন্ডস্ক্রিনের বাইরে। সেদিকে তাকিয়েই 
তিনি এবার বললেন, “জানো টুকু, ছোটদি ভেতরে-ভেতরে মেজদিকে হিংসে করতে শুরু করেছে 
দীপ্তি এবং শোভা তাকে “তুই' করেই বলেন, কিন্তু ছোট কাকিমা মণিকা অতটা পারেননি; তিনি 
তুমি" করে বলেন। হয়তো তাদের বয়সে বেশি তফাত নেই বলে। 

সুজয়া, দীপ্তি, এবং শোভা তিনজনেই হকচকিয়ে গেলেন। সুজয়া বলল, “হিংসে করবে কেন, 
মেয়ের শাশুড়ি হয়ে গেল যে! নিজের কপালে কী আসবে কে জানে! তবে__' 

“তবে কি 

'ছোটদিও সহজে ছাড়ছে না; ভেতরে-ভেতরে একটা দুর্দান্ত প্ল্যান করে ফেলেছে।' 

শোভা অবাক হয়ে বললেন, “আমি আবার কি প্ল্যান করলাম! 

মণিকা বললেন, “বা রে, তুমি সেদিন বলছিলে না- শানু খড়াগপুর থেকে বেরিয়ে এলে 
কানাডায়, আর কলি গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর লন্ডনে পাঠিয়ে দেবে।, 

হ্যা, বলেছিলাম। তাতে কি?, 

প্ল্যানটা তো ওইখানেই। মনে-মনে তোমার ইচ্ছে শানু একটা কানাডিয়ান মেয়ে বিয়ে করুক, 
আর কলি ব্রিটিশ ছেলে। কানাডা আর ব্রিটেনের শাশুড়ি হয়ে তুমি মেজদির ওপর টেক্কা দিতে 
পারবে। 

শোভা চোখ গোল করে বললেন, “ও মা, এই জন্যে আমি শানু-কলিকে বাইরে পাঠাতে 
চাইছি! কি শয়তান মেয়ে রে তুই! বলেই আলতো করে মণিকা ধবধবে সাদা ঘাড়ে এক চড় বসিয়ে 
দিলেন। 

নকল ব্যথায় উঃ” করে একটু শব্দ করেই হেসে উঠলেন মণিকা, “যদি ব্যাপারটা সত্যি- 
সত্যি ঘটে যায়, দারুণ একখানা কাণ্ড হয়, না কি বল টুকু।' 

সুজয়া হাসছিল। ঘাড় অনেকখানি হেলিয়ে দিয়ে বলল, হ্যা-_, 

মণিকা আবার বললেন, 'আমার তো ছেলেপুলে নেই। থাকলে ঘানা কি মোজান্থিকে গাঠাতাম। 
আফিকা থেকে ছেলের বউ কি মেয়ের জামাই আনতাম। তারপর আমাদের বাড়িতে ইন্টারন্যাশনাল 
শাশুড়িদের একখানা ব্র্যাঞ্চ অফিস খুলে বসতাম।' মণিকার বিয়ে হয়েছে বারো-তেকো বছর। 
ছেলেমেয়ে না থাকায় জন্য তার মধ্যে এক ধরনের দুঃখ রয়েছে। কিন্তু দুঃখটাকে তিনি বাইয়ে বেরিয়ে 
আসতে দ্যান না; হাসিখুশি এবং নানারকম মজা দিয়ে সবসময় ঢেকে রাখেন। 

কিছুক্ষণের মধ্যে সুজয়াদের ফিয়েট গাড়িটা হাওড়া ব্রিজ পেছনে ফেলে ব্র্যাব্রোর্ন রোডের 
ফ্লাই-ওভারের বিশাল ফ্রেম ছাড়িয়ে ডালহৌসি পেরিয়ে এখন ময়দানে এসে পড়ল। বাঁয়ে 


আপন মনে ১৫৭ 


চৌরঙ্গির নতুন স্কাইস্ক্রেপার কমপ্লেক্স; সামনে শেষ আশ্বিনের উজ্জ্বল সূর্যালোকে ভিক্টোরিয়া 
মেমোরিয়াল কি দূরে ক্যাগ্রিড্রালের চুড়াকে ছবির মতো মনে হচ্ছে। 

কয়েক গজ আগে আগে মণিমোহনদের প্রকাণ্ড ফোর্ড গাড়িটা চলেছে। পেছনের কাচ দিয়ে 
দেখা যাচ্ছে চার ভাই সমানে গল্প করে যাচ্ছেন। মাঝেমাঝে কোনও মজার কথায় হুল্লোড় বাধিয়ে 
হেসে উঠছেন। 

দীপ্তি পেছনের সিট থেকে বলে উঠলেন, “চার ভাই কেমন জমিয়েছে দ্যাখ__ 

শোভা বললেন হ্যা, এতদিন পর বড়দাকে পেয়েছে তো।, 

এই মুহূর্তে কিন্তু কাকিমাদের কথায় মন নেই সুজয়ার। সবুজ কার্পেটের মতো আশ্বিনের 
ময়দান, সারি-সারি হাই-রাইজ, আযসফান্টের ঝকঝকে রাস্তা, ডানদিকে দুরস্ত-গতি গাড়ির স্রোত 
দেখে যাচ্ছিল সে। নতুন কোনও জায়গায় এলে তার সব কিছুর দিকে চোখ যাওয়া স্বাভাবিক। 
সেই সঙ্গে আবছাভাবে অনেক কিছুই মনে পড়ছিল সুজয়ার। যেমন পুণা শহর, তার সুন্দর-সুন্দর 
রাস্তা, মিলিটারি হাসপাতাল, বিরাট কমপাউন্ড-ওলা তাদের প্রকাণ্ড বাংলো, ফুলের বাগান, টেনিস 
কোর্ট, বন্ধু-বান্ধবের মুখের প্রোফাইল ইত্যাদি ইত্যাদি। কি আশ্চর্য, এত সব দৃশ্য এবং মানুষের ভিড়ে 
মূণাল আর হীরকের মুখও ভেসে উঠছে। অথচ ওদের কথা মনে পড়ার কোনও কারণই নেই। 
কতক্ষণেরই বা আলাপ! তবু মনে পড়ছে, পরশু ওরা তাদের বাড়ি আসবে । মণিমোহন ঢালাও নেমস্তন্ন 
করে বসে আছেন। 

হঠাৎ ঘাড়ের পাশ থেকে আস্তে করে মণিকা বলে উঠলেন, “কী ভাবছ? 

চমকে মুখ ফেরাল সুজয়া', কই, কিছু না।' 

দুষ্টু মেয়ে, লুকোলে কি হবে। যা ভাবছ, আমি জানি।' 

“কী ভাবছি? 

'পুণার একটি বিশেষ বয়-ফ্রেন্ডের কথা। তাই না?” 

সুজয়া জানে ছোট কাকিমার মুখে কোনও কথা আটকায় না। তার ব্যবহার আচরণ একেবারে 
সমবয়সি বন্ধুর মতো। দু-বছর অগে ছোটকাকার সঙ্গে ছোট কাকিমা পুণায় গিয়েছিলেন, তখনও 
তার বয়ফেন্ডদের সম্বন্ধে অনেক কথা জিগ্যেস করেছিলেন। 

সুজয়া সাধারণ বাঙালি মেয়েদের মতো লাজুক না; খুবই স্মার্ট এবং ঝকঝকে । তবে এক্সটোভার্ট 
ধরনের নয়, অনেকাংশেই অস্তমূ্খী। পুণায় কো-এড কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময় 
অনেক ছেলের সঙ্গেই তার বন্ধুত্ব হয়েছিল। তার মধ্যে দুটি ছেলে, একজন মারাঠি, আরেকজন সিন্ধি__ 
অমল পুনেকর এবং সুরেশ ভিমানিকে তার খুব ভালো লেগেছিল। দুজনেই খুব ব্রাইট, হাদয়বান 
আর হাসিখুশি । ওদের দেখলে ভালো না লেগে উপায় নেই। 

একটি ছেলের সঙ্গে আরেকটি সমবয়সি ছেলের বা একটি মেয়ের সঙ্গে আরেকটি সমবয়সি 
মেয়ের যেরকম বন্ধুত্ব হয়, সুজয়ার সঙ্গে অমল আর সুরেশের সম্পর্ক ছিল সেইরকম। ছোট কাকিমা 
যে বিশেষ বন্ধুত্বের ওপর জোর দিলেন আদৌ তেমন কিছু নয়। সুজয়া হেসে হেসে বলল, “বয়ফেন্ড 
আমার অনেক আছে। তবে স্পেশাল কেউ নেই।' 

“বিশ্বাস করতে বলছ? 

“নিশ্চয়ই ।' 

“তা হলে পুণায় হৃদয়টি রেখে আসোনি? পিওর আনটাচড হার্টটি নিয়ে ঘরের মেয়ে ঘরে 
ফিরে এসেছ? 

সুজয়ার মজা লাগছিল। সে বলল, “তাই তো মনে হয়।' 

পেছন থেকে দীপ্তি এবার বলে উঠলেন, “যাক, আমাদের কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেল।' 

মুখ ফিরিয়ে সুজয়া জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল, “মানে? 


১৫৮ পাঁচটি উপন্যাস 


“মানে বড়দা কম্মাস ধরেই চিঠি লিখছিলেন ত্বার জন্যে যেন একটা ভালো জামাই খুঁজে 
রাখা হয়। তা বাপু তুই যখন পুণাতে প্রেম-ট্রম করে আসিসনি তখন আর কোনও সমস্যাই রইল 
না। তোর তিন কাকা ভালো ছেলের খোঁজে সারা কলকাতা চষে ফেলেছে। দু-তিনটি মনের মতো 
ছেলেও পাওয়া গেছে। তোরা এসেছিস; এবার তাদের আসতে বলা হবে। নিজের চোখে দ্যাখ, 
কথা বল। পছন্দ হলে শিগগিরই শুভকাজ লাগিয়ে দেব।' 

সুজয়া অবাক। মণিমোহন তার কাছে কিছুই লুকোনো না। কিন্তু গোপনে-গোপনে তার বিয়ের 
ব্যাপারে কাকা-কাকিমাদের যে কিছুদিন ধরে চিঠি লিখে যাচ্ছিলেন সেটা কিন্তু একবারও বলেননি । 
অথচ বিয়ের ব্যাপারে মনের দিক থেকে সুজয়ার এই মুহূর্তে একেবারেই সায় নেই। সব মেয়েই, 
গেয়োই হোক আর শহুরে “মড'ই হোক, বিয়ের কথা একটা সময়ে ভাবে; সেভাবে তৈরিও হয়। 
কিন্ত সুজয়া এখনও বিয়ে নিয়ে কিছুই চিস্তা করেনি। 

দীপ্তির পাশ থেকে শোভা বলে উঠলেন, ুকুর বিয়েতে সানাই আনা হবে, ব্যান্ড-পার্টি আনা 
হবে। বাড়ির বড় মেয়ের বিয়ে; যত ঘটা করা যায়, করব” একটু থেমে বললেন, “নানুটা কোথায়, 
কতদুরে আর্ধসমাজিদের মন্দির গিয়ে বিয়ে করল। আমরা একটু আনন্দও করতে পারিনি। এবার 
সেটা পুষিয়ে নেব। তিন শাশুড়ি মিলে বাসরঘরে জামাইয়ের সামনে যা নাচ নাচব না! 

মণিকার এক চোখ উইন্ডস্ক্রিনের বাইরে থাকলেও, আরেকটা চোখ ছিল সুজয়ার দিকে । তিনি 
বললেন, “কি, বিয়ের কথায় একেবারে চুপ করে গেলে যে? 

সুজয়া বলল, কী বলব! তোমরাই তো বলে যাচ্ছ।” 

দীপ্তি বললেন, “বড়দা কিন্তু বেশিদিন দেরি করবেন না। কয়েক দিন পরই ছেলেদের বাড়িতে 
খবর দেওয়া হবে।' 

মণিকা মজা করে বললেন, “আমার তো ইচ্ছে সব ছেলেকে একসঙ্গে ডেকে একেবারে স্বয়ংবর 
সভা বসিয়ে দেব।' | 

সুজয়া আস্তে করে বলল, “বিয়ের কথা কিন্তু এখনও আমি ভাবিনি। ওসব আপাতত থাক।' 

তিন কাকিমাই অবাক হয়ে গেলেন। দীপ্তি বললেন, “থাকবে কি রে! 

“আমার রিসার্চ করার ইচ্ছে আছে। ডক্টরেট না করে আমি বিয়ে-টিয়ে করছি না।, 

“বিয়ের পরও তো রিসার্চ করা যায়।, 

“তা হয়তো যায়। তবে আমি রিসার্চ শেষ না করে বিয়ে করছি না। 

কাকিমারা বুদ্ধিমতী। বুঝলেন বহুকাল বাদে কলকাতায় ফিরে যে এখনও বাড়ি পর্যস্ত পৌঁছিয়নি 
তার ওপর বিয়ে নিয়ে জোরাজুরি করা ঠিক হবে না। তারা প্রায় একইসঙ্গে বলে উঠলেন, “ঠিক 
আছে, ঠিক আছে। ওসব কথা পরে হবে। 

গাড়ি দুটো কিছুক্ষণ বাদে হাজরা, রাসবিহারী, সার্দান আভেনিউ আর গড়িয়াহাটা ব্রিজ পেরিয়ে 
ঢাকুরিয়ায় পৌঁছে গেল। 


তিন 


যোধপুর পার্কের উলটোদিকে ঢাকুরিয়ার পুরোনো পাড়ায় সুজয়াদের বিরাট কম্পাউন্ডওলা পুরোনো 
আমলের প্রকাণ্ড তেতলা বাড়ি। বাড়িটার গথিক স্ট্রাকচার, মোটা মোটা গোল থাম, বিশাল-বিশাল 
জানলা, পঙ্থের কাজ করা সিলিং এবং দেওয়াল। ভারী-ভারী নকশা-কাটা দরজায় দামি পরদা। এ- 
বাড়ির আসবাবপত্রেও পুরোনো আমলের ছাপ। নানারকম কারুকাজ-করা বার্মা টিমের ভারী-ভারী 
খাট, আয়না-বসানো প্রকাগু-প্রকাণ্ড আলমারি, শ্বেত পাথরের টেবল, সিংহাসনের মতো একেকটা 


আপন মনে ১৫৯ 


চেয়ার, সিলিং থেকে ঝাড়লগ্ঠন নেমে এসেছে। এক কালে এগুলোর ভেতর মোম জুলত, এখন 
বিজলি বাতি। . 

বাড়ির সামনের দিকে একধারে ফুলের বাগান, আরেক ধারে সবুজ ঘাসের লন; ফীাকে- 
ফাকে পাথরের স্ট্যাচু। 'লন' আর বাগানের মাঝখান দিয়ে নুড়ির রাস্তা চলে গেছে। রাস্তার গা- 
ঘেঁষে সারি-সারি পাম গাছ। 

দু-পা গেলেই সুবোধ মল্লিক রোডের ওপর এবং ওপারে নতুন আর্কিটেকচারের অগুনতি 
বাড়ি উঠেছে। যোধপুর পার্কে উঠেছে নানা ধরনের মালটি-স্টোরিড ত্যাপার্টমেন্ট হাউস। আযাসফান্টে 
মোড়া বড় রাস্তা দিয়ে উর্ধ্বশাসে ছুটে যায় ডবল-ডেকার, ট্যাক্সি, মিনিবাস, প্রাইভেট কার। ব্যস্ততা, 
শব্দ, চিৎকার, হইচই এবং এ-কালের যাবতীয় আক্রমণের মাঝখানে সুজয়াদের বাড়িটা নাইনটিনথ 
সেঞ্চুরির অলস মন্থর পুরোনো গন্ধ গায়ে মেখে একটা দ্বীপের মতো যেন দাঁড়িয়ে আছে। 

পরশু দিন সুজয়ারা এসেছে। তেতলায় দক্ষিণখোলা বড় একখানা ঘর তাকে দেওয়া হয়েছে। 
ঘরটার সঙ্গেই আ্যাটাচড়্‌ বাথ। তার পাশের ঘরখানা মেজোকাকার মেয়ে কলির। সুজয়া আসার পর 
কলি ঠিক করেছে সুজয়ার সঙ্গে এক ঘরে থাকবে। 

কাল আর পরশু সুজয়াদের আসার খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজনরা অনেকেই এসেছিলেন। 
শ্যামবাজার থেকে এসেছিলেন বড় মাসি, বড় মেসো আর তাদের ছেলেমেয়েরা। নিউ আলিপুর 
থেকে মণিমোহনদের খুড়তুতো বোন আভা পিসি, আর পিসেমশাই। এ ছাড়া সুজয়ার দুই মামা 
এবং মামিরা, অবনীমোহন বিজয়মোহন আর রামমোহনের শ্বশুরবাড়ির অনেক আত্ত্ীয়স্বজনও তাদের 
সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। এদের কাউকেই আগে বিশেষ দ্যাখেনি সুজয়া। কিংবা বাবার সঙ্গে 
দু-চারবার যখন কলকাতায় এসেছে তখন দেখে থাকলেও মনে নেই। তারা পুণা থেকে চলে আসায় 
সবাই খুব খুশি। ওদের আত্তরিকতা সুজয়াকে মুগ্ধ করেছে। যারাই দেখা করতে এসেছেন তারাই 
সুজয়াদের তাদের বাড়ি যাওয়ার কথা বলে গেছেন। মণিমোহন প্রত্যেককে কথা দিয়েছেন, সবার 
বাড়িতেই যাবেন। 

দুটো দিন নানা প্রিয়জনের ভিড়ে কিছু ভাবারই সময় পায়নি সুজয়া। তা ছাড়া ওই ভিড়ের 
মধ্যেই বড় কাকিমা নানু এবং তার আমেরিকান বউ-এর ছবি দেখিয়েছেন। ছবি কি একটা দুটো! 
কালারে তোলা কয়েক ডজন! আর্ধসমাজিদের মন